সরাইখানার গোলমাল আসে কানে,
ঘরের সার্সি বাজে তাহাদের গানে,
পর্দা যে উড়ে যায়
তাদের হাসির ঝড়ের আঘাতে হায়!
-মদের পাত্র গিয়েছে কবে যে ভেঙে!
আজও মন ওঠে রেঙে
দিলদারদের দরাজ গলায় রবে,
সরায়ের উৎসবে!
----------জীবনানন্দ দাশ
খাবার রান্না করা আর পরিবেশনের জায়গা, দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি আর ব্যবসা এই তিনটের জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।
খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ।
খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়। একই সাথে ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন। রয়েছে শেখার আগ্রহ ।
আমার কথাগুলো শুনছেন , তো ধরে নিতে পারি ফুড ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আপনার আগ্রহ রয়েছে। হয়তো নিজের ক্যাফে খুলতে চান । বা ভিনদেশের শহরে গিয়ে রান্না-বান্না নিয়ে পড়ার আগ্রহ রয়েছে। অথবা সহজাত কৌতূহল ।
আপনাকে খানিক ধারনা দেয়ার জন্যই এই আলোচনা ।
হোটেল বা ক্যাফে ভাল ভাবে চালানোর জন্য দরকার টিম ওয়ার্ক।
যেটা শুরু করতে পারে কর্মচারীরা, খাবার এবং পানীয় সম্পকে ভাল ভাবে জ্ঞান অর্জন করে। তাহলেই খদ্দেরকে ব্যাখ্যা করতে পারবে কি কি আছে বিক্রি করার জন্য । সার্ভিস হিসাবে কি কি পেতে পারে তারা।
ম্যানেজমেন্টে একজন থাকবে।
যিনি কিচেন এবং পানীয় দুই বিভাগের দিকেই খেয়াল রাখবেন। একই সাথে কাজে থাকা সমস্ত কর্মচারীদের সাথে কথা বলবেন। এবং সবার কাজ যাতে হোটেল বা ক্যাফের পলিসি অনুয়ায়ি চলে সেই ব্যাপারে নজর রাখবেন।
ম্যানেজমেন্টে নীচে যারা থাকবে তাদের কাজ অনেক। খদ্দেরের কাছ থেকে অর্ডার নেয়া হতে শুরু করে কিচেন থেকে খাবার এনে দেয়া, পানীয় টেবিলে রাখা এবং সার্ভিস এরিয়া পরিষ্কার করা পযন্ত তাদের কাজ ।
আরেক স্তরের কর্মচারী পরিষ্কার করবে। খদ্দের উঠে যাবার পর টেবিল গুছিয়ে রাখবে। নতুন করে চামচ, ন্যাপকিন আর মেনু টেবিলে রাখবে। সস, লবণ , গোলমরিচের শিশিগুলো ভর্তি করে রাখবে।
বারের কর্মচারীরা পানীয় তৈরি এবং সার্ভিস দেয়া পযন্ত খেয়াল রাখবে।
বারের কর্মচারী মানে বারটেনডার, অ্যালকোহলিক এবং নন অ্যালকোহলিক পানীয় তৈরি এবং পরিবেশন করবে। সেই সাথে অন্য সব কোল্ড এবং হট ড্রিংক পরিবেশন শুরু করে খাবারের অর্ডার নেবে ও পরিবেশন করবে।
বার পরিষ্কার রাখা ও বারটেনডারের কাজ।
বারের ষ্টক শেষ হলেই পূরণ করে রাখতে হবে। পরিষ্কার গ্লাস সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে হবে।
হসপিটালিটি সার্ভিসে ভিন্ন ভিন্ন ইউনিফর্মের গুরুত্ব অনেক। যাতে দেখা মাত্র বুঝা যায় কে কোন ডিপাটমেনটে আছে।
খেয়াল রাখতে হবে ইউনিফর্ম যেন পরিষ্কার এবং আয়রন করা হয়। জুতা জোড়া হতে হবে পরিষ্কার। এই ব্যাপারগুলো মোটেও হালকা করে দেখার উপায় নেই।
রেস্টুরেন্টের প্রবেশ মুখে সম্ভব হলে একজন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। খদ্দেরকে হাসিমুখে আন্তরিক ভাবে স্বাগতম জানানোর জন্য। ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি অমন রেস্টুরেন্টে যেতে পছন্দ করি না যেখানে আমি নিজেই ভেতরে প্রবেশ করে যে কোন একটা চেয়ারে ধপাস করে বসে হাক দেব, এই কে কোথায় আছিস?
খদ্দেরকে স্বাগতম জানানোর কাজটাকে বলে হোসট। খদ্দেরকে পছন্দসই টেবিল বেছে বসিয়ে হাতে মেনু ধরিয়ে দেয়া পর্যন্ত তার কাজ। সেই সাথে একজন ওয়েটার বা ওয়েট্রেসকে স্মরণ করিয়ে দেবে, অত নাম্বার টেবিলে নতুন খদ্দের বসেছে।
খদ্দেরকে আমরা গেস্ট বলি।
তাকে বা তাদেরকে উষ্ণ আন্তরিক ব্যবহার দিয়ে বসিয়ে দিন। কারন খাবারের আগে ওটাই বেশি নিয়ন্ত্রন করে গেস্টের মনোজগত। বিদায়ের সময় সুন্দরভাবে বিদায় দিন। সেই বহুল চর্বিত শব্দটা আবার ব্যবহার করুন, 'ধন্যবাদ। আবার আসবেন।'
এত ব্যবহারের পরও এই শব্দের আবেদন অসীম।
আপনার এবং কর্মচারীর আচরণের উপর গেস্টের মুড নিয়ন্ত্রন হবে। কাজেই ফ্রন্টসাইডের কর্মচারীদের হতে হবে বিনয়ী, কুশলী ও মার্জিত।
আগেও বলেছি ইউনিফর্ম, এপ্রন, জুতা সব পরিষ্কার হতে হবে । ইউনিফর্ম যেন কুঁচকে না থাকে। দেখে যেন মনে না হয় কলসির ভেতরে রাখা ছিল, সকাল বেলা সেটা পরেই কাজে চলে এসেছে। এপ্রনের উপর তেল ঝোলের দাগ রুচি বাড়ায় না। বিম্বিসা চলে আসে।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি আমার কর্মচারীদের হাতের আঙ্গুলের নখ পর্যন্ত পরীক্ষা করতাম। কারন খাবারের প্লেট দেয়ার সময় গেস্টের নজর সেই নখের উপর পড়বেই। দেখে যেন মনে না হয় কোন ডাকিনী তাকে খাবার দিচ্ছে। ময়লা নখ হলে তো সব শেষ পাণ্ডু।
মেনু।
বইয়ের সুচিপত্রের মত।
আপনার কিচেনের সব খবর থাকবে ওতে। ভাল মেনু সফল কিচেনের চাবি। মেনু বানানোতে যত্নবান হোন। বিশাল মহাভারত সাইজের মেনু বানাবেন না।
আফ্রিকার কাম্পালা শহরের এক রেস্টুরেন্টে ষোল পাতার মেনু পেয়েছিলাম। এটা পড়তেই তো জীবনের অর্ধেক সময় চলে যাবে। সকালে জলখাবারের জন্য বসে মেনু পড়া শুরু করলে রাতের ডিনারের সময় খাবার পছন্দ করে অর্ডার দিতে পারব।
আমার নিজের শহরে একটা মহা মহা নাম করা রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। নাম বলব না। কারন রেস্টুরেন্টের মালিক একটা রাজনৈতিক দলের সংগ্রামী সাথী।
উনার মেনুর সাইজ প্রায় বালিশের সমান। তেল এবং ঝোল মাখা। মানে ম্যারিনেট করা মেনু। সারা দুনিয়ার খাবার উনারা বিক্রি করেন।
বললাম - ফ্রেঞ্জ ফ্রাই আর বার্গার দিন।
ওয়েটার ওর প্যান্টের একটা সংবেদনশিল জায়গা চুলকাতে চুলকাতে বলল, ' ওটা আউট স্যার। অন্য কিছু অর্ডার দিন।’
আবার মেনু পড়ে বললাম , ‘পেনি পাস্তা দিন।'
' ওটা আউট স্যার। অন্য কিছু অর্ডার দিন , স্যার ।'
' ফ্রাইড রাইস আর চিংড়ি ভাঁজা দিন।'
' ওটা আউট স্যার। অন্য কিছু অর্ডার দিন, স্যার।'
' মোরগ পোলাও ?'
' ওটা আউট স্যার। অন্য কিছু অর্ডার দিন, স্যার।'
' ভেজি স্যুপ ?'
' ওটা আউট স্যার। অন্য কিছু অর্ডার দিন, স্যার।'
'আছে কি আপনাদের ?'
'ভাত স্যার । চিতল মাছের পেটি স্যার, হেলেঞ্চা শাক স্যার আর আপনার কল্লা ভাঁজা।'
'কার কল্লা ?
' করোলা স্যার।'
' মেনুর আর কোন খাবার নেই ?'
' আপনার এত কিচছু মেইন টেইন করা যায় না স্যার ।'
আমার এত কিচছু মেইন টেইন করা যায় না। কি অশ্লীল ইংঙ্গিত।
ছাপানো মেনুর সাইজ কত বড় হবে ?
বিশ্বাস করুন বা না করুন বিয়ের নিমন্ত্রণের যে কার্ড ছাপা হয় তেমন সাইজের মেনুও পেয়েছি আমি। প্রথমে ভেবেছিলাম, ওয়েট্রেস মেয়েটা আমাকে প্রেমপত্র দিয়েছে। মনে মনে বেশ রোমাঞ্চ জেগেছিল। নাহ। সকলই গরল ভেল।
জনপ্রিয় ম্যাগাজিনগুলো দেখেছেন ? মেনুর আকার হবে তেমন।
খাবারের নামের সাথে এক লাইনের বর্ণনা থাকবে।
যেমন- হাউজ সালাদ। টাটকা লেটুস, রোমা টমেটো ,দানাবিহীন শসার লম্বা ফালি। এবং গোলাপি পেঁয়াজের রিঙ ।
ক্লাসিক বার্গার। ঝলসানো মাংসের পেটি, চেদার চিজ, টম্যাটো , নোনতা শসা আর লেটুস।
দেখুন তো , খাবারের সম্পূর্ণ একটা চিত্র দেখা যাচ্ছে না মাত্র কয়েকটা শব্দে ?
আমাদের দেশের একটা পেপারব্যাক প্রকাশনী তাদের বইয়ের ব্যাক কাভারে সামান্য কয়েক লাইনে বইয়ের বিষয়বস্ত এত চমৎকার ভাবে তুলে ধরত। বইটা পড়ার জন্য পাগল হয়ে যেত পাঠক। কায়দাটা আজও বিস্ময় জাগায়।
মেনুটা কাব্যিক করবেন না। দরকার নেই। হাস্যকর হয়ে যায়।
আমার পরিচিত এক ভারতীয় বাবুর্চির মেনুর ভাষা-
'রক্তিম লালা বারবিকিউ - অসম্ভব পরিশ্রম করে খামারে উৎপাদন করা গরু বা ভেড়ার মাংসের ফালি সংগ্রহ করে , ঘরোয়া কায়দায় বানানো সসে ভিজিয়ে রাখা হয় সারাদিন। তিনিয়ান দ্বীপের পাহাড়ি মরিচের প্রলেপ মাখিয়ে ঝলসিয়ে মৌসুমি সবজীর সাথে পরিবেশন করা হবে আপনার থালায়।'
এটা কি মেনু নাকি হরর গল্প কে বলবে ?
আপনার ক্যাফে বা রেস্টুরেন্ট যদি নতুন হয় তবে মেনুতে দশটা খাবার দিয়ে চালু করুন। সেই দশ, যেটা আপনি বা আপনার বাবুর্চি ভাল রান্না করতে পারে। যে খাবারগুলো আপনার কিচেন সুন্দর ভাবে ধারন করতে পারে। এর বেশি কোনভাবেই সমর্থন করি না।
কয়েক ডজন খাবার দিয়ে দুনিয়ার সব খদ্দের টানতে যাবেন না। জরিপে দেখা গেছে মেনুতে প্রচুর খাবারের উল্লেখ থাকলে গেস্ট প্রায়ই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। বুঝে উঠতে পারে না কোনটা অর্ডার করবে। ডাইনিঙের আনন্দ অনেকাংশে মাটি হয়ে যায়।
দিনের কতক্ষণ চালাবেন সেটার উপর নির্ভর করেও খাবার অ্যাড করতে পারেন। সকালের জলখাবার / দুপুরের খাবার/ রাতের খাবার।
মেনুতে পানীয় অবশ্যই থাকবে। বিখ্যাত বোতলজাত কোমল পানীয়ের সাথে সাথে নিজের ক্যাফের চা, কফি, লেবুর শরবৎ বা অন্য কিছু। যেটা আপনার একান্ত নিজস্ব।খদ্দের যেন বলতে পারে এই দোকানের অমুক শরবৎ বা চা ফাটাফাটি।
তবে সাবধান !
থাইল্যান্ডে এক বাঙালি ভাইয়ের দোকানে চায়ের অর্ডার দিয়েছিলাম। এক পেয়ালা চায়ে দুধ, চিনি, আদা, লবঙ্গ , তেজপাতা সহ তিব্বতের প্রাচীন পুঁথিতে লুপ্ত সব যে সব লতা - গুল্মের কথা লেখা আছ সবই দিয়েছেন উনারা।
চুমুক দেয়ার সাথে সাথে মনে হল মৃত্যু আসলেও মহান।
সক্রেটিস সাহেব মরার আগে হয়তো এটাই পান করেছিলেন ?
দোকানের ম্যানেজার মিহি হেসে বললেন, কেমন লাগল স্যার ? এটা কিন্তু একদম আমাদের নিজস্ব রেসিপি।'
কিছু বলিনি। ভাষা হারিয়ে গিয়েছিল। তামিল মুভির নায়ক হলে দোকান ভেঙ্গে ফেলতাম।
রেস্টুরেন্ট চালাতে গেলে প্রডাক্ট জানতে হবে।
খদ্দেরে হাতে কী তুলে দিতে যাচ্ছেন সেটার ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারনা থাকতে হবে ।
ধরা যাক শুরু স্যান্ডউইচ বিক্রি করবেন। এখানেও আছে হরেক পদ।
আছে হ্যাম অ্যান্ড চিজের মত সাধারণ কিন্তু ক্লাসিক জিনিস। দুই ফালি টোষ্ট করা ব্রেড, ভেতরে পাতলা হ্যাম, পনীর আর সামান্য মাখনের প্রলেপ বা মানোনেজ।
বেশ কয়েক দশক আগে আমেরিকার ইস্কুলগুলোতে দুপুরের টিফিন হিসাবে এই হ্যাম অ্যান্ড চিজ স্যান্ডউইচ দেয়া শুরু করেছিল। যখন বেসবল খেলা হত, খেলোয়াড়দের দুপুরের হালকা খাবার হিসাবে দেয়া হত এই জিনিস।
মোটা মুটি আমেরিকান ইতিহাসের অংশ ।
পৃথিবীতে অন্য কোন দেশ স্যান্ডউইচকে অতটা আপন করে নিতে পারেনি যতটা পেরেছে আমেরিকা।
১৯ দশকের শুরুতে আমেরিকান বাসা বাড়িতে যে স্যান্ডউইচ চালু হয় সেটা ব্রেকফাস্ট স্যান্ডউইচ।
রুটির ভেতরে ডিম ভাঁজা দেয়া।
জিনিসটা আজকাল যে কোন ক্যাফেতে গেলেই পাবেন। যারা কি না সকালের জল খাবার বিক্রি করে। চোখের সামনেই বানিয়ে দেবে।
বাদামী রুটি। ভেতরে হলদে ডিম ভাঁজা। প্রাণ শক্তি সহজেই চলে আসে।
পাবেন শহর তলীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে। নিদেন পক্ষে মহল্লার কোণার ক্ষুদে দোকানেও।
রেস্টুরেন্টে চলবে কিন্তু বিএলটি স্যান্ডউইচ থাকবে না অমনটা হবেই না। বেকন , লেটুস আর টম্যাটোর আদ্যক্ষর দিয়ে এই স্যান্ডউইচের নাম।
হিসাবে পৃথিবীর দ্বিতীয় জনপ্রিয় স্যান্ডউইচ।
বেশ পুরানো জামানার খাবার।
১৯০৩ সালে প্রকাশিত ডক্টর ইভান মি-র লেখা ' গুড হাউজ কিপিং এভরি ডে কুক বুক' বইতে এর রেসিপি পাওয়া যায়।
বিকেলের চায়ের সাথে খাওয়া হত। জিনিসটার জনপ্রিয়তা শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। তখন আগারে বাগাড়ে সুপার মার্কেট ধরনের দোকান হতে থাকে। এরাও এমন স্যান্ডউইচ ছাড়তে চায় যেগুলোর উপাদান সারা বছর পাওয়া যায়।
মেরুন রঙের ভাঁজা বেকন, সবুজ লেটুস আর ঘম লাল টম্যাটোর ফালি দেয়া এই স্যান্ডউইচ এখন পপ কালচারের অংশ ।
তালিকায় নিশ্চিত আসবে টুনা মেটলড বা টুনা স্যান্ডউইচ।
ওই আরকি রুটির ভেতরে টুনার মাছের কুঁচি। একফালি পনীর। সাথে লেটুস বা টম্যাটো থাকলেও থাকতে পারে। অনেকটা পাইলেও পাইতে পার মানিক রতন ধরনের।
চাহিদা বেশি তাই বানানো হয় নাকি বেশি বানায় বলে বেশি চলে জানি না।
সস্তা শ্রমজীবীরা খেতে যায় অমন ক্যাফে হতে সাগর পাড়ের শৌখিন রেস্টুরেন্ট অমন জায়গায় সহজে পাওয়া যাবে।
বাস বা ট্রেন স্টেশনে থাকবেই জিনিসটা।
এগ সালাদ স্যান্ডউইচ সবচেয়ে সোজা। রুটির ভেতরে ডিম ভর্তা লেটুস দিলেই হয়ে গেল। সামান্য মায়োনেজ লাগবে । নইলে গলায় আঁটকে কেউ মারা গেলে আপনি তার দায় আমার উপর চাপাতে পারেন।
যাই হোক আসল কথায় আসি।
দুই একটা আইটেম থাকবে যেটা বিক্রি করলে আর্থিক ভাবে আপনি লাভবান হবেন। সেই খাবার বেশি বিক্রি করার চেষ্টা করবেন। দোষের কিছু না। পুশ সেল বলে। তেমন খাবারের নামগুলো উজ্জ্বল রঙ্গে লিখবেন। হলুদ, কমলা বা লাল রঙের মার্কার থাকতে পারে।
বেস্ট সেলার, শেফ স্পেশাল, বা টুডে স্পেশাল নামে ও দিতে পারেন।
খাবারের নাম একটু ভিন্ন ভাবেও দেয়া যেতে পারে । তবে এখানেও একটু রুচির পরিচয় দিতে হবে। সিডনি শহরের সারিহিল নামে এক জায়গায় ভারতীয় দোকানগুলোতে খাবারের নাম দেখে বেদম হাসতাম। যেমন- আকবরি ডাল, বেগুন মহারাজা, পেয়ার ক্যা দস্তানা আলুর টিক্কা, দিলখুশ বাটার নান। এইগুলো কি খাবারের নাম না কি ইমরান হাসমির মুভির নাম আজও পরিষ্কার না আমার কাছে।
এটা খাবার ব্যবসার সাধারণ কায়দা । সাধারণ বার্গার, নাম দেয়া হয়েছে মোনালিসা বার্গার। মেসি বার্গার। জলি বার্গার। মনস্টার বার্গার। গ্যালাক্সি স্যান্ডউইচ। সিডনিতে অজি বার্গার বিক্রি হত। আর দশটা বার্গারের মত। ভেতরে শুধু এক ফালি লাল রঙের বিট দেয়া। ব্যস। হয়ে গেল ব্যান্ডিং ।
আপনার দোকানের খাবারের নাম সুন্দর রুচিশীল ভাবে দেবেন। সেটা নির্ভর করবে আপনার ক্যাফের লোকেশন, সংস্কৃতি এবং থিমের উপর।
কিছু উদাহরণ দিলে ভাল হয়।
কফিন বে ওয়েস্টার । মানে এই ঝিনুকটা বিখ্যাত কফিন উপকুল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক স্টাইল পিজ্জা , এই পিজ্জায় আনারস থাকে না বা বারবিকিউ সস থাকে না। এবং মাত্র এক ফালি পিজ্জা আপনি কিনতে পারবেন। উড়ন্ত সসারের মত আস্ত পিজ্জা কিনতে হবে না।
ট্যাঁডিশনাল পটেটো স্কিন। আলু সেদ্ধ করে অর্ধেক করে কেটে ভেতর থেকে সামান্য আলু কুচিয়ে বের করে পনিরের কুঁচি, পেঁয়াজ অমন জিনিস ভর্তি করে আভেনে বেকড করে পরিবেশন ।
অর্থাৎ আপনি নিজেও খুঁজে বেছে নাম দিতে পারেন।
আমি বেশ মজার কিছু নাম পেয়েছিলাম। ফুলকপির সিঙ্গারা , তন্দুরি চা, জয়পুরী রোস্ট, লক্ষ্মীছানা (ছানার মিষ্টি), মাছের লালঝাল, সুলতানি হালুয়া (সাধারণ গাজরের হালুয়া প্রতিটা বরফি কাট দেয়া। মধ্যখানে একটা বাদামী কিসমিস ।) চক বাজারের লাচ্ছা। মামার আলুর দম।
তো মেনুর খসড়া এমন হতে পারে।
১। ব্রেকফাস্ট
২। এপিটাইজার। হালকা খাবার । ভাঁজা।
৩। সুপ। সালাদ।
৪। পাস্তা বা নুডুলস।
৫। মেইন কোর্স বা মূল খাবার।
৬। স্পেশাল বা পুশ সেল।
৭। পানীয়, ককটেল, কফি, চা।
৮। মিষ্টি জাতীয় খাবার। কেক। আইসক্রিম। পুডিং।
প্রতিটা খাবার দশ শব্দের মধ্যে ব্যাখ্যা করবেন মেনুতে। ইতিহাস লিখতে যাবেন না।শহরের সেরা জুসি বার্গার - এমন স্থুল নাম দেয়ার দরকার নেই।
নামের নীচে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন। কোয়াটার পাউনড বিফ পেটি , ক্রিমি মায়নেজ, গ্রিল মাশরুম, পাকা টমেটো। সুইস পনীর এবং টোস্ট করা বানে পরিবেশন হয় ।
খাদক মানে গেস্ট জানবে উনি থালায় কি পেতে যাচ্ছেন।
খাবারে কি আসবে সেটা উল্লেখ করুন । অনেক জিনিসে গেস্টের অ্যালার্জি থাকতে পারে। বাদাম, রসুন উদাহরন। ফ্যাট ফ্রি , ফুড কালার ব্যবহার করা হয়নি উল্লেখ করুন।
খাবারের অনুপাতের সাথে দাম নির্ধারণ করুন। আপনার দোকানের খাবারের দাম বেশি, এমন মিথ যেন ছড়িয়ে না পরে ।
খাবার বানাতে যত খরচ, অ্যাড করুন। শ্রমিক, কাঁচামাল, পরিবহণ, সংরক্ষণ। সব। মোট খরচ ১০ টাকা হলে আপনি খাবারের দাম রাখবেন ১৬ টাকা।
মনে রাখবেন , পকেট ভর্তি টাকা থাকলেও মানুষ সস্তা দামের ক্যাফে , হোটেল খোঁজে।
এপিটাইজার, মানে হালকা খাবার আর শেষ পাতের পুডিং, আইসক্রিম, মিষ্টি, এইসবে মাছ, মাংস বা মূল খাবারের চেয়ে উৎপাদন খরচ অনেক কম হবে। সেটা বেশি বিক্রি করে প্রফিট অর্জন করার চেষ্টা করবেন।
পাস্তা, নুডুলস, সালাদ জাতীয় খাবার বিক্রি করলে ৮০% থেকে ৮৫% প্রফিট অর্জন করা যায়। খদ্দেরকে সেইসব অর্ডার করতে উৎসাহিত করুন।
বাইরের দেশে একটা রেস্টুরেন্ট দাঁড়িয়ে থাকে অ্যালকোহলের উপর ভিত্তি করে।
অ্যালকোহলে লাভের পরিমাণ ৫০% থেকে ৭০ %।
অনেকেই মেনুর রঙ দোকানের রঙের সাথে মিলিয়ে করে। খুবই চমকপ্রদ আইডিয়া। এটাও কালার ব্র্যান্ডিঙে পরে। মেরুন, কালো সহ অন্য যে কোন ঘন রঙের ব্যবহার সিরিয়াস হোটেল ব্যবসার কথা মনে করিয়ে দেয়। সবুজ, হলুদ, কমলা , গোলাপি অমন রঙ সচারাচর ফাস্ট ফুড বা হালকা খাবারের ব্যবসার সাথে যায়।
সময় নিয়ে রঙ বেছে সেই অনুয়ায়ি দোকানের দেয়ালের এবং মেনুর রঙ করুন।
অনেক চতুর ব্যবসায়ী গোগোল থেকে ছবি সংগ্রহ করে মেনুতে সেঁটে দেয়। ভাবে উফ কি চালাকি না করলাম।
সমস্যা হয় না। কিন্তু আপনার কিচেনের খাবারের সাথে সেই ছবির যেন মিল থাকে। নইলে খদ্দের আদালত পর্যন্ত দৌড়াতে পারে। সেই অধিকার উনার আছে।
সাবওয়ের মত প্রতিষ্ঠান মামলা খেয়েছে। উনারা বিশাল সাইজের স্যান্ডউইচ অফার করছিল । পোস্টারে কোল বালিশের সমান স্যান্ডউইচের ছবি দিয়ে বলছিল 'স্পেশাল ১২ ইঞ্চির স্যান্ডউইচ।'
ভাল কথা।
কোত্থেকে এক গাড়ল এসে স্যান্ডউইচের অর্ডার দিয়ে খেতে বসে ফিতা দিয়ে মেপে মামলা ঠুকে দিল। স্যান্ডউইচের সাইজ ছিল সাড়ে দশ ইঞ্চি।
বোঝ এবার !
পুরো মেনুটা ছবির অ্যালবাম বানাবেন না। যেই খাবার বেশি বিক্রি করতে চান সেই খাবারগুলোর কয়েকটার ছবি দিন। অবশ্যই নিজের কিচেনে রান্না করে ছবি অ্যাড করবেন।
নিয়মিত মেনু আপডেট করবেন। সেটার দরকার আছে ।
জিনিসপত্রের দাম ঘন ঘন পরিবর্তন হয় আমাদের দেশে। মৌসুমি খাবার অ্যাড করবেন। পূজা স্পেশাল, রমজান স্পেশাল, নববর্ষ স্পেশাল রাখবেন।
ইউরোপের দেশগুলোতে দোকানের বাইরে পিচ্চি ব্ল্যাক বোর্ডে সেইদিনের স্পেশাল লিখে রাখে। কায়দাটা সুন্দর। সিডনিতে আমার রেস্টুরেন্টে অমনটা করতাম । ইদানিং কাঁচের শিটে রঙ বেরঙ্গের মার্কার পেন দিয়ে লেখা যায় । লেখার পর পিছনের আলো জ্বেলে দিলেই খদ্দেরের চোখে ধরা পরে।
মেনু ছাপতে দেয়ার আগে কয়েকজন মিলে আলোচনায় বসুন। মতামত নিন
১। মেনুটা কি পড়তে সহজ ?
২। খুব বেশি হিজিবিজি ?
৩। ডিজাইন কি জটিল ?
৪। রেস্টুরেন্টের থিম, বিষয় এইসবের সাথে যায় ?
থিম আবার কি ? মজা করে বলছি, দোকানের নাম 'আদর্শ হিন্দু হোটেল" কিন্তু মেনুতে গরুর কালা ভুনা আছে। অথবা মোসলেম বিরিয়ানি হাউজ কিন্তু মেনুতে শূয়রের পায়ের নলা আছে ?
৫। ছাপার ফ্রন্ট সুন্দর ?
এবং সর্বশেষ কথা
৬। মেনুতে বানান ভুল আছে ?
মেনু পড়তে গিয়ে যদি খদ্দেরের মনে হয় বিখ্যাত এক প্রকাশনীর বই পড়ছে । যারা বানান ভুলের জন্য বিখ্যাত । এবং সেইজন্য সারা বছর অর্ধেক দামে বই বিক্রি করে- ওমনটা হলে আপনি শেষ।
আরেকটা জিনিস, মেনুতে খাবারের দাম ইয়া বড় হরফে লিখবেন না। যে সাইজের ফন্ট ব্যবহার করে খাবারের নাম এবং বর্ণনা লেখা থাকবে সেই সাইজে দামের সংখ্যা লিখবেন। চাইলে ভিন্ন রঙ ব্যবহার করবেন কিন্তু বড় করে লিখবেন না।
কিছুটা ছ্যাবলামো দেখাবে।
ব্যবসা চালু হবার পর আবার মেনু মেরামত করবেন। হাতে টাকা থাকলে পেশাদার ফটোগ্রাফার দিয়ে খাবারের কিছু ছবি তুলে মেনুতে অ্যাড করবেন।
আবার এবং আবার বলছি, ছাপতে দেয়ার আগে মেনুর বানান ভাল করে চেক করুন। ভুল বানানের মেনু নেগেটিভ প্রভাব পড়বে আপনার ব্যবসায়। বেলের শরবৎ বিক্রি করা দোষের না। কিন্তু মেনুতে Balar sorvot লেখা দোষের।কথা ক্লিয়ার ?
মেনু খুলেই খদ্দের প্রথমে ঠিক মাঝখানে তাকায়। সাইকোলজি। পুশসেল আইটেমগুলোর নাম ওখানে রাখুন।
রঙের কয়েকটা ব্যবহার বলে দিচ্ছি। সবুজ রঙ মনে করায় খাবারগুলো টাটকা। কমলা রঙ রুচিবর্ধক। হলুদ রঙ সুখী ভাব সৃষ্টি করে। আর লাল রঙ ক্রয় করার আগ্রহ জন্মায়। সেইজন্য হয়তো দুনিয়ার সব বিরিয়ানির ডেকচিতে সাধুদের গায়ের লালসালু জড়িয়ে রাখে।
কিছু শব্দ আমাদের আবেগ , অনুভূতি নিয়ে কাজ করে। যেমন- ঘরোয়া পদ্ধতি বানানো স্যুপ, মায়ের হাতের রান্নার মতই…, নিজস্ব খামার থেকে সংগ্রহ করা, ঘানি ভাঙ্গা তেল দিয়ে…, সেই শৈশবের টাটকা স্বাদ।
অমন হরেক পদের শব্দ ধূর্ততার সাথে ব্যবহার করা হয় সফল রেস্টুরেন্টে। দোষের কিছু নেই। ভালবাসা এবং ব্যবসায় সব জায়েজ।
শুরুতে একবার বলেছিলাম কর্মচারীর আচরণ গেস্টের মুড নিয়ন্ত্রন করবে। তাই না ? ব্যাপারটা আসলেও সত্যি।
প্রাণবন্ত , হাসিখুশি, আন্তরিক কর্মচারী আপনার ক্যাফের পরিবেশ উজ্জ্বল করে আগত গেস্টদের মন ভাল করার অনুভূতি দেবে।
সম্ভব হলে ওদের খানিক শিখিয়ে পড়িয়ে নেবেন । দুইচারজন অভিজ্ঞ কর্মচারী নিযোগ দেবেন। হসপিটালিতে যাদের অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে। গেস্টদের বিনয়ের সাথে স্বাগত জানিয়ে টেবিলে বসিয়ে সেইদিনের স্পেশাল বলবে ওয়েটার। এক ফাঁকে নিজের নাম বলবে।
হার্ডরক ক্যাফেতে ট্রেনিঙের সময় আমাদের বলা হত , ‘ গিভ দেম ভিআইপি ফিলিংস।'
প্রতিটা মানুষ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে ভালবাসে। অদ্ভুত এক খিদে মানুষের। কেউ গুরুত্ব দিলে খুশি হয়।বর্তে যায়।
ছোট ক্যাফে হলেও পিচ্চি সাইজের একটা টয়লেট রাখবেন। ভাল একটা বেসিন আর আয়না সহ। প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর পরিষ্কার পরিছন্নতার দায়িত্বে আছে তেমন একজন কর্মচারী যেন টয়লেট পরিষ্কার করে আসে।
দেড় ডজনের বেশি দেশ ভ্রমণ করার মধ্যে কত হোটেল, ক্যাফেতে গেছি আজ আর মনে নেই। কিন্তু এল গাচো ( El Gaucho) স্টেক হাউজের টয়লেট আমার কাছে সবচেয়ে মজার লেগেছে। দুবাইয়ের রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফের টয়লেট ভাল , কিন্তু কেউ এল গাচোকে হারাতে পারেনি।
ওদের সব শাখার ডিজাইন এক। বাথরুম পিচ্চি। ভেতরে কৃত্রিম মোম জ্বলছে। মনে হয় ' হাউজ অভ ওয়াক্স ' মুভির কোন দৃশ্য। নিজেরদের লগো দিয়ে বানানো রোল করা কিছু ছোট তোয়ালে রেখে দিয়েছে বেতের ঝুড়ি ভর্তি করে। সবচেয়ে মজার জিনিস হিসু করার কমডে রেখে দিয়েছিল একগাদা কাগজী লেবুর ফালি।
কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর লাগতো মারিয়ানা আইল্যান্ডের সৈকতের ধারের বিচ ক্লাব বা বারের টয়লেটগুলো।
একটায় গিয়ে দেখি মেঝেতে বালি আর পাথরের কুঁচি। মোজাইক করা হয়নি। দেয়ালে জাহাজের হুইল। মেয়েদের টয়লেটের দরজায় মৎস্যকুমারীর ছবি আঁকা। ছেলেদের দরজার বাইরে সাগর দেবতার ছবি।
আরেকটা ফিসারম্যান ক্লাবে সামান্য পান করে টয়লেটে গিয়ে দেখি ভ্যানগঘের সূর্যমুখী ছবিটা ঝুলছে। বাইরে দৌড়ে গিয়ে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতেই উনি ঝূরঝূরে একটা হাসি দিয়ে বললেন, ' ফুটপাথের শিল্পী দিয়ে মাত্র ২০ ডলার দিয়ে আঁকিয়ে নিয়েছেন।
ক্যাফে অ্যান্ড মিউজিক।
বাইরের দেশে প্রায় সমার্থক শব্দ। প্রথম প্রবাস , আমি ঢং করে দ্বীপান্তর বলি সেই মারিয়ানা আইল্যান্ডের প্রত্যেকটা বার, ক্যাফে আর ক্লাবে জুক বক্স (jukebox ) ছিল।
জিনিসটা চিনতাম। মাইকেল জ্যাকসনের ' স্মুথ ক্রিমিনাল' ভিডিওতে দেখেছিলাম। দরজার কাছ থেকে উনি কয়েন ছুড়ে মারেন। চালু হয়ে যায় সেই সঙ্গিতের পেঁটরা। নেচে উঠে একদল কোট টাই পড়া নর্তক। আজও সেই নাচের মুদ্রা আর পরিচ্ছদ কপি করে খেয়ে বেঁচে আছে একদল নর্তক গায়ক।
জুকবক্স সেই সময় আমার কাছে একটা মহা বিস্ময়ের নাম।
এক ডলারের কয়েন ফেললে জুকবক্স চালু হয়ে যেত। পয়সা ফেলার ধাতব সুন্দর একটা শব্দ হয়ে জ্বলে উঠত রঙ বেরঙের আলো। পছন্দের অ্যালবাম থেকে তিনটে গান শোনা যেত। ১৯৯৬ সালে সেটা আমার কাছে অনেক বেশি টাকা মনে হত। কিন্তু যন্ত্রটা অপূর্ব। শব্দের কোয়ালিটি লাইভ মিউজিকের মত । দুষ্টু জাদুকরদের অমন জিনিস থাকে।
সিডনীর পাব বা বারে অত্যাধুনিক জুকবক্স পেয়েছি। দেয়ালে সেঁটে রাখা ফ্ল্যাট টিভির মত। পছন্দ হয়নি।
ক্লাসিক জিনিসটা হারিয়ে গেছে। আজও কোন বার বা ক্যাফেতে দেখলে থমকে দাড়াই।
খুব ব্যস্ত রেস্টুরেন্ট হলে মিউজিকের দরকার নেই।
অমনিতেও প্রচুর শব্দ হবে।
পেয়ালা-তশতরীর ঠুং ঠ্যাঙ, গেস্টদের নিজেদের মধ্যকার আলাপ সালাপ, টেলিফোন, হরেক শব্দ। আপনার শুধু খেয়াল রাখতে হবে কিচেনের হল্লা যেন গেস্টের কানে না আসে।
মাঝারি মাপের ক্যাফে হলে হালকা টোনে মিউজিক চলতে পারে, নির্ভর করবে গেস্টের রুচির উপর। হার্ডরক ক্যাফে যতক্ষণ খোলা থাকে মিউজিক চলে। ওটা ওদের বিজনেস পলিসি। বেশির ভাগ সময় কানের উপর অত্যাচার হয়ে যায়। বারগুলোতে মিউজিক লাগবেই।
থাইল্যান্ডে রাস্তার পাশে সুন্দর সব বার আছে। ঠিক আমাদের রাস্তার দোকানে যেমন লেবু শরবৎ বিক্রি করে তেমনি। বসার জন্য টুল আছে। কালো জিন্সের প্যান্ট আর শাদা শার্ট পড়া বুকে চাক্কু মারা এক সুন্দরী দোকান চালাচ্ছিল।
বসে অর্ডার দেয়া মাত্র দক্ষ হাতে আইস পিকার দিয়ে বরফ তুলে খাঁজকাটা রয়্যাল গ্লাসে পানীয় বানিয়ে দিল। ওর পিচ্চি দোকানেও বেশ শব্দ করে গান বাজছে। দেখি সুন্দরী, ল্যাবটপের ডিজে সফটঅয়্যারে গান ছেড়ে পেল্লাই দুই স্পীকার ফিট করে রেখেছে।
সস্তায় দারুন কাজ।
গান বাজতে পারে। নির্ভর করবে আপনার দোকানের উপর। বাজার চলতি চটুল স্থুল কথামালা সম্বলিত গান বাজিয়ে গেস্টের মনোরঞ্জন করার চেষ্টা করবেন না। ' ক্যাফে অ্যান্ড লাউঞ্জ মিউজিক' নামে প্রচুর মিউজিক ট্রাক পাবেন। সেইসব প্লে করুন।
গেস্ট বসার আগে যেন টেবিলের সেট আপ ঠিক থাকে।
লবণ,গোলমরিচের দানি, টম্যাটো কেচাপ, শর্ষেবাটা, ভিনেগার অমন একটার সেট আগে থেকেই টেবিলে থাকলে ভাল। গেস্ট বসার পর দৌড়ে গিয়ে সেইসব এনে দেয়া বিরক্তকর। তবে অনেক ক্যাফেরে গেস্ট বসার পর রুমাল বা পেপার ন্যাপকিন সহ চামচ, কাঁটাচামচ দেয়া হয়। ওটাও খারাপ না।
তবে জল ভর্তি জগ আর গ্লাস রাখার দরকার নেই। ওতে গেস্ট কোমল পানীয় বা অন্য কোন পানীয়ের অর্ডার দিতে চায় না।
অর্ডার নেয়ার সময় বাম দিক থেকে বসা গেস্টের অর্ডার প্রথম নেয়া ভাল।
সাথে জানিয়ে দেবে আজকের স্পেশাল কী কী
আছে।
স্পষ্ট উচ্চারনে, হাসি মুখে গেস্টের চোখে চোখে রেখে অর্ডার নেবে ওয়েটার। সেই সাথে জানিয়ে দেবে কতক্ষণ লাগবে খাবারটা টেবিলে আসতে।
যত দ্রুত সম্ভব তাদের টেবিলে পানীয় পৌঁছে দিতে হবে।
এবার তারা অপেক্ষা করতে পারবে। বিরক্ত হবে না।
খাবার তৈরি হলেই কিচেন থেকে হাঁক দিয়ে বা ঘণ্টা বাজিয়ে জানাতে হবে ওটা তৈরি।
গেস্টের অর্ডারের সাথে মিলিয়ে নিন, তারপর টেবিলে পরিবেশন করুন। খাবার নিয়ে খদ্দের যেন না বলে , আমি চেয়েছি মামার শরবৎ কিন্তু এটা তো তালুইয়ের শরবৎ ! এইসব কি ?'
খাবার দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাবেন না। জিজ্ঞেস করুন সব ঠিক মত পেয়েছে কি না ? আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করুন নতুন কোন পানীয় লাগবে কি না।
পুশ সেল প্ল্যাস গুড সার্ভিস।
খানিক পর আরেকটা চক্কর দিয়ে জানতে চাইবেন আরও কিছু দরকার কি না ? হয়তো চিনির বয়াম খালি হয়ে গেছে। হয়তো উনারা নতুন কোন অর্ডার দিতে চাইবেন। শেষ পাতে আইসক্রিম বা তেমন কিছু।
এত কিছুর পরও ভুল হতেই পারে। খদ্দের বিরক্ত বা রেগে যেতে পারেন।
সেইক্ষেত্রে গেস্টের প্রতি বাড়তি মনোযোগ দিন। বুঝিয়ে দিন আপনি তাদের কেয়ার করেন। অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছেন।
তেমন মনে করলে ম্যানেজারকে জানান।
ম্যানেজার ক্ষমা প্রার্থনা করে বা তাদের ভাল সার্ভিস দিয়ে খুশি করতে পারবেন।
টিমওয়ার্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কিচেনের ভেতরে যারা কাজ করবে বা সামনে যারা কাজ করবে সবাইকে এক টিম হিসাবে কাজ করতে হবে। এদের রেষারেষি, কলহ সব কিছু প্রভাব পড়বে সার্ভিসের উপর। গেস্ট সেটা বুঝতে পারবে। বহু ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট চোখের সামনে বন্ধ হয়ে যেতে দেখেছি। একটাই সমস্যা ছিল, কর্মচারীদের নিজেরদের মধ্যকার সস্তা ইগো এবং কলহ।
টিমওয়ার্ক না হলে আপনার দায়িত্ব সেই টিম ভেঙ্গে নতুন টিম বানানো। নতুন কর্মচারী নিযোগ এবং নতুন করে ট্রেনিং দেয়া।
শূন্য বা এঁটো থালা নিয়ে গেস্ট যেন টেবিলে বসে না থাকে। টেবিল থেকে দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে সেই সব। দোকান বন্ধ করার আগে মেঝে, কিচেন সব পরিষ্কার করতে হবে। কিচেনে ভুলেও যেন কোন ময়লার বিন না থাকে। চামচ, গ্লাস, তশতরি সব তৈরি রাখতে হবে পরের দিনের জন্য।
কোন কর্মচারী ভাল সার্ভিস দিলে তাকে প্রমোশন দিন। অল্প করে হলেও বেতন একটু বেশি দিন। সে যেন মনে না করে, খামাখাই বেগার শ্রম দিয়ে যাচ্ছে । ওদের দিয়েই তো আপনি উপার্জন করছেন। কার্পণ্য করবেন না। কোন কর্মচারী অন্য কর্মচারীকে বা খদ্দেরকে বিব্রত করলে কঠোর ব্যবস্থা নিন।
হাইজিন বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে সবাই নজর রাখবেন। কিচেনের কর্মচারী মাথায় ক্যাপ ব্যবহার করবে।
কোন বাবুর্চি যেন আঙুলে আংটি ব্যবহার না করে, সেটা যদি বাদশাহি আংটি হয় তবুও না।
সবশেষের ব্যাপারটা হচ্ছে বিজ্ঞাপন।
অনেকে বলে চেনা বামুনের পৈতা লাগে না। বাস্তবটা অন্য। খাবার ভাল হলে গেস্ট আসবেই। তারপরও আপনার দায়িত্ব আছে, আপনি যে ভাল করছেন সেটা মানুষকে জানানো।
কাউকে ধরে ফুড ব্লগে লিখে লাভ নেই। অনেকেই বিরক্ত ওই ব্যাপারটায়। পয়সা খরচ না করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পেইজ খুলে আপনার খাবারের বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। অনেকের চোখে পড়বে। সুন্দর কিছু ছবি, মেনু অ্যাড করুন। দোকানের লোকেশন, ফোন নাম্বার, ইমেইল যোগ করুন।
ফ্রি, শব্দটার প্রতি অমোঘ আকর্ষণ আমাদের। যোগ করুন কিছু। গেস্ট নিদিষ্ট পরিমাণ খরচ করলে তাদের বিনামুল্যে চা, কফি, আইসক্রিম দিন।
ব্যক্তিগত ভাবে খদ্দেরে নাম, চেহারা মনে রাখুন। এটা দারুন রকমের বিজ্ঞাপন।
ছোট বাচ্চা নিয়ে আসলে পিচ্চির হাতে বেলুন বা কাগজের খেলনা ধরিয়ে দেয়া পুরানো কিন্তু সুন্দর কৌশল।
দোকানের লগো এবং রঙ সম্বলিত কাগজের ব্যাগ বা বাক্স বানিয়ে নিন। বাড়িতে নেয়ার জন্য খাবার অর্ডার দিলে সুন্দর ভাবে প্যাকেট করে দিন। কফি ক্লাবগুলোতে খদ্দেরকে হাতে ভিজিটিং কার্ডের মত কার্ড ধরিয়ে দেয়া হয়। যাতে ছয় কাপ কফির অর্ডার দিলে সাত নাম্বার পেয়ালা মুফতে পাবে।
আজও বেশ জনপ্রিয়।
হাজার পদের আইডিয়া ব্যবহার করে স্বল্প খরচে বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন।
আপনার সফলতা কামনা করছি।
শেষ কথা, আপনার দোকানের সামনে কোন গরিব বাচ্চা ঘুরঘুর করলে কষে ধমক না দিয়ে লেফট ওভার খাবার থাকলে দিয়ে দিন। ওদের আশীর্বাদ আপনার সৌভাগ্য নিয়ে আসবে।
মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন