সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেকগুলো  বছর আগে  টিনের এক  কৌটা পেয়েছিলাম  ক্রিসমাসের উপহার 

 অবাক হয়েছিলাম দেখে  একি আজব চিজ।

সুভেনিয়র মনে হলেও ,  খুলে দেখি,  ভেতরে মসলা দেয়া খোসা ছড়ানো  ঝিনুক  

এত সুন্দর দেখতে , বলার মত না   আর হ্যাঁ ,  তক্ষুনি খেয়ে ফেলতে হবে না মোট পাঁচ বছর রাখা যাবে ! কোন তাড়া নেই  

 

হায় হায় !

ভেবে অবাক

মানুষ কেমন করে এই কায়দা আবিস্কার করল ?

মানে খাবার সংরক্ষণের এই কায়দা ?

খোঁজ নিলাম ভাল করে  

 নাহ ,  এর ইতিহাস অনেক প্রাচীন 

 সেই গুহাযুগেই মানুষ আবিস্কার করে,  সব সময় লাগাতার খাওয়া পাওয়া যাবে না কখনও প্রচুর খাবার পায় কখনও বেকার খালি হাতে ফিরতে হয়   

 টাটকা পেলে খায় না পেলে উপোষ 

 

তবে একটা সময় ,  রোদে শুকিয়ে     বা লবণে মাখিয়ে মাছ- মাংস জমিয়ে  রাখার কায়দা ঠিকই আবিস্কার করে ফেলে 

 লবণ মধ্য যুগে এত দরকারি হয়ে যায়,   রোমান সেনাবাহিনীর বেতন দেয়া হত লবণ দিয়ে লবণকে বলতো সেলারি সেই থেকে সেলারি মানে বেতন

 

শৈশবে  মা-কে দেখেছি,  মাংস আর মাছে লবণ আর মসলা মাখিয়ে সুন্দর করে রেখে দিত  ফ্রিজ ছিল না আমাদের 

গ্রামের বাড়িতে পরিচিত একজনকে দেখেছি,  মাটির ভাঁড়ে লবণ আর মাছ স্তরে স্তরে রেখে  দিয়ে ভাঁড়ের মুখ বন্ধ করে রেখে দিত অনেক দিন রাখা যেত সেই মাছ 

নষ্ট হত না 

এই কায়দাটাও বেশ প্রাচীন রোমান সামাজ্যে অমন করত মাটির জারে করে জলপাই আর মাছ নিয়ে যেত দূর  সাগর যাত্রায়   

বুনো পশ্চিমের রেড ইনডিয়ান বা অ্যাপাচিরা আগুনের ধোঁয়া দিয়ে   মাছ-   মাংস শুকিয়ে,  বর্ষার বা শীতের জন্য জমিয়ে রাখত 

ভুট্টার দানা পাথরের উপর রেখে গুঁড়িয়ে কেমন আটা বা ময়দা  বানিয়ে রেখে দিত চামড়ার ব্যাগে 

 

  আমরা গল্পে পড়তাম,  আরব ব্যবসায়ীরা শুকনো রুটি নিয়ে কাফেলা যাত্রা করতো এইসব রুটি কখনও কখনও তিন মাসের বেশি সময় ভাল থাকতো জলে ভিজিয়ে নিলেই হল 

ব্যবসায়ীরা দেখল ,   মসলা হচ্ছে এমন  একটা জিনিস যেটা শুকিয়ে নিলে ওজনে কমে যেত  দামে যেত বেড়ে 

কাজেই  সারা দুনিয়ার সব  চতুর ব্যবসায়ীরা মসলার জন্য পেল্লাই সব জাহাজ নিয়ে সাগরে ভেসে পড়ে

 

ক্রিস্টোফার কলম্বাসও তেমন

তবে যাত্রা পথে কলম্বাস বুঝে ছিলেন তাজা খাবারের ঝক্কি মাত্র কয়েক সপ্তাহেই জাহাজের সব তাজা সবজি আর ফল শেষ 

মোদ্দা কথা,  যাত্রা পথে খাবারের সমস্যা হবেই

 বিশেষ করে তখনকার সৈন্যদল যখন লড়াইয়ে যেত, যত সময় লড়াইয়ে ব্যয় হত তারচেয়ে বেশি সময় নষ্ট হত খাবার জোগাড়ের জন্য

 

খাবার সংরক্ষণের জন্য প্রথম চিন্তা ভাবনা করেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট উনি ঘোষণা দেন , খাবার সংরক্ষণের কায়দা কেউ আবিস্কার করতে পারলে তাকে বারো হাজার ফ্রাঙ্ক পুরস্কার দেবেন

১৮০৯ সালের কথা  তো মেলা টাকা 

 

নিকোলাস আফেয়ার নামে এক ভদ্রলোক, পেশায় বাবুর্চি , আবিস্কার করে ফেললেন একটা আদ্ভুত কায়দা

কি সেটা ?

খাবার দাবার টিনের কৌটার ভেতরে রেখে ,  কৌটার মুখ বন্ধ করে,  ধীরে ধীরে গরম করে রেখে দিলে সেই খাবার অনেক বছর ভাল থাকে

এই সামান্য কায়দা যে কত বড় উপকারে আসবে কেউ জানত না তো নিকোলাস সাহেব তখন  আমাদের  নেপো মানে নেপোলিয়নের কাছ থেকে পুরস্কারের টাকা  পেয়েছিলেন      

কিন্তু তখনও বানিজ্যিক ভাবে কৌটা ভর্তি খাবার বাজারে ছাড়া হয়নি  তখনও হরেক পদের সবজি  ভিনেগারে চুবিয়ে আচার ফাচার বানিয়ে  বয়ামে ভর্তি করে  বিক্রি হত

পিটার ডুরেন্ট , এক ইংরেজ ভদ্রলোক ,  টিনের কৌটায় খাবার ভর্তি করে বাজারে বিক্রি করার জন্য বেশ চিন্তা ভাবনা করা শুরু করেন

১৮২০ সালে তার আইডিয়া কাজে লাগিয়ে উইলিয়াম আন্ডারউড নামে এক অ্যামেরিকান,  বোস্টন শহরে টিনের কৌটার এই কারবারটা শুরু করেন তবে তখন তত বেশি মেশিন ছিল না সবই হাতে বানানো হত দাম পড়তো বেশি

 টাকা কড়িওয়ালা মানুষ জন শুধু কৌটার ভর্তি এইসব  জিনিস কিনতে পারতো

সন্দেহ নেই বেশ একটা ভাব নিয়েই তারা কিনত লোকজন গোল্লা গোল্লা চোখে চেয়ে দেখত

 

দিন সমান যায় না ডে নট গো সমানে সমানে

মেশিন আবিস্কার হল এক ঘণ্টায় যত কৌটা বানানো যায় আগে সারা মাসে ততটা বানানো হত ব্যাপারটা কিন্তু  সাংঘাতিক  

১৮৭৪ সালে আরেকটা দরকারি জিনিস আবিস্কার হল প্রেসার কুকার এখন এই পেল্লাই সাইজের প্রেসার কুকারের ভেতরে কয়েক শো কৌটা ভর্তি খাবার ঢুকিয়ে দিলে মাত্র এক মিনিটে রান্না হয়ে যেত, যেটা আগে এক ঘণ্টার মত লাগত

 

 কৌটার খাবারে বৈচিত্র এলো এইবার  গুণগত মান হল ফাটাফাটি রকমের ভাল বাজারে  পাওয়া যেতে লাগল অহরহ  

আর দাম গেল কমে

 

এখানে একটা মজার কথা না বলে পারছি না আজকাল বাজারে যে ক্যান ওপেনার দেখি সেটা কিন্তু তখন ছিল না লোকজন হাতুড়ি বাটালি দিয়ে ঠুক ঠাক করে ,  বেশ কষ্ট করেই কৌটা খুলে খাবার বের করতো

 

কি আর করা ?

 

 ১৮৫৮ সালের  জানুয়ারি  

  আবিস্কার হয়  ক্যান ওপেনার এজরা জে. ওয়ার্নার নামে এক ভদ্রলোক অনেক খেটে পিটে মাথা ঘামিয়ে বানান জিনিসটা 

দেখতে বিদঘুঁটে ছিল সে সব সায়েন্স ফিকশন মুভির অস্ত্রের মত 

পরে অনেকেই নানান ডিজাইন বের করে বাজারে ছেড়েছিল  

যারা ক্যানের খাবার কিনবে তারা অবশ্যই একটা হলেও ক্যান ওপেনার কিনবে  আর এমন আশ্চর্য কি !   এখন সুন্দর সব সাইজে ক্যান ওপেনার বের হয়েছে খুব কাজের জিনিস

 হিসাবে শুধু মাত্র আমেরিকায় প্রতি দিন পাঁচশো বিভিন্ন ধরনের খাবারের মোট  একশো মিলিয়ন টিনের কৌটা খোলা হচ্ছে

প্রতিদিন !

তো ,  ধীরে ধীরে  কৌটা ভর্তি খাবারের জগত ফুলে ফেঁপে উঠলো 

ব্যাপারটা সম্ভব হয়েছিল নতুন নতুন সব যন্ত্রপাতি আবিস্কার হবার জন্য 

দক্ষ লোকজন ঢুকে পড়লো এই কাজে 

জড়িত আছে খামারের মালিক যত্ন করে ফসল ফলানোর শেষে নিজে খবর দেয় টিনের খাবারের কম্পানিতে  কোম্পানির লোক  এসে নিয়ে যায় ট্রাক ভর্তি করে 

সাগর থেকে বেশি মাছ ধরা হলেও ভয়ের কিছু নেই

নষ্ট হবে না একটা পিচ্চি হেরিং মাছও খবর দাও বা নিয়ে যাও টিনের কোম্পানিতে সেই মাছ চলে যাবে কত দূরের দেশের রান্নাঘরের সেলারে

কারখানায় মালসামান আসা মাত্র পরিষ্কার হাতে খাবার বাছাই করে ওরা   ধুয়ে পরিষ্কার করে মেশিন দিয়ে সুবিধে মত সাইজে কেটে কৌটায় ভর্তি করে

সতর্ক নজর রাখা হয় প্রতিটা ধাপে

যন্ত্রপাতি এত নিখুঁত ভাবে কাজ করে  দেখে অবাক হতে হয়

সবজি, ফল , খাবার পরিষ্কার করছে, ধোয়া হচ্ছে  এবং সেইসব খাবারে  নানা কায়দা করে লবণ বা দরকারি জিনিস দিয়ে মাখিয়ে বা সুপে ভিজিয়ে শেষ মেষ বানানো হচ্ছে নিখুঁত একটা টিনের কৌটা

প্রত্যেকটার ওজন সমান

গরম করার সময় আরও সতর্ক থাকতে হয় কোন খাবার গরম করতে হয় মাত্র এক মিনিট কোন খাবার ঘণ্টা দুই 

কী নেই ?

মটরশুটি , বরবটি, মাসরুম, পালং শাক-  সেটা খেয়ে ক্যাপ্টেন পাপাই মারামারি করে আছে  হরেক পদের মাছ , মুরগি হতে   বুনো হরিণের  মাংস, ঘন নীল ব্লু বেরি , সোনালী ভুট্টার দানা আলুর ভর্তা   স্কুইড  কচ্ছপের স্যুপ   দুধের ঘন সিরাপ  খোসা ছড়ানো লিচু বা কাঁঠাল । আনারস। এমন কি রান্না করা পাস্তা বা স্প্যাগেটি  ও !

  

একটা কৌটায় কোন রকম খুঁত পেলে সেই লটের সব কৌটা আবার নতুন করে পরীক্ষা করা হয় বা বাতিল করে দেয়

সব শেষে দারুণ একটা লেবেল মুড়ে বাক্স বন্দি করে বাজারে পাঠায়

 

ভাল কথা,  এই লেবেলটা কিন্তু খুব দরকারি একটা জিনিস অনেকটা বইয়ের ব্যাক কাভারের মত লেবেলের লেখা পড়ে আর ছবি দেখেই আমরা বুঝতে পারি ভেতরে কী আছে কতদিন রেখে খাওয়া যাবে কেমন জায়গায় রাখতে হবে 

 

 এই টিনের খাবার যে কত দরকারি হয়ে উঠেছিল , বলার মত না

আমরা যারা বুনো পশ্চিমের কাহিনি পড়েছি , তারা জানি সেই সময় সোনার খনির লোভে মানুষ চলে যেত কত কত দূরে

তখন দরকার হত এই টিনের খাবারের গুপ্তধন শিকারিদের দরকার হত   কাউবয় যারা তাদের দরকার হত 

দিনের শেষে ঝর্ণার ধারে ক্যাম্প ফেলে টগবগে কাউবয় সে যাবে কার্সন সিটিতে 

ব্যাগের ভেতর থেকে বের করে আনে সিমের দানা ভর্তি টিনের কৌটা বেকন  আর কফি সেই সময় কনডেনস মিল্ক আর টম্যাটো সুপের কৌটা বেশি বিক্রি হত 

আমার পিচ্চিবেলায় ব্লু ক্রস নামে একটা কনডেনস মিল্কের কৌটা অহরহ পেতাম 

আজ আর দেখি না

অথচ জিনিসটা বেশ ভাল ছিল  

শীতের সন্ধ্যায় মায়া মায়া কুয়াশা পড়তো বাইরে ধূসর হাওয়া।  মা বানাত চা টিনের সেই ব্লু ক্রস কৌটা খুলে বের করত কনডেনসক মিল্ক   কৌটার উপরেও একটা ক্রসের ছাপ থাকতো  

আহা আমার  শৈশব      

আফ্রিকান শিকারি, যারা হাতির দাঁতের লোভে চলে যেত বতসয়ানা বা মোম্বাসায়, তারাও সাথে নিত টিনের খাবার

নিভু নিভু ক্যাম্প ফায়ারের পাশে কৌটা খুলে রাতের খাবার খাচ্ছে নিঃসঙ্গ শিকারি বা খনি সন্ধানী , অমন কল্পনা মনটা কেমন রোমাঞ্চপ্রিয় করে দেয় আজও  

ক্যান ফুড আজ একটা শিল্প

 ইতিহাসের জিনিস  ক্লাসিক ইতিহাসের অনেক বাঁকে আমাদের সঙ্গী বিজ্ঞানের দান  

আজকাল প্রায় সবই পাওয়া যায় টিনের কৌটায় এমন কি বার্গারও  যদিও সেটা টাটকা বার্গারের মত সুস্বাদু না পেয়েছি ভারতীয়  গোলাপজাম নামের মিষ্টি  

 

আমি ভাবি -  যদি কখনও টাইম মেশিনে করে চলে যেতে পারি গুহা যুগের সময় শিকারি কোন আদিম মানুষের সামনে টিনের কৌটা খুলে বের করে আনি কোন খাবার !

কেমন অবাক হয়ে যাবে ওরা তাই না ?

ওদের স্বল্প জ্ঞানে ওরা দিশেহারা হয়ে যাবে এই ভেবে, এটা কী করে সম্ভব ?

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...