বছরের এই সময়ে পিরামিড মামা বেড়াতে আসেন।
পিরামিড মামাকে না চিনলে মস্ত বড় জিনিস মিস করেছ তোমরা।
উনি আসলে আমার বন্ধু যজ্ঞিদাসের মামা। আমরা উনাকে কুট্টি মামাও বলতাম । চাকরি করেন বনবিভাগে । সারা বছর কোথায় কোথায় থাকেন যেন । বছরে একবার বা আধবার আসেন বেড়াতে ।
এইবার অগ্রহায়ণের প্রথম দিকেই চলে এলেন।
সাথে পেল্লাই এক সুটকেস। উনার গাড়িটা কমলা রঙের গোবরে পোকার মত। এই ধরনের গাড়িকে ভক্সওয়াগন বলে।
সাথে একটা কুকুর আছে। কুকুরটার নাম - বিস্কুট। নামের পিছনে কিন্তু একটা পিচ্চি গল্প আছে।
পিরামিড মামা যখন হলুদগঞ্জে ছিলেন তখন নির্জন মত রাস্তার ধারে চা খেতে বসেছিলেন। সস্তা ধরনের চায়ের দোকান। যেমন হয় আর কি। দোকানী হরেক পদের চা বানাতে পারে। বিচ্ছিরি ধরনের লতাপাতা দেয়া চা। আদা চা হতে শুরু করে কলা চা পর্যন্ত। ইদানিং জাম্বুরা চা বিক্রি করছেন। চায়ের মধ্যে এমিবার মত গোলাপি রঙের কয়েকটা জাম্বুরার কোয়া হাবুডুবু খায়।
কুকুরটা তখন টুলের পাশে বসে হ্যাংলার মত বারবার পিরামিড মামার দিকে তাকাচ্ছিল।
‘ ও কি চা খেতে চায় নাকি ?’ জানতে চেয়েছিল মামা।
‘ নাহ, কুত্তা তো চা কফি খায় না। বিস্কুট খায়।’ সব দাঁত বের করে বলেছিল চা-ওয়ালা। ‘ কাস্তমার আইলেই বইয়া থাকে। বেশি খুন বইলেই লাকড়ির টুকরা ফিক্কা মারি।’
‘ অমন করবেন না।’ রাগ করলেন পিরামিড মামা। ‘ জীব জন্তুর সাথে অমন করা ঠিক না । ওকে বিস্কুট দিন।’
‘ মুল্ল্য আপ্নে পরিশোধ করবেন ?’ দাঁত দেখাতে দেখাতেই বলল চা-অয়ালা। যতগুলো দাঁত আছে সবগুলোই দেখাচ্ছে । লুকিয়ে রাখেনি একটাও।
বিস্কুট দেয়া হল।
আটার হলুদ বিস্কুট। ইংরেজিতে বিস্কুটের গায়ে কি সব লেখা। এই ধরনের বিস্কুট খেলে যে কোন মানুষের আমাশা, কলেরা হয়ে যাবে।
‘বিস্কুটগুলো আপনার শৈশব থেকেই দোকানের বয়ামে আছে নিশ্চয়ই।’ বিরক্ত হয়ে বললেন মামা।
দোকানদারের ভাব দেখে মনে হচ্ছে একটার পর একটা দম ফাটানো কৌতুক শুনেই যাচ্ছে সে। অথবা তার শৈশব খুব বেশি দিন আগের কথা না। গতকালই ছিল তার শৈশব ।
কুকুরটার খিদে পেয়েছিল।
সব বিস্কুট খেয়ে ভেজা ভেজা চোখে পিরামিড মামার দিকে চেয়ে রইল । হয়তো ধন্যবাদ দিল।
পিরামিড মামা যখন বাসায় ফিরছিল তখন ওটা পিছন পিছন আসছিল। সেই থেকে ওটা পিরামিড মামার কুকুর, নাম- বিস্কুট।
তো, পিরামিড মামা বেশি দিন থাকেন না। বেশি হলে পনের দিন।
সারাদিন পরে পরে ঘুমান। আর পিশাচের মত খাওয়া দাওয়া করেন। কটকতারা চালের ভাত, ফুলকপির রোস্ট, বাঁধাকপির আচার, শালগমের সালাদ, ইলিশ বিরিয়ানি, ডিমভরা কই মাছের টক, পাঁঠার তেলতেলে মাংস, মোরগ পোলাও আলুর দম আর দিস্তায় দিস্তায় লুচি।
বাকি সময় তিনি বই পড়েন। ইয়া মোটা মোটা বই।
অমন বই কয়েকটা সাজিয়ে রাখলেই যে কোন লোক ভয়ে তোম্বা হয়ে যাবে।
সন্ধ্যার পর আমরা ছাদে বসি। নিয়ম করে।
যজ্ঞিদাসদের বাড়ির ছাদটা এক কথায় অপূর্ব।
পরিষ্কার ঝকঝকে। লেপাপোঁছা। লাল রঙের আলপনা আঁকা ছাদের মধ্যে।
এক কোনায় একটা কালাই করা টিনের নীল বেসিন আর পেতলের কল আছে। আছে বাহারি কয়েকটা টব ভর্তি নাম জানা না জানা জংলা ফুল। অর্কিড বলে নাকি।
পিরামিড মামা আমাদের জঙ্গলের গল্প বলনে।
উনার জামার বুক পকেট ভর্তি গল্প। দারুন করে বর্ণনা দেন। আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে দূরের তরাইয়ের জঙ্গল, কুমায়ুনের মেঠো পথ, ময়াল উপত্যকার হাতি, গাড়োয়ালের হলুদ বাঘ, সাহেবগঞ্জের ঘন বন, হরিয়াল নদীর বুনো শম্বর ।
মনটা ছুটে যায়।
কল্পনায় দেখি, ঘুমঘুম একটা বাংলো। লাল টালির ছাদ। চারিদিকে শাল আর শিশু গাছের দঙ্গল। হাতে হাত ধরে ওরা দাঁড়িয়ে আছে । কেমন একটা নিঃসঙ্গ বাতাসে ওদের পাতা খসে পড়ছে টুপটাপ করে। পাতার রঙ পোস্ট আপিসের, পুরানো দিনের খামের মত। যেন গাছ আমাদের চিঠি লিখে পাঠাচ্ছে। আমরা সেই চিঠি খুলেও দেখছি না। রাখছি না ওদের খবর ।
বাংলোর বাইরে কমলা রঙের আলো। জানালার কাঁচ কুয়াশায় ভিজে কেমন ঘোলাটে । বাইরে শনশন হাওয়া।
গল্প শুনে আমরা সবাই ঠিক করি বড় হয়ে আমরাও ফরেস্ট অফিসার হব।
বুক ভরে নেব গাছপালার সবুজ ঘ্রাণ।
আমরা যতক্ষণ গল্প করি, ততক্ষণ মামার হাতে থাকে নীল রঙের কাচের পেয়ালা। কমলা রঙের চা। খানিক পর পর সাদা সিরামিকের তশতরি ভর্তি করে আমাদের জন্য ছাপা সন্দেশ আর ক্রিম দেয়া কাপকেক নিয়ে আসে বাসার কাজের লোক অক্টোপাস দাশ । ওর আসল নাম ভুলে গেছি। আট বার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ফেল করে করে পাশ করেছে তাই ওর নাম অক্টোপাস রাখা হয়েছে। নামটা সুন্দর না ?
আজকেও আমরা বসেছিলাম।
পিরামিড মামা তার কাপ শেষ করে ছয়টা ক্রিমরোল আর এক বাউল পুডিং খেয়ে বলতে লাগলেন- গতবার তোদের কাঞ্চনপুরের বাঘের গল্প বলেছিলাম। ধইঞ্চা উপত্যকার পাগলা হাতির গল্প ও শুনেছিস । আজকে বলব কাছিমপুরের কাহিনি। কাছিমপুর জায়গাটা কখনই তেমন বিখ্যাত ছিল না। অনেকে বলেন তুরস্কের সেনাপতি বিন কাসিমের নামে ঐ জায়গার নাম করা হয়েছে। হতে পারে। এইসব ব্যাপারে সিমেন্টের মত শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না।
সুলতানপুর পার হয়ে গেলেই মধুগঞ্জ। তারপর রুমঝুমপুর। তারপর বাকরখানিগঞ্জ। এর পর সন্দেশপুর।
তারও মাইল তিনেক পর কাছিমপুর। বেশ নিরিবিলি এলাকা।
কাহিনির শুরু বেশ আগে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে।
শহর থেকে কোন গাড়ি আসছে না। কেরসিন তেল পাওয়া বেশ মুশকিল হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে রেডির তেলের লণ্ঠন জ্বালাচ্ছেন হারাধন ডাক্তার। রেডির তেলে লণ্ঠন জ্বালালে ধোঁয়া উঠে বেশি। কাচের চিমনি ময়লা হয়ে যায়। রোজ ওটা পরিষ্কার করা ঝামেলা। কিন্তু সন্ধ্যার সাথে সাথেই দোকান বন্ধ করে বাসায় যেতে ইচ্ছা করে না।
দোকান বলতে চেম্বার বুঝানো হয়েছে।
তখনও চেম্বার বা ডিসপেনসারি শব্দটা চালু হয়নি।
হারাধন ডাক্তার বেশ পসারওয়ালা ডাক্তার । বিলেত ফেরত। নাম যশের তুলনায় চেম্বার ছোট। পিচ্চি একটা ঘর। দেয়ালজুড়ে কয়েকটা কালো কাঠের আলমারি। সামনে কাঁচ। ভেতরে হরেক সাইজের শিশি। গুড়ের রঙের শিশি। সাদা শিশি । সবুজ শিশি । শিশির গায়ে কাগজের বরফি আকারের লেবেল সাঁটা। সেই লেবেল মেপে ওষুধ খেতে হয়। দাগ মাপা ওষুধ। একটা কাঠের টেবিল, আর নিজের জন্য একটা চেয়ার। রোগী আসলে, টুলে বসে।
কাত্তিক মাসের সন্ধ্যা।
তখন কাত্তিক মাসেই বেশ শীত পড়ে যেত। এখন তেমন পড়ে না। সারা দুনিয়ার আবহাওয়া বদলে গেছে, মানুষ যেমন বদলায়। তাছাড়া গাছাপালা নেই আগের মত। পুকুর ডোবা ও গেছে কমে। নইলে কবি নিজেই বলে গেছেন, কাত্তিক মাসের কাইত্তানি হাওয়ায় গা শিরশির করে ।
বাইরে মশার শনশন শব্দ।
চেয়ারে বসে আকাশ পাতাল ভাবছেন হারাধন ডাক্তার।
হালকা বাতাসে লণ্ঠনের আলো কেঁপে রোমাঞ্চকর একটা ভাব হয়েছে। দেখতে ভাল লাগছে। বাড়ি গিয়ে স্নান শেষ করে , লাল চালের ভাত , মাগুর মাছের ঝোল আর পটল ভাঁজা দিয়ে ভাত খেয়ে একটা ঘুম দেবেন কি না ভাবছেন তখনই টমটম গাড়িটা এসে থামল বাইরে।
নিশ্চয়ই কোন পয়সাওয়ালা রোগী ?
নড়ে চড়ে বসলেন হারাধন ডাক্তার। সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে বললে আট আনা চেয়ে বসেন। এটা টমটম করে এসেছে। বেশি চাওয়া যাবে। থাকে যদি নসীবে টমটমে চেপে আসিবে।
টমটম থেকে নেমে এলো মধ্য বয়স্ক এক লোক।
মুখটা দইয়ের পাতিলের মত গোল। চোখ দুটোও গোল্লা গোল্লা। মাথার চারভাগের তিনভাগ টাক। পুরো চেহারার মধ্যে কেমন হুতুম প্যাঁচা ভাব আছে। চোখদুটো ও ঘুমঘুমে। গায়ে শুকনো পাতার রঙের চাদর। প্যাঁচাটা যখন চেম্বারে ঢুকলো বাইরে তখনও ঘোড়া দুটো ওদের পা ঠুকছে।
‘একটা রোগী দেখতে যেতে হবে বাবু।’ ঘুমঘুম গলায় বলল প্যাঁচা।
‘কোথায় ?’ খুশি চেপে যতদূর সম্ভব শুকনো গলায় জানতে চাইলেন হারাধন ডাক্তার।
‘এই তো সামনেই।’
‘আমার ফি কিন্তু...।’
‘যা চাইবেন পাবেন। টাকা পয়সার জন্য সব কাজ দুনিয়ায় আটকে থাকে না। ’ হারাধন বাবুর কথা শেষ না হতেই তাকে থামিয়ে দিল প্যাঁচা। টেবিলের উপর রাখা চামড়ার পেট মোটা ডাক্তারি ব্যাগটা তুলে নিয়ে বলল, ‘চলুন ।’
লণ্ঠন নিবিয়ে দরজার আঙটায় পেল্লাই এক তালা ঝুলিয়ে প্যাঁচাকে অনুসরণ করলেন হারাধন ডাক্তার।
টমটমে উঠে বসার সাথে সাথেই বেশ বড় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে লাগলো।
লোহার নাল পরানো খুর থেকে ছন্দময় তুমতুম ধরনের শব্দ হচ্ছে । নাচতে নাচতে পিছনে চলে যেতে লাগল চারিদিকের ঘাসবন, কচুপাতার দঙ্গল । বাজারের মাঝে হারাধন ডাক্তারের দোকান। সন্ধ্যার আগে ভাগেই বাজার খালি হয়ে যায়। সবাই সন্ধ্যার আগেভাগেই বাড়ি ফিরে গেছে। আজকালের মত মাছবিক্রেতা মধ্যরাত পর্যন্ত বাতি জ্বালিয়ে এক ভাগা চাপিলা মাছ নিয়ে বসে থাকে না।
বাজার শেষ হতেই পথ আরও নিঝুম হয়ে গেল।
দুইদিকে বড় বড় জারুল গাছ। আর নাম না জানা ঝোপঝাড়ের দঙ্গল। ভেজা একটা মিষ্টি ঘ্রাণ। মুঠো ভর্তি জোনাকি জ্বলছে।
টমটমের বাইরে সহিসের সাথে মোটা বরফিকাট কাচের লণ্ঠন ঝুলছে । সেই আলোতে টমটম চলছে। ভেতরে অন্ধকার। প্যাঁচার চেহারা দেখতে পারছেন না হারাধন বাবু। কয়েকবার ভাবলেন আলাপ জমাবেন নাকি। সমস্যা হল অন্ধকারে গালগল্প করা যায় না। আর কি অদ্ভুত, প্যাঁচা লোকটা বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
হারাধন ডাক্তার কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন কোথায় যাচ্ছেন।
বাইরে অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখার নেই। খেয়ে ফেলা অর্ধেক বিস্কুটের মত কেমন অর্ধেকের কম চাঁদ ঝুলছে আকাশে ।
কাল পরশু অমাবস্যা ওটা পুরোপুরি খেয়ে ফেলবে।
একঘেয়ে যে কোন শব্দই ঘুমপাড়ানি গানের মত কাজ করে।
টমটমের শব্দে কেমন তন্দ্রামত লেগে গেল হারাধন বাবুর। বড় একটা ঝাঁকুনিতে জেগে উঠলেন। পাশেই প্যাঁচা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘ নেমে পড়ুন ডাক্তার বাবু। আমরা চলে এসেছি।’
টমটম থেকে নেমে অবাক হয়ে দেখলেন পেল্লাই সাইজের একটা দোতলা দালানবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
অভিজাত বাড়ি। সামনের রোয়াকের বারান্দা আর বড় বড় থাম দেখেই বুঝা যাচ্ছে বাড়ির মালিক আর্থিক দিক দিয়ে বেশ সবচ্ছল। কিন্তু তারপরও বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে আছে। বারান্দায় কাঁচের একটা লণ্ঠন ছাড়া অন্য কোন আলোর টুকরো দেখা যাচ্ছে না। অদ্ভুত তো !
‘কার বাড়ি এটা ?’ বিরক্ত হয়ে জানতে চাইলেন ডাক্তার হারাধন মিত্র।
‘রাজা দশরথের ।’ দীর্ঘ একটা সময় চুপ থেকে শান্ত গলায় জবাব দিল প্যাঁচা।
নামটা শুনে চমকে গেলেন হারাধন বাবু।
আজ প্রায় এক বছর ধরে এসেছেন তিনি এই কাছিমপুরে । প্রথম দিন থেকেই এদের নাম শুনেছেন। রাজা মানেই রাজা নন। মন্ত্রী , পেয়াদা, কোটাল নেই। কিন্তু লোকজন আদর করে ভালবেসে, রাজা ডাকে।
এলাকার সবচেয়ে ধনী মানুষ- রাজা দশরথ। তার বাড়ি ? এই অবস্থা কেন ? বাড়িতে লোকজন নেই ? সাথে সাথেই নিজেকে তিরস্কার করলেন হারাধন বাবু। ছিঃ ছিঃ। হয়তো বাড়ির কেউ সাংঘাতিক রকমের অসুস্থ। মন মেজাজ কারও ভাল নেই। এই সময় কি আর যাত্রাপালার মত উজ্জ্বল আলো জ্বলবে চারিদিকে ?
‘ রোগী কে ? দশরথ বাবু ?’ অমায়িক ভাবে জানতে চাইলেন তিনি।
‘ বড়কুমার।’ বলেই হনহন করে বাড়ির অন্দরমহলের দিকে পা বাড়াল প্যাঁচা। হাতে পেট মোটা ডাক্তারের ব্যাগ।
প্যাঁচার পিছন পিছন হাঁটতে লাগলেন হারাধন বাবু।
দরজার সামনে কাঁধে গামছা নিয়ে চাকর বাকর কিসিমের কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের দুইজনকে দেখে পেল্লাই এক নমস্কার ঠুকে ভেতরে চলে গেল। তার আগে প্যাঁচার হাতে ধরিয়ে দিল লণ্ঠন। প্রায় নাচতে নাচতে লণ্ঠন হাতে চলছে প্যাঁচা। পিছন পিছন হারাধন বাবু।
এইঘর সেইঘর। এই কামরা সেই কামরা পেরিয়ে বেশ খানিক চলার পর দোতলার বড় একটা কামরায় এসে হাজির হল দুই বান্দা। একটা বিছানা আর শ্বেত পাথরের ভারি টেবিল ছাড়া কামরাটা প্রায় ফাঁকা বলা যায়। বিছানার পাশে আরাম কেদারা। চাদরমুড়ি দিয়ে বিছানায় কেউ শুয়ে আছে। বড় কুমার হবে- অনুমান করলেন হারাধন বাবু।
কামরায় অন্য কোন লোকজন নেই। টেবিলের উপর বেতের ঝুড়ি। ভর্তি মৌসুমি ফল।
অসময়ের আম ও দেখা গেল। দেয়ালের একটা খোপে নীল রঙের চিমনিওয়ালা লণ্ঠন রাখা। চিমনিটা কলকে ফুলের মত। গায়ে খাঁজ কাঁটা।
কোন রোগী দেখতে গেলে রোগীর সাথে সাথে পারিপার্শ্বিক অবস্থাও ভাল করে জরিপ করেন হারাধন ডাক্তার। ইংল্যান্ডে যখন পড়াশোনা করেছেন তার শিক্ষক উইলিয়াম কেরি পই পই করে তাকে বারবার বলেছিলেন- ‘রোগী দেখিবার পূর্বে উহার চারদিকও ভাল করিয়া চাহিয়া দেখবি। উহা রুগির কেসহিস্ট্রি হিসাবে কাজ করিবে’।
ডাক্তারি ব্যাগটা শ্বেতপাথরের টেবিলের উপর রেখে প্যাঁচা দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভারি পর্দার পিছনে প্যাঁচার পায়ের জুতা দেখা যাচ্ছে। ধিরে সুস্থে হারাধনবাবু গিয়ে চেয়ারে বসলেন। বিছানার পাশেই বড় এক জানালা। লোহার মোটা শিক। কাঠের পাল্লা। সবই সুন্দর সবুজ রঙ করা। বটল গ্রিন।
একটা জিনিস লক্ষ্য করে অবাক হলেন ডাক্তার। কামরার মেঝেতে কিসের যেন দাগ। আঁকিবুঁকির মত। দুষ্ট কোন বাচ্চা ধারালো কিছু দিয়ে অমন করেছে - ভাবলেন।
বড় কুমার সম্ভবত জেগেই আছে। কিন্তু ধিরে ধিরে শ্বাস নিচ্ছে। ক্লান্ত বা লম্বা সময় ধরে অসুখে ভুগলে যেমন হয়।
‘ আপনি কেমন আছেন বড় কুমার ?’ শান্ত গলায় বললেন হারাধন বাবু। কোন কারন ছাড়াই সামান্য অস্থির বোধ করছেন। এত বড় বাড়ি অথচ লোকজন নেই কেন ? নাকি রাজা দশরথের বাড়িতে এমনিতেও ফালতু লোকজন কম। ধনীর বাড়িতে পরগাছা মার্কা মানুষ বেশি থাকে। ওরা নানান অজুহাতে উঠে হাজির হয়। পরে শেকড় গেঁড়ে বসে যায়। গুগলি শামুকের মত।
বড় কুমার জবাব দিল না। আগের মতই চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।
‘দেখি আপনার হাতটা।’ দরদ মাখা গলায় বললেন হারাধন।
অনেকটা সময় নিয়ে চাদরের ভেতর থেকে হাতটা বের করে দিল বড় কুমার।
একটা কিশোরের হাত। ফর্শা। বাজে ব্যাপার হল, আঙ্গুলের নখ বড় বড়। কতদিন না কাটলে নখ অমন বিচ্ছিরি হতে পারে সেই ব্যাপারে কোন ধারনা নেই হারাধনের। আঙ্গুলগুলো ও কেমন সরু সরু। অনেক সময় ধরে নাড়ির গতি বুঝার চেষ্টা করলেন। দুর্বল। মন্থর। সমস্যা কি সেটা বুঝতে পারলেন না। মউসুমি জ্বর ? মনে হচ্ছে না।
‘ চাদরের তলা থেকে মাথা বের করুন বড় কুমার। চোখ আর জিভ দেখব।’ নরম গলায় বললেন হারাধন।
অনেক সময় নিয়ে ধিরে ধিরে চাদরের নীচ থেকে মুখ বের করলো বড় কুমার। বলতে লজ্জা নেই একা হলে ভয় পেয়ে যেতেন। ষোল বছরের এক কিশোরের মুখ। রোগে ভুগে কুৎসিত হয়ে গেছে । চোখ দুটো অপ্রয়োজনীয় রকমের বড় বড়। মাথার চুল সব ঝরে গেছে। গলায় বুড়ো মানুষের মত বলিরেখা। গাল ভাঙ্গা।
কেমন যেন ছমছম করে উঠলো হারাধন ডাক্তারের শরীর। কত রোগীর চেহারা দেখেছেন। অমনটা আগে কখনই দেখেননি।
‘জিভ দেখি বাবা।’ দুঃখী গলায় বললেন তিনি।
বড় কুমার তাই করলো।
সমস্যা যে কি সেটা মোটেও বুঝতে পারছেন না ডাক্তার। কিন্তু নিশ্চিত মস্ত কোন ঘটনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। অমন বিরল রোগ কি আছে ? অচেনা বিচ্ছিরি রোগ !
চাদর টেনে নামালেন । টেথিস্কোপ কানে দিয়ে বড়কুমারের শরীরের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে দেখলেন ছেলেটার পেটে আর বুকে অদ্ভুত রকমের ছক ছক দাগ কাটা।
‘কী করে অমনটা হল ?’ জানতে চাইলেন হারাধন ডাক্তার। অবাক হয়ে চেয়ে আছেন বড় কুমারের দিকে।
আরও অবাক হলেন যখন দেখলেন ছেলেটা কাঁদছে।
‘খুব খারাপ লাগছে বাবা ?’ নরম গলায় জানতে চাইলেন হারাধন।
ছেলেটা কাঁদছে ।
অনেক চেষ্টা করেও কোন কথা বলাতে পারলেন না তিনি । হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন । দরজার দিকে চেয়ে গলা খাঁকারি দিলেন কয়েক বার। সাথে সাথেই প্যাঁচার চেহারা দেখা গেল। হালকা ছন্দে কামরায় প্রবেশ করলো প্যাঁচা। হারাধন বাবুর ইঙ্গিত পেয়ে ডাক্তারির ব্যাগ তুলে একই সাথে দুইজনে বের হয়ে এলো ।
আবার অনেক অলিগলি। শেষে বৈঠকখানা মার্কা একটা কামরার বসান হল হারাধন বাবুকে।
‘রাতের খাওয়ার আয়োজন হয়েছে।’ বিনয়ের সাথে বলল প্যাঁচা ।
‘ কিছু প্রশ্ন ছিল।’ থমথমে গলায় বললেন হারাধন বাবু।
‘ আপনি খেতে বসুন। আমি সব বলব।’ ঘুমঘুমে গলা প্যাচার।
ধনবান ব্যাক্তির বাড়ির তুলনায় খাওয়ার আয়োজন সামান্য। কটকতারা চালের ভাত, সোনামুগের ডাল, রুই মাছের তরকারি আর পেল্লাই সাইজের মাছ ভাঁজা। কাঁচের এক বয়ামে আমলকী আচার। পেতলের ঘটি ভর্তি কুয়ার ঠাণ্ডা জল। মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসার আয়োজন। আরাম করে খেতে বসলেন হারাধন বাবু। পাশে একটা জলচৌকিতে বসলো প্যাঁচা।
খাওয়া শুরু করার অল্প সময় পর অর্থাৎ হিসাবে দুই তিন গ্রাস খেয়েছেন মাত্র তখন ঘুমঘুম গলায় গল্প শুরু করলো প্যাঁচা।
‘ আমি রাজা দশরথের নায়েব। এই পরিবারের সব কিছুই জানি।’ মিহি গলায় বলছে প্যাঁচা। ‘আপাতত দৃষ্টিতে কাহিনীটা হাস্যকর । কিন্তু সত্য। গত বছর জিউস দিঘির ধারে বিকেল বেলায় নির্মল বায়ু সেবন করতে গিয়েছিলেন বড় কুমার। কাছিমপুরে আপনি নতুন, তাই জিউস দিঘি না ও চিনতে পারেন। অনেক পুরানো দিঘি । দিঘিটা শখ করে কেউ কাটেনি। প্রাকৃতিক। কত বছরের পুরানো কেউ জানে না। দিঘিতে প্রচুর কচ্ছপ আছে। তবে কেউ ধরে না। কিংবদন্তী আছে দিঘি আর দিঘির কচ্ছপ নিয়ে। ভয়ে কেউ ধরে না।
‘ তো বড় কুমার একটা কচ্ছপ ধরেছিলেন ? বা মেরেছিলেন ?’ খাওয়া থামিয়ে প্রশ্ন করলেন হারাধন বাবু।
‘ কি ভাবে বুঝলেন ?’ অবাক প্যাঁচা।
‘ অনুমান করলাম ।’
‘ আপনার অনুমান সঠিক। সবার বাধা উপেক্ষা করে জাল দিয়ে বড় দেখে একটা কচ্ছপ ধরেন বড় কুমার। তারপর কি যেন ভীমরতিতে ধরে। আছাড় দিয়ে কচ্ছপটা শক্ত পাথরের উপর ফেলে দেন তিনি। খোলস চৌচির হয়ে মারা যায় কচ্ছপটা।’
‘কিংবদন্তীটা কি রকম ?’
‘ শুনলে বিশ্বাস করবেন না।’
‘যে কচ্ছপ মারবে সে অসুখে ভুগে মারা যাবে ?’
‘মরবে না।’
তবে ?
‘ কচ্ছপের মত আয়ু নিয়ে বেঁচে থাকবে কিন্তু শারীরিক ভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যাবে।’
‘কি রকম বিকলাঙ্গ ?’
এইবার দীর্ঘ একটা সময় নিয়ে চুপ করে রইল প্যাঁচা। অনেক সময় পর নিচু গলায় জবাব দিল,’ সে নিজেই কচ্ছপ হয়ে যাবে।’
ধিরে সুস্থে খাওয়া শেষ করলেন হারাধন বাবু। অনেক সময় নিয়ে হাত মুখ ধুলেন। গামছায় মুখ মোছার সময় ভৃত্য টাইপের একজন পেতলের থালায় করে পানসুপারি আর ডাক্তারের পাওনা টাকা নিয়ে এলো।
ফতুয়ার পকেটে টাকা রেখে মশলা ভর্তি একটা পান মুখে পুরে বললেন, ‘ কয়েকটা অষুধের নাম লিখে দিচ্ছি। লক্ষণ দেখে চামড়ার কোন রোগ বা পীত জ্বর বলেই মনে হচ্ছে। তাও নিশ্চিত হতে পারছি না। তবে আপনার গল্প বিশ্বাস করছি না। এই ধরনের গল্প বিদেশি লেখকরা লিখে। বকোয়াজ ধরনের গল্প।’
‘ আপনি অভিশাপ বা কিংবদন্তী বিশ্বাস করেন না ?’
‘ না। করি না। যৌক্তিক কারন ছাড়া জগতে কিছু হয় না। এই নিন ওষুধের নাম। শহর থেকে আনাতে হবে। এইখানে মনে হয় না পাবেন।‘
নিজের বিছানা ছাড়া ঘুমাতে পারেন না হারাধন বাবু। তাই রাত গভীর হয়ে যাবার পর ও টমটমে করে নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে দেয়া হল তাকে।
আর সব ডাক্তারদের মত রোগী দেখে আসার পর পরই তাকে ভুলে যান না হারাধন বাবু। এইবারের ঘটনা বেশ অস্বাভাবিক । নিজেই খোঁজ খবর রাখলেন। মাস খানেক পর কৌতূহল মেটাতে না পেরে ভাড়া করা টমটম নিয়ে নিজেই চলে গেলেন দশরথের বাড়িতে। বাইরে বসে বসে তামাক টানছিল প্যাঁচা। হারাধন বাবুকে দেখে উনার মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেল।
সম্ভাষণ করে বসার আসন দিলেন। পানীয় আর হালকা খাবার আনতে লোকের জন্য হাক ডাক দেয়া শুরু করলেন।
‘ দেখুন আমাকে আপ্যায়ন করতে হবে না।’ বিব্রত গলায় বললেন হারাধন বাবু। ‘ বড় কুমারের খবর জানতে এসেছি। কেমন আছে ?’
অনেক সময় চুপ থেকে প্যাঁচা বলল, ‘ গেল সপ্তাহের পূর্ণিমা রাতে বড় কুমার জিওস দিঘিতে চলে গেছেন।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’ অবাক হলেন হারাধন বাবু।
‘ আপনাকে আগেই বলেছিলাম।’ এই প্রথম বিরক্ত হল প্যাঁচা। ‘ জিয়স দিঘির কচ্ছপ মারলে অভিশাপ লাগে।’
‘ বড় কুমার কচ্ছপ হয়ে গেছে ?’ হতভম্ব গলা ডাক্তারের।
‘ আপনার ধারনা মিথ্যে কথা বলছি আমি ?’ আরও বেশি বিরক্ত প্যাঁচা।
গল্প এখানেই থামিয়ে দিলেন পিরামিড মামা।
তারপর কি হল ? সবাই মিলে চেঁচিয়ে উঠলাম।
‘ বলছি দাঁড়া। তার আগে অক্টোপাস দাশকে দিয়ে আরেক পেয়ালা চা আর বাঁধাকপির সালাদ নিয়ে আসি। ’
জিনিসগুলো আনা হল। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল।
চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে পিরামিড মামা বলতে লাগলেন-
গত বছর আমার পোস্টিং হয়েছিল কাছিমপুরে। বুড়ো ডাক্তার হারাধনের সাথে পরিচয় হয়েছিল পেটের ব্যাথার চিকিৎসা করাতে গিয়ে। ওখানের জঙ্গলে কমলা রঙের সুন্দর মাশরুম পাওয়া যায়। বিষাক্ত, জানতাম না। খেয়ে অসুখ। হারাধন বাবুর মুখে এই অদ্ভুত গল্পটা শুনলাম। বিশ্বাস করিনি।
কয়েক সপ্তাহ পরে জিওস দিঘির ওখান দিয়েই আসছিলাম ।
রাত অনেক। আচমকা গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেল। মহাবিপদ তো। অমন সময় একটা কান্ড হল। পাঁচ ছয় জনের একটা ডাকাত দল ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার উপর। মুখে গামছা বাঁধা। হাতে অস্ত্র। রামদা আর বল্লম আছে এক গণ্ডার মত।
বাধ্য হয়ে টাকা পয়সা ঘড়ি সব তুলে দিচ্ছি ওদের হাতে । অমন সময় দিঘির পার থেকে উঠে এলো জিনিসটা। আকাশে বড় এক ফালি চাঁদ ছিল সেই আলোতে দেখে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ওটা কি ?
শরীরটা মানুষের। সিক্স প্যাক ওয়ালা পেট। ব্যায়াম করা পেটা শরীর। মুখটা হাসি হাসি। চোখে লাল রুমাল বাঁধা। দুটো ছিদ্। ওখান দিয়ে দেখে। কবজি , বাহুতে আর পায়ের হাঁটুতে কাপড়ের ফালি শক্ত করে বাঁধা। পিঠে ইস্কুল ব্যাগের মত কি যেন বাঁধা । পরেই বুঝতে পারলাম কচ্ছপের খোল ওটা। হাতে ব্যাকা ছুরি। দেখতে হুবহু নিনজা টারটেলের সেই কচ্ছপদের মত।
‘ কি রে, তরা আবার আমার এলাকায় অপরাধ করছিস ? হাসি মুখে বলল বিচ্ছিরি সেই লোকটা।
সব ডাকাত হাউ মাউ করে ভয়ে ভয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে পালিয়ে গেল।
অবশ্য আমার টাকা পয়সা আর জিনিস ফেলে দিয়ে।
‘ আপনি গাড়িতে বসুন।’ বলল সেই লোকটা। হাসছে। ‘ লোকালয় পর্যন্ত গাড়িটা ঠেলে দিচ্ছি।’
আমি তখনও অবাক হয়ে চেয়ে আছি।
শক্ত পেশিবহুল দুই হাত দিয়ে বেশ খানিক তক গাড়িটা ঠেলে দিল সে। তারপর সামনে কাউকে আসতে দেখে দৌড়ে ঝপ করে নেমে গেল দিঘির জলে। সামনেই একটা মুদির দোকান। লোকালয় ।
বাংলোয় ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল।
সব শুনে দারোয়ান বরফ আলী বলল, ‘স্যার উনি তো বড় কুমার। উনাদের পরিবারের সবাই কলকাতা চলে গেছে। উনি আজও নিজের এলাকা রক্ষা করেন কুম্ভ অবতারের মত। কেউ বিপদে পরলে সাহায়্য করেন। পারলে এক সময় দিঘির সিঁড়ির উপর খানিক তাল মিছিরি রেখে আসবেন। বড় কুমার খুব পছন্দ করেন। ’
‘ বড় কুমার কি একা থাকেন দিঘিতে ?” অনেকক্ষণ পর প্রশ্ন করলাম।
‘ না স্যার। উনার আরও তিন বন্ধু আছে। মোট চারজন। ১৯৮৪ সালে দুই বিদেশি ভদ্রলোক, নাম হল - কেভিন ইস্তম্যান আর পিটার ল্যারিদ , উনারা এসেছিলেন এখানে। বড়কুমার আর তার বন্ধুদের চরিত্র নিয়ে কার্টুন বানিয়েছেন । টিনেজ মিউট্যান্ট নিনজা টারটেল নামে। আপনি কিন্তু মনে করে দিঘির সিঁড়ির উপর খানিক তাল মিছিরি রেখে আসবেন। বড় কুমার খুব পছন্দ করেন। ’

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন