তখনকার দিনের শৌখিন- মেজাজি মানুষদের চেনা যেত খুব সহজেই।
ওদের কোন ভাব চক্কর থাকত না।
কিন্তু সামান্য একটা কিছু থাকতো । দেখেই বুঝতাম, মানুষটা শৌখিন। আর কে না জানে , যারা শৌখিন, তারা মানুষ হিসাবে ও ভাল হয়।
এদের কারও হয়তো আছে, ছয় ব্যাটারির পেল্লাই একটা টর্চ লাইট। এই লাইটের জন্যই সারা এলাকায় বিখ্যাত সে।
কারও আছে ঝকঝকে পিতলের হ্যাজাক।
রাতের কোন অনুষ্ঠানে আচমকা বিজলি চলে গেলেই হ্যাজাকে পাম্প করে ম্যানটেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। শো - শো শব্দ করে উজ্জ্বল ফকফকা পনির গলানো আলোয় চারিদিকটা ভরিয়ে দেয় হ্যাজাকটা। আমরা হ্যাজাক বললেও জিনিসটার আসল নাম পেট্রোম্যাক্স ল্যাম্প। জিনিসটা আবিস্কার হয়েছিল ১৯১০ সালে। বেশ পুরানো জিনিস।
এদের একজনের আছে এমন একটা রেডিও, যেটার জন্য কোন ব্যাটারি লাগে না। রোদে রাখলেই পিনিং পিনিং করে বেজে উঠে। খবর পরিবেশন করে । গান শোনায়।
উনি শীতের দুপুরে স্নান শেষ করে বারান্দার হলুদ রোদে রেডিও নিয়ে বসেন। অনেক সময় নিয়ে সারা শরীরে মাখেন শর্ষের তেল।
আর মনোযোগ দিয়ে খবর শোনেন।পথ চলতি লোকজন বিস্ময়ে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়ায়। একদম দাঁড়াও পথিক মার্কা ভাব।
লোকজনের ভিড় বেশি হলে উনি ধমক দেন- ঐয় সরে দাঁড়া। রেডিওর গায়ে রোদ লাগে না তো...। খবরটা শুনতে দে। বৈরুতে অস্ত্র হামলা...। আবার ঐদিকে মস্কো আর ওয়াশিংটনে শীতল যুদ্ধ...। লেলিনগ্রাদে বরফ জমে গেছে।
উনার তম্বি দেখে আমরা বেশ ভয়ই পেতাম।
বিদেশ থেকে ফেরার সময় একজন ধাউস সাইজের একটা টর্চ নিয়ে এলো। যেটার মধ্যে ঘড়ি আছে। আবার রেডিও আছে। আবার... হায় হায়.. থার্মোমিটার আর কম্পাস ও আছে । এক কোণে আবার ইঞ্চি- সেন্টি মাপার স্বচ্ছ একটা স্কেলও আছে।
এইসব কী ?
উনি বেশ বিখ্যাত হয়ে গেলেন।
উনিও সারাক্ষণ পেল্লাই সাইজের জিনিসটা সঙ্গে নিয়েই ঘুরতে লাগলেন।
বাজারে গেলেও বগলে করে সেটা নিয়ে যেতেন। হনুমান আর ভীমসেন যেমন করে সব সময় গদা রাখত তেমনই আর কী ।
আগে বিখ্যাত ছিল হরিপদ হাজরা। উনি চাষের জমি বিক্রি করে রেডিও কিনেছিলেন। সেই জমিতে নাকি কয়েক মন তিসি আর তিল হত।
কিন্তু তিসি বা তিল নিয়ে কোন দুঃখ নেই উনার। উনার কথা হল- এত তিসি আর তিল দিয়া কি করমু আমি ? টক বানাইয়া খামু ?
কেমন সব বিচিত্র মানুষ ! অভাব নেই অমন মানুষের।
এমন সময় আরও একজনকে পেলাম।
সারা বছর সাদাসিধে জীবন যাপন করলেও শীতের মৌসুমে উনি কাঁধে রাইফেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন।
গায়ে জিন্সের প্যান্ট আর জ্যাকেট। সেইসময় আমাদের এলাকায় এই রকম পোশাক গুণ্ডা প্রকৃতির মানুষজন পরত।
কিন্তু উনি গুণ্ডা না শিকারি।
আরও থাকতো মাথায়, চেক কাটা কাপড়ের চ্যাপ্টা কেমন একটা টুপি।
টুপিটা তেমন পছন্দ হত না।
সম্ভবত ক্লাসিক বেরেট ফ্ল্যাট হ্যাট বলত। অটম উইন্টার হ্যাটও বলে ।
ঠিক জানতাম না।
অনেক খোঁজ নিয়ে পরে জেনেছি এই টুপির নাম - নিউজবয় ক্যাপ।
কারণ ?
বিশ শতকের গোঁড়ার দিকে ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকার কাঁচ্চা বাচ্চা ছেলেপিলেরা এই টুপিটা জনপ্রিয় করে।অনুমান করা হত, যেই সব বাচ্চারা সারাদিন রাস্তায় চিল্লা ফাল্লা করে- ‘ কাগজ আছে...কাগজ। আজকের তাজা কাগজ… ।’ বলে নিউজ পেপার বিক্রি করত তারাই এই টুপি বেশি ব্যবহার করত।
কিন্তু ঘটনাটা পুরোপুরি ঠিক না।
সেই সময়ের অনেকগুলি ফটোগ্রাফে দেখা যায় এই ধরনের ক্যাপগুলি শুধুমাত্র নিউজবয়েরা পরত না।
কামার, ইস্পাত শ্রমিক, জাহাজের চালক, কৃষক, ভিক্ষুক, পকেটমার, কারিগর এবং বিভিন্ন ধরণের ভবঘুরে বেকার কিসিমের লোকজনও মাথায় চাপাত।
তো আমাদের এই শিকারি সাহেব শীতের সকালে চলে যেতেন দূরে কোথাও। হয়তো সস্তাপুরের ঐ দিকে। বা শীতলক্ষ্যার পাড়ে। ফিরতেন শেষ বিকেলে। কখনও কখনও সাঝবেলার একটু আগে।
তখন চারিদিকে অনেক সবুজ রঙ ছিল । আর গাছপালাও ছিল বেশ।
পাখি ?
সে তো মানুষের চেয়ে বেশি।বাঁশ বনের তিতির। চিত্রা বনমুরগি। শুটি রাজহাঁস। ফুলুরি হাঁস । তিলা কুটিকুড়ালি। বর্মী কাঠঠোকরা। নীলকান বসন্ত বৌরি। ঝুঁটিয়াল মাছরাঙ্গা। সবুজ সুঁইচোরা। ঘর বাতাসি।
শীতের রোদ তখন বোধ হয় আরও মায়াবী গহন হত।
রোদের রঙ হয় অনেক রকম। পাকা লেবুর খোসার মত। ফালি করে কাটা আনারসের মত। ভুট্টার দানার মত। কুমড়ার ফালির মত। পাকা কামরাঙার মত। পাকা ফুটির মত।
উনি হেঁটে যেতেন সস্তাপুরের গাছপালা ঠাসা চিকন পথ ধরে। শীতের বিকেলে ওখানে ফিকে কুয়াশা পড়ত । চোরকাঁটা। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ।
শীতলক্ষ্যার পাঁড়ে ভাঙ্গা ডিমের খোসা। শেয়ালকাঁটার থান। পেল্লাই সব বৃষ্টি গাছ।
বেশির ভাগ সময় শিকারি ফিরে আসতেন খালি হাতে। অকস্মাৎ কখনও একটা বালিহাঁস।
কখনও একটা পানকৌড়ি নিয়ে। বা ডাহুক।
কখনও সোনালী- কমলা রঙের দেশী খেজুরের কাঁদি নিয়ে।
সারারাত টিনের বালতি ভর্তি জলে ভিজিয়ে রাখতে হত কমলা রঙের খেজুরের কাঁদি। পরদিন সকালে খাওয়া যেত।
কখনও আনতেন নিমপাতা। বেগুনের ছক্কা দিয়ে ভেজে খাবেন। কখনও অচেনা শাক।
বুনো পালং। পকেট ভর্তি কুল বরই। কয়েকটা বকুল ফল ।
ফিকে হলুদ আর সাদা মেশানো রঙের বিঘৎ খানেক ছোট্ট দুটো ভুট্টা।
তিনটে ভিন্ন সাইজের পান্না সবুজ কাঁচা টম্যাটো।
একবার নদীর পাড়ে জলজ ঘাস আর ভেজা শ্যাওলার আড়ালে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন রাজহাঁসের ডিম।
সেই সন্ধ্যায় উনার চাকর, ডিমটার অমলেট বানিয়ে চিনামাটির তশতরীতে করে সামনে দিল। বারান্দায় বসে তিনি চামচ দিয়ে অনেক সময় নিয়ে অমলেটটা খেলেন। মাঝে মাঝে কাচের টোপা থেকে নিচ্ছিলেন গোল মরিচের গুঁড়া। উনার চেহারায় সুখী সুখী একটা ভাব। বাইরে কুয়াশা। শীতের বাতাসে খসে যাচ্ছে লেবু গাছের হলুদ পাতা।
উনার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করতো। গায়ে পড়ে আলাপ কখনই করতে পারতাম না। কিন্তু খুবই ইচ্ছা করত।
শিকার শূন্য এই শিকারি মেঘলা বিকেলে ক্যানভাসের চেয়ারে বারান্দায় বসে থাকতেন।
বাগান থেকে রিমিঝিমি করে ভেসে আসতো বর্ষার কোন ফুলের মিষ্টি সৌরভ। উনার বারান্দার ল্যাম্পশেডটা ছিল হরিণের শিংওয়ালা একটা মাথা। জিনিসটা আসলে প্ল্যাস্টিকের। জানালার পর্দা বাতাসে সরে গেলে দেখতাম ভেতরে কাঠের আলমারি ভর্তি বই।
উনি গভীর মন দিয়ে দেখছেন বাড়ির দেয়ালে জন্মানো পেপেরোমিয়ার দঙ্গল। ভাবছেন কী যেন । হাতে পেপার ব্যাকের ওল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট বই।
চিনামাটির পেয়ালায় গরম জলে কেমন একটা প্যাকেট ডুবিয়ে পান করতেন তিনি। ওটা নাকি টি-ব্যাগ। যেন কুয়ার মধ্যে ফাঁসিতে ঝুলছে কেউ। আমার শহরে প্রথম টি-ব্যাগ উনি ব্যবহার করতেন। জিনিসটা নাকি বিলাসিতা।
শিকার না পেলেও উনি দুঃখ পেতেন না। চাকরটাকে বলতেন- ”এই যে শিকারের জন্য যাচ্ছি আর সারাটা দিন টই টই করে ফিরে আসছি সেটা শিকারের চেয়ে বেশি মজার। তুই বুঝবি না।”
বড় হয়ে বুঝেছি। কথাটা হচ্ছে- Not the Game, but the chase .
দুঃখ, এইসব শৌখিন দরাজ দিল হীরককুঁচি দিয়ে ভর্তি হৃদয়ওয়ালা মানুষগুলো নেই। আমার শৈশব হারানোর সাথে সাথে উনারাও হারিয়ে গেছেন।
পুরানো পয়সার মত।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন