সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সালাদ

 সালাদ কোন খাবার নয় এটি একটি শৈলী" - ফ্রান লেবোভিটজ

 

 

আগের দিনে বিয়ে বাড়িতে প্রায়ই দেখা যেত একজন বেচারাম টাইপের লোক , অ্যালুমিনিয়ামের   বিশাল একটা গামলা  নিয়ে ঘুরছে।

গামলার  মধ্যে  নোনা জলে  দৌড়া দৌড়া করছে কয়েক ফালি শশা । প্রায় গলে যাওয়া লাল টম্যাটো আর প্রচুর পেঁয়াজ।

ভোজনরত লোকজনের সামনে দিয়ে  সেই বেচারাম   ব্যস্ত ভাবে হাঁটত আর বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করত-

সালাদ লাগবে কারও  ?

কেউ হ্যাঁ সূচক মাথা ঝাঁকালেই  সেই নোনা মিশ্রণটা এক হাতা ঢেলে দিত পোলাউ মাংসের উপর।

দিতেই থাকতো । দিতেই থাকতো ।  দিতেই থাকতো ।  যতই চিল্লা ফাল্লা কর লাভ নেই। সে সালাদ দেবেই।

 

সালাদ নিয়ে  এটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।

তখন বিয়ে বাড়িই ছিল সালাদের একমাত্র সরবরাহকারি বাড়ি।

শহরের অভিজাত খাবারের দোকানগুলোতে চিকেন টিক্কা,  বটি কাবাব  বা গাল ভরা নামের খাবার গুলোর সাথে ও সালাদ আসতো উপগ্রহের মত।

আজকাল অবশ্য ফুটপাথ থেকে দুটো শিঙারা কিনলেও  খোসা সব কাটা  এক মুঠো তেঁতো শশা সালাদ হিসাবে গছিয়ে দেয়। জনগণের চাহিদা। কখনও শেকড় সহ পেঁয়াজ।

সিডনিতে রান্না বান্না নিয়ে পড়াশোনা করার সময় সালাদ একটা সাবজেক্ট হিসাবে  চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল আমার উপর ।

ঠেকায় না পরলে কে জানতে চায় এইসব?

আমিও ঠেকায় পরে জানলাম।

 

সালাদ শব্দটা এসেছে ফরাসি salada শব্দটা থেকে। আরেকটা ফরাসি শব্দ salata মানে হচ্ছে নোনতা।

রোমানরা ২০০০ বছর আগে   বেশ কয়েকটা লেটুস পাতাতে লবণ আর ভিনেগার মিশিয়ে খেত। তবে ধরে নেয়ার কোন কারন নেই যে রোমানরাই প্রথম সালাদ খাওয়া শুরু করেছিল।

তারও আগে ব্যাবিলনে সালাদ খাওয়ার প্রচলন ছিল। তবে শুধু ধনী লোকজনদের মধ্যেই।

দেখা গেছে soy sauce নামে যে নোনতা সসটা আমরা চিনি,  চীনদেশে প্রায় ৫০০০ বছর আগে এই সসটা চালু ছিল। আর নাক বোঁচা চিনারা বকচয় ( Bok choy ) নামের মায়াবী  সবুজ নরম এক ধরনের সবজীর সাথে লম্বা নরম বাঁধাকপির (যেটা নাপা ক্যাবেজ নামে পরিচিত)   টুকরো মিশিয়ে সয়োসস মাখিয়ে খেত।

সালাদের জন্ম বোধহয় তখনই হয়েছিল।

১৪০০ সালের শুরুর দিকে ইংল্যান্ডে সালাদ খাওয়া শুরু হয়।

একটা রান্নার ইতিহাস বইয়ে পড়েছিলাম-' গরমের দুপুরগুলোতে ঠাণ্ডা আমারদায়ক হালকা খাবার হিসাবে সালাদের প্রচলন শুরু হয়।'

তবে আবার সেই টাকা পয়সাওয়ালা লোকদের মধ্যেই। সালাদ খাওয়াটা অভিজাত্য প্রকাশের ও একটা নমুনা ছিল। আমরা সালাদ খাই মানে আমাদের টাকা পয়সা আছে...। বাকি সবাই ফকির । হেন তেন ।  

তবে ধীরে ধীরে সালাদের  প্রচলন বাড়তে থাকে। এমন কী তখন  শেক্সপিয়রের নাটকের চরিত্রদের সংলাপের মধ্যেও সালাদ শব্দটা ঢুকে পড়ে। মাই সালাদ ডেস, হোয়েন আই অয়াজ গ্রিন ইন জাজমেন্ট-    অ্যান্টনি এন্ড  ক্লিওপেট্রা ।

১৯০০ সালের দিকে আমেরিকানরা ও লতা পাতা আর সবজী দিয়ে সালাদ খাওয়া শুরু করে ।

আর এবার সালাদে আসে আরও বৈচিত্র , স্বাদ আর আকর্ষণ।

জাতি হিসাবে আমেরিকানরা মাংশাসী। তার উপর এদের রয়েছে জাঙ ফুড প্রবণতা। বার্গার, স্যান্ডউইচ  , পিৎজা,   আর টিনজাত খাবারের উপরই বেঁচে আছে এরা।

সালাদ খাওয়া শরীরের জন্য ভাল- আয়ু বাড়ে- ট্রেস কমে এই সব কথাগুলো প্রচার হতে লাগল নানান ভাবে।  আর হুজুগে ইয়াঙ্কিরা বোল ভর্তি সালাদ নিয়ে হাউ মাউ করে খাওয়া শুরু করলো।

আজ পৃথিবীর যে কোনও দেশের যে কোনও হোটেলে সালাদ একটা কমন ডিশ হিসাবে রাখা হয়।

এমন কি শুধু মাত্র সালাদ বানানোর জন্যও আলাদা  বাবুর্চি ভাড়া করা হচ্ছে।

কারণ বিশ্বাস করা হয় - সালাদ শুধু মাত্র কিছু লেটুস খাওয়া না। নিঃসঙ্গতা দূর করা।

  

সালাদের জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে ম্যাকডোণাল্ড, KFC  , বার্গার কিং , পিৎজা হাটের মত ফাস্ট ফুডের দোকানগুলোতেও পিচ্চি পিচ্চি কনটেইনারে করে সালাদ বিক্রি হচ্ছে।

কত রকমের সালাদ আছে ?

বলা মুশকিল।

তবে পেশাদার বাবুর্চিরা নিজেদের সুবিধার জন্য সালাদের কয়েকটি ক্যাটাগরি বানিয়েছে।

যেমন---

১। গ্রিন সালাদঃ এই সালাদের মূল হচ্ছে শুধু হরেক রকমের লেটুস পাতা । কজ লেটুস, রোমা লেটুস, আইসবারগ লেটুস এই রকম হাজার পদের লেটুস আছে। কয়েক পদের লেটুস পাতার মিশ্রণই গ্রিন সালাদ। তবে কয়েক ফালি শশা , টম্যাটোও আর পেঁয়াজ ব্যবহার করা যাবে। ব্যস আর কিছু না। অনেক দেশে বা অনেক হোটেলে একে  গার্ডেন সালাদ ও বলে।

 

২। ভেজি সালাদ : যদিও সালাদ সবজী দিয়েই তৈরি তারপরও এর নাম ভেজি সালাদ। সব ধরনের  সবজী ব্যবহার করা যায় এই সালাদে - শশা, টম্যাটো, মাশরুম, পেঁয়াজ পাতা, পেঁয়াজ, আভোকাডো,গাজর, মূলা ,শালগম, জলপাই, আলু, কেপসিকাম, বরবটি, ভুট্টা, এমন কি ভাত  পযন্ত। আর কত রকমের সবজী যে ব্যবহার করা যায় তার কোন ইয়ত্তা নেই।

৩। বাঊণ্ড সালাদ   :  এর নামের সাথে প্রকৃতির কোন মিল নেই।

এর কোনও সীমাই নেই। তবে সহজ ব্যাপার হচ্ছে এই সালাদে মায়োনেজ আর চিজ( পনির) ব্যবহার করা হয়।সেই সাথে বয়েল ডিম, গ্রিল করা মাংসের টুকরো , ভাঁজা মাছ, চিংড়ী, কাঁকড়ার মাংস, এইসব হাবিজাবি সবই দেয়া যায়।

অনেকগুলো বিখ্যাত সালাদ এই ক্যাটাগরির । যেমন - টুনা সালাদ, পাস্তা সালাদ, এগ সালাদ,পটেটো সালাদ, গ্রিক সালাদ, কব সালাদ, মিশিগান সালাদ, আর সিজার সালাদ।

৪। ফ্রুট সালাদ   : ঠিকই ধরেছেন। নামেই পরিচয়। এই সালাদ শুধু হরেক রকম তাজা ফলের টুকরো দিয়ে তৈরি হয়। ট্রপিক্যাল দ্বীপগুলোতে সারা বছরই চলে। ক্যারাবিয়ান দ্বীপগুলোতেও।

অনেক সময় ফ্রুট সালাদে এক চামচ ভ্যানিলা আইসক্রিম দেয়া হয়।

কর্তায় ইচ্ছায় কর্ম। মানে খদ্দেরের ইচ্ছায় পরিবেশন।

৫। সী উইড সালাদঃ সমুদ্রের শেওলা দিয়ে তৈরি হয়। সাথে থাকে ছোট ছোট মরিচের কুঁচি। আদার ফালি আর খোসা ছাড়ানো সাদা তিল। যে যাই বলুক খেতে দারুণ।

সাধারণ সবুজ সালাদ খাওয়া মাঝে মাঝে কষ্টকর। তাই এতে লেবুর রস , জলপাই তেল আর অল্প ভিনেগার দিয়ে অনেকে খায়।

আর এ ভাবেই জণ্ম নিয়েছিল সালাদ ড্রেসিংগুলো। যাকে ইচ্ছা করলে সালাদের সস বলতে পারেন।

বিখ্যাত বাবুর্চি জেইমি অলিভার তার রান্নার শো -গুলোতে খুব সহজ একটা রেসিপি দেখান প্রায়ই।

৫০০ মি;গ্রাম জলপাই তেলের সাথে সমান পরিমাণ বালসামিক ভিনেগার, সাথে এক চিমটি লবণ আর একটু গোল মরিচের গুঁড়ো নিয়ে মিনিট খানেক ঝাঁকালেই পৃথিবীর সব চেয়ে সহজ অথচ জনপ্রিয় সালাদের ড্রেসিংটা তৈরি হয়ে যাবে।

মার্কেটে গেলে দেখবেন বোতল আর কন্টেইনার ভর্তি ড্রেসিঙের অভাব নেই।

নামগুলো ও বড় বিচিত্র। যেমন- ভিনাগ্রেট, ব্লু চিজ, সিজার, তাহিনি, থাউজেন আইল্যান্ড  । আরও অনেক। এ গুলো চলেও দারুন। শুধু ১৯৯৭ সালেই ৬০ মিলিয়ন গ্যালন সালাদ ড্রেসিং বিক্রি হয়েছিল উন্নত দেশগুলোতে।

ভাবা যায় ?

প্রতিটা ড্রেসিঙের স্বাদ ভিন্ন। আর প্রত্যেকটা ড্রেসিং বানানোর পিছনে রয়েছে মজার সব গল্প।

প্রথম বোতল ভর্তি ড্রেসিং বিক্রি শুরু হয় ১৯১৯ সালে ।

 

মার্জেটি (Marzetti)  নামের  এক ভদ্রলোক ১৮৯৬ সালে  একটা রেস্টুরেন্ট খোলেন। রেস্টুরেন্টের নাম কলম্বাস।  বোতল  ভর্তি সালাদ ড্রেসিং বিক্রির আইডিয়া তার মাথাতেই আসে।

বাইরের দেশগুলোতে প্রচুর সালাদ বার বানান হচ্ছে। যেখানে খদ্দেরের সামনে ঠাণ্ডা পরিবেশে হরেক পদের সালাদ সাজানো থাকে। খদ্দেরের পছন্দ অনুসারে পরিবেশন  করা হয়। বা খদ্দের নিজের পছন্দ মত তুলে নেয় চিনামাটির তশতরী ভর্তি করে।

সালাদ বারগুলো চলছে ও দারুন। অন্তত আমি নিজে যে কয়টা দেখেছি সব গুলোই দারুণ রকমের ব্যবসা করছে।

সালাদ পরিবেশনের সময় খেয়াল রাখতে হবে জিনিসটা যেন যথেষ্ট ঠাণ্ডা থাকে।

প্রয়োজনে  ফ্রিজে রাখা  ঠাণ্ডা প্লেটে পরিবেশন করা ভাল। তবে  আলুর সালাদ আর পাস্তা সালাদ খদ্দেরের রুচি অনুসারে গরম পরিবেশনকরা যায়। হোটেল চালাতে গেলে মোটামুটি কয়েকটা বিখ্যাত সালাদ রাখতেই হবে। কোব সালাদ, সিজার সালাদ, গ্রিক সালাদ।  

মাঝে মাঝেই দু চারজন গিনেস বুকে নাম উঠানোর জন্য বিশাল সব সালাদ বানায়।

২০০৭ সালে যেটা বানান হয়েছিল সেটা ছিল ১০ হাজার  ২৬০ কেজি। বিক্রি হয়েছিল ২৫ হাজার ডলারে। আর ২০১০ সালে যেটা বানান হয়েছিল সেটা ছিল ১২ টনের।

২০১৬ সালের ৪  সেপ্টেম্বর  বানানো হয়েছিল গ্রিক সালাদ। ওজন  ২০ হাজার ১০০ কেজি।

 

কি সাংঘাতিক।

আমার ও প্রায়ই ইচ্ছা করে বিশাল এক সালাদ বানিয়ে  আমার পাঠকদের  সবাইকে নিমন্ত্রণ  দেই।

কিন্তু এই দেশে সবজির যা দাম তা দিয়ে আফ্রিকাতে হীরের খনি কেনা যায়।

তাই তো রেগে মেগে আর করা হলো না।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...