জিরাফ অবাক হয়ে বলল , ' তুমি নিশ্চিত , গাছটা ওখানে ছিল না ?'
নোটন হেসে ফেলে , ' বারে , অমন কাঁচা ভুল হয় নাকি ? কতবার গিয়েছি ওই পথ দিয়ে । বউবাজারে গেলে তো ওই পথ দিয়েই যেতে হত । গাছটা থাকলে আমি দেখব না ?'
'অমন হয় নাকি ?' অবাক বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায় জিরাফের।
হতাশ হয়ে রেখে দেয় ফোন।
ভাবতে থাকে ।
সমস্যাটা শুরু হয়েছিল একদম শান্ত ভাবে। যেমনটা হবার কথা নয় ।
আর জিরাফ নিশ্চিত , এটা কোন মনের ভুল না।
এই বার কেমন করে যেন বর্ষা চলে এলো।
অকস্মাৎ । বলার আগেই ।
আগের দিন ও ছিল কাঞ্চন রঙা ঝলমলে রোদ ।
আচমকা ধূসর মেঘ জমে টলটল করে বৃষ্টি নামলো । দেখে লোভ সামলাতে পারেনি জিরাফ । গিয়েছিল , জল কাঁদা মাখামাখি করে ফুটবল খেলতে । লোভে পাপ। পাপে পা পিছলে আলুর দম ।
বেমক্কা পরে হাঁটুর মালাই চাকির মধ্যে বেশ ব্যাথা পেল।
ঠিক হল, কয়েকটা দিন বাসায় থেকে বিশ্রাম নেবে । অবশ্য অন্য কোন উপায় ও নেই। বেশ রুমঝুম বৃষ্টি হচ্ছে সেই দিন থেকেই। কে না জানে, এইসব বাদলার দিনে, বাড়িতে থাকার মজাই আলাদা। সবজি দিয়ে ঢালা খিচুড়ি খাও। সাথে ঘি দিয়ে ভাঁজা , বার্গারের পেটির সাইজের মোটা তাল বেগুন । শর্ষে ইলিশ । পটলের দম ।
খাওয়া শেষে জানালার ধারে বসে বই পড়া।
জম্পেস করে বই পড়ছিল জিরাফ।
বাইরে জল আর হাওয়া। হাওয়া আর জল। আকাশ ভর্তি কালো মেঘ । আকাশের রঙ যেন ময়াল উপত্যাকার কালো হাতি । হিল হিল করে ভেজা জলজ হাওয়া দৌড়ে চলে আসছে। দূরের অচেনা দেশ থেকে।
বিগল জাহাজে করে ডারউইনের যাত্রা নিয়ে বইটা মাত্র শেষ করেছে । আন্দেজ পাহাড়ের উপর ভেঙ্গে পড়া বিমান দুর্ঘটনার উপর লেখা বইটা পড়বে ভাবছিল । তারপর পড়বে জলদস্যুদের মোহর নিয়ে লেখা বইটা । পাতায় পাতায় ছবি আর গুপ্তধনের নকশা আছে। ডাবলুন আর পিসেস অভ এইট মোহরের বর্ণনা ।
তখনই ড্রয়ারে কী খুঁজতে গিয়ে পেল এ্যালবামটা ।
ওদের বাসার নানান সময়ে নানান ছবি তোলা হয়েছিল। প্রায় সব ছবিই যত্নে আছে। তবে এখানে যে ছবিগুলো আছে, সবই জিরাফের তোলা । কাজ না থাকলে মাঝে মধ্যেই অ্যালবামটা উল্টে পাল্টে দেখে জিরাফ।
পুরানো ছবি দেখতে বেশ মজা লাগে ওর ।
পুরানো ছবিতে মানুষগুলোকে কেমন বোকা বোকা দেখায়। কত কিছু যে, সময়ের সাথে বদলে যায়, সেটা দেখলেও হাসি পায়। এক ছবিতে জিরাফের বাবা একটা জামা গায়ে দিয়েছেন , কলার প্রায় বিঘৎ খানেক লম্বা। খরগোশের কানের মত। দেখলেই হাসি পায়।
আরেক ছবিতে , বাবার আপিসের এক বড় সাহেব, গলায় বেঁধেছেন ববি প্রিন্টের সিল্কের টাই । আজকাল অমন টাই গলায় বাঁধলে লোকজন ফিরে চাইবে। গলা ছেড়ে না হাসলেও মুখ টিপে হাসবে ।
একটা সময়, জিরাফের বাবা আদ্যিনাথ বাবুর ছবি তোলার বাতিক ছিল বেশ।প্রায় ইটের সমান বড় একটা ক্যামেরা কিনেছিলেন। তখন ফিল্ম কিনতে হত । কোডাক বা ফুজি । বেশ দাম । ছবি তোলার পর স্টুডিয়োতে নিয়ে ডেভেলপ করে তেলতেলে মোটা কাগজে ছবি ছাপিয়ে আনতে হত। সেটারও বেশ খরচ।
তারপরও কথায় বলে, শখের দাম আশি টাকা তোলা।
আদ্যিনাথ বাবু বেশ খরচ করতেন।
সময় সুযোগ পেলেই ছবি তুলে রাখতেন। আকাশে একটু জল ভরা মেঘ জমা হল ? উনি ছবি তুলবেন। বাগানে ঘন নীল অচেনা সুন্দর কোন গুল্ম হয়েছে ? চেঁচিয়ে উঠবেন - জিরাফ জলদি আমার ক্যামেরাটা নিয়ে আয় তো। চায়ের দোকানের বাইরে বাদামের খোসার রঙের একটা কুকুর শুয়ে আছে ? ছবি তুলবেন।
একবার প্রচুর শিলা বৃষ্টি হল। উঠানের উপর এত এত শিলা পড়লো , প্রায় সাদা হয়ে গেল উঠান । জিরাফ আর ওর বোন টুকলি রেইন কোট গায়ে চাপিয়ে মহানন্দে শিলা কুড়াচ্ছিল। টুকলি গুণ গুণ করে ছড়ার মত করে বলছিল –
আকাশ থেকে নেমে এলো ছোট্ট একটি প্লেন
সেইখানেতে বসে ছিল ছোট্ট একটি মেম।
তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম- হোয়াট ইজ ইয়োর নেইম
সে আমাকে উত্তর দিল, মাই নেইম ইজ জ্যাম ।
আদ্যিনাথ বাবু সেই ছবি তুলে , কি মনে করে বিদেশের এক পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলেন । কয়েক মাস পর সেই ছবি ছাপা হল। নাম- ছিল সম্ভবত , হ্যাপিনেস। বিদেশ থেকে মানি অর্ডারে বেশ খানিক টাকা এলো আদ্যিনাথ বাবুর নামে। রাতারাতি পাড়ার সবার কাছে হিরো হয়ে গেলেন জিরাফের বাবা ।
নিজে আরেকটা ভাল ক্যামেরা কিনে পুরানোটা জিরাফকে দিয়েছিলেন আদ্যিনাথ বাবু। বলেছিলেন , ' কোন দৃশ্য পছন্দ হয়ে গেলে ছবি তুলে ফেলবি। আমি তোকে সস্তার সাদাকালো ফিল্ম কিনে দেব, চিন্তা করিস না। ছবির একটা মজার ব্যাপার হল কি জানিস ? সময়টা ছবিতে কেমন সুন্দর আঁটকে থাকে। বয়স বাড়ে না । দৃশ্য পাল্টায় না। এক একটা মুহূর্ত কেমন সুন্দর আঁটকে থাকে ।'
জিরাফ ছবি তুলত।
যা পছন্দ হত তাই। জুতার বাক্স হতে শুরু করে মাছ বিক্রেতার ঝুড়ির মাছ। চারিদিকে গোল করে সাজিয়ে রাখা বরফের কুঁচি। মাঝে বৃত্তাকার করে সাজিয়ে রাখা রূপার পাতের মত এক একটা ইলিশ। হাসি হাসি সূর্যমুখি ফুল। বেগুন গাছের ফিকে বেগুনী ফুল। রাস্তার ধারের বেলুনওয়ালা । হাতে রঙ্গ-বেরঙ্গের বেলুন। কেমন পেল্লাই এক সিলিন্ডার থেকে গ্যাস দিয়ে বেলুন ফুলাচ্ছে ।মিষ্টির দোকানের সামনে পেতলের থালায় হলুদ - লাল বুন্দিয়া ।
সব কিছু। মোট কথা যা ভাল লাগে।
কেন জানি না, বেশি দিন ছবি তোলার শখটা ধরে রাখতে পারেনি জিরাফ। কেন ? - বলতে পারবে না। আরও খানিক বড় হতেই বন্ধু বান্ধবদের সাথে মাঠে গিয়ে খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ক্যামেরা বন্দি রইল ড্রয়ারে। কিছুটা বোধ হয় অনাদরে ।
কখনও কখনও কারো জন্ম দিনের কেক কাটার সময় বের করা হত।
সে সব অনেক দিন আগের কথা। কিছু মনে আছে। কিছু , কেমন যেন হারানো দিনের মত মনে হয়। ফিকে হয়ে গেছে কিছু ।
আজ এই বাদলা হাওয়ার দিনে, পুরান ছবির এ্যালবাম বের করে দেখতে বেশ ভালই লাগছিল ওর। এই তো সেদিন, আবার মনে হয়, নাহ , কতকাল আগের কথা।
একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, গগন কাকু হাসি মুখে শালপাতার ঠোঙায় ঘুগনি মেখে সামনে বাড়িয়ে দিচ্ছে । পেল্লাই গোঁফের গগন কাকু রোজ সন্ধ্যায় অ্যালুমিনিয়ামের কেমন চ্যাপ্টা থালায় ঘুগনি বিক্রি করতে আসতো। খুবই বিখ্যাত জিনিস। গোলাপি পেঁয়াজ, লাল টম্যাটো, হলুদ আলুর ছক্কা , ধনিয়া আর জিরার দানার মিহি, ধনেপাতার কুঁচি সব মিলিয়ে মরি হায় হায় কিসিমের জিনিস।
লোকটা নেই, ছবি রয়ে গেছে।
আরেকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে রোগা পটকা রাম দয়াল দারোয়ানের ছবি। গজারি কাঠের একটা লাঠি থুতুনিতে রেখে, ঘুম ঘুম চোখে চেয়ে আছে ক্যামেরার দিকে।
রামদয়ালকে নিয়ে একটা কাহিনি আছে।
জিরাফ বড়দের মুখে শুনল , ওদের পাড়ায় দারোয়ান রাখা হবে। শুনে তো জিরাফ মনে ভেবেছিল , দারোয়ানের মাথায় পাগড়ী থাকবে। ইয়া গোঁফ থাকবে, কানে থাকবে দুল । জরির কাজ করা জামা আর নাগড়া থাকবে পায়ে। জামার বোতাম হবে পিতলের , মাশরুমের মত বড় বড়।
আসলে আনন্দমেলা পত্রিকা পড়ে পড়ে , জিরাফের মনে দারোয়ানদের নিয়ে অমন একটা কাল্পনিক ছবি ঢুকে গিয়েছিল।
কিন্তু প্রথম দিন যখন রামদয়াল ডিউটি করতে আসলো, দেখে বড্ড হতাশ হয়েছিল জিরাফ। লোকটা মোটেও আনন্দমেলা পত্রিকায় আঁকা দারোয়ানদের মত না। রোগা। মাথায় চুল উল্টে আঁচড়ানো। মনে হয় এক গাদা আম পাতা সুন্দর , কাঁত করে আঠা দিয়ে আঁটকে রাখা হয়েছে মাথায়। কেমন খাকি রঙের ডাকপিয়নদের মত পোশাক পরে এসেছে লোকটা । বগলের তলায় একটা দুই ব্যাটারির রেডিও। সেটাই পিন পিন শব্দ করে বাজে। কানে ঠেকিয়ে - অনুরোধের আসর শুনে ।
কারা করে এইসব অনুরোধ ? তাও আবার রেডিও স্টেশনে চিঠি লিখে !
রামদয়াল মজার সব ধাঁধাঁ জানত। একটা অমন
কাঁসারি র সারি ছাড়া
পাঁঠা ছাড়া পা।
লবঙ্গের বঙ্গ ছাড়া
কিনে আনবি তা।
জিনিসটা কি ? অনেক ভেবে বের করেছিল জিরাফ। কাঁঠাল ।
মাঠের ধারে বড় একটা গাছে, সুলতানদের তলোয়ারের মত কেমন এক ধরনের শিম ধরত। ঘন সবুজ সেই শিমের নাম মৌ শিম। বন শিম বা পাহাড়ি শিম ও বলতো কেউ কেউ। ওটা যে খাওয়া যায়, জিরাফ জানত না। কাউকে খেতে দেখেনি। শুকিয়ে গেলে মরক্কোর ঝুম ঝুমির মত ঝাঁকুনি দিয়ে বাজানো যেত। দারোয়ান রাম দয়াল সেই শিম কুঁচি কুঁচি করে ভেঁজে আটার রুটি দিয়ে খেত । কখনও সেদ্দ করে ভর্তা বানিয়ে খেত গরম ভাতের সাথে।
রাম দয়াল আসার পর সেই গাছ সব সময় খালি থাকতো।
আজ এই বৃষ্টি ভেজা দিনের হাওয়া ভরা সন্ধ্যায় , ছবিগুলো দেখতে দেখতে কেমন উদাস হয়ে যাচ্ছিল জিরাফ।
তখন ওরা নবীগঞ্জে থাকতো । সেই শহর ছেড়ে এসেছে আজ ছয় বছর।
শহরটা বেশ সুন্দর ছিল।
নদীর পাড়ে শহরটার জন্ম । বড় বড় সোনালু গাছে ভর্তি। একটা মৌসুমে হলুদ ফুলে ফুলে ভরে যেত শহরটা। ছিল পুরানো দিনের একটা ইটের মন্দির । সেই কবেকার এক ভাঙ্গা জমিদার বাড়ির সিংহ দরজা। দুটো পিচ্চি ভাঙ্গা সিংহ আজও দরজার সামনে থাবা উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সারা বছর শহরটার উপর দিয়ে বয়ে যেত নদীর পাগলাটে হাওয়া । মাঝ রাতে ইস্টিমারের সিটির শব্দে কেমন ঘুম দেশের দরজায় কড়া নাড়ার মত আয়োজন হত। সেন্ট পিটার গির্জার ঘণ্টা- টিলিঙ ! টিলিঙ !
একটা ছবি দেখে কেমন যেন খুঁত খুঁত করতে লাগলো জিরাফের মন। মনে হল ছবিটায় কি যেন নেই। কিছু একটা ছিল। এখন নেই।
আরে তাইতো !
গাছটা কই ?
সেই যে কেমন অদ্ভুত ধরনের অচিন গাছ ! যেটার পাশ দিয়ে যাবার সময় অবাক হয়ে চেয়ে থাকতো জিরাফ । ওই গাছটা গেল কই ? ছবিতে দেখা যাচ্ছে - মিষ্টি আলু বিক্রি করতো যে বুড়িটা , বসে আছে। কিন্তু যে গাছতলায় বুড়ি বসে থাকতো , সেই গাছটা নেই ছবিতে ! অমন হয় নাকি ?
ছবি তোলার সময় গাছটা ছিল তো।
মনে করার চেষ্টা করলো জিরাফ , শেষ বার যখন ছবিটা দেখেছিল, তখন গাছটা ছিল কী না ?
অবাক হয়ে আবিস্কার করলো, মনে পড়ছে না। কিন্তু গাছটার কথা জিরাফ ভুলবে কেমন করে ? অমন গাছ কি আর ভোলা যায় ? অমন গাছ কি সহজে পাওয়া যায় খুঁজলে ?
স্মৃতির গহনে ডুব দিয়ে মনে মনে পুরানো দিনে চলে গেল জিরাফ।
ওদের বাড়ির পিছন থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে একেবেকে। সেই সময় কেন জানি না রাস্তা ঘাট এত ঘন ঘন ভেঙ্গে যেত না। আজকাল যেমন প্রত্যেক বর্ষার সময় রাস্তাঘাট মেরামত শুরু হয়। এখানে ওখানে গর্ত। রিক্সা উল্টে পড়ে। সেইসময় অতটা অমন দেখেনি জিরাফ। বিশেষ করে বাড়ির পিছন দিকের রাস্তাটা যেন ব্লক দিয়ে তৈরি। পিরামিড বানানোর ব্লক । রাস্তাটা আবার বেশ অদ্ভুত রকমের সাদা ।
চলে গেছে একে বেঁকে।
রবীন্দ্রনাথের ছোট নদীর মত।
রাস্তার দুই পাশে জুতার বাক্সের মত একতলা বা দোতলা বাড়ি। লোহার ফটক। মরচে ধরে গেছে। ফটকের গায়ে যেন বাটা মশলার প্রলেপ। দুই পাশে ঘন সবুজ ঘাস। বিষকাঁটালির ডাল দেখে জিরাফ কতদিন ওদের কাউন ভেবেছিল। আরও আছে ভেন্নাপাতা। ভেন্নার বীজ দিয়ে তেল হয়। রেডির তেল ।
এই রাস্তা দিয়েই বউ বাজার যেতে হত।
বউ বাজার মানে না এই বাজারে আগে বউ বিক্রি হত। যার বিয়ে করা দরকার সে বাজারে গিয়ে পুটলি থেকে টাকা বের করে বলতো - আচ্ছা ভাল দেখে একটা বউ দাও দেখি। একদম কমলাফুলির মত বউ চাই।
অমন না কিন্তু।
অনেক আগে , কয়েক বাড়ির বউ তাদের বাগানে ফলানো সবজি নিয়ে বিক্রি করতে বসতো এই বাজারে। সাদা সবুজ ছিট পড়া গোল বেগুন । মরকত রঙা পালং শাক । সাগরের শ্যাওলার মত পুঁইশাক । রুবির মত লাল শাক , সেটা রান্না করলে এত লাল টুকটুকে ঝোল হয় , কাউনট ড্রাকুলা দেখলে চেটেপুটে খেয়ে ফেলবে। সেইজন্য হয়তো লালশাক রান্না করলে রসুন দেয় জিরাফের মা।
পোখরাজ রঙা শর্ষের তেল বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসতো কোন বাড়ির বউ। লাল টুকটুকে মাটির হাড়ি পাতিল । বেতের ঝুড়ি । তালের শাঁস । আরও অনেক কিছু।
এক কোনে মাছ বিক্রি করতে বসতো সিধুর মা। পলো দিয়ে মাছ ধরতো পুকুর থেকে। সরপুঁটি, কুচো চিংড়ি আর রয়না। গামছা পরা খালি গায়ের কালো কুচকুচে এক লোক আসতো। ঝুড়ি ভর্তি নীল কাঁকড়া আর সবুজ কালো শামুক । বেশ বিক্রি হত উনার জিনিস।
বাঁশ কোড়ল নিয়ে আসতো এক বিক্রেতা। জিনিসটা আর কিছুই না। বাঁশের গোঁড়ার কচি অংশ। বর্ষাকালে হয়। খেতে ডাটা শাকের মত। বাঁশ কোড়ল সরাসরি সংগ্রহ করে খাওয়া হয় । আবার সুন্দর একটা কায়দা করেও যোগাড় করা যায়।কোড়লটি যখন মাত্র মাটি ফুড়ে বের হয়ে আসে তখনই একটা পেল্লাই ভারি মাটির কলস বা ঘড়া দিয়ে ওটাকে ঢেকে দেয়া হয় । কিছুদিন পর সেই কোড়ল বড় হয়ে উপর দিকে না গিয়ে ঘুরে ঘুরে বাঁধাকপির মত হয়ে যায় । তখন সেটা সংগ্রহ করে কেটে রান্না করার কথা ও জিরাফ শুনেছে ওর মায়ের মুখে।
বউ বাজার যাবার পথে সুন্দর একটা বাঁক পড়ত। বাঁকের এক পাশে কাজলের মত কালো ডোবা। ময়ূরকণ্ঠী শাড়ির মত এক ঝাঁক কস্তুরি ফুল দিয়ে ভর্তি। আর সেই নিরিবিলি রাস্তায় গাছটা দাঁড়িয়ে । নিঃসঙ্গ । যেটার নাম কখনই জানা হয়নি জিরাফের। বা কেউ জানত না হয়তো।
গাছটা বড়।
অনেকটা কদমগাছের সাইজ। এক গাদা পাতা। পাতাগুলো অদ্ভুত রকমের গোলাকার। সবগুলো পাতার আকৃতি এক রকম । অন্য সব গাছের পাতার মত ছোট বড় না। চকচকে সবুজ , টিয়া পাখির পালকের মত। মাঝে সরু শিরা। বাদলার মৌসুমে চিঁড়ার মত সরু সাদা ফুল ধরে। বেশ রিমঝিম করা মিষ্টি সৌরভ।
সব মনে আছে জিরাফের।
কতবার অলস চৈতালি হাওয়ার দুপুরে , কমলা রঙের বিকেলে এই গাছটার সামনে এসে উদাস হয়ে গেছে। কিন্তু এখন এই ছবিতে গাছটা নেই। অথচ সেই বুড়ি বসে আছে।
অবাক কাণ্ড !
জিরাফ শুনেছে, কখনও কখনও ফিল্মের দোষে, তাপমাত্রায় বা আলো ছায়ায় কারসাজিতে ছবির উপর বাজে প্রভাব পড়ে। ছবি ডেভেলপ করার পর নানা রকম অসঙ্গতি ধরা পড়ে। অমন কোন অবজেক্ট আছে ছবিতে, ছবি তোলার সময় ছিল না । কিন্তু ছবি ডেভেলপ করার পর দেখা যায় আছে। আবার হয়তো কিছু অবজেক্ট ছবিতে আসেনি।
পুরানো দিনের ফিল্মে তোলা ছবিতে অমন কাহিনি বেশি হত।
এটাও কি তেমন একটা রহস্য ?
জানে না জিরাফ।
আচমকা গাছটার জন্য ওর মন কেমন করতে লাগল।
শৈশবের স্মৃতি।
কতবার সেই পথ দিয়ে এসেছে। কতবার গাছটা দেখে মুগ্ধ হয়েছে। বুক ভরে নিয়েছে সাদা ফুলের সৌরভ। অনেকটা যেন কদম ফুলের মত।
কি মনে হতেই বন্ধু নোটনকে ফোন দিল জিরাফ। ওরা কয়েকবার সেই পথ ধরে গেছে, সেই অচিন গাছের তলায় বসে থাকা বুড়ির কাছ থেকে কিনে খেয়েছে সেদ্দ মিষ্টি আলু। শীতের সময় আবার ভুট্টা পুড়িয়ে বিক্রি করতো বুড়ি ।
কয়েকবার ল্যান্ডফোনে রিঙ বাজতেই ওপাশ থেকে ফোন ধরল নোটন , ' হ্যালো !'
'হ্যালো নোটন , আমি জিরাফ। কেমন আছ ?'
'ভাল। তোমার নাকি পা ভেঙ্গেছে ?'
'পা ভাঙ্গেনি। মালাইচাকি চেন তো ? ওটা সামান্য মচকে গেছে। চাইনিজ টাইগার বাম লাগাচ্ছি। বেশ কাজের জিনিস। আর প্রচুর বই পড়ছি। '
'আমি মুভি দেখছিলাম। জ্যাকি চ্যানের মুভি। ওর মুভি আমার ভীষণ প্রিয় । '
' বিরক্ত করলাম ?'
'তেমন না। আমি পরে রিপ্লে করে দেখব।'
'আচ্ছা নোটন , তোমার মনে আছে আমরা নবীগঞ্জে থাকার সময় বউ বাজারের ওখানের একটা রাস্তা দিয়ে যেতাম। বড় নির্জন শুনশান রাস্তা। পুরানো আমলের একটা ভিলা ছিল , ভিলার সব জানালা রঙ্গিন কাচের ।'
'মনে আছে তো। ধনী ব্যবসায়ী আলিজান মীর্জার বাড়ি ।উনি বাকরখানির ব্যবসা করতেন । কি ব্যাপার বল তো ? শখের গোয়েন্দাগিরি করছ নাকি ?'
'আরে হ্যাত। এক বুড়ি মিষ্টি আলু আর ভুট্টা বিক্রি করতো সেটা মনে আছে ?'
' থাকবে না কেন। কতবার কিনে খেলাম। ডোবার পাশে তো ? '
'হ্যাঁ , একদম। আচ্ছা বুড়ি যে একটা গাছের তলায় বসতো সেটা মনে আছে ? গাছটা অনেকটা ঝাঁকড়া ধরনের । সাদা ফুল ধরত। কদম ফুলের মত মাথা ধরা ঘ্রাণ। পাতাগুলো একদম গোল গোল। আমরা অচিন বৃক্ষ নাম দিয়েছিলাম।'
'আমরা নাম দিয়েছিলাম ? অচিন বৃক্ষ ?' অনেক ক্ষণ চুপ থেকে অবাক গলায় বলল নোটন। ' কিন্তু বুড়ি তো কোন গাছের তলায় বসতো না।'
'না বসুক। ওই জায়গার অচিন গাছটার কথা তো মনে আছে ? দোকানদার পাকরাশিকে আমরা গাছের নাম জিজ্ঞেস করায় বুড়ো বলল ওটার নাম নেই । অচিন বৃক্ষ।'
'কি অদ্ভুত। অমন গাছের কথা তো আমার মনে পড়ছে না।'
' এত ভুলো মন হলে চলে ।' খানিক যেন ধৈর্যের উপর চাপ পড়লো জিরাফের।
'উহু। তোমার কোন ভুল হচ্ছে জিরাফ। অমন গাছের কথা আমি ভুলে যাব কেন ? আমি নিজেও তো গাছপালা পছন্দ করি। পৌর পাঠাগারের বাইরে কৃষ্ণচুড়া গাছটার কথা খেয়াল আছে। রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে কাঠবাদাম গাছটার কথা মনে আছে। আর অমন বিচিত্র ফুলের গাছটার কথা মনে থাকবে না ? '
'তুমি বলছ অই অচিনগাছটা ছিল না ?' খানিক দিশেহারা হয়ে গেল জিরাফ।
'একদম না। তোমার কোন ভুল হচ্ছে। বাস্তবে নেই কিন্তু মনে হয় আছে বা ছিল। বৃষ্টির দিন তো তাই। ভেতরে হালকা জ্বর টর আছে কি না দেখ। অমনিতেও বৃষ্টির দিনে মানুষ অতীত দিনের স্মৃতি খুঁজে। যাও কড়া দেখা এক পেয়ালা চা খাও। ঠিক হয়ে যাবে। কফি আছে তোমাদের বাসায় ? রেঙ্গুন থেকে চায়ের পাতা ও এনেছ নাকি শুনলাম ? '
এর পর আলোচনা আর জমল না।
ফোন রেখে দেয়ার পরও জিরাফের মনের ভেতরের আছন্ন ভাবটা কমল না।
সন্ধ্যার পর আধ ভাঙ্গা ছাতি হাতে ভিজে শরীরে আপিস থেকে ফিরলেন আদ্যিনাথ বাবু। রিক্সা পাননি, অনেক পথ হেঁটে ফিরেছেন। দমকা বাতাসে ছাতি উল্টে গেছে। শিক ভেঙ্গেছে । কাঁদা লেগে জামা কাপড় কেমন বাটিক প্রিন্ট হয়ে গেছে ।
স্নান করে চায়ের পেয়ালা হাতে বসা মাত্র জিরাফ বৈঠকখানায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলো , ' বাবা, আমরা যখন নবীগঞ্জে ছিলাম। তখন তুমি রাম সীতা মন্দিরের ওখানের রাস্তা দিয়ে বউ বাজার গেছ , না ?'
আদ্যিনাথ বাবু খবরের কাগজ মেলে ধরেছিলেন চোখের সামনে। আপিস থেকে ফিরে অনেকটা সময় ধরে খবরের কাগজ পড়েন তিনি। সেটা পড়া শেষ হলে রাতের খাবার খেয়ে আবার টিভির খবর দেখতে বসে যান। দুনিয়ার এক বিন্দু খবর তিনি মিস করতে চান না। দরকার হোক না হোক সব খবর চাই ।
খানিক অবাক হয়ে তিনি জিরাফকে বললেন , ' হ্যাঁ , সেটা তো অনেকবারই গেছি। যদিও আমি বাজার করতাম দিগু বাজার থেকে। আপিস থেকে ফেরার সময় সুবিধে হত, কিন্তু তারপরও গেছি তো অই রাস্তা দিয়ে। '
' বাবা, তোমার কি মনে আছে? ওইখানে একটা কেমন অচেনা গাছ ছিল। গাছটা আমরা কেউ চিনতাম না। পাকরাশিদের দোকানের ওরা বলতো অচিন বৃক্ষ। পাতাগুলো কেমন গোল গোল। বর্ষায় ফুল ফুটত। অনেকটা কদমের মত ঘ্রাণ ।'
আদ্যিনাথ বাবু অবাক হয়ে বললেন , ' অই রাস্তায় কয়েকটা কাক জাম, খেজুর আর বাবলা গাছ ছাড়া তো অন্য কোন গাছ দেখিনি। বিশেষ করে তোর দেয়া বর্ণনা মত কোন অচিন গাছ তার ফুল আবার কদমের মত ঘ্রাণ। নাহ ।'
' তুমি নিশ্চিত ?' হতাশ হল জিরাফ।
' আরে ভুল হবে কেন ?' বাবা আরও অবাক হলেন। ' ব্যাপারটা কি সিরিয়াস নাকি ? বাজি টাজি ধরেছিস কারো সাথে ?'
'না, বাবা।' খানিক বিব্রত হয়ে বলল জিরাফ । ' আমার পরিষ্কার মনে আছে । ওখানে একটা গাছ ছিল। অচিন গাছ। এই যে এই ছবিটা দেখ। বুড়ি বসে ভুট্টা পুড়িয়ে বিক্রি করছে না ? ওর পিছনে ছিল।'
আদ্যিনাথ বাবু ফটোটা অনেকক্ষণ দেখলেন। শেষে ঠোঁট উল্টে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন , ' গাছটা থাকলে ছবিতে আসেনি কেন ?'
'আমারও একই প্রশ্ন।'
' না । আমার মনে হচ্ছে তোর কোন ভুল হচ্ছে। ফলস মেমরি ব্যাপারটা জানিস ?'
'না তো।'
' বলছি দাঁড়া।' পেয়ালাতে চুমুক দিয়ে বাবা বলতে লাগলেন।
' ১৯৬০ এর শুরু থেকেই একটা মজার সিনড্রোম কাজ করেছিল অনেকের মধ্যে । এটাই ফলস মেমরি মার্কা কাহিনির সুত্রপাত । বেশ কিছু দিন ধরে এক গাদা লোক দাবী করছিল, গভীর রাতে নির্জন পথ দিয়ে ফেরার সময় উড়ন্ত সসার দেখেছে । উজ্জ্বল লাল , সাদা, হলুদ আলো জ্বলছিল সসারের গায়ে। ওটার ভেতর থেকে নীল বা সবুজ রঙ্গের দুইজন মানুষ এসে তাকে ধরে নিয়ে গেছে সসারের ভেতরে । নানা জায়গায় ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে শেষে আবার ফেরত ও দিয়ে গেছে ।
এই রকম রিপোর্ট আছে ডজন ডজন ।
সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটা হচ্ছে জর্জ অ্যাডামসকি সাহেবের ।
জর্জ অ্যাডামসকি সাহেব ছয় ইঞ্চি একটা দূরবীন নিয়ে রাত জেগে বাসার ছাদের উপর বসে আকাশের তারা দেখতেন । এটাই ছিল তার বাতিক । গরম , বর্ষা, শীত কিছুই মানতেন না। এইরকম এক রাতে তিনি আকাশে সিগারের আকৃতি একটা ভিন গ্রহের যান দেখতে পায় । সেটা ছিল ১৯৪৬ সালের ঘটনা ।
এর পর ১৯৫২ সালের ২০ নভেম্বর ক্যালিফোনিয়ার মরুভূমির ওখানে তার চোখের সামনে ল্যান্ড করে অচেনা স্বচ্ছ ধাতুর তৈরি বিচিত্র একটা সসার । ভেতর থেকে নেমে আসে শুক্র গ্রহের বাসিন্দা । যাদের বলা হয় ভেনাসিয়ান । ভেনাসিয়ান শব্দটা আবার জনপ্রিয় করেছিলেন টারজান সিরিজের লেখক এডগার রাইস বারোজ । শুক্র গ্রহের বাসিন্দাদের নিয়ে উনি বেশ কিছু কল্পকাহিনী লিখেছিলেন । এমন কি ভেনাসিয়ান বর্ণমালা পর্যন্ত লিখেছিলেন । অবশ্যই মজার ছলে ।
তো সেই স্বচ্ছ ধাতুর তৈরি সসার থেকে ভেনাসিয়ান বাসিন্দারা নেমে অ্যাডামসকি সাহেবকে ধরে নিয়ে যায় ভেতরে । সসারের ভেতরে ওদের দলের সর্দার ছিল । যাকে গুরু বলে সম্বোধন করেছিলেন অ্যাডামসকি । গুরুর বয়স এক হাজার বছর । উনারা নাকি সব সময় পৃথিবীতে এসে আমাদের দেখে যেতেন ।
তখন ভেনাসিয়ানরা উনাকে শুক্র গ্রহ ঘুরিয়ে নিয়ে আসে।
নিয়ে যায় চাঁদের মাটিতে। সেখানে আছে অচেনা সব গাছপালা । বিচিত্র মায়াবী নগর। বরফে ঢাকা পাহাড় । ফিরে এসে সেই সব ঘটনার দারুন বর্ণনা দিয়ে বই লিখে ফেলেন অ্যাডামসকি । দ্যা ফ্লাইং সসার হ্যাভ ল্যানডেড , ইনসাইড দ্যা স্পেসশিপ । আরও কয়েকটা লিখেছেন । তবে এই দুটো বেশি বিক্রি হয়েছে । অর্থ, বিত্ত , জনপ্রিয়তা সবই পেয়েছিলেন অ্যাডামসকি ।
তবে উনার তোলা উড়ন্ত সসারের ছবিটা দেখে জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ালথার ইয়োহানেস রিডেল বলেন, যে এই ছবিটি একটি সার্জিক্যাল ল্যাম্পের ছবি। কম আলো ব্যবহার করে কায়দা করে তোলা হয়েছে । মোট কথা জর্জ সাহেব একজন প্রতারক।
যাই হোক , সেই সময়ে কিন্তু প্রচুর লোকজন জর্জ সাহেবের মত অমন দাবী করতো । পরে ক্যামেরা আর ভিডিও প্রযুক্তি সহজলভ্য হবার পর এই ধরণের দাবীর পরিমাণ কমে গেছে । প্রমাণ হিসাবে ফ্লাইং সসারের ছবি দেখাতে হবে । আর জাল ছবি ধরাও সোজা ।'
'এখানে ফলস মেমরি কোথায় ?' বাঁধা না দিয়ে পারলো না জিরাফ ।
' তো এখান থেকেই ফলস মেমরির সুত্রপাত । উড়ন্ত সসারে ধরে নিয়ে গিয়েছিল বলে যারা দাবী করেছে, উনারা ভাবছেন, সত্য সত্যি অমন হয়েছে তাদের জীবনে। আসলে হয়নি। অথচ মনে প্রাণে উনারা অমনটা বিশ্বাস করেন । ফলস মেমরির আরেকটা উদাহরণ এক সময় প্রচুর লোকজন পাওয়া যেত , যারা বিশ্বাস করতো তাদের পূর্বপুরুষ এসেছে মঙ্গল বা শক্র গ্রহ থেকে। হারানো আটলান্টিসের বংশধর অমন দাবী করা মানুষও পাওয়া গেছে। সবই ফলস মেমরির কেস । যাকগে অনেক জ্ঞান ঝাড়লাম । আর কথা বললে আমার কাগজ পড়া হবে না । যা তোর মাকে বল আরেক পেয়ালা চা দিতে। বিস্কুট থাকলে দুই একটা যেন দেয় । বেছে বেছে আমাকেই যেন ন্যাতান বিস্কুট না দেয় । সেটা খেয়াল রাখবি। '
‘ তোমার লাইফে কোন রকম ফলস মেমরির অভিজ্ঞতা হয়েছে ?' বাবার লেকচার শেষ হতেই জানতে চাইল জিরাফ।
‘ হয়েছে না আবার।' মুচকি হাসলেন আদ্যিনাথ বাবু। ' ফলস মেমরি নাকি বেশির ভাগ শৈশবের সময় হয়। আমার শৈশবের একটা স্মৃতি খুব বেশি মনে পড়ত। একটা দীঘল ঘাসের মাঠ। একতলা কাঠের বাড়ি। আমি বসে আছি জানালার ধারে। ভেতরে মা বসে আমার জন্য কাটা দিয়ে উলের সোয়েটার বুনছে। কামরার ভেতরে আধো আলো অন্ধকার। পুরানো জামানার চিমনীর ভেতরে তেলের প্রদীপ। বাইরে সাঁই সাঁই হাওয়া। মিহি বরফ পড়ছে। কয়েকটা নেকড়ে ঘুর ঘুর করছে বাড়ির বাইরে। এত স্পষ্ট। প্রতিটা জিনিস একদম খুঁটি নাটি দেখতে পেতাম। কিন্তু জিনিসটা একদম অসম্ভব। জনমের পর থেকে আমাদের পরিবারের কেউ বরফ পড়ে অমন কোন দেশে যাইনি। একই কথা এসে যায় কাঠের বাংলো আর নেকড়ের মধ্যে। পুরো ব্যাপারটা এক অদ্ভুত জিনিস। আমার মন জোড় দিয়ে বলছে ব্যাপারটা সত্যি। আমার একদম ছেলেবেলার স্মৃতি। কিন্তু অমন ঘটনা জীবনেও হয়নি।'
' তোমাদের শৈশব তাহলে মজার ছিল।' বলল জিরাফ।
'সবার শৈশব ই অনেক মজার।' বললেন আদ্যিনাথ বাবু।
'বিজ্ঞানের এত কিছুর প্রতি তোমার আগ্রহ হল কেমন করে ?'
' তখন এত কিছু পাওয়া যেত না। বই বা ম্যগাজিন কিছুই না । তবে আমাদের সময়ে টিভি ছিল জাদুর বাক্স। সারাদিন চলতো না। শুধু বিকেলে। এত চ্যানেলও ছিল না। তবে মজার হচ্ছে , সেই ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ টিভি ভর্তি ছিল সায়েন্স ফিকশন সিরিজ। তখন একটা বেশ হুজুগ চলছিল। যেমন - সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, বায়োনিক অমেন, স্টার ট্র্যাক, নাইট রাইডার , ইনক্রেডিবল হাল্ক , ম্যান ফ্রম অ্যাটলান্তিস। এই সব কিন্তু অজান্তেই আমাদের বিজ্ঞানের প্রতি কৌতূহলী করে তুলেছিল ।'
সেইরাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের ছেলেবেলার কথা অনেকক্ষণ ভাবল জিরাফ।
হতে পারে সেই মায়াবী অচিন বৃক্ষের ব্যাপারটাও ওর জীবনের ফলস মেমরি। নইলে নোটন বা বাবার মনে পড়ত না ?
টানা সাতদিন বৃষ্টি পড়লো ।
কখনও একটু কমে তো আবার ঝুমঝুমির মত শব্দ করে নামে। আশেপাশের দালানবাড়ি কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেল। রাতারাতি শেওলা ধরে গেল পাশের বাড়ির চুন করা দেয়ালে। বাড়িতে বসে বই পড়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই জিরাফের। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে সেই অচিন গাছটার কথা মনে হতেই কেমন বিবাগী অনুভব হল।
গাছটা বাস্তবে নেই ?
অমন ও হয় ?
বৃষ্টি শেষ হতেই ইশকুল চালু হল।
ততদিনে পায়ের ব্যাথাও ভাল হয়ে গেছে ওর। আফসোস হল । পায়ের সমস্যা অন্য সময় হলে একটু বেশি ছুটি পাওয়া যেত। কি আর করা। জীবন অমন বেইনসাফি করে মাঝে মাঝে । নীলগিরির গুপ্তধন নামে একটা বই পড়া মাত্র পড়া শুরু করেছিল । শেষ না হতেই বৃষ্টি শেষ হয়ে গেল।
ইশকুলে নোটনের সাথে দেখা।
জিরাফ ভেবেছিল নোটন হয়তো সেই গাছের কথা জিজ্ঞেস করবে। অমন হল না। কারো কারো আগ্রহ একদম কর্পূরের মত।
আরও অনেক বার জিরাফ খেয়াল করেছে। কোন একটা ব্যাপার নিয়ে ও অনেক উত্তেজিত হয়ে পড়ে । কিন্তু ওর বন্ধুদের অনেকেই সেই ব্যাপারটা তেমন পাত্তা দেয় না। অথচ তুচ্ছ জিনিসগুলো ওকে কেমন আনন্দ দেয়। নির্জন গরমের শেষ দুপুরে, বগলে রুদ্র প্রয়াগের চিতা বইটা নিয়ে হেঁটে যায় জিরাফ। মহল্লার মোড়ে পেল্লাই এক কৃষ্ণচুড়া গাছ। ওটার সামনে এসে বিহ্বল হয়ে পড়ে জিরাফ। আগুন লাল ফুলে টেঁসরা হয়ে পড়া রোদ যেন আরও আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
'কৃষ্ণচুড়া ফুলের আরেক নাম জানো ?' নোটনকে জিজ্ঞেস করে ।
‘ না তো।' জবাব দেয় নোটন ।
' গুলমোহর ।' জবাব দেয় জিরাফ।
নোটন কোন রকম আগ্রহ দেখায় না। অথচ জিরাফ ভেবেছিল , নোটন জিজ্ঞেস করবে , অমন নাম হবার কারণ ? কিন্তু নোটন জানতে চাইল না।
তারপর ধরা যাক গুপ্তধন শিকারি মার্কা এক বই পড়ে একবার জিরাফ জানলো - ‘ সোনার মুদ্রাকে বলে মোহর । রূপার মুদ্রাকে বলে চান্দি বা রূপী । আর তামার মুদ্রাকে বলে জিতল। তখন রূপার মুদ্রা দিয়েই কেনাবেচা হত। সোনার মোহর রাজকীয় লেনদেন বা পুরস্কার হিসাবে দেয়া হত। তামার মুদ্রা প্রথম চালু করে মুহম্মদ বিন তুঘলক। সোনার মোহরকে সুলতানি আমলে বলা হত আশরফি। তুর্কী ভাষায় গোল ধাতব মুদ্রাকে বলতো 'তঙ্কা' । এই তঙ্কা থেকেই টাকা শব্দটা হয়েছে।‘
দেখা গেল এইসব ব্যাপারে নোটনের কোন আগ্রহ নেই।
ও আছে শুধু জ্যাকি চ্যানের মুভি নিয়ে। অথবা কমিকস সংগ্রহ নিয়ে। আজকাল খুঁজে খুঁজে পাপাই দা সেইলর ম্যান জমাচ্ছে । আগে জমাত ম্যানড্রেক আর অরণ্যদেব ।
ইশকুল খোলার পর ওদের পড়াশোনার চাপ বেড়ে গেল।
যেমনটা বরাবর হয়।
মাস তিনেক কেটে গেল কেমন সহজে ।
সেপ্টেম্বরের এক মন কেমন করা বিকেলে পৌর পাঠাগারের বাইরে জিরাফ আচমকা বলে বসলো , ' ওটা কিন্তু সত্যি ছিল।'
'কোনটা ?' আচমকা ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে কেমন যেন হকচকিয়ে গেল নোটন।
'গাছটা।'
' কোন গাছটা ?'
' অচিন বৃক্ষ ।'
' তুমি এখনও ওটা মাথায় রেখেছ ?' দুই চোখ গোল্লা গোল্লা করে ফেলল নোটন।
পিঠে ঝোলানো জলপাই রঙের কাপড়ের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করলো জিরাফ। আসলে বই না। ডায়েরি। পৃষ্ঠা উল্টে এক জায়গায় আঙুল দিয়ে দেখাল জিরাফ। নীল রঙের কালিতে ঝর্ণা কলমে লেখা ।তখন শখের বশত ডায়েরি লেখা শুরু করেছিল জিরাফ। ওটাও ক্লাস সেভেনের পর বন্ধ হয়ে গেছে।
ডায়েরীটা বেশ অলংকরণ ভঙ্গীতে লেখা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার মত প্রচুর কাটা কুটি করা। তারিখ আর বার আলাদা রঙে লেখা। বেগুনী, সবুজ, লাল, নীল কালিতে জায়গায় জায়গায় হাতে আঁকা ছবি, অলংকরণ , নোট । সব মিলিয়ে জলদস্যুদের গুপ্তধনের নকশা বা তিমি শিকারিদের ডায়েরি যেন।
এক জায়গায় সুন্দর লেখা-
আমাদের শহরে কোন বাদলার মৌসুমে তিন অংকের গুণফলের মত ঘন বৃষ্টি হয় ।
আর বৃষ্টি হলেই পাকা মটর দানার মত হলুদ রঙের রেইন কোট পরে , পায়ে গাম বুট চাপিয়ে বাজারে চলে যায় দারোয়ান রাম দয়াল। বৃষ্টি হলেই দাম কমে দশ টাকা করে হয়ে যায় এক একটা ইলিশ মাছ । তবে বেশির ভাগ সময় কুচো চিংড়ি ভাগা হিসাবে কিনে আনে। অথবা ভাগা দেয়া কোন পাঁচ মিশালী মাছ। ইংরেজিতে যাকে বলে মিক্স ক্যাচ।
বৃষ্টি হবে কিন্তু রাম দয়াল বাজারে যাবে না অমনটা হতেই পারে না। নিজেই রান্না করে রাম দয়াল। ওর রান্নাও মজার। কাঁঠালের দানা দিয়ে কাচকি মাছ। গোল আলু দিয়ে তরকারী ।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, রেইন কোটের পকেটে করে মাছ নিয়ে আসে ও।
এক বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মাছের পোঁটলা বের করে দেখাল। গলায় পেঁচিয়ে রেখেছে এক আটি শাপলা। হাতে একটা গাছের ডাল। ভর্তি চিঁড়ার মত সাদা ফুল। কদম ফুলের মত সৌরভ। আমার হাতে দিয়ে বলল , ' লও দাদাভাই। তুমার লাইজ্ঞা আনছি অচিন গাছের ফুল । বোতলে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখ। ঘরের ভিত্রে আতরের লাহান ঘেরান বাইর হইব।'
আমি তাই করলাম, রাম দয়াল অনেক ভাল।‘
লেখাটার পাশেই ক্রেয়ন দিয়ে আঁকা অদ্ভুত রকমের ফুল আর গোল গোল কেমন একটা পাতা ।
‘ এতে তেমন কিছুর প্রমাণ হয় কি ?' ডায়েরিটা ফেরত দিয়ে বলল নোটন ।
‘ না হয় না।' একমত হল জিরাফ। কিন্তু জিনিসটা না থাকলে ডায়েরীতে লিখব কেন ? বানিয়ে কেউ কিছু ডায়েরীতে লেখে ?'
'বেশ একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি আমি।' মুচকি হেসে বলল নোটন। ' তো ?'
' আমি যা ভাবছি তুমিও তাই ভাবছ ?' এতক্ষণে মুখে হাসি ফুটল জিরাফের।
' মহান লোকদের চিন্তা ভাবনা একই রকম হয়।' আমুদে সুরে বলল নোটন। ‘ সামনের সপ্তাহে ইশকুল বন্ধ আছে। নবীগঞ্জ এখান থেকে মাত্র সাত মাইল দূরে। বাসে করে গেলে তদন্ত শেষ করে বিকেলেই ফিরে আসতে পারব। তোমার এই সন্দেহ আর মনের দোলনা মার্কা চিন্তা ভাবনা সব শেষ হয়ে যাবে সেইদিন। কি বল ? '
‘ আমিও তো তাই চাই।' বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করলো জিরাফ।
বাসটা ওদের নামিয়ে ধূলা উড়িয়ে বাকি লোকজন নিয়ে ভেগে গেল।
এখন খানিক হাঁটতে হবে।
দুপুর বারোটা।
চারিদিকে চন্দ্রপ্রভা ফুলের মত হলুদ রোদ। কালো পিচের রাস্তা চলে গেছে একে বেঁকে। এই পথেই হাঁটতে হবে খানিক । তারপর বউ বাজারের সেই পথ। আর সেই অচিন বৃক্ষ। যার জন্য মন খারাপ হয়ে আছে জিরাফের।
সাত বছর পর পুরানো শহরে আবার ফিরে এসেছে দুই বন্ধু। মাঝে একবারও আসেনি।
এইসব পথ ঘাট সব ওদের পরিচিত। দোতলা একটা বাড়ি। পুরানো হয়ে গেছে। বাড়ির সব কয়টা ব্যালকনি ভর্তি ঘাস। এখানে ওখানে বটের চারা। একদিন হুড় মুড় করে ভেঙ্গে পড়বে বাড়িটা । আগে কারা যেন থাকতো। বাস্তহারা মানুষ আর পথের ভিখিরি রাতের বেলা এসে ঘুমাত। বাড়ির সামনে একটা লাইনের কল। দুই বেলা জল আসতো। সেই জল নেয়ার জন্য বেশ হল্লা মল্লা করতো গরীব মানুষগুলো। এই বাড়ির উঠানে বসে ছোট্ট এক খোকা বসে বসে বেশ গলা উঁচু করে চয়নিকা বই থেকে পড়ত –
ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির
পাঁচ বোন থাকে কাল্নায় ,
শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায় ,
হাঁড়িগুলো রাখে আল্নায় ।
কোনো দোষ পাছে ধরে নিন্দুকে
নিজে থাকে তারা লোহাসিন্দুকে ,
টাকাকড়িগুলো হাওয়া খাবে ব ' লে
রেখে দেয় খোলা জাল্নায় —
নুন দিয়ে তারা ছাঁচিপান সাজে ,
চুন দেয় তারা ডাল্নায় ।
রামসীতা মন্দিরটা আগের মতই আছে । তবে মন্দিরের মাঝে দানবের মত দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছটা নেই। বাজ পড়ে পুড়ে গেছে। মন্দিরের সাথে এক গাদা ফণীমনসা । আর সেই চিনির ফল গাছ।
‘ মনে হয় হাজার বছর পর ফিরলাম।' ফিসফিস করে বলল নোটন ।
আস্তে কথা বলছে , যেন জোরে কথা বললেই এই নীরবতা ভেঙ্গে সব কিছু চোখের সামনে মিলিয়ে যাবে মরীচিকার মত।
পথ ঘাট আছে আগের মতই। বদলায়নি কিছু। দুই একটা অদল বদল হয়েছে। কোন বাড়ি দোতলা থেকে হয়েছে তিন তলা। কোন বাড়ির দেয়ালে চুন করা ।অথবা কোন দেয়ালে শেওলা। তারপরও শহরতলীর পুরানো পথ যেন রয়ে গেছে আগের মতই। আগের মতই নিঝুম। হলুদ রোদ নেমেছে জ্যামিতিক কোণে।
মায়াবী লাগছে সব কিছু ।
প্রথমেই নীলু হাজরার দোকান দেখতে পেল ওরা।
আকাশমনি গাছের নীচে।
ছোট খাট দোকান। কাচের আলমারি ভর্তি জামা কাপড় রাখা। দেয়ালে হ্যাঙ্গারে ঝুলছে কয়েকটা কোট আর পাঞ্জাবী। সামনে কাঠের টেবিলের উপরে মোটা চাদর বিছিয়ে রোঁয়া উঠা টেট্রনের প্যান্ট ইস্ত্রি করছেন নীলু হাজরা । উনার পাশে একটা মাটির চুলা। ভেতরে জ্বলছে গনগনে কাঠ কয়লা।
জিরাফ মনে মনে হাসল। আজ থেকে আট বছর আগেও এই প্রাচীন কায়দায় কাপড় ইস্ত্রি করতেন নীলু কাকা।
উনার ইস্ত্রিটা পিতলের । পেল্লাই সাইজের জিনিস। হাতলটা কাঠের। উপরে বাটারফ্লাই স্ক্রু টাইপের একটা ইস্ক্রু আছে। সেটা দেখতে আবার ক্ষুদে একটা মোরগের মত । প্যাঁচ দিলেই খুলে যায়। ইস্ত্রির ভেতরে ফাঁপা জায়গা। লোহার চিমটা দিয়ে চুলার ভেতর থেকে জ্বলন্ত কয়লা বের করে আনেন হাজরা কাকু । ইস্ত্রির ভেতরের সেই ফাঁপা জায়গায় জলন্ত কয়লা রেখে, ন্যাকড়া দিয়ে ধরে স্ক্রু আবার প্যাচিয়ে দিলেই ইস্ত্রি হয়ে যায় গনগনে গরম।
ব্যস। কর ইস্ত্রি। যতক্ষণ গরম থাকে। দরকার মত আবার ভেতরে কাঠকয়লা পুরে দিলেই হয়ে গেল।
এত দিন গেছে । নতুন হাল আমলের বৈদুত্যিক ইস্ত্রি কেনেনি নীলু হাজরা। এই পিতলের ইস্ত্রি নাকি উনার বাবার জিনিস। মায়ার চোটে বাতিল করতে পারছেন না।
নীলু হাজরার মুখটা সরু। চোখে গোল রিমের চশমা। তালপাতা দিয়ে বানানো খেলনা চশমার মত। নাকের নীচে সাদা গোঁফ। শিমুল তুলা পাকিয়ে বানানো যেন। ওদের দুইজনকে দোকানের দিকে আসতে দেখে অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন।
আরও খানিক সামনে এসে দুই বন্ধু জোর হাতে প্রায় এক সাথে বলে উঠলো , ' নীলু কাকা ভাল আছেন ?'
'কারা তোমরা ?' ইস্ত্রিটা কাঠের তক্তার উপর খাড়া করে দাঁড়া করে ওদের দিকে একশো ভাগ মনোযোগ দিয়ে চিন্তিত সুরে বললেন বুড়ো নীলু হাজরা। ' দেখে তো চেনা চেনা লাগছে । আরে বাসস। এ তো জিরাফ। আর তুমি বোধ হয় ও পাড়ার নোটন। যাদের বাসার সামনে একটা ডোবা ছিল। বর্ষায় প্রচুর হেলেঞ্চা শাক পাওয়া যেত সেই ডোবায়। কত দিন পরে এলে তোমরা। সেই যে গেলে একবার ঘুরে দেখে গেলে না কেমন আছি আমরা। কেমন আছে তোমাদের পুরাতন এই শহর। বাসার সবাই ভাল তো ? বাবার চাকরি ? ছোট ভাই বোন ? '
হব হব করে কথা বলতে লাগলেন বুড়ো নীলু হাজরা।
আবেগের ধাক্কা খানিক সামলে নিয়ে বাইরের টুলে ওদের বসতে দিলেন। দোকানের ভেতরে বসার জায়গা নেই। তাছাড়া ভেতরটা বেশ গরম গরম।
'দাঁড়াও তোমাদের জন্য বেগুনী আনাই।' ব্যস্ত হয়ে বললেন বুড়ো নীলু হাজরা।
'ও সব কিছু লাগবে না।' বুড়োকে থামিয়ে দিল জিরাফ। ' আপনি চা খাবেন ? আমি নিয়ে আসছি। তারপর কথা বলছি। স্কুল ছুটি পেয়ে আজ ঘুরতে এসেছি। ইশকুলের ম্যাগাজিনে এই শহর নিয়ে একটা ফিচার লিখব। আমার স্মৃতির শহর টাইপের। আপনার কাছে কিছু তথ্য লাগবে। আপনি হলেন কি না এই শহরের সবচেয়ে পুরানো লোক।'
খানিক দূরে ল্যাম্প পোস্টের নীচে ফিরোজা রঙের ক্ষুদে চায়ের দোকান।
ভেতরে জায়গা কম। দোকানী শুধু মাত্র বসতে পারে। উনুনের উপর একটা বাচ্চা হাতির মত কেটলি বসে আছে। ওর ঢাকনা লগবগ করে নাচছে ,সামান্য। সামনে রঙ জ্বলা অয়েলক্লথের উপর এক ডজন চীনামাটির পেয়ালা উবু করে রাখা। পেয়ালার গায়ে নীল ফুলের ছবি। কাচের টোপার মধ্যে সৈকতের বালির মত লাল চিনি। টিনের এক ক্যানেস্তারার মধ্যে বড় করে লেখা - চা। মানে ওটায় চায়ের পাতা ভর্তি। আরেকটা ক্যানেস্তারার মধ্যে বিঘৎ খানেক লম্বা লাঠি বিস্কুট। ওটার সামনের অংশ কাচের। লোকজন যাতে সহজেই বুঝতে পারে ভেতরে কি দ্রব্য রাখা ।
দোকানের বাইরে এক কোণে বাতিল চা পাতার স্তূপ।
আগে এই চায়ের দোকান অন্য একজন চালাত। এখন নতুন লোক।
'তিন পেয়ালা চা দিন তো।' চা ওয়ালা ছোকরাকে অর্ডার দিল জিরাফ।
'নীলু হাজরা কাকার লিজ্ঞা ?' জানতে চাইলো ছোকরা চাওয়ালা।
জিরাফ সম্মতি সূচক মাথা নাড়তেই ছোকরা তাকের উপর থেকে নামিয়ে আনল একটা টিনের কৌটা। ব্লু ক্রস । কনডেনস মিল্ক। লোহার পেরেক ঠুকে সেটায় ছিদ্র করতে করতে ছোকরা বলল , ' ইস্পিসাল কইরা বানাইতাছি। নাইলে কাকায় আমারে ইস্ত্রি দিয়া ডলা দিয়া সিধা কইরা ফালাইব।'
'আগের দোকানী বারেক ভাই কই ?' জানতে চাইল জিরাফ। ' উনি আমাদের চিনতেন।'
'আমি হের ছোট ভাই। বারেক ভাই চাকরি পাইছে পোষ্ট আপিসে ।' খুশি খুশি গলায় বলল ছোকরা। বড় ভাই চাকরি পাওয়ায় বড্ড খুশি সে। হবেই না কেন ? ভাই তো ।
‘ আমরা বরং এখানেই বসে চা খাই ?' নীলু হাজরাকে বলল জিরাফ। ' দোকানের এই জায়গাটা বেশ কিন্তু।'
তিনজনেই বসে পড়লো টুলে।
জিরাফের কাছে বেশ লাগছে। জীবনের প্রথম দোকানে বসে চা খাওয়া। বেশ অ্যাডভেঞ্চার মার্কা ভাব আছে তো ।
দোকানের বাইরের কাঠবাদাম গাছটার বেশ ছায়া ছায়া আমেজ। সামনে রাখা কেতলির নল দিয়ে চায়ের সৌরভ। ঢাকনা নাচছে অল্প স্বল্প। জেমস ওয়াট নাকি কেতলির ঢাকনার এই নাচ দেখেই বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কার করেছিলেন। সত্যি ? নাকি গল্প গাঁথা ?
তবে এই বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কারের পর সভ্যতার চেহারা যেমন পাল্টে গিয়েছিল তেমনই শিল্প সাহিত্যে নতুন একটা ধারা চালু হয়েছিল। স্টিম পাঙ্ক । এই ধারায় সবচেয়ে বেশি লিখেছিল জুল ভারন আর এইচ, জি ওয়েলস।
নীলু হাজরা ওদের পরিচয় করিয়ে দিল চাওয়ালা ছোকরার সাথে, ' মনটু তুই ওদের চিনবি না। ওরা এই শহরেই ছিল। ওই যে হেলেঞ্চা শাক ভর্তি ডোবা আছে না ? ওটার সামনের বাড়িতে থাকতো এই নোটন বাবু। আর আমির হাজির লাল বাড়িটায় থাকতো জিরাফ মহাশয় । বাড়ির সামনে প্রচুর গাঁদা ফুল ছিল তখন। শীত কাল এলে দেখার মত একটা জিনিস হত। এরা চলে গেছে শহর ছেড়ে । '
'আপনিও এক পেয়ালা চা নিন না।' বলল জিরাফ। ' আমার তরফ থেকে। দাম আমি দেব।'
'না দাদা ভাই।' করুন গলায় বলল মনটু । ' সারাদিনে সুযোগ পাইলেই ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ চা গিলি। শেষে রাইতে গুম আহে না। আবার সকালে ঝিমানি লাগে, মুরগির রানী খেত রুগ অইলে যেমন ঝিমায় অমন।'
দুঃখী দুঃখী গলায় বলল মনটু । কিন্তু হাসি চেপে রাখা কষ্ট হয়ে গেল ওদের জন্য। হাসলে খারাপ দেখায়। তাই অনেক কষ্টে সামলে নিল ওরা দুজন।
' তোমরা চলে যাবার পর আরও অনেকেই চলে গেছে এই শহর ছেড়ে।' পেয়ালায় গোঁফ ভিজিয়ে চা খেতে খেতে বললেন নীলু হাজরা। ' অমন হয়। দুই একটা শহর দিনে দিনে কেমন বড় হতে থাকে। নতুন নতুন দালান বাড়ি উঠে। মানুষ আসে। জ্যান্ত হয়ে যায়। আবার দুই একটা শহর কেমন যেন আগের মত থাকে। কিছুটা যেন শামুকের মত। পুরানো মানুষগুলো কোন কারণ ছাড়াই চলে যায়। নতুন দালান ঘর তেমন বেড়ে উঠে না। কে জানে কেন অমন রহস্য । কিছু তো আছেই ।'
চুপ করে রইল ওরা।
ভর দুপুরে বাতাসে কেমন অচিন দীর্ঘশ্বাস।
শহরতলীর বিষণ্ণ পথ। তামার টুকরার মত একটা চিল উড়ে যাচ্ছে অপরাজিতা ফুলের মত গহন নীল আকাশে। নদীর বুক থেকে মিষ্টি হাওয়া। পুরানো দিনের ঘ্রাণ।
'এই শহর তখন ছিল শৌখিন মানুষে ভর্তি।' বলছেন নীলু হাজরা। ' ওই কোণে ছিল গণেশ ত্রিপাঠি বাবুর বাড়ি। উনি বাজার থেকে বড় কোন মাছ আনলেই দুপুরে লোক ডেকে খাওয়াতেন। ভাবা যায় ? প্রথম ক্যাসেট প্লেয়ার কিনেন ওয়ালী সাহেব। দিন যাই ছিল, ভালই ছিল। ডাকটিকিট জমাতেন অবনী বাবু । সহজে শৌখিন হওয়া যায় না। শখ থাকতে হবে। আবার সেই শখের পিছনে সময় দিতে হবে।
' একটা শখের পিছনে কেউ যখন সারাজীবন নষ্ট করে ফেলে তখন তার দিকে মমতা ভরা চোখে দেখতেই হয়। রেললাইন থেকে পাথর কুড়িয়ে জমাতাম আমিও। সেই তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। কয়েকজনকে পেলাম যাদের শখ বড্ড বিচিত্র । একজন, ক্ষুদে ক্ষুদে শিশি ভর্তি করে বিভিন্ন নদীর জল সংগ্রহ করে রেখেছে। উপরে কাগজের লেবেল সেঁটে রেখেছে - নদীর নাম। নদীর দৈঘ্য। আর সংগ্রহের তারিখ।
অমন নদী পাগল মানুষ আর আছে নাকি ?
আরেক জনকে পেয়েছিলাম কাচের বাক্সে তুলার গদির উপর পাখির ডিম জমায়।
সে এক দেখার মত জিনিস।
বাক্সে ছোট ছোট খোপ। সেই খোপে তুলার গদির উপর ঘুমিয়ে আছে এক একটা ডিম। নানান সাইজের। নানার আকৃতির। মন কেমন করা নীলচে ডিম। যেন দুধের মধ্যে এক ফোঁটা কাপড় পরিষ্কার করার নীল ফেলে দিয়েছে কেউ। আরও আছে ছিট ছিট ছাপওয়ালা। বাদামের খোসার মত। আবার মনে হয় লোহার উপর মরিচা পড়ে গেছে , অমন রঙের ডিম ও আছে । ফিকে সবুজ রঙের একটা ডিমও পেয়েছি। হাতির দাঁতের রঙের ডিম।
এটাও একটা শখ। ওওলজি বলে। আজকাল কেউ এই শখ পুষে না। অতীতে বেশ জনপ্রিয় ছিল। এবং পক্ষীবিদ্যার একটা অংশই ছিল। এরা পাখির ডিম, পালক আর পাখির বাসা জমায়। তখন ভাল মানের দূরবীন ছিল না। পাখি দেখার ক্লাব তেমন গড়ে উঠেনি।
কাজেই যারা এই শখ পালন করতো সমাজে তাদের বেশ বিজ্ঞানী মার্কা সম্মান দেয়া হত। পরে এই ওওলজি আইন করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উপায় নেই।পাখির ডিম সংগ্রহ করতে গিয়ে এই শৌখিন মানুষগুলো প্রচুর পাখির বাসা ভাঙ্গত বা ডিম নষ্ট করতো।
আর কে না জানে , একটা ডিম নষ্ট চড়ুই পাখির কষ্ট। চড়ুই পাখি না , সব পাখির।‘
'কাকু আপনার কি অচিন গাছটার কথা মনে আছে ?' সাবধানে প্রশ্ন করলো জিরাফ। ' বউ বাজারে যেতে বাঁকানো এক রাস্তায় ছিল গাছটা। গোল পয়সার মত পাতা। বর্ষা কালে চিঁড়ার মত ফুল ধরে। কদম ফুলের মত মিষ্টি একটা ঘ্রাণ। মাথা ঝিম ঝিম করে ।'
‘ মনে থাকবে না কেন ?' হাসি মুখে বললেন নীলু হাজরা । ' গাছটার নাম জানি না। আমাদের ছোট বেলায় ছিল। সেটা তো প্রায় বছর পনের আগে বাজ পড়ে ঝলসে গিয়েছিল। তুমি সেই গাছের কথা শুনলে কার কাছ থেকে ?'
শেষের দিকে বুড়োর গলায় বিস্ময়ের সুর।
‘ পনের বছর আগে সেই গাছ নেই।' প্রায় চিৎকার করে উঠলো জিরাফ। 'অথচ আমি যখন এই শহরে ছিলাম গাছটা আমি নিজেই দেখেছি ।'
' অমন হয় নাকি ?' স্নেহের হাসি হেসে বললেন নীলু হাজরা। সহজ অংক ভুল করলে অংকে পাকা মুরুব্বিরা অমন করে হাসে । ' যা নেই সেটা দেখবে কেমন করে ?'
অবাক না হয়ে পারলো না জিরাফ।
ভুত গাছ নয়তো ।
কত হেমন্তের বিকেলে গাছটা দেখেছে সে। বর্ষায় ওই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিয়েছে মাতাল করা রিমিঝিমি সৌরভ।
'গাছ তো মনে হয় আছিল।' চিন্তিত সুরে বলল চা-ওয়ালা মনটু। ' আমার ছোড বেলায় মনে হয় গাছটা দেখছিলাম। পরে আর দেহি নাই। মনে হয় সরকারী লুক ওইটা কাইত্তা ফালাইছে। '
পেয়ালা ফেরত দিল জিরাফ। ' আমি এখনই ওই রাস্তায় গিয়ে দেখে আসি। ব্যাপারটা আমার মাথায় খেলছে না।'
'অত বছর আগে বাজ পড়ে নষ্ট হওয়া গাছ তুই দেখবি কেমন করে ?' মনটুকে ধাতানি দিলেন নীলু হাজরা ।
'আমার তো মনে হয় আমি দেখছি।' মিনমিন করে বলল মনটু। ' বর্ষা কালের কথা। বাজার থেইক্কা ইচা মাছ কিন্না বাজানের লগে ফিরতাছিলাম তক্ষন গাছের তলায় খারাইছিলাম...। লাল চিঁড়ার মত ফুল ।'
স্মৃতির গহনে ডুবে গেছে মনটু।
সবার স্মৃতি কেমন মিষ্টি হয়। বতসোয়ানার হাতির পাল যেমন স্মৃতির নিশানা মেপে চলে যায় জাম্বিয়ার জলাভূমিতে। জল আর রসালো ঘাসের লোভে !
'আমার কিছু বলার আছে।' গলা খাঁকারি দিয়ে বলল নোটন। ' আমি ওই রাস্তা দিয়ে গেলেও গাছটার কথা একদম মনে করতে পারছি না। মানে গাছটার কোন স্মৃতি নেই আমার মনে।'
'অমনটা হতে পারে।' নীলু হাজরা জবাব দিলেন। ' একই জিনিস সবার মনে এক রকম দাগ কাটে না।'
'কিন্তু পুকুরটার কথা তো মনে আছে।' অসহায় একটা ভঙ্গী করলো নোটন।
'তারচেয়ে বড় কথা আমাদের চারজনের স্মৃতি চার রকম।' মুখ কুঁচকে আপন মনেই বলল জিরাফ। ' নীলু কাকু দেখেছেন উনার শৈশবে কিন্তু পনের বছর আগে গাছটা বাজ পড়ে, পুড়ে গেছে। মনটু দেখেছে ওর ছোট বেলায়। পরে আর দেখেনি । মানে পনের বছর আগেও গাছটা ছিল । আমি শহর ছেড়েছি আট বছর আগে। তখন আমি দেখেছি। কিন্তু নোটন কখনই দেখেনি। অদ্ভুত না ?
'ঘোস্ট ট্রি । ভুত গাছ ।' ফিসফিস করে বলল নোটন। 'অমনটা আমি শুনেছি। শুধু যে ভুতুড়ে বাড়ি আর গোরস্থানে ভৌতিক ব্যাপার হয় তেমন না। অমন ভুতুড়ে গাছ আছে কোথাও কোথাও। রকি পাহাড়ের উত্তরে যেখানে সারা বছর হিম হিম ঠাণ্ডা থাকে। ওই পাহাড়ি বাতাসে সব সময় গাছেরা ফিসফিস করে কথা বলে। ওই সব গাছ নাকি হেঁটে চলে ভরা জোসনার রাতে। যেমনটা মহাসাগরের বুকে অনেক ভুতুড়ে দ্বীপ পাওয়া যায়। আচমকা ভেসে উঠে আবার হারিয়ে যায়। পুরানো নাবিকদের ম্যাপে অমন দ্বীপের ছবি আঁকা থাকে। আবার নতুন নাবিকেরা বলে অমন কোন দ্বীপ নেই। '
‘ বাস্তবে অমন কিছু নেই।' হাসল জিরাফ। ' চলো এইবার গিয়ে জায়গাটা দেখে আসি।'
দুই বন্ধু উঠে পড়ে।
'ফেরার সময় দেখা করে ফিরব ।' নীলু হাজরার দিকে ফিরে বলে জিরাফ। ‘ দারোয়ান রামদয়ালের সাথে ও দেখা করে যাব ।‘
হাঁটতে থাকে দুই বন্ধু।
উদাস দুপুর।
ফিনেফিনে হাওয়া।
শহরতলীর মায়াবী পথ।
অনেক বছর আগে এই পথে ওরা হেঁটেছিল। ওদের দুইজনের বাবা যদি চাকরির জন্য শহর না ছেড়ে যেত, আজও এই শহরের অংশ হত ওরা। এত স্মৃতি কাতর হত না। জীবজগতের সবাইকে জায়গা বদল করতে হয়। এমন কি পাথরের টুকরা পর্যন্ত সব সময় এক জায়গায় থাকে না। ঝর্ণার জলে নদীর স্রোতে ভেসে যায় নানান জায়গায়। পাথর থেকে হয় নুড়ি। নুড়ি থেকে বালি ।
হাঁটতে গিয়ে ভাঙ্গা জমিদার বাড়িটা দেখতে পেল। অর্ধেক দেয়ালের ইট কারা যেন খুলে নিয়ে গেছে। একদিন পুরোটা হাপিস হয়ে যাবে। অথচ পৌর সভার লোকজন চাইলেই বাড়িটা যত্নে রাখতে পারতো। নিশ্চয়ই ইতিহাসের কোন অংশে ছিল বাড়িটা ? সদর দরজায় এখনো ভাঙ্গা দুই সিংহ আছে। ওদের শরীর ক্ষয়ে গেছে স্ফিংসের মত। গায়ে পেপারোমিয়ার ঝাড়। কারা ছিল এই খানে ? গেল কোথায় ? নিজেদের বাড়িঘর ফেলে কেউ অমন হারিয়ে যায় ?
হাঁটতে লাগলো দুই বন্ধু।
দোতলা একটা বাড়ি। কাদের কে জানে ! ওরা যখন এই শহরে ছিল, দীপাবলির রাতে এই বাড়িতে হাজার হাজার মাটির প্রদীপ জ্বালানো হত। দূর থেকে বেশ চিত্ত হরণ করা দেখাত।
কি এক অদ্ভুত সাদা পাথরের ব্লকে রাস্তাটা তৈরি। জিরাফের মনে আছে - ভরা জোসনার রাতে এই পথটা ভৌতিক রকমের উজ্জ্বল দেখাত। বাবার ঘড়ির ভেতরের রেডিয়ামের মত । পাশে বিষকাঁটালি আর ঢোল কলমির দঙ্গল। একটা পুকুর। বাঁধানো ঘাট । এক গাদা মহিলা, সারাক্ষণ পেল্লাই সব তামা কাঁসার থালা বাটি নিয়ে বসে বসে তেঁতুল আর ছাই দিয়ে মাজত। এখন কেউ নেই। আশেপাশের সব বাড়িতে লাইনের জল এসে গেছে, তাই অমন পরিবর্তন।
বদলে যাওয়া জগতের নিয়ম।
এটাই বউ বাজারের রাস্তা।
এখানে একটা খেজুর গাছ তখন মুগ্ধ করতো ওদের। সোনালী বুলেটের মত খেজুর ধরে কাঁদি ভর্তি। মৌসুম এলে , গাছি এসে ঝুলিয়ে দিত মাটির হাড়ি । নীচে এক বুড়ো বসে ভাপা পিঠা বিক্রি করতো। প্রচুর নারকেলে কুঁচি আর মিষ্টি গুড় ঠেসে দেয়া।
ওদের চলার গতি দ্রুত হল।
সামনের মোড়ে সেই ডোবা। ময়ূরকণ্ঠী কচুরি ফুল ভর্তি থাকে।
সেই মোড়ে অচিন গাছটা।
অনুভব করলো ওদের শ্বাস প্রশ্বাস বেড়ে গেছে।
ওই তো ডোবা। কালো ঠাণ্ডা জলে কচুরি ভর্তি। ফুল নেই। দুটো গরু অর্ধেক শরীর ডুবিয়ে মনের সুখে কচুরি খাচ্ছে।
পথের মোড়ে ঘুরে দুই বন্ধু থমকে দাঁড়ালো ।
‘ বললাম না , এখানে গাছটা কখনই ছিল না।' নরম গলায় বলল নোটন।
জিরাফ দেখল - ওখানে কিছু নেই।
সামনে গিয়ে দাঁড়ালো জিরাফ। রাস্তাটা নতুন করে পিচ ঢালাই হয়েছে। কিন্তু চওড়ায় বড় করেনি। মনোযোগ দিয়ে ওখানের মাটি দেখল জিরাফ। কোন শেকড় বা অমন চিহ্ন নেই , যাতে মনে হতে পারে অতীতে এখানে বিশাল আকারের একটা গাছ ছিল।
' অথচ এখানেই গাছটা ছিল।' বিবাগী গলা জিরাফের। ' এক বর্ষার বিকেলে গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। আকাশ ভর্তি ছিল ছাই রঙা মেঘ । ফুলের মিষ্টি সেই সৌরভ আজও পাই।'
'আর আমি গাছটা কখনই দেখিনি। তোমার সাথেই হেঁটে এই পথ দিয়ে গেছি।' মাথা নেড়ে বলল নোটন। ' সত্যি বড্ড ভুতুড়ে ব্যাপার।'
পড়ন্ত রোদের শেষ দুপুরে দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে রইল ।
বেশ কিছু দিন চলে গেছে। বছর প্রায় শেষ ।
ঘটনার রেশ ফিকে হয়ে গেছে অনেক।
হাল ছেড়ে দিয়েছে জিরাফ ।
এলাকার অনেকের সাথে কথা বলেছিল ওরা সেদিন। এমন কি দারোয়ান রামদয়ালের সাথে পর্যন্ত । আরও কয়েকবার গেছে দুই বন্ধু।
মোটামুটি দুই ধরনের মানুষ পেয়েছে ওরা।
১। সেই অচিন বৃক্ষ সত্যিই ছিল। তবে কে কবে শেষ দেখেছে সেটা পরিষ্কার কারো মনে নেই। কারো সাথে কারো স্মৃতির জাবর মিলছে না।
২। অমন কোন গাছ ওই রাস্তায় কখনই ছিল না।
যারা বলছে গাছটা সত্যি ছিল, তাদের স্মৃতিতে গাছের গোল পাতা , চিঁড়ের মত ফুল আর সেই ফুলে কদম ফুলের মত রিমিঝিমি ঘ্রাণ একদম মিলে যায়। সবচেয়ে রহস্যময় হচ্ছে , গাছটার সাথে বৃষ্টির দিনের স্মৃতি সবারই আছে।
ব্যাপারটা নিয়ে দিনের পর দিন ভাবল জিরাফ। পুরানো স্মৃতির দেরাজ হাতড়ে গাছের পাতা আর ফুলের স্কেচ আঁকলো সুন্দর করে। পাঠিয়ে দিল সেইসব পরিচিত এক আঙ্কেলের কাছে। যে কিনা বোটানির ছাত্র। এখন বিদেশে থাকে। আমাজনের বনভুমির গাছপালা নিয়ে গবেষণা করছে।
দিন পনেরোর মধ্যে জবাব এলো-
প্রিয় জিরাফ। আশা করি ভাল আছ। তোমার আঁকা গাছের পাতা ফুল সম্ভবত তোমার মস্তিস্ক প্রসুত। পরিচিত কোন গাছের সাথে এর কোন মিল নেই। পাতার ধরন মাদাগাস্কারের একটা গাছের সাথে মিল আছে বটে কিন্তু সেই গাছ ঝোপ জাতীয়। অমন কদম গাছের মত বড় এর ঝাঁকড়া নয়। অমন গোল পাতা পাকুড় গাছের ও হয়। বাদবাকি কিছুর সাথে মিল পেলাম না।
আশা করছি বাড়ির সবাই ভাল আছে। তোমার গলা কি জিরাফের মত লম্বা হয়েছে ? মজা করলাম। বাড়ির বড়দের আমার প্রনাম আর ছোটদের স্নেহ দেবে।'
ইত্যাদি।ইত্যাদি।
বেশ আশাহত হল জিরাফ।
নোটন এই গাছের নাম দিয়েছে ভুত গাছ।
যদিও প্রাচীন ইতিহাসে অমন গাছের গল্প তেমন শোনা যায় না। উত্তর আমেরিকার আদিম লোক কাহিনিতে অমন কিছু গাছের কথা শোনা যায়, যে সব গাছ রাতের বেলা হেঁটে চলে বেড়ায়। জায়গা বদল করে। উইলিয়াম ক্রুক নামের এক ভদ্রলোক তার ' রিলিজিয়ন অ্যান্ড ফোকলোর অফ নর্দার্ন ইন্ডিয়া' বইয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে অদ্ভুত রকম ভুতুড়ে গাছের কথা লিখে গেছেন।
খোঁজ খবর নিয়ে ভৌতিক গাছের কিছু খবর পেল জিরাফ।
যেমন ভারতের মীর্জাপুরে পিপুল ধরনের একটা গাছ নিয়ে অনেক গল্প গাঁথা আছে। অভিশপ্ত গাছ। সন্ধ্যার পর কেউ ভয়ে ওই পথে যায় না। রাতের বেলা যে ওই গাছের সামনে দিয়ে হেঁটে যাবে সে অসুখে ভুগে ভুগে মারা যাবে। আবার জাপানের এক বনে লোকজন দল বেঁধে আত্নহত্যা করে।
বেশির ভাগই গল্পগাথা। লোকজন ছড়ায়। কিন্তু এমন গাছের খোঁজ পেল না , যে গাছটা কেউ কেউ দেখে। আবার কেউ দেখে না।
মাস তিনেক তদন্ত করে ফাইলের উপর লাল কালি দিয়ে - 'অমীমাংসিত' কথাটা লিখে ক্যাবিনেটে রেখে দিল জিরাফ।
থাকুক জিনিসটা। সময় আর সুযোগ পেলে এটা নিয়ে ভাবা যাবে।
শেষ কথা
পিরামিড মামা বসে আছেন কামরাতে।
টেবিলের উপয় কাচের টোপা। ভেতরে জলজ পানা আর শ্যাওলার মধ্যে সাঁতার কাটছে মিস্টার বুদ্বুদ। পোষা মাছ। টেবিলের উপর পিটার বেঞ্ছিলি সাহেবের বই - বিস্ট । ভেতরে হাঙরের দাঁতের বুকমার্ক গুঁজে রাখা। দানব এক স্কুইড নিয়ে লেখা বইটা বেশ রোমাঞ্চকর। ক্রিয়েচার হান্টিং থ্রিলার।
'মানে তুমি আজও বৃষ্টির দিনে ফুলের সৌরভ পাও। গাছটার কথা মনে পড়ে ?' জানতে চাইলেন পিরামিড মামা।
'হু।' মন খারাপ করা গলায় বলল জিরাফ। 'আপনি আমাকে কল্পনা বিলাসি ভাবতে পারেন। বলবেন সবই মনে কল্পনা । আসলে কিন্তু অমন না ।'
'জানি। তাহলে গাছটা তুমি একাই দেখতে পেতে। কিন্তু আরও অনেকেই দেখেছে।'
'কিন্তু এখন নেই কেন ? আবার অনেকেই দেখেনি কেন ? আর গাছটা কবে ছিল সেটা নিয়ে একেক জন একেক সময় বলবে কেন ? এর ব্যাখ্যা কি ? কেন শুধু গাছটার সাথে সবার বর্ষা আর বৃষ্টির স্মৃতি মিশে আছে ? '
'দেখ এই জিনিসটা হচ্ছে ম্যানডেলা এফেক্ট।'
' আফ্রিকার কালো নেতা নেলসন ম্যানডেলা ?'
'হ্যাঁ । তবে এই সূত্র তিনি চালু করেননি। ফিওনা ব্রুম নামে এক ভদ্রমহিলা এই সুত্রের আবিস্কারক। উনি ভেবেছিলেন নেলসন ম্যানডেলা জেলখানায় ১৯৮০ সালে মারা গেছেন। টিভিতে এই মৃত্যু নিয়ে খবর প্রচার করা হয়েছিল। এবং ভিডিও দেখান হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমন হয়নি। বাস্তবে মেনডেলা ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর নিজের বাড়িতে শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার কারণে মারা যান।
‘ তো এই ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগে ফিওনা ব্রুমের কাছে। ভাল করে খোঁজ খবর নিতে গিয়ে খেয়াল করেন, প্রচুর মানুষ আছে যারা জানে, মেনডেলা ১৯৮০ সালে মারা গেছেন। সেইদিন সবাই টিভিতে খবরটা দেখেছে। অনেকে নাকি খবরের কাগজে ও পড়েছে। অদ্ভুত না ? উনি জরিপ করে দেখলেন , বিশাল সংখ্যক মানুষ একটা ভুল স্মৃতি বা ধারনা নিয়ে বাঁচে যেটা বাস্তবে অন্য রকম হয়েছে। এই জিনিসটার নাম ফিওনা ম্যাডাম রাখেন, মেনডেলা এফেক্ট।'
'অমন আবার হয় নাকি ?' অবাক হয়ে যায় জিরাফ।
'প্রচুর হয়।' হাসলেন পিরামিড মামা। ' দেখা যায়, দুনিয়ার অর্ধেক মানুষ ভুল করে নিউজিল্যান্ড কোথায় ? মানে মানচিত্রে কোথায়। কেউ বলে অস্ট্রেলিয়ার উপরের দিকে। আবার বাকি অর্ধেক বলে, অস্ট্রেলিয়ার নীচের দিকে। অথচ অমন ভুল হবার কথাই না। একই ভাবে গ্রিনল্যান্ড আর আইসল্যান্ড। কোথায় আছে ম্যাপে ? বেশির ভাগ লোকে ভুল বলে।'
'অদ্ভুত তো।'
' কিছু মুভি নিয়েও অনেকের মধ্যে অমন আলাদা চিন্তা থাকে। মুভিতে অমন কোন সংলাপ বা দৃশ্য ছিল না। কিন্তু অনেকে দাবী করে, ছিল। আমার ছোট বেলায় একবার সারারাত অংক করে পরদিন পরীক্ষা হলে গিয়ে দেখি সেইদিন বাংলা পরীক্ষা। সাথে করে আবার জ্যামিতি বক্স ও নিয়ে গিয়েছিলাম। সবাই কেমন করে আমাকে দেখছিল।'
হো হো করে হেসে ফেললেন পিরামিড মামা।
জিরাফ ও হাসল ।
'ইতিহাসে অমন প্রচুর উদাহরণ আছে।' বললেন পিরামিড মামা। ' যেমন প্রেসিডেনট কেনেডির হত্যার সময় গাড়িতে আরোহী কতজন ছিল বা গাড়ির মডেল কি ছিল। এটা নিয়েও একেক জন একেক কথা বলে। অথচ ঘটনাটা হয়েছে সবার চোখের সামনেই। আমার শৈশবে সস্তাপুরের ওখানে একটা পোস্ট আপিস ছিল। কতদিন ওটার সামনে দিয়ে গেছি। বড় হয়ে জানলাম ওখানে কোন পোস্ট আপিস ছিলই না।'
'কিন্তু কেন অমন হয় ?' জিরাফের প্রশ্ন।
'অনেক রকম ব্যাখা আছে।' মিস্টার বুদ্বুদকে খাবার দিতে দিতে বললেন পিরামিড মামা । ' তবে বেশ পোক্ত যুক্তি হচ্ছে প্যারালাল জগত। অন্য ডাইমেনশন। অনেক গুলো জগত একই সাথে পাশাপাশি বয়ে যাচ্ছে। সব জগতের জিনিস হুবহু এক না। কিছু কিছু অমিল তো আছেই । অন্য জগতের সময়সীমা বা রাস্তা মাঝে মাঝে আমাদের জগতের সাথে মিশে যায়। তখন ঘটে যাওয়া ওই সব ঘটনার স্মৃতি শুধু তার মনে থাকে , যে সেই টাইম লাইনে ছিল । অন্য কারো স্মৃতিতে কিছু থাকে না।
‘ তোমার সেই অদ্ভুত অচিন গাছটা সত্যি সত্যি কোন একটা জগতে আছে। বর্ষার মৌসুমে সেটায় মায়াবী ফুল ধরে। মাতাল করা সৌরভ ছড়ায়। সেই টাইম লাইনে তুমি দাঁড়িয়েছিলে । তুমি দেখেছ। তোমার বন্ধু নোটন একই সাথে হেঁটে গেলেও নোটনের টাইম লাইনে সেই জগত আসেনি । তাই সে দেখেনি। তোমরা কেউ ভুল করোনি। সবাই সত্যি । এইজন্য হয়তো প্রাচীন সাধুরা বলে, কেউ কেউ দেখা পায়। বা বাড়ির পাশে আরশি নগর । '
ফোঁস করে দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন পিরামিড মামা , ' যে যাই বলুক অচিন বৃক্ষটা সত্যিই আছে। এই তো সামনের মাসেই বর্ষা। সন্দেহ নেই গাছটা ফুলে ফুলে ভরে যাবে। ওই টাইম লাইনের মানুষদের কাছে আজব কিছু না।এই টাইম লাইনের তোমার মত বা দারোয়ান রামদয়ালের মত কেউ কেউ বৃষ্টির দিনে দেখে ফেলবে গাছটা। যারা আলাদা আলাদা দুই টাইম লাইনে দাঁড়াতে পারে , এরা বড্ড ভাগ্যবান।'

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন