সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভ্যাবলার অ্যাডভেঞ্চার

 মাঝে কয়েক দিন খুব  বৃষ্টি হল। 

শ্রাবণ মাস। 

বৃষ্টি হতেই পারে। যে সময়ের যেটা  সেটা না হওয়াই খারাপ  

 আষাঢ় শ্রাবণ এই দুই মাস বৃষ্টি না হলেই ক্ষতি। 

আকাশ ভর্তি কালো মেঘ। যখন তখন বৃষ্টি। সস্তা পেয়ে বাবা রোজই পেল্লাই সাইজের ইলিশ মাছ কিনে  আনছে। মোড়ের কাছের চায়ের দোকানে বেশ বড় জটলা।  রাজ্যের সব  বুড়ো মানুষ আদা চা খাওয়ার লোভে হাজির। উনাদের তো আর ইস্কুলে যেতে হয় না। হাতে অফুরন্ত সময়।  

  আমার কাজ ছিল জানালায় বসে দূরের বিপিন বাবুর  বাগান দেখা।  

 

বাগান ভর্তি গাছ।  অনেক গাছ চিনি না। শুধু আম গাছটা চিনি। এক মৌসুমে   সোনালি ফুল ধরে গাছে। আমের মুকুল  বিনবিন করে  হলুদ আর কালো ডোরা কাটা দাগওয়ালা  মৌমাছি এসে হাজির হয়। আর ফাল্গুন মাসে তো ঝোপড়া ঝোপড়া আম ঝুলে থাকে গাছে। 

কে না জানে, বৃষ্টি হলে গাছপালা স্নান করে নেয়। ওরা তো সাবান শ্যাম্পু মেখে আমাদের মত রোজ  স্নান করতে পারে না। ওরা অপেক্ষা করে কখন বৃষ্টি নামবে। তো বৃষ্টি মানেই ওদের জম্পেশ এক স্নান। এই জন্যই তো বৃষ্টির পর চকচক করে ওদের পাতা। 

বৃষ্টির  জন্য বাইরে  যেতে পারছি না। বাংলার মাঠের  কী   অবস্থা কে জানে ?

 হয়তো  গিয়ে দেখব সবুজ ঘাসগুলো লকলক করে এক হাত  লম্বা হয়ে গেছে। তারপরও ঘাসগুলো  ভাল।  ভদ্র আর বিনয়ী ঘাস।   খেলতে গিয়ে পড়ে গেলে হাত পা ছিলে যায় না।

 শীতলক্ষ্যা নদীর কাছে   বরফকলের ওখানের ঘাসগুলো একদম   ব্লেডের  মত ধার   এত ধার মনে হয় দাড়ি গোঁফ কামানো যাবে। 

বৃষ্টির পর এমন বড় ঘাসের জন্য কয়েকদিন বাংলার মাঠে খেলা যাবে না। সপ্তাহখানেক লাগবে রোদে বাতাসে ঘাস  নরম হতে। তারপর সবাই খেলতে পারব। 

বসে বসে  কী   করব  ভাবছিলাম। 

 এক  বাক্স নতুন ক্রেয়ন রঙ পেনসিল আছে । কালকে মাত্র কেনা হয়েছে ।  আরও আছে তুদ্রা অঞ্চলের বরফের মত সাদা কাগজ।  অনেক অনেক কাগজ। 

  ছবি আঁকা যেতে পারে  কয়েকটা   । 

 নীল  রঙের আম। হলুদ আকাশ। বেগুনি নদী। সবুজ  রঙের হাতি।  পাখাওয়ালা মাছ আকাশে উড়ছে ,  এমন আজগুবি কিছু ছবি। আজগুবি ছবি আঁকতে ভাল লাগে।

এমন সময় দেখি ভ্যাবলা আসছে। 

 টানা পাঁচ ছয় দিন দেখা হয়নি ওর সাথে  

 ভ্যাবলা আমার বন্ধু। ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল পাকরাশিদের দোকানের পাশে। দৌড়ে কাঁটা ঘুড়ি ধরতে গিয়ে ড্রেনে পড়ে গিয়েছিল  ভ্যাবলা  আমি ওকে তুলতে  সাহায়্য করেছি  সেই থেকেই বন্ধু। আরেকবার রাস্তায় একটা কুকুরের বাচ্চা পেয়েছি। নিজেরা পয়সা দিয়ে সেই কুকুরটাকে আটার বিস্কুট কিনে দিয়েছি। হলুদ রঙের  বাবুল বিস্কুট  ইয়া বড় বড় এক একটা বিস্কুট। উপরে ইংরেজিতে কী  সব যেন হিজিবিজি  লেখা ।

 কাজেই আমরা ভাল বন্ধু।  

ভাল বন্ধু খুব দরকার জীবনে ।

সহজে ভাল বন্ধু পাওয়া যায় না।

নতুন সব খেলা আবিষ্কার করতে পারে ভ্যাবলা। 

যেমন - গত বার আমরা  পোস্টম্যান পোস্টম্যান খেললাম। সহজ আর মজার খেলা। অনেকগুলো  শুকনো কাঁঠাল পাতা যোগার করলাম। মনে মনে ভাবলাম  ওগুলো পোস্টকার্ড। পাতার রঙ প্রায় পোস্টকার্ডের  রঙের মতই। এবার প্রতিবেশী সবার  বাড়ি গিয়ে জানালা দিয়ে তিন চারটে করে শুকনো  কাঁঠাল পাতা ফেলে দিয়ে গম্ভীর গলায় হাক দিলাম-  চিঠি আছে চিঠি। দারজিলিং থেকে আপনার নাতির চিঠি।  

যে বাড়িতে অমন  হাঁক দিচ্ছি সেই বাড়িতে কারো নাতি থাকতেও পারে। আবার নাও থাকতে পারে। 

কিন্তু অমন করে বললে ভাল লাগে। তাই বলি। 

 

খেলাটা দারুন। আরও মজার যখন বুড়ো শিবশঙ্কর পানিপুরি আমাদের দেখলেই বাতের ব্যাথা নিয়ে   চেঁচিয়ে উঠে-  আবার এসেছিস তোরা  আমার ঘর দোর ফালতু পাতা ফেলে নষ্ট করতে ? দাড়া দেখাচ্ছি মজা। 

তখন আমরা    দম খিঁচে দৌড় দেই। ওটাও বেশ মজার। সিনেমার নায়কদের মত লাগে। 

আমরা নতুন খেলা বানাতে ওস্তাদ 

পাতলা উইন্ড ব্রেকার জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে স্পেসস্যুট বানিয়ে নভোচারী হতাম

পিঠে কোল বালিশ দড়ি দিয়ে বাঁধতাম ওটা অক্সিজেন সিলিন্ডার 

মহাশূন্যে বাতাস নেই কে না জানে !

আর মাথায় পলিথিনের ব্যাগ ফুটো করতাম শ্বাস নেয়ার জন্য

উঠানে গিয়ে পাথর কুড়াতাম উঠান হচ্ছে চাঁদ ওখানে প্রচুর পাথরের টুকরা থাকতো 

পাথরের নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসতাম

মানে ঘরের বারান্দায় 

পিতলের হাতলওয়ালা   আতশি কাচ দিয়ে পাথর পরীক্ষা করে গম্ভীর গলায় বলতাম - 'হায় হায়, দেখা যাচ্ছে   পটাশ আর  ডেলোডিয়ামের পরিমাণ খুবই বেশি আর এক ফোঁটা জল নেই'

'কয়লার পরিমাণ কী   রকম ?' গম্ভীর গলায় পাশ থেকে জানতে চাইত ভ্যাবলা  

' কয়লা না ওটা কার্বন বললে ভাল শোনায়' দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলতাম 

 

 

অনেক ভাবি আমি আর ভ্যাবলা।  জীবনে সুখী হতে গেলে আসলে কি দরকার ?

 

এত কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বা পেল্লাই সব বাড়ির দরকার আছে ?

নেই

বেণী মাধব লশকরের কত টাকা !

অভাব নেই কিন্তু দেখ, ডাক্তার তাকে বলেছে চিনি খেতে পারবে না

এটা কিছু হল ? চিনি ? সেটা খেতে পারবে না ?

উনাকে শুধু করলা ভর্তা আর থানকুনি পাতার ঝোল দিয়ে ভাত খেতে হয় 

কী জীবন ! হায়রে 

আমাদের আসলে কি দরকার ?

অনেক হিসাব করে দেখলাম  

একটা পুরানো রাজপ্রাসাদ কিনতে পারলে ভাল হত রাজপ্রাসাদের মধ্যে একটা কেমন ভাব আছে  লোকজন বেশি রাখতাম না একজন দারোয়ান শুধু লোহার ঢাল আর বল্লম নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেই চলবে ওর গায়ে অবশ্য টিনের পোশাক জমবে ভাল

মুখে গোঁফ আর মটরশুঁটির দানার সমান একটা জড়ুল থাকলে পোয়া বারো  

ভ্যাবলার মতে,  একটা পোষা বাঘ হলে ভাল হয়

হলুদ কালো ডোরা কাটা বাঘটার গলায় হাত দিয়ে বিকেল বেলা হাঁটতে বেরুলে লোকজন কেমন অবাক হবে তাই না ?

তো সুখী হবার তালিকায় বাঘের নাম রাখলাম 

একটা তিন  মাস্তুলওয়ালা জাহাজ দরকার পাল তোলা জাহাজ ইঞ্জিনের জাহাজ আমরা কিনব না। সস্তা পেলেও কিনব না।

জাহাজে  বিশাল  পাল থাকবে। দরকার হলে  বাড়ির সব বিছানার চাদর আর দরজা জানালার পর্দা পাল হিসাবে ব্যবহার করব

জাহাজের পিপে ভর্তি থাকবে ময়দার বিস্কুট তিলের গজা  মোরব্বা 

পিতলের একটা বিউগল দরকার ভ্যাবলার 

কোন এক অনুষ্ঠানে গিয়ে ভ্যাবলা দেখেছিল একজন মুস্কো মত লোক পিতলের বিউগল বাজাচ্ছে সবাই কেমন তারিফ করছে 

জিনিসটা বেশ ওজনদার নাহ একটা দরকার  ওর

দরকার কিছু পাখি 

ওরা সব সময় কিচির মিচির করবে আমরা কর্মচারী রাখব যারা মাঠ থেকে ঘাস ফড়িং ধরে এনে পাখিদের খাওয়াবে 

ছাতু আর মরিচ কেনা হবে বস্তা বস্তা

একটা মোরগ দরকার 

সকাল বেলা মোরগটা আমাদের ডেকে তুলে দেবে এইজন্য  কারণ আমরা ঘড়ি ব্যবহার করব না ঘড়ি দেখলে মনে হয় সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে মাথার উপর অনেক চাপ পড়ে 

তবে রেডিও শুনেও সময় জানা যায় 

কয়েকটা ভেড়া দরকার ভ্যাবলারভেড়া গুনলে নাকি সহজে ঘুম এসে যায় অমন আজগুবি কথা জীবনেও শুনিনি

তারপরও ভ্যাবলার জন্য লিস্টে ভেড়া রাখতে হল

কিছু পিঁপড়ে দরকার 

কারণ পিঁপড়ে ব্যস্ত থাকলে মানে সামনে বর্ষাকাল 

ওদের দেখে আমরা ঋতু বুঝতে পারব আর আশে পাশে পরিশ্রমী প্রাণী দেখলে জীবনে বড় হবার ইচ্ছা জাগে

গোল কাচের বাউলে একটা মাছ থাকতে হবে ঘন হলুদ বা সোনালী হলে ভাল হয় 

আর গোপনে  খোঁজ নিতে হবে কোথাও ড্রাগন পাওয়া যায় কি না

পেলে দাম নিয়ে আলোচনা হতে পারে । টাকা পয়সাটা বড় কোন ব্যাপার না।

অনেক চিন্তা করে দেখলাম সুখী হতে গেলে আসলেও বেশি কিছুর দরকার হয় না

অথচ চারিদিকে কত অসুখী মানুষ !

 

 ভ্যাবলা কোন ইস্কুলে ভর্তি হয়নি। সামনের বছর হবে। 

 দেখতে বাটুল ধরনের। সব সময়   ঢোলা জামা পরে। ওর বড় ভাইয়ের পুরানো জামা।

জানালার বাইরে দাড়িয়ে আমাকে দেখে হাসল। 

 

আমি   ও  বাইরে যাবার একটা ছুতো পেয়ে গেলাম।

 বারান্দার সিঁড়িতে বসলাম। ওর হাতে পেল্লাই সাইজের একটা ছাতা। কয়েক জায়গায় তালি দেয়া। জামার বুক  পকেটে এক গোছা পেপরমিয়া গাছ। শেকড় মাটি সহ ।  ইংরেজিতে  অনেক দেশে এই গাছটাকে - ইঁদুরের কান বলে।  পাতাগুলো দেখতে অমন, তাই। 

কী   ব্যাপার  কয়েকদিন  দেখিনি যে  জানতে চাইলাম। 

তিলের নাড়ু থাকলে দাও। শুকনো মুখে বলল ভ্যাবলা।  তোমার সাথে যে আবার দেখা হয়েছে সেটাই বড় ভাগ্য।

সে কী   ? কেন ?

নাড়ু দাও ,তারপর  বলছি।

ভেতরে গিয়ে সিরামিকের তশতরিতে করে কালো কুচকুচে কয়েকটা তিলের নাড়ু নিয়ে এলাম। সাথে এক লোটা জল। 

গাপ গাপ করে খেয়ে লোটার জল শেষ করে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল - ইস কী   কপাল। ভাগ্য ভাল আবার   দেখা হল তোমার  সাথে।

‘   হয়েছে  কী   বলবে তো  এইবার খানিক বিরক্ত হলাম। খেয়াল করলাম ওর দুই পায়ের হাঁটুর উপর শুকনো ক্ষত। কনুই খানিক  ছয়ে গেছে। 

তর্জনী দিয়ে গালের আর মাড়ির  ভেতরে সেঁটে থাকা বাকি নাড়ু বের করে আবার খেয়ে বলতে লাগল ভ্যাবলা। শুনে তো আমি একদম গ্যালাক্সি থেকে পড়লাম। অমন হয় না কি ?

 

 ওর কাহিনি মোটামুটি  এই রকম।  ভ্যাবলার মুখ থেকেই শোন -

 

গত কয়েক দিন আগের কথা। 

প্রথম যেই বিকেলে ঝড়ো বাতাস বইল মনে আছে ? ছাতা হাতে আমি  মুদি দোকানে গিয়েছিলাম  চার আনার কালিজিরা  কিনতে। মা,  কুমড়ার ছক্কা বানাবে।  কালি জিরা  দিলে স্বাদ ভাল হয়। রাতের বেলা সাদা  রুটির সাথে কুমড়ার ছক্কা দিয়ে  খেতে বেশ অমায়িক লাগে। সাথে পেঁয়াজ , ধনেপাতার চাটনি থাকলে এক হালি রুটি বেশি খাওয়া যায়  ।   

বৃষ্টি কমই ছিল। গুড়ো  গুড়ো  হয়ে  পড়ছিল। ইলিশ মাছের ডিমের মত  রেণু বৃষ্টি। ইলশেগুড়ি না আসলে চিংড়িগুড়ি বৃষ্টি।    

 কালিজিরা হাতে ফেরার পথে মস্ত এক কাণ্ড হল। 

 কোত্থেকে যেন দমকা এক বাতাস এলো  হা হা করে। অমন হাওয়া আগে পরে জীবনেও দেখিনি।  ছাতা থাকায় একদম প্যারাসুটের মত উপড়ে উঠে গেলাম। ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে গেছে আমার, কালি জিরার পোঁটলা খসে গেছে হাত থেকে। কয়েকটা কয়লার মত  রঙের কাক দেখি সেই কালিজিরা খেয়ে ফেলল। 

আমি তখন আকাশে উড়ছি। নীচে ওয়ালী সাহাবের বাড়ি দেখাচ্ছিল  একদম জুতার বাক্সের মত। বাটা কোম্পানি যেমন বাক্স দেয় তেমন পেল্লাই সাইজের। 

ভয়ে  আমার দম যেন বন্ধ হয়ে যাবে। একবার ভাবলাম গগন শিরীষ গাছের উপর লাফ দিয়ে পড়ব নাকি ?  আবার মনে পড়লো কালি দাস বাবুর বউ সেই গাছের ডালে ফাঁসি দিয়ে  আত্নহত্যা করেছিল। অনেকেই রাতের বেলা উনাকে দেখেছে। কে জানে এখন যদি বসে থাকে ?

আমি তো ছাতায় ভাসতে ভাসতে উড়ে চলে যাচ্ছি। ভয় কমে গেছে ততক্ষণে। মজাই লাগছে। কিন্তু নিচের কোন জায়গা চিনতে পারছি না। যেমন ধর  বউবাজারটা বা    শীতলক্ষ্যা নদীটা    দেখছি না। 

 শুধু ঘাসের বন।  সাথে  মিষ্টি আলুর মত এবড়ো থেবড়ো   জমি। ওখানেই  একদম অচেনা এক শহর দেখলাম। বললে বিশ্বাস করবে না-পুরাপুরি বিদেশের মত।   ততক্ষণে  বাতাসের বেগ অনেক কমে গেছে  

 

ওখানে নেমে পড়লাম  ঝুপ করে  অপূর্ব একটা জায়গা। বললে বিশ্বাস করবে না, ওই দেশের   মানুষগুলো মাত্র বুড়ো আঙুলের সমান।  ডিমের খোসা দিয়ে  নিজেদের  বাসা বানায়   জানালা বানায় বোতাম দিয়ে।   কলকারখানা বানায়  কনডেন্স মিল্কের বাতিল কৌটা দিয়ে। 

ওই  দেশের  পুকুরগুলো ছোট ছোট, বিছানার চাদরের সমান   কাঠবাদামের খোসা দিয়ে নৌকা বানায় ওরা। অই দেশের নাম পিচ্চিগঞ্জ। ম্যাপে খুঁজলে পাবে না। কারন সরকারী ভাবে নথি করা নেই।  

ওরা চাষবাস করে।   চাষবাসই মূল পেশা। সভ্যতার আদি যুগে আছে।  

  কাউনের দানার মত অচেনা এক  ঘাসের দানা খায়। মাছ মাংস খায় না। পিঁপড়ে পালে। এই পিঁপড়ে মানুষের বাসা থেকে চিনির দানা চুরি করে ওদের কাছে নিয়ে যায়। ওরা চিনির দানা আর শিশিরের জল দিয়ে শরবত বানিয়ে রেখে দেয় গরমের দুপুরে খাবে বলে।    এমনিতে ওদের প্রিয় খাবার হচ্ছে  হাওয়াই মেঠাই। 

কারখানার মেশিনে  চিনি ঢেলে দিলেই বাতাসে কল  কব্জা চলা শুরু হয়। মাকড়সার জালের মত হাওয়াই মেঠাই তৈরি হয়ে যায়। যার যত দরকার লাইন দিয়ে নিয়ে যায়। কারখানার কেরানি লম্বা টালি খাতায় লিখে রাখে কে কত ছটাক হাওয়াই মেঠাই নিল।

 পিচ্চিগঞ্জের লোকজন   পায়ে হেঁটে চলাচল করে। তবে অনেকে এঁটুলি পোকা বা গুবরে পোকার উপর উঠেও চলাচল করে।   ওখানে কোন দোকান পাট নেই। সবাই নিজের জিনিস নিজে বানায়। কারো কিছু বেশি হলে বদলা বদলি করে নেয়।  হ্যাঁ  ভাল কথা,  ইস্কুলও নেই। ইস্কুলের মত ফালতু জিনিসের দরকার হয় না।

 একদম বিন্দাস জীবন ওদের। খাও দাও। খেলা কর। বাচ্চারা  প্রজাপতি বা কাচপোকা  ধরে সুতা   বেধে  ঘুড়ির মত উড়ায়।  বিদ্যুৎ  নেই।  শহরের মেয়র   রাতের  বেলা কাচের বোতলে করে জোনাকি  পোকা রেখে দেয় ওদের শহরের রাস্তায় রাস্তায়। সেই আলোতে সবার কাজ চলে। 

তোমাকে দেখে ওরা ভয় পায়নি ? এতক্ষণে  প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম।

আরে নাহ। একগাল হেসে জবাব দিল ভ্যাবলা।  মোটেও ভয় পায়নি। বেশ আপ্যায়ন করেছে। আমি ওদের কাজ করে দিলাম।

যেমন ?

বড় জমির মাটি কুপিয়ে বেশি ফসল বুনে দিয়ে এলাম। নারকেল গাছে উঠে কয়েক ডজন নারকেল পেড়ে দিলাম।  বোতলের কাচ ভেঙ্গে ওদের বাসার জানালার কাচ বানিয়ে দিলাম।    তরমুজ ক্ষেতে গিয়ে কয়েক  গণ্ডা  তরমুজ এনে দিলাম। বিরাট  উৎসব  হল তিনদিন ধরে।    পিচ্চিগঞ্জের সবাই  তরমুজের ভেতরে সাঁতার কেটে কেটে তরমুজ খেল। উৎসবের নাম রাখা হল  হরমুজে তরমুজ।   করমচা পচিয়ে অদ্ভুত রকম মদ বানায় ওরা, জিনিসটা বৈধ।  আমাকে দিল কয়েক বালতি। পান্তা ভাতের মত স্বাদ।    আমাকে বেশ রাজার সম্মান দিয়ে রাখল।  সারাজীবন থাকতে ইচ্ছা করছিল ওদের সাথে  ।  

চলে এলে কেন ?  মনে মনে লোভী হয়ে   উঠলাম। 

চারিদিকে সতর্ক ভাবে চেয়ে ভ্যাবলা বলল -  আরে বাথরুমের সমস্যা। তিন দিন রোজ দূরের মাঠে গিয়ে ইয়ে করতে হয়েছে আমাকে।  তারপরও সেটা বড় কোন সমস্যা না। থেকেই যেতাম।  তিন দিন পর   আবার আচমকা ঝড়ো বাতাস শুরু হল।  বাইরে হাঁটছিলাম   ছাতাটা বগলেই ছিল । কী মতিভ্রম হল। আসলে কপালে না থাকলে ঘি ঠন ঠন করে হবে কী ! ভুলে ছাতাটা খুলে ফেলেছিলাম। হায়রে ।    শেষে আবার ছাতায় উড়ে চলে এলাম। সাবধানে থাকবে  বাদলার দিনে ঝড়ো বাতাসের মধ্যে ছাতা নিয়ে বের হলেই সমস্যা।

হাত পা নেড়ে  আরও কী সব    বলতো ভ্যাবলা কে জানে ?

 

কোত্থেকে ভ্যাবলার বড় ভাই  এসে  ঠাস ঠাস করে ভ্যাবলার দুই গালে দুই চড় মেরে বসলো  কান দুটো মুচড়ে অক্সফোরড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিকশনারির মত লাল করে ফেলল। চেঁচিয়ে বলল-  আবার তুই ছাতা নিয়ে বের হয়েছিস?

ঠিকই বলেছেন  বদ্বা   উনাকে সমর্থন করলাম।  আবার যদি  উড়ে যায় ?

 উড়ে যায় ?  ওর গপ্পো বিশ্বাস কর ? সিনেমার ভিলেনের মত হাসল বড় ভাই ওরফে বদ্বা     কাউকে না বলে দাদুর   এই ছাতা নিয়ে বের হয়েছিল বাসা থেকে। ছাতা দিয়ে একতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে প্যারাসুট প্যারাসুট  খেলে শয়তানটা।   বাতাসের তোড়ে  উলটে পড়ে ছাতার সব শিক ভেঙ্গে ফেলেছে। দশ টাকা লেগেছে ছাতা মেরামত করতে ।  নিজেও পড়ে গিয়ে হাত পা ছিলে মোরব্বা বানিয়ে ফেলেছে। ওকে  শুধু এখন  বয়াম ভর্তি  চিনির সিরায় রেখে দিলেই হবে।  আর এখন তোমার কাছে বসে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসেছে এইসব  আজগুবি  গল্পের  আইডিয়া পেয়েছে আবার   গালিভার ট্রাভেলস বইটা থেকে। আমার পড়ার টেবিলে বইটা দেখে জিজ্ঞেস করেছিল। আমিই ওকে গল্পটা বলেছি। এখন নিজের অ্যাডভেঞ্চার বলে চালাচ্ছে।  

 

 আচমকা  কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই  ছাতা  বগলে  করে বাই বাই করে দৌড় দিল ভ্যাবলা।

ভালই দৌড়াতে পারে দেখলাম।

 

 

 

পরদিন হাঁটতে গিয়ে দেখি ওদের বাগানের বেড়ার পাশে বসে বড় বড় দূর্বা ঘাস তুলে    দিচ্ছে ভ্যাবলা। 

জানি  এটা  ওর শাস্তি    বড় ভাই ওরফে বব্দা  শাস্তি দিচ্ছে ওকে। আমাকে দেখে  কাজ  করার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। যেন দুনিয়ার সব চেয়ে বড় আর বিশাল তেপান্তরের   মাঠের ঘাস তুলছে  ও। 

 চেহারা বেশ গম্ভীর।

 কথা  বলার  ফুরসত নেই এমন একটা ভাব।  আমাকে যেন চেনেই না !

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...