আট
বিশ্ব ভরা প্রাণ
প্রথমেই স্বাভাবিক ভাবে যে প্রশ্নটা আসে, সসারগুলো যদি সত্যিই ভিন গ্রহের বাসিন্দাদের যান হয় তবে ওরা আসে কোত্থেকে ?
সত্যিই কি মহাবিশ্বের আরও কোথাও কোন বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব থাকা সম্ভব ?কত বড় আমাদের এই মহাবিশ্ব? কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ ?
মহাবিশ্ব কত বড় সেটা মাপার জন্য দূরত্ব মাপার সাধারণ কোন একক বা উপাদান ব্যবহার করা সম্ভব না। এক কথায় অসম্ভব। সেইজন্যই মহাশূন্যের দূরত্ব মাপার জন্য আমরা ভিন্ন একটা পদ্ধতি ব্যবহার করি। সেটার নাম আলোকবর্ষ।
আলোর রশ্মি এক সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল যেতে পারে। যা কিনা ৩ লক্ষ কিলোমিটার। অর্থাৎ আলো ১ সেকেন্ডে সাত বার পৃথিবীকে ঘুরে আসতে পারে।
সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় নেয় আট মিনিট। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব আট আলোক মিনিট।
মোটামুটি এই হচ্ছে হিসাব।
আলোর গতি এক বছরে যতটা দূরত্ব অতিক্রম করে সেতাই হচ্ছে এক আলোক বর্ষ। এটা কিন্তু সময় মাপার হিসাব নয়। দূরত্ব মাপার হিসাব।
এক বছরে আলো যায় ছয় ট্রিলিয়ন মাইল।
অসম্ভব ভয়াল সেই দূরত্ব !
এখন পৃথিবীকে কেউ যদি মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসাবে কল্পনা করে সে মারাত্নক রকমের ভুল করবে।
এই মহাবিশ্বে কোন কিছুই কেন্দ্র নয়। কারন এটার কোন সীমা পরিসীমা নেই। আমরা জানি না, কোথায় এর শুরু আর কোথায় এর শেষ ।
কখনও জানব, সে সম্ভবনাও নেই।
অসীম অন্ধকারে ডুবে আছে এই মহাবিশ্ব। সেই তুলনায় গ্রহ নক্ষত্রগুলো অনেক ভাগ্যবান। ওদের তাপ আলো আর আকৃতি আছে অন্তত।
অনন্ত এই মহাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে আছে কোটি কোটি অথবা তারও বেশি গ্যালাক্সি। ওদের সঠিক সংখ্যা কত তাও আমরা জানতে পারব না । হ্য়তো কক্ষনই না । হতে পারে চিরকাল অচেনা অধরা রয়ে যাবে ওরা। এই গ্যালাক্সিরা কেউ কেউ নিঃসঙ্গ।
ঈশ্বরের মত নিঃসঙ্গ। প্রেমিকের মত নিঃসঙ্গ। কবির মত নিঃসঙ্গ।
আর ওরা বেশির ভাগই দল বেঁধে জটলা হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি। অথবা ভেসে যাচ্ছে।
কোথায় ?
তাই বা কে বলবে?
গ্যালাক্সিগুলো কিভাবে এত ঠাসা ঠাসি করে একসাথে রয়েছে সেটাও এক বিস্ময় ।
মোটামুটি অনুমান করা যায় মানে হিসাব কষে , এই মহাজগতে রয়েছে মোট একশো বিলিয়ন গ্যালাক্সি। একশো বিলিয়ন মানে দশের পর এগারোটা শূন্য বসালে হবে সেই সংখ্যাটা । আর প্রত্যেকটা গ্যালাক্সিতে রয়েছে সূর্যের মত একশো বিলিয়ন নক্ষত্র।
এক একটা গ্যালাক্সিতে কতগুলো করে গ্রহ থাকতে পারে ?
আনুমানিক হিসাব ১০এর পরে ১১টা শূন্য x ১০ এর পর ১১টা শূন্য = ১০ এর পরে ২২টি শূন্য । অর্থাৎ মোট গ্রহের সংখ্যা দশ বিলিয়ন ট্রিলিয়ন।
এত বিপুল সংখ্যক গ্রহ মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকার পরও আমরা কেন ভাবছি পৃথিবীই একমাত্র জায়গা যার মধ্যে প্রাণ আছে?
বাদবাকি সব গ্রহ মৃত ।
বা শূন্য ।
কেউ নেই। কিচ্ছু নেই।
এ রকম ভাবাটা কতখানি যুক্তিসম্মত ?
কতটুকু খোঁজ নিতে পেরেছি আমরা সেই গ্রহগুলো সম্পর্কে ?
কেন ভেবে অনাবিল আনন্দ পাচ্ছি, বিশাল এই জগতে আমরাই একমাত্র অস্তিত্ব ?
অন্য কোন গ্যালাক্সি থেকে দেখলে আমাদের এই সৌর জগত , পৃথিবী, সূর্য সবই মহাশূন্যের বুকে একটা ধূলা কণার চেয়ে ও প্রাণহীন , বিবর্ণ আর অর্থহীন বলে মনে হবে।
যত দূরে যাবেন ততই অর্থহীন - গুরুত্ব হীন একটা ধূলার কণার মত লাগবে প্রিয় এই মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথটাকে।
বহু দূরে কোথাও যদি কোন বুদ্ধিমান প্রাণী থাকে ওরা ভাবতেও পারবে না এখানে আছে আশ্চর্য নীল এক গ্রহ । আছে বিচিত্র সব প্রাণ। আছে মানুষের মত অদ্ভুত এক প্রাণী যাদের আবার চেতনা আর আবেগ নামে কি কি সব অদ্ভুত অনুভূতি রয়েছে।
আমাদের এই গ্যালাক্সি থেকে যদি বহু দূরে কোথাও চলে যেতে পারি, সেখান থেকে ফিরে তাকালে দেখতে পাব , নিজের বাহুগুলো নিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরছে আমাদের এই গ্যালাক্সি । অনন্ত সময় নিয়ে ঘুরছে ওর বাহুগুলো।
আর আমরা অবাক হয়ে দেখব , গ্যালাক্সির বাহুগুলোর মাঝে মাঝেও ছড়িয়ে আছে চুমকির মত অসংখ্য নক্ষত্র। এই নক্ষত্রগুলোও এক একজন ধারন করতে পারে এক ট্রিলিয়ন পৃথিবী !
এ এক অদ্ভুত জগত।
সামান্য কয়েকটা নক্ষত্র নিঃসঙ্গ। আমাদের সূর্যের মত। বাদবাকি সবার সঙ্গী সাথী রয়েছে। বেশির ভাগ সূর্যই জোড়া সূর্য। জ্বলছে ওরা। নীল নক্ষত্রগুলো জন্ম নিয়েছে মাত্র ।
শিশু নক্ষত্র।
অসম্ভব রকমের উত্তাপ রয়েছে ওদের ভেতরে।
হলুদ নক্ষত্রগুলো মধ্য বয়স্ক। মহাজাগতিক জীবনে অনেক কিছুই দেখেছে ওরা। লাল নক্ষত্রগুলো পৌঁছে গেছে ওদের জীবনের শেষ প্রান্তে । শৈশবের কথা ভাবে ওরা ?
আর ছোট কালো সাদা নক্ষত্রগুলো জীবনের হাল ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছে।
ওদের মৃত্যু সময়ের ব্যাপার মাত্র ।
প্রত্যেকটা নক্ষত্রই যেন বিচ্ছিন্ন।
ওখানে কোথাও কোন গ্রহে প্রাণের আবির্ভাব ঘটলে কতটা সময় লাগবে বিবর্তনের সব পথ ঘাঁট হেঁটে সভ্য হতে ?
কখন পারবে ওরা, জ্ঞানে বিজ্ঞানে উন্নত হয়ে মহাশূন্য ভ্রমণে বেরিয়ে যেতে ?
কখন ওরা ভাবতে শিখবে, ওরা একা নয় ?
বুঝতে পারবে, ওদের মত আরও অনেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসীম এই অন্ধকারে ।
বেশির ভাগ নক্ষত্র ঘিরে থাকতে পারে অসংখ্য গ্রহ। যেগুলোতে প্রাণের ছোঁয়া লাগতে আরও কোটি কোটি বছর সময় লাগতে পারে। অফুরন্ত এই সময়ের মধ্যে কোথাও কোথাও হয়তো হয়ে গেছে সভ্যতার চাষাবাদ।
ওরা ওদের গ্রহে তৈরি করেছে অপূর্ব সব নগরী।
সেই সব বিচিত্র বাসভূমি দেখতে কেমন কে জানে ?
ওদের আকৃতি কেমন তাই বা কে জানে !
কী উপাদানে তৈরি ওদের জৈবিক দেহ ?ওরাও কি শিল্প কলার চর্চা করে ?
গান গায় ? কবিতা পড়ে ?
ওদের ইতিহাস কেমন ? আমাদের মত যুদ্ধবাজ ? নিশ্চয়ই ওদেরও রয়েছে ইতিহাসের উত্থান পত্তন। ধর্ম বা দর্শন রয়েছে ? মহাশূন্যের বুকে ওরা আমাদের আত্মীয় হতে পারে ? কসমিক ব্রাদার ?
তবে এটাও সত্যি। দূরে... বহুদূরে অনন্ত মহাশূন্যে চলে গেলে আপনি পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য এক অদ্যম টান অনুভব করবেন। পুরো মহাবিশ্ব বাজি ধরে বলতে পারি আমি। পৃথিবীর তুলনা শুধু পৃথিবীই।
আমাদের বাড়ি যে ! প্রাচীন অনেক ধর্মে সেইজন্য বলতো পৃথিবী আমাদের মা।
অতি প্রাচীন কালেও আমাদের অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিগন বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্ব মোটেও ফাঁকা কোন জায়গা নয়।
১৬০০ সালেই ইতালীয় দার্শনিক জিওর্দানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়। উনার দোষ, উনি লিখেছিলেন - ছায়াপথ আসলে অসংখ্য গ্রহ আর নক্ষত্রের সমষ্টি। আর সেইসব গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে।
বায়োকেমিস্ট ডঃ এস মিলারের মতে - কেন আমরা ভাবছি বিশাল এই মহাবিশ্বে আমরাই একমাত্র জীবিত প্রাণী ?মহাশূন্যে কত অসংখ্য গ্রহ শীতল হয়ে গেছে পৃথিবী জন্মের বহু বহু বছর আগেই। কত রকমের সভ্যতা সেখানে তৈরি হয়েছে কে বলবে ?
কমপক্ষে এক লক্ষের চেয়েও বেশি গ্রহ আছে যেখানে পৃথিবীর চেয়ে আরও বেশি আরও উন্নত মানের সভ্যতা রয়েছে।
অনেক যুক্তি দেখায় সব গুলো গ্রহের পরিবেশ কী পৃথিবীর মত হবে ? না হলে, সেখানে প্রাণের বিস্তার হবে কেমন করে ?
সভ্যতাই বা কেমন করে তৈরি হবে ?
আমরা এত দিনে অন্তত এইটুকু বুঝতে পেরেছি , জীবন ধারনের জন্য সঠিক পরিবেশ বা আবহাওয়া কোনটা সেটার সঠিক কোন সংজ্ঞা নেই। আমাদের পরিচিত এই পৃথিবীর জীব জগতের বৈচিত্র দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। চেনা কোন কিছুর ছকের সাথে মিলে না ওরা।
অক্টোপাসের কথাই ধরা যাক।
পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাসের সাথে মোটেও খাপ খায় না এই প্রাণী।
এমন অনেক জীবাণু আছে, বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন দরকার হয় না। অথবা পারমাণবিক রিঅ্যাক্টের তেজস্ক্রিয় জলেও দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। ব্যাঙকে ফ্রোজেন করে বরফ বানিয়ে রেখে আবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে দিলে জ্যান্ত হয়ে লাফাতে পারে।
আফ্রিকায় এক রকমের পাঁকাল মাছ আছে যেগুলো খাবার আর জল ছাড়াই শক্ত শুকনো মাটির ভেতরে দীর্ঘ চার বছর ধরে মড়ার মত পড়ে থাকতে পারে। বৃষ্টির মৌসুমে আবার সিমেন্টের মত শক্ত শুকনো মাটির তলা থেকে বেড়িয়ে আসে বাইরে।
কাজেই ভিনগ্রহে প্রাণের জন্য পরিবেশ কি রকম হওয়া উচিৎ বা সেখানে প্রাণী থাকলে ওরা দেখতে কেমন হবে সেটা নিয়ে চূড়ান্ত কথা বলার মত সময় আসেনি এখনও।
বিচিত্র এই মহা শূন্যে ব্যাখ্যা আর যুক্তির বাইরেই হয় সব কিছু ।
আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার।
আজ আমাদের যে দৈহিক রুপে আমরা নিজেদের আবিস্কার করছি একদিনে সেই পথ পেরিয়ে আসিনি আমরা।
বিবর্তনের সুদীর্ঘ এক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে সেজন্য। আর এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার সময় প্রকৃতি যদি অন্য রকম আচরণ করতো তবে আমরা দেখতে হয়ে যেতাম অন্য রকম।
এখনকার মত না মোটেও।
কেমন হতাম সেটা কল্পনাও করা প্রায় অসম্ভব ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন