সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বিনি পয়সার বিপদ

 বৃষ্টি ।

গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি ।

শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।  

 গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয় ,  আষাঢ়-  শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে।

ব্যস -এই ।

  যারা  আশির দশকের মানুষ ,  তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে , মানুষের  স্মৃতিতে ।

এই বছরের  বৃষ্টি     পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  ।

গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক , এস আই।

পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল ।

সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি,  কী  মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে ।

মনে মনে বিরক্ত  খলিল ।

রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস্টেবলের সাথে বসে ষোলগুটি খেলবে ।

নাহ ,  সব আশা বর্ষার লবণের মত গলে শেষ ।

দিলদার খানের সাথে গাড়িতে করে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে মাগুর মাছের মত ঘুরে ঘুরে মর ।

একশো টাকা চায়ের খরচ ও কারও কাছ থেকে আদায় করা যাবে না।

রাতটাই মাটি ।

অন্য কোন অফিসারের সাথে ডিউটি হলে এতক্ষণে হাজার টাকা তুলে ফেলত । দিলদার খানের সাথে সেটা সম্ভব না। মনে মনে স্যারকে কয়েকটা গালি দিল । স্যারের মায়ের সাথে বিচ্ছিরি একটা সম্পর্ক হয়ে গেল তাতে ।

 স্যার বেশির ভাগ সময় তাকেই বেছে নেয় রাতের টহলের সময় ।  থানায় তাদের জোড়াকে   আড়ালে  ' গুপিগাইন বাঘা বাইন'  বলে ডাকে ।

মানুষ কত খারাপ  !

এক মনে গাড়ি চালাচ্ছিলেন দিলদার খান ।  সতর্ক চোখ ।  ভেজা পথের উপর ।

আচমকা  চলার  গতি কমে আসতেই ঘুমের জাল জড়ানো চোখে বাইরে তাকাল খলিল ।

মনটা খুশি হয়ে গেল । খাওয়া দাওয়া হবে। সামনে  দীনেশ বাবুর দোকান ।

অতটা খুশি হতে পারতো না খলিল ,   যদি জানতো  কত   বড়  অবিশ্বাস্য, বিস্ময়কর   আর বিপদজনক   ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে  ওদের  ।

সেইরাতে  যদি  দীনেশ বাবুর দোকানে না আসতো ,  তবে হয়তো  আড়ালে থাকতো সব কিছু ।

কত বিচ্ছিরি ঘটনাই না ঘটে ।

 ঢাকা নারায়ণগঞ্জের   বিশ্বরোডের  মাঝে এখনও অনেক ফাঁকা জায়গা ।  ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ।  দীনেশ বাবুর দোকানটা  এমন একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে । পাশে একটা ডোবা । বড় বড় কয়েকটা জারুল গাছ জায়গাটা বেশ আরামদায়ক বানিয়ে ফেলেছে ।

আরও খানিক দূরে একটা পেট্রোল পাম্প । সেটা সন্ধ্যার পর পর বন্ধ হয়ে যায় । সব সময়ই  ।

 দীনেশ বাবুর দোকানে কোন সাইনবোর্ড নেই । আগে ছিল । রোদে বাতাসে নষ্ট হয়ে গেছে । নাম পড়া যায় না। নতুন করে সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি আর ।

গাড়ি পার্ক করে বৃষ্টির ছাঁট থেকে  বাঁচার   জন্য মাথা  নিচু করে কেমন একটা কায়দা করে দোকানের দিকে দৌড় দিলেন দিলদার খান । পেঙ্গুইনের মত।   অনুসরণ করলো  অনুগত খলিল । আগেও এসেছে কয়েক বার ।  দীনেশ বাবুর দোকানের মালাই চা ফাটাফাটি একটা জিনিস ।

খাওয়াও পাওয়া যাবে । অমন খাবার শহরে কোথাও নেই ।

রাত মাত্র দশটা ।

বৃষ্টির জন্য মনে হচ্ছে গহীন রাত ।

এত   হল্লামল্লার মধ্যেও ব্যাঙের ডাক কানে গেল । জারুল গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটার মন কেমন করা শব্দ ।   ভেজা বাতাসের রাগিণী মন কেমন করে দেয় ।

কাচের জানালা দিয়ে  ভেতরের   কুমড়ো  ফুলের মত আলো দেখা যাচ্ছে ।

দরজা ঠেলে দুইজনেই ভেতরে ঢুকে পড়লো ।   

দরজা ঠেলা দিতেই ঠুং ঠুং শব্দ  । কায়দা করে দরজার উপরে পেতলের একটা ঘণ্টা বেঁধে রেখেছে দীনেশ দম্পতি । কেউ ভেতরে ঢুকলেই শব্দ হয় । উনারা বুঝে,  খদ্দের এসেছে ।

দোকানের ভেতরের শান্ত হাওয়ায় মন ভাল হয়ে গেল । শসা পেঁয়াজ মিশে কেমন মিষ্টি একটা ঘ্রাণ । ডিম ভাঁজা আর চা-পাতা ফুটানোর ঘ্রাণ পাগল করে দিল এই দুই খদ্দেরের মন মেজাজ   ।

শান্তি ।

দোকান খালি । আর কোন খদ্দের নেই ।

সম্ভবত বন্ধ করার আয়োজন করছিল ।

 পরিচিত  দুইজনকে দেখে হাসি মুখে কাজ শুরু করলো দীনেশ দম্পতি ।

দীনেশ বাবুর গিন্নি শকুন্তলা দেবী ঘুমন্ত কেতলির চুলার আঁচ বাড়িয়ে চিনির বয়াম খুলতে লাগলো ।

তাওয়ার উপর পরোটা আর ডিম ভাঁজার প্রস্তুতি নিল দীনেশ বাবু ।

'সবজি করেননি আজ ?' কাঠের তক্তার সাথে ঝুলন্ত তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে জানতে চাইলেন দিলদার খান ।

'না স্যার।'  দুঃখী মানুষের মত জবাব দিল দীনেশ বাবু । '  এত বৃষ্টি হচ্ছে বাজারে যেতে পারিনি । পটল আর ঝিঙে ছিল । দুপুরেই শেষ । ডিম আছে শুধু । অমলেট করি ? বেশি করে কাঁচা মরিচ দেব , তাই না ?'

এই দোকানের ভাল জিনিস হচ্ছে , সব টাটকা । চোখের সামনে বানিয়ে দেবে ।

এমনকি বেগুনি চাইলেও চোখের সামনে বেগুন ফালি করে বেসন গুলে ভেঁজে দেবে ।

দীনেশ বাবু মোটা সোটা মানুষ । মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে । কাচাপাকা । পেল্লাই এক জোড়া গোপ । চোখে ভালমানুষের ছায়া ।

বাবুর্চিদের একটা ইউনিফর্ম চাপিয়ে কাজে লেগে গেল  ।

শকুন্তলা দেবীর বয়স চল্লিশ । দেখায় একটু বেশি । জীবন এদের  অনেক কষ্ট দিয়েছে । চেহারায় ছাপ রয়ে গেছে সেটার ।

মধ্য বয়স্ক এই দম্পতিকে দেখে সবাই অবাক হবে । দেখেই বুঝা যায় খাবারের দোকান চালানো আসল রুজি ছিল না এদের । ঈশ্বরের নিষ্ঠুর কৌতুকে এরা অমন করছে ।

বিশ্বরোডে এই দোকানটা দশ বছর আগে দীনেশ দম্পতির  একমাত্র ছেলে চালু করেছিল ।

দারুন নাম করেছিল তখন ।  বেশ চলতো । এক গরমের হলুদ দুপরে   ছেলেটা রাস্তা পাড়ি দেয়ার সময় গাড়ি চাপা পরে মারা  যায়  ।

দীনেশ দম্পতি তখন পাগল হয়ে ছিল অনেকগুলো দিন  মাস  বছর ।

সবাই বলেছিল দোকান বিক্রি করে দিতে ।

প্রাণে ধরে সেটা করতে পারেনি এরা । এই দোকান তাদের একমাত্র ছেলের স্বপ্ন , স্মৃতি । কিভাবে বিক্রি করে ?

নিজেরাই চালু করেছে ।

যতক্ষণ দোকান চালায় মনে হয় ছেলের সাথে সময় কাটাচ্ছে ।  মরণের ওপার থেকে খোকা  সব দেখছে ।   ভালই লাগে ।

বছর খানেক আগে কয়েকজন মাস্তান এসে খেয়ে,  পয়সা না দেয়ার ফন্দি হিসাবে ঝামেলা করেছিল । কাকতালীয় ভাবে দিলদার খান ঢুকে পড়েছিল এক পেয়ালা চায়ের জন্য । রাম প্যাঁদানি দিয়েছিল সদ্য তরুণ মাস্তানদের ।

সেই থেকে পরিচয় । সখ্যতা ।

 

'সবজি হলে ভাল হত । ' টেবিলের সামনের একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন দিলদার খান । ' ডিম ভাঁজা সারা দুনিয়ায় পাওয়া যাবে । কিন্তু আপনার সবজির ঘ্যাঁট সেরা । একদম মন্দিরের ল্যাবরার  মত ।'

'সরি স্যার ।' মুখটা করুন করে বলল দীনেশ বাবু । ' দোকান বন্ধ করতাম। তেমন খদ্দের নেই । ভাল সময় এসেছেন । মিনিট  পাঁচেক দেরি হলেই হয়েছিল । '

ইউনিফর্মের সম্মান দেখাতে খানিক দূরে একটা চেয়ার টেনে বসলো খলিল । মন ভাল হয়ে গেছে । বৃষ্টিতে ঘুরতে ভাল লাগছিল না। এক পেয়ালা চা দরকার ছিল ।

 চা  ছাড়া বাঁচা  যায় নাকি  ?

চা কারা আবিস্কার করেছে ? চাইনিজ সাধুরা ? ওদের ধন্যবাদ দেয়া দরকার । মনে মনে ধন্যবাদ  দিল ।

দোকানটা বেশি বড় না। বড় জোড় দশজন খদ্দের বসতে পারবে। বেশ ফাঁকা ফাঁকা করে টেবিল পাতা হয়েছে । চেয়ারগুলো গদি আঁটা । কাউনটারের    সামনে হাফ ডজন টুল আছে । বুঝা যায় দোকানের ডিজাইন করেছিল টগবগে কোন তরুণ ।

একটা কফি মেশিন , সাথে এক ডজন  চিনামাটির পেয়ালা । হাতির দাঁতের রঙা দেয়ালে  গোল ঘড়ি । কোন একটা কোমল পানীয়ের কোম্পানি মাগনা দিয়েছে ওটা । একটা মিউজিক প্লেয়ার । খদ্দের অনুরোধ করলেই সেটা বাজানো  হয় ।

'নতুন কোন খবর আছে দিলদার বাবু ।' চায়ের পেয়ালায় চিনি মেশাতে মেশাতে জানতে চাইলো শকুন্তলা দেবী ।

দিলদার খান যখনই এসে বসে তখনই হরেক রকম ক্রাইম স্টোরি নিয়ে গল্প করেন  । এই দম্পতির চোখে উনি জ্যান্ত ' জেমস হেডলি চেইজ ।'

'আপনারা তো মনে হয় রেডিও শুনেন না । নিউজ পেপারও রাখেন না ।' চেহারাটা কেমন সিরিয়াস করে ফেললেন দিলদার খান ।

না। এই দম্পতি খবরের কাগজ রাখা ছেড়ে দিয়েছে । খদ্দের সেটা হাতে করে নিয়ে ভেগে যায় । তাছাড়া গত কয়েক দশক ধরে খবরের কাগজে এমন কোন খবর ছাপা হয়নি যা দেখে মানুষ শান্তি পাবে।

রেডিও ?

সেটা ছাড়েন । তবে খদ্দের গান শুনতে চায় ।  খবর না ।

' কেন কি হল আবার ?' পরোটা উল্টে প্লেটে নামাতে নামাতে দীনেশ বাবুর প্রশ্ন ।

'গতকাল নিতাইগঞ্জের এক আবাসিক হোটেলে খুন হয়েছে ।' তম্বা চেহারা করে বললেন দিলদার খান । ' এক হালি খুন । গোলাগুলি । কে মারল কেন মারল কিচ্ছু জানা যায়নি । দুই লাশ পরে ছিল  গাড়ি পার্ক করার জায়গায় । একটা ছিল বাথরুমে । আরেকটা বিছানার তলায় লুকিয়ে ছিল । মারা গেছে ওখানেই ।  চেহারায় ভয়ের ছাপ ।'

হাত বাড়িয়ে পরোটা- ডিম ভাঁজার প্লেটটা নিলেন তিনি । ' হতে পারে গ্যাং ফাইট । মাদক চোরাচালান নিয়ে বা এলাকা দখল নিয়ে লড়াই করে নিজেরা মারা গেছে । এই রকম আকসার হয়েই থাকে । উম্ম দারুন ঘ্রাণ । খেয়ে নিই ।'

' পুলিশ কোন রকম সুত্র পেয়েছে ?' খলিলের সামনে  চায়ের পেয়ালা দিতে দিতে প্রশ্ন করলো শকুন্তলা দেবী । উনার গলায় ভয় ।

স্বাভাবিক । মধ্য বয়স্কা দম্পতি একা থাকে এই শহরে ।

' নাহ ।' মুখে খাবার পুরে জবাব দিলেন দিলদার খান । ' কোন রকম সুত্র পাওয়া যায়নি । তদন্ত চলছে । দেখা যাক । যদি কোন ভাবে জানা যায় অপরাধীদের গ্যাং ওয়ার তবে পুলিশ হাত পা ধুয়ে বসে থাকবে ।  ভাবখানা নিজেরা নিজেরা কামড়া কামড়ি  করে  মরুক । '

আচমকা গাড়ির হেড লাইটের আলো এসে পড়লো সবার চোখে মুখে । শোনা গেল টায়ারের কর্কশ শব্দ ।

সবাই ফিরে চাইলো ।

পুরানো লক্কড় ঝক্কড় মার্কা একটা গাড়ি এসে থামল বাইরে । ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে পড়লো টাক মাথার এক ভদ্রলোক । চোখে চশমা । সাথে বাঁধাকপির মত মোটা এক মহিলা । আর দশ বারো বছরের একটা বালক ।

সবাই টি-রেক্সের মত মাথা নীচু করে বৃষ্টির হাত থেকে বেঁচে দোকানের দিকে দৌড় দিল ।

খানিক পর তিন জনেই ধুস মুস করে ঢুকে পড়লো ভেতরে ।

ঘণ্টা বাজল টুং টাং ।

'খোলা নিশ্চয়ই ।' জানতে চাইলো চশমা ভদ্রলোক ।

' নিশ্চয়ই ।' জবাব দিল দীনেশ বাবু । ' কিন্তু ভাত তরকারি পাবেন না।'

' চা কফি ?' জানতে চাইলো চশমা ।

' পাবেন । সাথে হালকা পাতলা খাবারও । '

তিন জনেই দূরের একটা টেবিল দখল করে বসে পড়লো ।

'চিটাগাং যাচ্ছিলাম , শালার বিয়ে ।' সাফাই গাইল চশমা । ' এই বৃষ্টির মধ্যে টানা গাড়ি চালানো যে কি ঝক্কি । ব্রেক দরকার । ঠাণ্ডায় হাত পা জমে গেছে । '

'অমন রাতে দূরপাল্লার যাত্রা আমি সমর্থন করি না। ' মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে আউ আউ করে বললেন দিলদার খান । ' বড্ড বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন । সামনে রসুলগঞ্জের ওখানে রাস্তা আবার ভাঙ্গা ।  জল জমে গর্ত বুঝা যায় না। খানিক দূরে একটা হোটেল আছে । হোটেল বনলতা । অল্প খরচে রাতটা কাটিয়ে সকালে যাত্রা করলে ভাল হত ।'

তিনজনের দলটা কেমন দমে গেল কথাগুলো শুনে ।

'খারাপ হবে না ।' সমঝদারের মত মাথা নেড়ে জবাব দিল চশমাওয়ালা । ' মনে হয় তাই করতে হবে ।'

মেনু হাতে এগিয়ে গেল শকুন্তলা দেবী । ' চা না কফি ? খোকার জন্য চকোলেট শেক দিতে পারব ?'

'বার্গার আছে আপনাদের ?' খোকা মানে সেই বালক জানতে চাইলো ।

'নেই তবে ডিম ভেঁজে পাউরুটি দিয়ে স্যান্ডউইচ বানাতে পারব । সাথে আলু ভাঁজা । তোমরা ফেঞ্জ ফ্রাই না কি বল ।'

আরও কিছু বলত শকুন্তলা দেবী ।

বাইরে গাড়ির টায়ারের বিচ্ছিরি শব্দ হল আবার ।

 

 

 

এত গহন বৃষ্টি । দোকানের ভেতরের সাতজন মানুষের শব্দ । তারপরও সবাই চমকে ফিরে তাকাল । বিশেষ করে বালক আর বাঁধাকপির মত মোটা মহিলা উঠে জানালা পর্যন্ত চলে গেল ।

রাস্তার দুই প্রান্ত থেকে তুমুল বেগে আসছিল দুটো গাড়ি ।

গতিবেগ, পিচ্ছিল সড়ক অথবা অন্য কিছুর জন্য মুখোমুখি সংঘর্ষ হতে হতে এক চুলের জন্য বেঁচে গেল ।

তবে পেশাদারী চোখে দিলদার খান যা বুঝলেন নীল রঙের গাড়িটার দোষ , যেটা রসুলগঞ্জের দিক থেকে আসছিল ।

অনেক বেশি জোড়ে চালাচ্ছিল সেই গাড়ির চালক । অন্য প্রাইভেট কারটা কোন ভাবে বেঁকে গিয়ে বেঁচে গেল দুইজনেই ।

নইলে সবাই সাক্ষী থাকতো মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনার ।

নীল রঙের গাড়িটা নিয়ন্ত্রন হারিয়ে হয়তো রাস্তার পাশের ডোবার মধ্যে পড়ে যেত । কোন ভাবে অথবা ভাগ্যের জোড়ে সামনে নিল নিজেকে ।

মাতালের মত খানিক চলে এসে থামল দীনেশ বাবুর দোকানের সামনে ।

পাক্কা ড্রাইভার ।

উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার সামনে এসে পড়েছেন দিলদার খান ।

খলিল বসে খেয়েই যাচ্ছে । যদিও সতর্ক চোখে চেয়ে আছে । ওর বসার জায়গা থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যায় ।

একই জায়গায় পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে দীনেশ দম্পতি । এত গোলমালের মধ্যেও কোত্থেকে একটা পান মুখে ভরে চিবুনো শুরু করেছে দীনেশ বাবু ।

সবাই যেন একটা মঞ্চ নাটক দেখছে ।

নীল গাড়িটা থামল দোকানের বাইরে পারকিং প্লেসে ।

ঘন নীল না। ফিরোজা । দুধের বাটিতে বেশ খানিক কাপড় কাঁচা নীল পড়ে গেলে অমন দেখায় ।

বাদলার রাতে সব কেমন অন্য রকম ।

গাড়ির ড্রাইভার দরজা খুলে যেন এক মহাযুগ পরে নামলো । তখনই দূরে কোথাও বাজ পড়লো । আকাশে চমকে উঠলো আদিম বিদ্যুৎ । সেই নীলচে বেগুনী মাহাজাগতিক আলোতে দেখা গেল এক যুবকের মুখ ।

'যাক এত রাতে গোরস্তানে যেতে হবে না আমাদের ।' পরিবেশটা হালকা করার জন্য বললেন দিলদার খান । ' দীনেশ বাবু মনে হয় খদ্দের পেলেন ।'

তখনও পান চিবুচ্ছে দীনেশ বাবুর । কোন কারণ ছাড়াই গা ছমছম করে উঠলো তার  ।

কেন অমন হল সেটার ব্যাখ্যা পরবর্তীতে কখনও  পাননি দীনেশ বাবু ।

তখন অবশ্য তার মনে হয়েছিল বাদলার দিনের স্বাভাবিক ব্যাপার । অমন হয় । বৃষ্টির দিনে অমন অনেক রকম অনুভূতি হয় । সবার ।

মাপা সতর্ক পায়ে যুবকটা এগিয়ে এলো দোকানের দিকে । বৃষ্টির ঝটকা আগের চেয়ে সামান্য বেড়েছে । দোকানের দরজা পর্যন্ত আসতেই বেশ ভিজে গেল ।

ভুরু -চুল বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে ।

সবার দিকে এক নজর চোখ বুলিয়ে নিল আগন্তুক । ভেতরের উজ্জ্বল হলুদ পাকা লেবুর খোসার মত আলোতে সবাই দেখতে পেল তাকে ।

আটাশ - ত্রিশ বয়স ।

রোগাই বলা যায় । চোয়াল ভাঙ্গা । বেতফলের মত ম্লান চোখ । চোখের নিচে কালির প্রলেপ । সেটা ঘুমের অভাবে হতে পারে ।

কিন্তু খলিল প্রথম দর্শনেই মনে মনে - 'হালায় নেশাখোর হিরোইঞ্চি' অমন তকমা দিয়ে ফেলল ।

কালো জিন্সের প্যান্ট আর কালো রেশমি কাপড়ের জামা গায়ে । কি মনে করে পাতলা ছিল ছিলে কাপড়ের উইন্ড ব্রেকার চাপিয়েছে গায়ে । সেটাও কালো ।

বর্ষার মউসুমে কেউ গায়ে উইন্ড ব্রেকার চাপায় না। তবে এই ব্র্যান্ডের উইন্ডব্রেকার শীতের মউসুমের জন্য না সেটাও মনে মনে স্বীকার করলেন দিলদার খান । বাদলার দিনের জন্যই ।

ছেলেটাকে বেশ বানিয়েছে ।

সবাই ওর দিকে চেয়ে আছে সেটা বুঝে খানিক বিব্রত হল আগন্তুক ।

এক পা খানিক টেনে টেনে হাঁটে ।

সেটা লক্ষ্য করে খলিল মনে মনে রায় দিল - চুরি চোট্টামি করতে গিয়ে মাইর খেয়েছিল হালায় ।

রিঙে ঝুলে থাকা তোয়ালেতে মাথা হাত মুছে দীনেশ দম্পতির দিকে ফিরে বলল , ' একদম ফুটন্ত গরম চা দিতে পারবেন ? আপাতত এক কাপ । কিন্তু পরে আরও দুই এক কাপ লাগবে । চিনি বেশি ।'

চিনি বেশি শুনেই খলিল মনে মনে বলল -কই ছিলাম না হালায় ফ্রেন্সিখোর ?

চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো শকুন্তলা দেবী ।

কাঠের টুল টেনে কাউনটারের সামনে বসে পড়লো ল্যাংড়া যুবক ।

' অ্যাই মিয়া ।' আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন দিলদার খান । হালকা ভৎসনার সুরে বললেন , ' অনেক বেশি স্প্রিডে গাড়ি চালাচ্ছিলেন আপনি । তাই না ?'

'হ্যাঁ ।' মাথা সামান্য নেড়ে নরম গলায় বলল যুবক । 'একটু বেশি জোড়েই... সরি ।'

' একটু না , অনেক বেশি জোড়ে গাড়ি চালাইছেন মিয়া ।' মওকা পেয়ে এই প্রথম কথা বলে উঠলো খলিল ।

' তুমি থাম খলিল ।' হাত তুলে সঙ্গীকে থামিয়ে দিলেন দিলদার খান । ' এত জোড়ে গাড়ি চালানো ঠিক না। দুর্ঘটনা ঘটতে পারে । গাড়ি ড্রাইভ করার সময় মনে রাখবেন আপনার এবং পাবলিকের জান আপনার হাতে ।'

'সরি স্যার ।' নরম গলায় জবাব দিল যুবক ।

ততক্ষণে পেয়ালা ভরে চা যুবকের সামনে দিয়ে ফেলেছে শকুন্তলা দেবী ।

কামরার সবাইকে অবাক করে দিয়ে এক কাণ্ড করলো যুবক ।

গরম পেয়ালা মুখের সামনে নিয়ে এক চুমুকে শেষ করে দম ছাড়ল সে। মনে হচ্ছে জল গিলল ।

সবচেয়ে বেশি হতভম্ব হয়ে গেল শকুন্তলা দেবী নিজে ।

'আরেক পেয়ালা দিন তো ।' যুবকের আবদার ।

'আপনি কি মেনুটা দেখবেন বাবা ? কিছু খাবেন ? ' পেয়ালা ভর্তি করে সামনে রাখতে রাখতে জানতে চাইলেন দেবী ।

আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন দিলদার খান । পেশাদারী মাপা চোখে দেখছেন সব কিছু 

শকুন্তলা দেবী তিনজনের পরিবারটার সামনে যাবার আগে দিলদার খানের সামনে দাঁড়িয়ে কণ্ঠস্বর কয়েক ধাপ নামিয়ে বললেন , ' ছেলেটা ক্লান্ত , অন্য কিছু না। বিরক্ত করবেন না ওকে ।'

পান চিবুতে চিবুতে সামনে এগিয়ে গেল দীনেশ বাবু । কারণ ছাড়াই সতর্ক ভাবে দেখছেন ছেলেটাকে । কেন ? নিজেও জানে না ।

'কিছু খাবেন ?' জানতে চাইলেন ।

'বিয়ার বিক্রি করেন ?' সহজ গলায় জানতে চাইল যুবক । যেন সরল কোন পানীয় চাইছে ।

সারাদিনে এই প্রথম হাসল দীনেশ বাবু , ' নাহ , লিকার লাইসেন্স নেই । অবৈধ ভাবে এই সব জিনিস বিক্রি করিও না । অনেক ফাস্টফুড দোকানে পাবেন । আমার কাছে না ।'

খুব খারাপ কথা ।' আফসোস করলো যুবক । ওর ভেজা চুল থেকে জল গড়াচ্ছে টপটপ করে । ' এমন বাদলার দিনে ঠাণ্ডা বিয়ার সেইরকম জিনিস ।'

'খুব পিনিক উঠে তাই না ?' বলে উঠল খলিল ।

জবাব দিল না যুবক । খানিক বাদে আপন মনেই বলল , ' নাহ বিয়ারের একটা বাজে ব্যাপার হল ঘুম ঘুম  তন্দ্রা  এসে যায় । ওটাই খারাপ ।

 টেবিলের   সামনে এগিয়ে গিয়ে নিজের চায়ের পেয়ালা তুলে নিলেন দিলদার খান ।

কি মনে করে বসলেন না । আগের জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন । এখান থেকে পুরো কামরা এক সাথে দেখা যায় । আবার বাইরের রাস্তা আর পারকিং প্লেস ও দেখা যায় ।

 

অদ্ভুত এক অনুভূতি হল দীনেশ বাবুর ।

ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারবে না । কেন যেন তার মনে হল এই বাদলার রাত অনেক পুরানো ।

তার স্মৃতি আর মহাজগতের একটা অংশ । পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে বৃষ্টি হয়েছিল । তাতেই তো প্রাণ এসেছে । রোদের চেয়ে বৃষ্টি অনেক প্রাচীন অনুভূতি ।

এইযে দমকা হাওয়া , ভেজা রাত  তার অনেক পরিচিত । আবছা ভাবে যেন দেখতে পেল যুবকটা বসে আছে , কিন্তু ওর হাতে চায়ের পেয়ালার বদলে নাম করা বিদেশী কোম্পানির একটা বিয়ারের টিন ।

'আপনি ঠিক আছেন তো ?' যুবকের কথায় তন্দ্রামত ভাবটা চলে গেল দীনেশ বাবুর।

মনে হল মাইক্রো স্লিপে চলে গিয়েছিলেন ।

কানে এলো শকুন্তলা দেবী খাবারের অর্ডার বুঝিয়ে দিচ্ছে তিনজনের পরিবারটাকে ।

'আরও চা লাগবে ?' নিজেকে সামলে জানতে চাইলো দীনেশ বাবু । কারণ যুবকের পেয়ালা শূন্য ।

'দিন , চা বেশি লাগে আমার । অভ্যাস ।' শান্ত গলায় ব্যাখ্যা করলো যুবক ।

কেতলিতে ছিল ।

ঢেলে পেয়ালা ভর্তি করে দিল দোকানী ।

পকেট থেকে কমলা রঙের একটা কৌটা বের করলো যুবক । লেবেল সাঁটা । অমন কৌটায় ওষুধ ফসুধ রাখে লোকজন ।

ছিপি খুলে কড়ে আঙুলের প্রথম কড়ের সমান দুটো ক্যাপসুল বের  করে  আনল সে । মুখে ফেলে চা দিয়েই গিলে ফেলল ।

আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে পরোটা আর ডিম ভাঁজা খাচ্ছিলেন দিলদার খান । অলস চোখে সব দেখছেন ।

' ওষুধ মনে হচ্ছে ?' জানতে চাইলেন ।

'ঠিক ধরেছেন স্যার ।' যুবক বিরক্ত না , কথার খাতিরে কথা চালিয়ে যাচ্ছে ।

' কিয়ের ওষুধ ?' খলিলের প্রশ্ন । ' 'আজকাইল গুমের ওষুধ খাইয়া মেলা ছাওয়াল পাওয়াল নিশা করে ।' ঠাস করে বলে বসলো খলিল ।

'ঘুমের ওষুধ খেয়ে যে কেউ গাড়ি চালায় আপনার কাছ থেকে জানলাম ।'

চেহারা শান্ত রেখেই জবাব দিল যুবক ।

' বাবা আপনি ডিম ভাঁজা আর পরোটা খাবেন ?' পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সামনে চলে এলো শকুন্তলা দেবী । ' আর কিছু নেই । '

' না । লাগবে না । আরও খানিক চা দিন ।' যুবকের জবাব । ' এটাই শেষ কাপ । তারপরই চলে যাব ।'

'এই বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালিয়ে যেতে কষ্ট হবে। ' কথার কথা অমন ভাবে বললেন দিলদার খান । কিন্তু আসলে ফাঁদ পাতছেন ।

'মনে হয় না । ভাল গাড়ি চালাই ।' খানিক টিটকারির সুরে বলল যুবক ।

'সে তো দেখলামই ।' সমান তালে ফেরত দিলেন দিলদার খান । রুমাল দিয়ে মুখের কোনা মুছতে মুছতে বললেন , ' যেই ভাবে গাড়ি চালান তাতে পথের মাঝখানে কোন রকম এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে বসলে অবাক হব না মোটেও । যাবেন কোথায় ?'

' নারায়ণগঞ্জ ।'

'সে তো বেশ দূরের পথ । এক কাজ করুন না । পাশেই একটা হোটেল আছে । সস্তা । রাতটা কাটিয়ে সকাল বেলায় যেতে পারেন । ওই ফ্যামিলির মত । সেটাই নিরাপদ । '

'না স্যার ।' সাফ মানা করে দিল যুবক । ' কোথাও রাত কাটাতে পারব না। আমাকে যেতেই হবে ।'

' খুব জলদি মনে হচ্ছে ।' অবাক হয়েছেন অমন একটা ভাব ধরে বললেন অফিসার । ' ভাগছেন টাগছেন নাকি ? মানে যারা কোন কাণ্ড করে বসে তারাই অমন জলদির তালে থাকে ।'

লম্বা দম নিল যুবক । পকেট থেকে পিতলের জিপ্পো লাইটার বের করে  খামাখাই কয়েকবার  জ্বেলে পরখ করে  রেখে  দিল কাউনটারে । ' আমি ভাগছি না।' ভাগার মত কিছু করিনি । শুধু রাতে বাইরে থাকতে চাই না।'

' কেন ?' সামনে এগিয়ে এলেন দিলদার খান । যুবকের সামনের টুলে বসলেন বুজুম ফ্রেন্ডের মত  । ' কোন সমস্যা ?'

'কোন সমস্যা নেই স্যার । ' খানিক বিরক্ত হল যুবক । ' আপনি গায়ে পরে আমার সাথে অমন করছেন । আমি রাতে বাইরে থাকতে চাই না । বাসায় থাকতে চাই ।'

'পেশা কি আপনার ?'

' চিকিৎসক । আগে আর্মিতে ছিলাম । বাদ পড়েছি । সেইজন্য লজ্জিত । '

'খুব ভাল । আমারও শখ ছিল আর্মিতে ঢোকার । মামা চাচা না থাকায়  সুপারিশ হয়নি । বাদ পড়েছি । আর লজ্জিত হবার কিছু নেই ।'

যুবক উঠে পড়লো ।

' আমার বিল কত হয়েছে মাসি ?' শকুন্তলার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলো ।

মুখে মুখে হিসাব করে জবাব দিল শকুন্তলা দেবী ।

' আপনি হোটেলে রাত কাটিয়ে সকালে যান । রাস্তার অবস্থা ভাল না ।' টুল ছেড়ে উঠে পড়লেন দিলদার খান । দাঁড়ালেন যুবকের সামনে ।

'আপনি তো কড়া মাল সাহেব ।' যুবকের গলায় রাগ । ' কোন কমিশন পান নাকি ওই হোটেল থেকে ?'

'আপনার ভালর জন্যই ...'

'আমার ভাল আপনার চিন্তা করতে হবে না । ডিউটি করুন । আর্মিতে ছিলাম । জীবনের অভিজ্ঞতা আপনার চেয়ে হাজারগুণ বেশি । চোখের সামনে কত মৃত্যু আর রক্ত দেখলাম । '

'কোথায় লড়াই করেছেন আপনি ?' ফস করে বলে বসলেন দীনেশ বাবু । মুখে পান । চিবিয়ে রস গিলছেন নিয়মিয় ছন্দে । অবাক হয়ে কথাবার্তা শুনছিলেন ।

'কোথাও না। কিন্তু অনেক মৃত্যু দেখছি ।' কেমন ক্ষ্যাপার মত বলে বসলো যুবক । ' সব সময় ।'

বাইরে তাকাল যুবক । অন্ধকার । বৃষ্টি । রুম ঝুম শব্দ ।

'কি দেখছেন রাইরে ?' চিবিয়ে চিবিয়ে বলল যুবক । ' শান্ত রাত । তাই না । কিন্তু গত বছর এমন রাতেই আক্রমণ করা হয়েছিল আমাকে । একগাদা সৈনিক । গুলি করেছিল । কল্পনা করতে পারেন সেইরাতেও বৃষ্টি হচ্ছিল । গুলি খেয়ে কাঁদার মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে আধামাইল গিয়েছি আমি । পারবেন ? জানেন কেমন লাগে কাঁদার মধ্যে আহত অবস্থায় হামাগুড়ি দিতে ?'

কামরার সবাই অবাক হয়ে চেয়ে আছে ওর দিকে । শুনছে ওর কথা । শকুন্তলা দেবীর হাতে চায়ের পেয়ালা । কেতলিতে  সামান্য ছিল । নিজে খেয়ে  নেবে। ফেলে দিতে মায়া লাগে ।

' আপনি বলতে চাইছেন গত বছর বাইরের ওই জায়গায় আপনাকে গুলি করা হয়েছিল ? ' ম্বা চেহারা করে বলল দীনেশ বাবু । ' হ্যাঁ অমন একটা কথা শুনেছি । মানে গোলাগুলির শব্দ পেয়েছে অনেকে কিন্তু ...'

কথা শেষ করলো না ।

কেন কে জানে ?

' আমাকে যেতে দিন । ' আবারও বলল যুবক । ' দূরে যেতে হবে আমাকে ।

'গত বছর গোলাগুলির ব্যাপারটা একটু বলুন তো ।' দিলদার খান বললেন খানিকটা হুকুমের সুরে ।

' বললাম তো একগাদা সৈনিক । ওদের গুলি লেগে আমার পা নষ্ট হয়ে যায় । হাতের তালুতে লেগেছিল একটা ।' হাত উঁচু করে তালু দেখাল যুবক । পুরানো বুলেটের ক্ষত  সেখানে  ।  আমাকে যেতে দিন ।'

উঠে দীনেশ বাবুর সামনে গেল যুবক । ' সবাই ক্ষমা করবেন আমাকে । সামান্য উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম । কত যেন হয়েছে আবার বলবেন ?'

দীনেশ বাবু জবাব দিল ।

যুবক পকেট থেকে টাকা বের করল ।

খলিল উঠে  এসে দাঁড়ালো দিলদার খানের  পাশে । ' স্যার ব্যাটা সন্দেহজনক মাল ।' ফিসফিস করে বলল ।

'হু , ধরে থানায় নিতে হবে । জটিল  কিছু লুকাচ্ছে।'একই রকম ফিসফিস করে বললেন দিলদার খান।  

'আর্মিতে আছিল সাবধান ...'

'ছিল , এখন নেই ।'

চায়ের দাম শোধ করে ফিরতেই যুবক আবিস্কার করলো দরজা ব্লক করে দিলদার খান দাঁড়িয়ে আছেন  ।

'ভাল কথা,  আপনাকে আমি যেতে দিতে পারি না । ' শান্ত গলায় বললেন দিলদার খান । ' হয় আপনি পাশের হোটেলে গিয়ে রাত কাটাবেন । সকালে চলে যাবেন আপনার বাসায় । অথবা এখনই আমাদের সাথে থানায় যাবেন ।'

'সেটা ভাল হবে না স্যার ।' মুখ শক্ত করে বলল যুবক । ' অনেক নিরীহ মানুষের বিপদ হতে পারে । কোন হোটেলেই সেইজন্য রাত কাটাই না আমি ।'

'হুমকি দিচ্ছেন ?'

'না সাবধান করে দিলাম ।'

কেন ?'

'শেষ বার আমি একটা হোটেলে রাত কাটিয়েছিলাম । সাবধানেই ছিলাম । পেয়ালার পর পেয়ালা চা গিলেছি । তারপরও ঘুমিয়ে গেছি । তখন আবার আক্রমণ করেছিল আমাকে । আমার কিছু হয়নি । কিন্তু পাশের রুমের চারজন মারা গিয়েছিল । '

'কি বলছেন এইসব ? কারা আক্রমণ করে আপনাকে ? আপনি কেন আইনের আশ্রয় নেন না ? পুলিশে যান না কেন ? 

' আমি ঘুমালেই ওরা আসে । ঘুমের জগত থেকেই । আমি ঘুমিয়ে গেলেই কয়েক মুহূর্তের জন্য দুঃস্বপ্ন দেখি আমি । সেইসব আসলে বাস্তব হয়ে যায় । '

' মানে কি ?' প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন দিলদার খান ।

' শালা এ তো দেখছি বোধাইয়ের হাট বাজার ।' ঢোক গিলল খলিল ।

' দাঁড়ান একটু বুঝিয়ে বলছি ।' কাঁপা কাঁপা গলায় বলল যুবক । ' দীনেশ বাবুর দিকে ফিরে বলল , ' আপনার দোকানে হাঁসের মাংস আছে ?'

'প্রশ্নই উঠে না ।' পান মুখে জবাব দিল দীনেশ বাবু ।

' ঘুম ঘুম চোখে দেখলাম হাঁসের রেজালা ।' স্বপ্নিল গলায় বলল যুবক । চেয়ে আছে চুলার দিকে ।

কামরার সবাই চমকে উঠলো । চুলার উপর দেখা যাচ্ছে মাঝারি একটা ডেকচি । মাংস রান্না হচ্ছে । চনমন করা সৌরভ ।

সবাই দেখল । সবচেয়ে বেশি চমকে গেল শকুন্তলা দেবী । মুখ থেকে বের হয়ে গেল , ' হায় ভগবান ।

মোটা বালক চেঁচিয়ে উঠলো , ' আব্বা দেখেন দেখেন ...'

মাত্র পাঁচ থেকে ছয় সেকেন্ড ডেকচিটা দেখা গেল । মিলিয়ে গেল বাতাসে ।

' এই রকমই হয় সব সময় ।' কান্না মেশানো দুঃখী গলায় বলল যুবক । 'বেশিক্ষণ থাকে না বাস্তবতা । ঘুমের আলফা লেভেলে গেলে যা স্বপ্ন দেখি তাই বাস্তব হয়ে যায় । কিন্তু খুবই স্বল্প সময়ের জন্য । স্বপ্ন যে আসলেও সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী জিনিস কে না জানে !'

ধপাস করে হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়লো দীনেশ বাবু । ভয় পেয়েছে । অচেনা ধরনের আতঙ্ক ।

'ফাজলামোর একটা সীমা আছে । ' গলা উঁচু করে চেঁচিয়ে উঠলেন দিলদার খান । ' এইসব হাত সাফাইয়ের জাদু দেখিয়ে আমাকে ভুলাতে পারবেন না। থানায় নিয়ে ডলা দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে ।'

' খামাখাই চেঁচাবেন না দিলদার খান ।' শান্ত গলায় বলল যুবক । ' এখনও কিচেনে হাঁসের মাংসের রেজালার ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে ।'

' তো ?' চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন দিলদার খান । ' এর চেয়ে ভাল হাত সাফাইয়ের খেলা দেখেছি আমি । দুনিয়ার সেরা খেলা হচ্ছে পুলিশের ডাণ্ডা । অমন থেরাপি দেব আপনাকে যে একদম ভদ্র মানুষ হয়ে যাবেন ।'

'হায়রে ।' মুচকি হাসল যুবক । ' এইসব সত্যি । আমি পারি । আমি একা না । আমরা কয়েকজন । এই পৃথিবীতে বড় জোর আমরা তিনজন আছি অমন । বিজ্ঞানীরা কি যেন বলে না - প্রকৃতি কিছু মানুষকে বাড়তি ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠায় অমন আর কি। আপনি দেখেননি কিছু কিছু মানুষ জীবনেও গান শেখে না। রেওয়াজ করে না । তারপরও অদ্ভুত সুন্দর তাদের গলা । স্বর্গের গান্ধবের মত । আমার  এই বিচ্ছিরি ক্ষমতা আসলে অভিশাপের মত । ঘুমাতে পারি না। ঘুমুতে গেলেই স্বপ্ন দেখি । আর সেই স্বপ্ন স্বপ্নের জগত থেকে একদম বাস্তব হয়ে যায় । ভাগ্য ভাল মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থায়ী হয় সেই সব । নইলে কি যে হত  ?

কামরার সবাই বড় বড় চোখে চেয়ে আছে যুবকের দিকে । তিনজনের পরিবারটা আতংকে চেয়ার ছেড়ে  উঠে দাঁড়িয়েছে ।

বাইরে বৃষ্টি । নিটোল  গহন ।

' গতকাল আপনি নিতাই গঞ্জের হোটেলে রাত কাটিয়েছিলেন তাই না ?' কয়েক কদম সামনে চলে এলেন দিলদার খান । ' হোটেলের বাইরের সিসি ক্যামেরায় আপনার চেহারা ধরা পড়েছে । গভীর রাতে এই গাড়ি নিয়েই ভাগছিলেন । কি করেছেন ওখানে ? সত্যি করে বলুন ।'

'আমি রাত কাটানোর জন্য উঠেছিলাম আর কিছু না।' কান্না কান্না গলায় জবাব দিল যুবক । ' কফি চা গিলে দেখি ঘুম আসছে । তখন ঘুম দূর করার জন্য এই ক্যাপসুল খেয়েছি । মাত্র খানিক আগে যেটা গিলতে দেখলেন । তারপরও হালকা তন্দ্রামত লেগে গেল । আর ...আর তখনই এলো ওরা ।'

হাউ মাউ করে কাঁদছে যুবক । চোখে জল ।

'ওদের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল । দরজা নক করছে ওরা । হাতে অস্ত্র । সবাই আমার বুকের দিকে তাক করে রেখেছি । আমি জানি সব বাস্তব হবে। আমি ...আমি দৌড়ে পালালাম । মৃত্যু ...অহ... যে চারজন ঘটনার সময় ছিল সবাই মারা গেছে আমার দোষে ...'

মাথার চুল পাগলের মত টানতে লাগল যুবক ।

ফিরে চাইলো দিলদার খানের দিকে , চেঁচিয়ে বলল , ' আমাকে যেতে দিন দিলদার সাহেব । নইলে... নইলে পরে আফসোস করবেন ।'

দিলদার খান অভিজ্ঞ মানুষ । হাত সাফাইয়ের মত করেই হোলস্টারের টিপ বোতাম খুলে নাইন এম এম পুলিশ পিস্তল বের করে যুবকের বুকের দিকে তাক করলেন , ' আপনাকে এরেস্ট করছি । থানায় চলুন আমার সাথে ।'

তিনজনের পরিবারটা পিছিয়ে গেল । আড়াল খুঁজছে , গোলাগুলির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ।

এর পর যা হল কেউ কল্পনা করতে পারেনি ।

 

 

বাইরে গুড়ুম করে বাজ পড়লো ।

বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠলেন দিলদার খান ।

উনার হাত ফস্কে কিভাবে যেন  পিস্তলটা শক্ত মেঝেতে পড়ে গেল ।

সবাই দেখল যুবক চেয়ে আছে । মুখটা চুনের মত সাদা হয়ে গেছে ওর । চোখ দুটো  যেন বিড়ালের । মাত্র কয়েক সেকেন্ড । আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল ।

বাম হাত দিয়ে নিজের ডান হাতের কবজি ধরে রেখেছেন দিলদার খান । চেহারায় অবিশ্বাস , ব্যাথা । ফোস্কা পড়ে গেছে উনার হাতের তালুতে ।

নিজের উপর রাগে দিশেহারা হয়ে গেল খলিল ।

ডিউটি জীবনের এই প্রথম রাইফেল গাড়িতে রেখে এসেছে । কিছু করবে সেই সাহসও পাচ্ছে না ।

ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে যুবক এগিয়ে গেল শকুন্তলা দেবীর সামনে । মাথায় হাত রেখে বলল ,' আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন মা । দারুন চা বানাতে পারেন আপনি । আমার মা ও অমন বানাত । '

'নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন বাবা ।' একটু ও ভয় পাননি শকুন্তলা দেবী । কেন ? সেটা বুঝিয়ে বলতে পারবেন না। কখনই না ।

ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল যুবক  ।

এত দ্রুত ঘটলো,  যে কেউ দিলদার খানকে বাহবা দেবে ।

টেবিল থেকে টম্যাটোর কেচাপের একটা বোতল তুলে  গায়ের সব শক্তি দিয়ে ভাংলেন যুবকের মাথায় ।

কাচ ভাঙ্গার শব্দ । মোটা বালক আর শকুন্তলা দেবীর চিৎকার । সব মিলিয়ে নরক গুলজার ।

'বাগে পেয়েছি হামারজাদাকে ।' চিৎকার করে বললেন দিলদার খান । ' খলিল জলদি হ্যান্ডকাফ লাগাও ।'

' উনি কি মারা গেছে ?' কি মনে করে চেঁচিয়ে জানতে চাইলো মোটা বালক । এই জাদুকরকে তার ভালই লেগেছিল । মারা গেলে কষ্ট পাবে। ইস্কুলে গিয়ে এর কথা বলতে পারবে সে । বেঁচে থাকুক ।

দ্রুত এগিয়ে যুবকের হাতে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দিল খলিল । ' চোখের পাতা নড়তাছে । হালায়  জ্ঞান  ফিরা পাইব জলদি ।'

জানালো খলিল ।

'আপনারা গাড়িতে গিয়ে বসুন ।' তিনজনের পরিবারের দিকে ফিরে বললেন দিলদার খান । ' আমার ধারনা এই ব্যাটা একা না ওর দলের আরও লোকজন আছে । নিরাপদে চলে যান । '

যুবক তখন চেতনা আর অতিচেতনার মাঝামাঝি কেমন একটা স্তরে আছে ।

 ঘুম ঘুম ভাব। স্বপ্ন ? বাস্তবতা ?

কেউ নেই তারপরও দরজার ঘণ্টা বেজে উঠলো ঠুং ঠ্যাং করে ।

তিনজনের দলটা দৌড়ে বের হয়ে গেল বাইরে । কিসের খাবার ? কিসের বিল ?

বাইরে বের হওয়া মাত্র থমকে গেল পরিবারটা ।

কারা ওরা ?

কখন এলো ?

ঐদিকে তন্দ্রাছন্ন হয়ে গেছে যুবক ।

ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি । কারা যেন নেমে আসছে অন্ধকার সীমান্ত বেয়ে , তাই না ?

বাইরে বাঁধাকপির মত মোটা মহিলা চেঁচিয়ে উঠলো , ' ওরা কারা ?'

'জানি না।' ভয়ার্ত গলার সুর স্বামীর ।

বৃষ্টি হচ্ছে ।   দূরের  আকাশ থেকে উড়ে আসছে নতুন কালো মেঘ । তুমুল হাওয়া ।

কিন্তু অচেনা উৎস থেকে ফিকে গোলাপি রঙের আলো এসে আলোকিত করে তুলছে চারিদিকটা ।

রাস্তার পাশে উল্টা দিকে একটা পেট্রোল পাম্প থাকার কথা । নেই । বদলে - গভীর বন । অচেনা মোটা কাণ্ডের গাছ দিয়ে ভর্তি । নীচে পচা পাতা , ডালাপালা।

একদল মানুষ ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে । ভারি দেহ । কুঁজো । গায়ে পশুর চামড়ার পোশাক । চুন আর লাল  মাটির রঙ দিয়ে শরীর ভর্তি আঁকিবুঁকি । হাতে পাথরের অস্ত্র । বর্শা । জ্বলন্ত মশাল ।

হাজার হাজার বছর আগের মানুষ । কোন এক অসভ্য জাতি ।

কিন্তু , কি করে   সম্ভব ?

রাস্তার এইদিক ওইদিক পড়ে আছে অসংখ্য নরকঙ্কাল । চোখের জায়গায় পান্নার মত সবুজ পাথর । কঙ্কালের গায়ে ক্ল্যামফ্লেজ আর্মি পোশাক । মাথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার হেলমেট । কিন্তু সবার মুখের দাঁত বড় বড় । পিরানহার মত ।

অচেনা অদ্ভুত এক শঙ্কর মানব জাতি।

বাস্তব আর পরাবাস্তব মিলিয়ে অন্য রকম এক দৃশ্য ।

পৃথিবীর  হারিয়ে যাওয়া কোন দৃশ্য ? আজ বৃষ্টির দিনের জলহাওয়ায় রিপিট হচ্ছে সেইসব ? নাকি পৃথিবীর কোন অন্য মাত্রা ?  দুই মাত্রা এসে ফেঁসে গেছে একই  সরল  রাস্তায় !  

দৌড়ে তিনজনের দলটা আবার ঢুকে পড়লো দোকানের ভেতরে ।

যুবকের চোয়াল ধরে জোড়ে জোড়ে ঝাঁকুনি দিচ্ছে দিলদার খান , ' উঠে পড় ব্যাটা । জলদি ...'

বাইরের উজ্জ্বল আলো দোকানের ভেতরটা আলোকিত করে তুলল ।

সবাই ফিরে  চাইল কাচের জানালা দিয়ে ।

মানুষগুলো  এগিয়ে আসছে ।

কাছে আসতেই বড় বড় পাথর ছুড়ে মারতে লাগল । সাথে সেই প্রাচীন আমলের বর্শা ।

প্রথম ধাক্কায় পুলিশের গাড়িটার সব কাচ ভেঙ্গে বনেট তুবড়ে গেল ।

মোটা মহিলা দৌড়ে এসে বসলো যুবকের পাশে , ' উনাকে জাগিয়ে তুলুন । উনি জেগে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে । দেরি হলেই সব শেষ ।'

বাইরে বৃষ্টির চেয়ে বেশি - পাথর আর তীরের ফলা, সব দোকানের দিকে উড়ে আসছে ।

একটা মশাল পুলিশের গাড়ির উপর পড়তেই বুউউপ করে আগুন জ্বলে উঠলো ।

দোকানের জানালার সব কাচ ভেঙ্গে গেল পাথরে ।

দীনেশ বাবু  সহ  সবাই দৌড়ে কাউনটারের পিছে চলে গেল । খানিক নিরাপদ ওখানে ।

মোটা মহিলা শুধু একা ঝুঁকে আছে যুবকের মুখের উপর । জান  প্রাণ দিয়ে চিৎকার করছে , ' জেগে উঠুন বাপ আমার , জেগে  উঠুন  ।'

প্রথমে মারা গেল খলিল ।

পাথরের ফলা লাগানো বর্শা ঢুকে গেছে ওর কপালে।  বিনা আপত্তিতে  কলা গাছের মত পড়ে গেল ।

আরও সামনে চলে এসেছে অচেনা সেই আদিম গোত্র ।

দোকানের ঝাড় লন্ঠন ভাঙল । কাচের টুকরো ছিটিয়ে পড়লো সবার মাথার উপর ।

ভাঙ্গলো কাচের পাল্লা দেয়া আলমারি । পেয়ালা - তশতরী -গ্লাস -চিনির বয়াম- রেডিও- কেতলি ।

দেয়ালে বাঁধাই করা তেলরঙ খসে পড়লো চশমা  ভদ্রলোকের মাথার উপর।

দরজার আড়ালে পজিশন নিয়ে পিস্তল বাগিয়ে গুলি করার আগেই তীর বিঁধল দিলদার খানের বুকে ।

মরণ চিৎকার দিয়ে মেঝেতে  পড়ে গেলেন ।

খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো বিদঘুটে একটা আদিম মানুষ । হাতে বর্শা । শকুন্তলা দেবী জীবনের প্রথম   অমন কাণ্ড করলো , কেউ চিন্তা করেনি । হাতের কাছে লোহার হাতলওয়ালা ভারি তাওয়া তুলে ছুড়ে মারলো  আক্রমণকারির মুখে ।

মুখ থুবড়ে পড়ে গেল শত্রু   ।

হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল দীনেশ বাবু । তাওয়া তুলে যুবকটার মাথায় আঘাত করতে যাবেন পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো শকুন্তলা দেবী , ' ওকে মেরো না । ওর চোখ দুটো আমার খোকার  মত ।'

থমকে গেল দীনেশ বাবু ।

'মেরে ফেলুন ।' চিৎকার করে বলল চশমাওয়ালা । ' ও বেঁচে থাকলে আরও মানুষের বিপদ ঘটাবে । মারুন ।'

হাত থমে গেল দীনেশ বাবুর ।

যুবক জেগে গেছে । চেয়ে আছে ওর দিকে । কে জানে,  হয়তো তাদের ছেলের মত ওর চোখ । শকুন্তলা কি মিছে বলবে ?

আরও চার পাঁচ জন আদিম মানুষ দরজার সামনে  দাঁড়িয়েছে । একজন বর্শা ছুড়ে   মারলো   দীনেশ বাবুর দিকে । ডান হাতের বাজুতে লাগতেই ব্যাথায় চিৎকার করে  পড়ে  গেল দীনেশ বাবু ।

'আমি এইদিকে । হাঁক দিল যুবক ।

আদিম মানুষের দলটা দাঁড়ালো ওর সামনে । পাথরের হাতুরি  দিয়ে ছেঁচে দিল যুবকের   মাথাটা ।

হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল শকুন্তলা দেবী ।

তখনই  চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেল সবাই ।

সব কিছু ।

বাইরে কেউ নেই । ফিকে গোলাপি আলো নেই । শব্দ নেই ।

বৃষ্টি হচ্ছে । পুলিশের গাড়িটা পুড়ছে । তিনজনের পরিবারের গাড়িটা ভেঙ্গে প্রায় চ্যাপ্টা হয়ে গেছে ।

ভেজা বাতাসে পোড়া গন্ধ ।

 

 

 

অনেক -  অনেক পর  এ্যাম্বুলেন্স এলো । সাথে পুলিশের গাড়ি ।

আগুন নেভাচ্ছে দমকল বাহিনির লোকজন । ভিড় । চেঁচামেচি । চিৎকার করে হুকুম দিচ্ছে বড় এক অফিসার ।

ট্রেচারে করে এ্যাম্বুলেন্স তোলা হচ্ছে দীনেশ বাবুকে । পাশে দাঁড়িয়ে আছে শকুন্তলা দেবী । হাতে ধরে আছেন স্যালাইনের ব্যাগটা ।

' চিন্তা কর না , তুমি ঠিক হয়ে যাবে ।' ফিসফিস করে বললো ।

'কেউ কি আমাদের কথা বিশ্বাস করবে ?' হাঁপাতে হাঁপাতে বলল দীনেশ বাবু ।

জবাব দিল না শকুন্তলা দেবী ।

অন্য গাড়িতে উঠানো হচ্ছে সেই তিনজনের পরিবারটাকে ।

ফিরে চাইলো শকুন্তলা দেবী । খানিক আগের ঘটনার কোন চিহ্ন নেই । একটা পাথর বা তীর বা বর্শা নেই ।

দোকান আবার মেরামত করে চালু করতে পারবে ?

ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল । বিচ্ছিরি এক রাত বদলে দিয়েছে সব কিছু ।

'অমন ক্ষমতাওয়ালা আরও কয়েকজন   আছে ।' ফিসফিস করে বলল দীনেশ বাবু ।  সবাই মরলে দুনিয়া শান্ত হবে ।´

'মনে হয় রাসপুটিন ও এদের লোক ।' বলল শকুন্তলা দেবী । কে জানে ইতিহাসে আর কে কে ছিল ! ,  

বৃষ্টি থেমে গেছে ।

পূব আকাশ অন্যদিনের   মত পাকা জামের মত কালো কুচকুচে না।

আজ হয়তো আর বৃষ্টি হবে  না ।

শন শন হাওয়ায় শকুন্তলা দেবীর শীত শীত লাগল ।

 

(Robert R. McCammon -এর ছোট গল্পের কাঠামো অবলম্বনে )

 

* মাইক্রো স্লিপ - এক সেকেন্ড বা অমন ক্ষুদ্র সময়ের জন্য ঘুম । যে কোন সময় হতে পারে ।

 

 

 

 

 

 

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...