এক
একতলা বাড়িটা শালবনের একদম নাকের ডগায়।
টিন, কাঠ , ইট , লাল টালি দিয়ে কেমন একটা খিচুড়ি টাইপের বাড়ি।
সন্দেহ নেই, শালবনের সাথে বাড়িটা বেশ মানায়।
এখানে যদি পেল্লাই একটা দালান হত, মানাত না কিছুতেই।
সারাদিন কেমন সাই সাই বাতাস।
শাল বনের সব শুকনো পাতা দৌড়ে চলে আসে এই বাড়ির দিকে। টিনের চালে কেমন খচর মচর শব্দ করে শুধু ।
শালবন ভর্তি যে শুধু শাল গাছ , তেমন না। হরিতকি, বহেরা, কড়ই, শিমুল, অর্জুন অমন হরেক পদের গাছও আছে। শাল গাছকে অনেকে আবার গজারি গাছ বলে। যে যাই বলুক, এই সব গাছের পাতা সব সময় ঝরে পড়ে।
রোজ। প্রতিদিন । সব সময়।
কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে সব গাছ ওদের পাতা ফাতা ফেলে কেমন একটা দিগম্বর আর ন্যাড়া মাথার চেহারা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকটা হিমালয়ের সাধুদের মত।
আনন্দ এইখানে এসেছে আজ তিন দিন।
এই দেশে অমন নিরালা শহর ও আছে আগে জানত না।
জেনে খুব আফসোস হচ্ছে।
আরও আগে কেন এলো না ?
কেমন একটা ঘুম ঘুমি বাতাস বয়।
বনের ভেতরে বসতি বানিয়ে আছে রাজ্যের সব চিত্রিবিত্রি বনবিড়াল, সোনালী বানর ,
কমলা রঙের শিয়াল, বেজি,, সজারু, কাঠবিড়ালী, ধলাকোমর শ্যামা , লাল বনমুরগী, সবুজঠোঁট মালকোয়া।
লাল মুরগি কিন্তু সত্যি লাল। একদম টকটকে লাল ওর পালক। দেখলে মনে হয় কোন শিল্পী প্রচুর তেল রঙ দিয়ে এঁকেছে।
গাঁয়ের এক লোক কয়েকটা সজারু ধরে এনেছিল।
বিক্রি করে কম পয়সায়।
মাঝে মাঝে শালবনে সজারু বেড়ে যায়। ওরা ঢুকে পড়ে কৃষকের খেতে। চুরি করে খায় - গাজর, আনারস, ফুলকপি আর পাতাকপি। তখন ফাঁদ পেতে ধরা হয় ওদের।
সজারু রান্না করা বেশ ঝামেলার কাজ। প্রথমে একটা একটা করে কাটা তুলতে ফেলতে হয়। পরে কেটে গরম জল দিয়ে পরিষ্কার করে মাংস রান্নার মশলা দিয়ে রান্না করলে খেতে নাকি অপূর্ব হয়।
আনন্দ সজারু খেতে চায় না।
সজারু দেখলে ওর মায়া লাগে।
আসলে মাংস তত বেশি মজার খাবার না। মানুষ মাংস খেতে পারে শুধু মসলার জন্য । এই সব হরেক বিচিত্র মশলা না থাকলে মাংস ততবেশি মজার খাবার না।
শেষ পর্যন্ত মানুষ স্বাদের জন্য গাছের বাকল আর লতা গুল্মের কাছেই চলে যায়।
অনেকে শীতকালে হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়।
পিরামিড মামা একবার হাঁসের রোস্ট করে খাইয়েছিল। পুরো রান্নাটা করতে সময় লাগে পয়ত্রিশ ঘণ্টা। হাঁস কেটে গরম জলেই ভিজিয়ে রাখতে হয় দুই ঘণ্টা। মশলা মাখিয়ে আবার ফ্রিজে রেখে দিতে হয় ছয় ঘণ্টা।
শেষে হাঁসের ভেতরে রসুন আর অন্য সব মশলা পুরে সেটা কায়দা করে ঝলসাতে হয়।
এত নাটকের পরও সেটা ভাল লাগে না আনন্দের।
ও কিছু খেতে চায় না।
ওর শরীর অনেক দুর্বল।
সবাই বলেছে শালবনের এখানে কিছুদিন থাকলে ওর খিদে বাড়বে। এখানে জল হাওয়া অমন জাদুকরী । শরীর স্বাস্থ্য ভাল হয়ে যায় হনহন করে ।
কিন্তু আনন্দের কিছু খেতে ইচ্ছা করে না। কিছুই না।
তবে জায়গাটা ওর পছন্দ হয়েছে।
অমন জায়গা পছন্দ হবে না কার ?
দূরে দূরে আরও দূরে- কোন প্রতিবেশী নেই।
অনেক দূরে কয়েকটা বাড়ি। নিঃসঙ্গ।
কারা থাকে কে জানে !
সন্ধ্যার পর বাসি মাখনের মত কমলা আলো জ্বলে । এইসব শুনশান বড্ড ভাল লাগে আনন্দের।
মাত্র পাঁচ দিন হলেও আনন্দ খেয়াল করেছে , এখানে একটা মজার ব্যাপার হয়। রোজ সন্ধ্যার পর বৃষ্টি হয় শালবনে। বেশিক্ষণের জন্য না। পনের মিনিট । বা কক্ষনও কুড়ি মিনিট। বা হয়তো দশ মিনিট। এমন কী মাত্র তিন চার মিনিট ও।
কিন্তু রোজই বৃষ্টি হয়।
‘বৃষ্টি কি সব সময় হয় এখানে ? সব মৌসুমে ?’ জানতে চায় আনন্দ।
‘হ্যাঁ , তা হয়।’ জবাব দিলেন পিরামিড মামা। ‘ আমি শালবনে এসেছি আজ ছয় মাস। বিশ্বাস করবি না, প্রত্যেক সন্ধ্যায় অমন বৃষ্টি হয়।ঘড়ি ধরে গুনে দেখেছি। ’
‘ তবে খুব বেশি সময়ের জন্য না। তাই তো ?’
‘তাই।’
‘ কিন্তু রোজ বৃষ্টি হয় এটা অবাক লাগে না তোমার ?’ আনন্দ অবাক হয় বেশ।
‘নাহ। ভারতের চেরাপুঞ্জির নাম শুনেছিস ?’
‘শুনেছি তো ।’
‘অনেকে চেরাপুঞ্জিকে বলতো কমলার দ্বীপ। কারণ আর কী , প্রচুর কমলা হত। তবে এই শহরের নাম ছিল সোহরা । ইংরেজরা বলতো চেরা। এই চেরাপুঞ্জিতে রোজ বৃষ্টি হয়। বছরের সব দিনে। তারপর কলম্বিয়া আর কোস্টারিকাতেও তো প্রায় সারা বছর বৃষ্টি হয়।’
‘ কিন্তু আমাদের শালবনের মত রোজ ঘড়ি ধরে একই সময়ে । অবাক লাগে না ?’
‘আরে এটা তরাই এলাকা। বৃষ্টি হতেই পারে। আর সময়ের কথা বলছিস ? ওটা প্রকৃতির একটা খেয়াল। কেনেথ অ্যান্ডারসনের বইতে পড়েছি ভারতের কয়াম্বাটুর জেলার কোন একটা এলাকায় রোজ রাত দশটা থেকে ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। আর সেটা শেষ হয় রাত তিনটায়। একদম ঘড়ি ধরে। এই এলাকার নামই হয়ে গেছে ঝড়ো উপত্যাকা।’
‘দারুণ তো। জানতাম না ।’
‘সেইজন্যই কবি বলেছেন, কত অজানারে। জানার কোন শেষ নেই।’
দুই
যাই হোক, শালবন পছন্দ হয়ে গেল আনন্দের।
শালবনের ঘুমঘুমি হাওয়া আর সন্ধ্যার পর বৃষ্টি , কেমন একই সুতায় বাঁধা।বড্ড মায়াবী লাগে ওর।
আঁকা বাঁকা পথ ধরে শহরের দিকে হেঁটে গেছে আনন্দ। অনেক বার ।
অমন আয়নার মত শান্ত শহর ও কি কোথাও হয় ?
অলস বাসের ডিপো । তিন চার ঘণ্টা পর পর লক্কড় ঝক্কড় মার্কা এক একটা বাস আসে শহর থেকে। নামে কিছু মানুষ। ওঠে আরও অল্প। বাসটা চলে যায় শান্ত ভাবে ।
বাস স্ট্যান্ডের পাশে মিষ্টির দোকান। পুরানো দিনের হারিয়ে যাওয়া দোকানের মত। ফিরোজা রঙের দোকান ।
ক্যাশিয়ারে এক লোক বসে আছে। লোকটার চেহারাও ঘুম ঘুমে। যেন সে পাখি হতে চেয়েছিল কিন্তু ঈশ্বর তাকে মানুষ বানিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে।
পিচ্চি এক কর্মচারী ময়লা ন্যাকড়া দিয়ে দোকানের কাচ আর টুল বেঞ্চি পরিষ্কার করছে সারাক্ষণ।
টুল বেঞ্চিও সংখ্যায় মাত্র দুটো।
কাচের শো-কেসে মিষ্টি রাখা। শো-কেসের কাচ আবার ফাটা। ইলেকট্রিক টেপ দিয়ে সেই ভাঙ্গা জোড়া দেয়া হয়েছে। দেখলে হাসি পায়।
অ্যালুমিনিয়ামের বাউল ভর্তি মিহিদানা। হাফ ডজন আমৃত্তি। চিনির সিরায় ডুব সাঁতার দিচ্ছে রসগোল্লা। লোভে পরে মারা গেছে কয়েকটা মৌমাছি। ওদের লাশ মিষ্টির সাথেই আছে। একেবারে লোভে পাপ , পাপে সিরায় ডুবে মৃত্যু।
দোকানের মজার জিনিস হচ্ছে পিতলের পেল্লাই একটা পাত্র। পিপের মত । ওটা ভর্তি চা। নীচে জলের কল আছে। কলের নীচে চিনামাটির পেয়ালা রেখে কল খুলে দিলেই চা পড়ে।
দেখার মত জিনিস।
পাশে কাচের টোপাভর্তি ভর্তি লাল চিনি । লাল চিনি।
এখানে খবরের কাগজ আসে না হররোজ। লোকজনও বাইরের দুনিয়ার খবর রাখতে চায় না।
একবার শহর থেকে ফেরার সময় সন্ধ্যা নেমে এলো শালবনে।
কেমন রোমাঞ্চ জাগানিয়া অনুভূতি হল আনন্দের। পায়ের তলায় শুকনো শালপাতা।
খচ মচ করে শব্দ হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বাতাসের মতি গতি কেমন বদলে যায় এইসব পাহাড়ি নিঝুম পথে।
তখনই কেমন বৃষ্টি নেমে এলো।
আনন্দ জানে বৃষ্টি নামবেই। শালবনের নিয়ম। এই কয়দিনে জেনে গেছে ও।
বাতাস যেন ফিস ফিস করে ডাকছে না ?
কাঁদছে কেউ ? মনে হল একটা বাচ্চা মেয়ের কান্না।
আর কেমন বুড়োটে গলায় একজন ফ্যাস ফ্যাস করে কাউকে ডাকছে।
আনন্দ জানে এইসবই মনের ভুল।
বৃষ্টির দিনে কান পাতলেই ওরকম অশৈলী শব্দ শোনা যায়। মনে হয় কেউ ছড়া পড়ছে। বা গান গাইছে। নাম ধরে ডাকছে।
শহরেই হয়।
আর এ তো শালবন।
তারপরও গা ছমছম করে উঠলো আনন্দের।
কেন? সেটা নিজেও জানে না।
একবার ভাবল দৌড় দেবে কি না। মনে পড়ল, পিরামিড মাম একবার বলেছিল - ভয়ের বীজ খুব ছোট। কিন্তু একবার সেই বীজ থেকে যদি অঙ্কুর বের হয় তবে ডালা পালা ছাড়িয়ে বট গাছের চেয়েও ভয়াল হয়ে যাবে।
শান্ত ভাবে পা ফেলতে লাগল আনন্দ।
খানিক পরেই ওদের বাড়ির বারান্দার মায়াবী নরম হলুদ আলো দেখে দিশা ফিরে পেল।
পিরামিড মামা ফেরেনি।
সন্ধ্যার অনেক আগে , বিকেলের পর কাজের লোকটা চলে যায়।
দরজার সামনের নারকেলের খোসা দিয়ে বানানো পাপোষ। ওটার তলা থেকে চাবি বের করে ভেতরে ঢুকল আনন্দ।
ভেজা জামা , প্যান্ট জুতা বদলে নিল। ক্যাম্বিসের জুতা ভিজে কাঁদায় নোংরা হয়ে গেছে।
বাড়ির রান্নাঘরটা সুন্দর।
এক ডজন কাচের বয়াম ভর্তি চায়ের পাতা। কফির দানা। লাল চিনি। টিনের কৌটা ভর্তি ঘন দুধ , কনডেনস মিল্ক ।
ফ্ল্যাক্স ভর্তি চা বানিয়ে রেখে গেছে কাজের লোকটা। যত রাতেই বাড়ি ফিরুক এক পেয়ালা চা নেবেই পিরামিড মামা।
চিনামাটির পেয়ালাতে চা ঢেলে নিল আনন্দ। পেয়ালার গায়ে নীল ফুলের ছবি। রয়্যাল ব্লু কাপ । চায়ে চিনির পরিমাণ পছন্দ হওয়াতে খুশি হল।
পেয়ালা নিয়ে জানালার পাশে বসা মাত্র থেমে গেল বৃষ্টি। বাতাসের অভিমান। শাল পাতার শব্দ। আকাশের রঙ ধোয়া কাঠকয়লার মত।
সময় নিয়ে পেয়ালার চা ধীরে ধীরে শেষ করল আনন্দ।
পরিবেশটা এত সুন্দর। শুধু চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছা করে। শালবনের ধারে অমন একটা নিরালা বাড়িতে থাকা আসলেও অনেক মায়াবী এক অভিজ্ঞতা।
বৃষ্টি শেষ হওয়া মাত্র এক গাদা ঝিঝি পোকা নেমে গেছে নতুন উদ্যমে। এতক্ষণের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য আরও বেশি হল্লা মল্লা করছে। কোথায় যেন পড়েছে আনন্দ , পৃথিবীতে নয়শোর বেশি প্রজাতির ঝিঝি পোকা আছে। সবার ডাক নাকি আলাদা !
খানিক পর হাজির হলেন পিরামিড মামা।
‘ কী রে, বিকেলে কোথায় কোথায় ঘুরলি ?’ হেসে জানতে চাইলেন ।
‘ যাব আর কোথায় ? বাস স্ট্যান্ড , মিষ্টির দোকান, শালবনের ওখানের রাস্তা। ব্যস।’
‘একঘেয়ে লাগছে নাকি ?’
‘নাহ । তবে বৈচিত্র্য কম।’
‘এমন জায়গাগুলোতে বৈচিত্র্য পাবি কোথায় বল ?’
‘তোমার খারাপ লাগে না ?’
‘নারে। নির্জন জায়গার একটা অন্য রকম ব্যাপার আছে। প্রথম প্রথম তোর খারাপ লাগবে কিন্তু কিছুদিন থাকলে দেখবি নির্জনতা তোকে গ্রাস করে নেবে। শহরের ভিড় হইচই তোর আর ভাল লাগবে না। আফ্রিকার ইউগানডায় কাবালে নামে একটা গ্রামে থেকেছি। চার মাইলের মধ্যে কোন মানুষজন নেই। একটা মাত্র মুদি দোকান। সেই দোকানে এক ডজন মোমবাতি, কয়েকটা বিয়ারের বোতল, সামান্য চায়ের পাতা, আলু আর এক কেজি চিনি ছাড়া আর কিছু নেই। পরে সেই কাবালেতে মন এত বসে গিয়েছিল, নিউ ইয়র্ক শহরে গিয়ে মনে হয়েছে, ও বাবা এ কোথায় এলাম!’
ঘাসের সৌরভ মাখা সাবান দিয়ে স্নান করে ফিরে এলেন তিনি।
রাতের খাওয়া নয়টার মধ্যে খেয়ে নিল ওরা। বাঁশফুল চালের গরম ভাত, ডিমের তরকারি। বেগুন পুড়িয়ে ভর্তা। বিউলির ডাল।
‘দাবা খেলবি নাকি ?’ খাওয়া শেষে বললেন পিরামিড মামা।
বেশিক্ষণ দাবা খেলতে পারে না আনন্দ।
ওর মাথা কেমন গুবলেট হয়ে যায়- তখন ভুলভাল চাল দিতে থাকে।
‘একটা মজার কথা জানিস।’ ঘোড়ার চাল দিতে দিতে বললেন পিরামিড মামা। ‘ সারা দুনিয়ায় এক লাখের উপর বই লেখা হয়েছে দাবা খেলা নিয়ে। আর কোন খেলা নিয়ে ওত বই লেখা হয়নি।’
আনন্দের মনে আছে, ও যখন খুব ছোট তখন খাঁজা মার্কেটে একটা দোকানে প্রচুর দাবা খেলার বই দেখেছিল। বুড়ো মত এক লোক অনেক খুঁজে খুঁজে বই কিনতেন। ১৯৮৫ সালেই সবচেয়ে সস্তা দাবা সেটের দাম ছিল বিশ টাকা। আনন্দের বাবা কিনে এনেছিল। সেই দোকানে এখন আর দাবার বই বিক্রি হয় না। শুধু পরীক্ষা পাশের গাইড বই।
বাম হাতে ঘড়ি ছাড়া পিরামিডমামাকে কেউ কখনও কোন রকম অলংকার ব্যবহার করতে দেখেনি। এইবার আনন্দ দেখল, উনার গলায় চামড়ার সুতলির মধ্যে ঝুলছে ঘষা নীল রঙের রত্নপাথর।
‘কী পাথর এটা ?’ জানতে চায় ও। ‘অমন নীলা আগে দেখেনি।’
‘ নীলা ফিলা না রে। আসলে পাথরই না ওটা।’
‘তবে?’
‘কাচ।’
‘কাচ!’
‘ সাধারণ কাচ না। সাগরের কাচ। ইংরেজিতে বলে সি গ্লাস।’
‘সাগরের কাচ ! জিনিসটা বুঝলাম না তো।’
‘বলছি। সমুদ্রের মধ্যে মানুষজন বোতল ফেলে দেয় প্রতি বছর ।নানান ভাবে। কখনও ইচ্ছা করে। আবার কখনও ভুলে। দুর্ঘটনায়। বোতলগুলো হারিয়ে যায় সাগরের জলে। ভাঙ্গে। অনেক বছর ধরে ঢেউ, প্রবাল আর বালির ঘর্ষণে পালিশ হয়ে প্রায় মসৃণ হতে হতে কেমন অচেনা রকমের জিনিস হয়ে যায়। লোকজন সাগরের তলা বা সৈকত থেকে কুড়িয়ে নিয়ে আসে পরম যত্নে। শখ করে কেউ কেউ জমায় এইসব। শখের ব্যাপার জানিস তো। একজনের কাছে যেটা আবর্জনা অন্য জনের কাছে সেটাই রত্ন।’
‘এইসবে আবার গয়না হয় ?’
‘হয় না আবার ? হয় তো। আজকাল বাইরের দেশে বেশ চলছে।’ পিরামিডমামা ব্যাখ্যা করলেন। ‘সি গ্লাস জিনিসটা আবার কিছুটা রুপক মার্কা জিনিস।’
‘সেটা কেমন ?’
‘যে কাচটা খুঁজে পেলি সেটার বয়স বিশ থেকে চল্লিশ হতে পারে। বা আরও বেশি। ভাঙ্গা বোতলটা কত কুৎসিত ছিল । সময়ের কাছে ঘষা খেয়ে পালিশ হয়ে সেটা কেমন মিষ্টি চেহারা নিয়েছে। জীবন আমাদের কত রকম আঘাত দেয়। ছোট খাট হতাশা আমাদের মন ভেঙ্গেও দেয় । মানুষজনের বাজে ব্যবহার বা অবহেলাও আঘাত। সেসব আঘাত সহ্য করে দিনের শেষে আমরা আবার অমন সুন্দর রত্ন হয়ে উঠতে পারি। যারা সি গ্লাসের গহনা ব্যবহার করে তারা নিজেরদের মনের জাদুকরী শক্তি বাড়ানোর জন্য করে। সব সময় নিজেকে মনে করিয়ে দিতে যায় জীবন আসলেও অলৌকিক কিছু। হারিয়ে যায় না কিছুই। সব ফিরে আসে।’
ব্যাপারটা আনন্দের ভাল লাগল।
তিন
রাতে মামা ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুমের মাসি পিসিরা আসতে চাইল না আনন্দের চোখে ।
খোলা জানালা দিয়ে দূর আকাশের নক্ষত্র দেখছে। কালচে নীল চাঁদরে ভাঙ্গা কাচের টুকরো ছড়িয়ে রেখেছে যেন কেউ। বাতাসে শালবনের গাছদের আলাপ আলোচনা।
এখনও বৃষ্টির ঘ্রাণ।
এই জিনিসটাকে বাংলা ভাষায় প্রথম লিখেছেন বিভূতিভূষণ। ভিজে মাটির সোঁদা ঘ্রাণ। ইংরেজিতে বলে প্যাট্রিইকর ( petrichor)। বিজ্ঞানীরা বলেন, মাটিতে অনেক রকম জীবাণু থাকে। বৃষ্টির জল মাটিতে পড়লেই এই সব জীবাণু ঘ্রাণ ছড়ায়। তাছাড়া বৃষ্টির সময় বাতাসে অক্সিজেন আর নাইট্রোজেনের অণু পাগলের মত দৌড়া দৌড়ি করতে থাকে। ওদের জন্যও ভিজে মাটির অমন মজার সৌরভটা পাওয়া যায় ।
বৃষ্টির ঘ্রাণ আমাদের মগজ পছন্দ করে। এটা বিবর্তনের অংশ। সেই অতীতে বৃষ্টি মানেই জল। রসালো ঘাস। ফসল। আবাদি করার সুযোগ। হয়তো মাছ ধরার মউসুম!
সব মিলিয়ে বৃষ্টির ঘ্রাণ পৃথিবীর সেরা সৌরভ। মানব মগজের পছন্দের জিনিস।
বইয়ে পড়েছিল আনন্দ, আফ্রিকার বতসোয়ানাতে টাকাকে বলে পুলা। পুলা অর্থ বৃষ্টি। বুঝা যায় টাকা আর বৃষ্টি একই রকম দামি কালাহারি আর আর সাহারা মরুভূমির এই দেশটাতে।
বৃষ্টির শব্দ, পৃথিবীর আর সব যাবতীয় শব্দের চেয়ে একদম আলাদা। একে বলে পিঙ্ক নয়েজ। গোলাপি শব্দ। মগজের যে অংশ সব সময় সতর্ক থাকে সেই অংশটা জাইলোফোনের মত বৃষ্টির টুং টাং শব্দে বেশ অসতর্ক হয়ে নিরাপদ বোধ করে। তখন মগজের অন্য অংশ ভাল কাজ করে। কেউ অতীতের কথা ভাবতে পছন্দ করে। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা খামাখাই মনে করে আমাদের মন।
কেউ এই সময় খুব ভাল কবিতা লিখতে পারে। নতুন সব আইডিয়াও চলে আসে অমন বাদলার দিনে।
আনন্দ বৃষ্টি পছন্দ করে।
কারণ বৃষ্টি পৃথিবীর পুরানো দিনের একটা জিনিস। যা এখনও আছে । মানুষ যখন ছিল না তখনও বৃষ্টি হয়েছে , আজও হচ্ছে।
বৃষ্টি পৃথিবীর পুরানো বন্ধু ।
অন্য গ্রহেও বৃষ্টি হয় । শুক্র গ্রহে সালফিউরিক এসিড আর নেপচুন গ্রহে হয় হীরার বৃষ্টি !
বৃষ্টির দিনে ওর কেমন যেন লাগে। জানালার পাশে বসে থাকতে এত ভাল লাগে। ও জানে , বইতে পড়েছে। আজ থেকে পঞ্চাশ হাজার বছর আগে গুহাযুগের মানুষেরা এমন বৃষ্টির দিনে গুহায় থাকতে পছন্দ করত। গুহায় থাকা মানেই নিরাপদ বোধ। সেটা আদিম মানুষের মনে অন্য রকম আনন্দ দিত।
পঞ্চাশ হাজার বছর পরও মানুষ বৃষ্টির দিনে একই রকমের অনুভূতি পায়।
যারা বৃষ্টি পছন্দ করে তাদের বলে প্লুভিওফাইল। ফরাসি এই শব্দের মানে বৃষ্টি প্রেমী।
এরা একা থাকতে পছন্দ করে !
চার
পিরামিড মামা বেশ সকাল সকাল উঠেন।
অত সকালে উঠতে চায় না আনন্দ।
ও এসেছে ছুটি কাটাতে । এত সকালে উঠে করবেটা কী ?
আধো ঘুম ঘুমের মধ্যে শব্দ পায় , কিচেনে গিয়ে মেশিনে কফি বসাচ্ছে পিরামিড মামা। ছোট একটা যন্ত্র দিয়ে দানা ভেঙ্গে মিহি করে মেশিনে পুরে দিচ্ছেন। খানিক বাদে পুরো বাড়িটা কফির চনমন করা সৌরভে এলোমেলো হয়ে যায়।
খানিক বাদের ছুটা লোকটা আসে। রুটি বানায়।
রুটি- ডিম ভাজা খেয়ে মামা চলে যান ।
কাজের লোকটা ওদের জন্য ভাত আর তরকারি রান্না করে দুপুরের পর চলে যায়। কক্ষনও বাজার করে দেয়। লোকটা তেমন কথাবার্তা বলে না। ওর কথার মধ্যে কেমন একটা পাহাড়ি টান আছে। আনন্দ বুঝে না কিছু।
আলাপও তাই জমে না।
দুপুরের খাওয়া শেষ করে বই নিয়ে জানালার পাশে বসে আনন্দ।
পিরামিড মামার একটা জিনিস ওর খুব ভাল লাগে। যেখানেই যান, সাথে এক গাদা বই থাকে ।
‘ এত কাজের মধ্যেও বই পড়ার সময় পান কেমন করে ?’ প্রথম দিনেই বইগুলো দেখতে দেখতে বলেছিল আনন্দ।
‘ বিছানায় শুয়ে মোবাইল বা ল্যাবটব অমন জিনিস ব্যবহার করি না।’ জবাব দিয়েছিলেন পিরামিড মামা। ‘ ঘুমানোর আগে পড়ি। ওতে ঘুম ভাল হয়। সাথে আবার কিম্ভূত সব স্বপ্নও দেখা যায়।’
‘কিম্ভূত স্বপ্ন ?’
‘শুনলে হাসবি । বেশির ভাগ সময় বইয়ে পড়া কাহিনিটা স্বপ্নে আসে। অন্য রকম হয়ে। বেশ মজা লাগে। তবে সবচেয়ে কিম্ভূত স্বপ্ন দেখেছিলাম মোবিডিক বইটা পড়ে।’
‘কী রকম ?’
‘ আর বলিস না, দেখি কেমন অচেনা একটা বন্দরে ঘুরে বেড়াচ্ছি । পুরানো দিনের বন্দর।ওক কাঠের গোল পিপে এদিক সেদিক। বাদামি মোটা দড়ি পড়ে আছে কুণ্ডলী পাকিয়ে। নিঃসঙ্গ একটা কেবিন। বাইরে তিমির তেলের ল্যাম্প জ্বলছে। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি ক্যাপ্টেন আহাব বসে আছেন। মুখে সিন্ধু ঘোটকের দাঁতের পাইপ। দেয়ালে হারপুন ।
ক্যাপ্টেনের সামনে কাচের বাউল।
বাউলের ভেতরে সাঁতার কাটছে পেল্লাই এক সাদা তিমি। টিনের কৌটা খুলে মাছের খাবার বের করে আনলেন ক্যাপ্টেন। কৌটার ভেতরে ছোট ছোট পা। মানুষের পা। একটা একটা করে সেই পা ফেলে দিচ্ছেন বাউলের ভেতরে। কিন্তু তিমিটা খাচ্ছে না।’
‘কেমন ভয়াল স্বপ্ন।’ হেসে ফেলল আনন্দ। ‘ ভাল কথা মামা আপনি আজও শিশুতোষ বই পড়েন কেন ?’
‘ বাচ্চাদের বই পরলে মগজের অনেক জট খুলে যায়। শিথিল হয় চিন্তাভাবনা। যেমন ধর - রুশ লেখক আনাতোলি আলেকসিন সাহেবের লেখা, এ ভেরি স্কেরি স্টোরি। বাংলায় ‘’ভয়ংকর রোমহর্ষক ঘটনা’’ নামে ছাপা হয়েছিল । রামধনু প্রকাশনী থেকে। ননী ভৌমিকের অনুবাদ। এত মজার বই। সেই ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় শেষ করেছিলাম। আজও পড়লে বেশ মজা লাগে। শিশুতোষ বইয়ের মজাই এটা।’
টেবিলের উপর রাখা পিরামিড মামার পেপারওয়েটটা ও বেশ সুন্দর।
কাচের একটা বোতল। কর্কের ছিপি। বোতলের ভেতরে তরল নীল । ওখানে ভাসছে পুরানো জামানার পাল তোলা একটা জাহাজ।
নীল রঙের তরলের নীচে পেল্লাই সাদা একটা তিমি। সামান্য নড়াচড়া লাগলেই টলমল করে নীল তরল। পাল তোলা জাহাজ টালু মালু হয়ে নড়ে। সেই সাথে নড়ে চড়ে বসে সেই সাদা তিমি।
পুরো পেপারওয়েটটা মোবিডিক উপন্যাসের থিমে বানানো।
অপূর্ব জিনিস।
আর মোবিডিক যে পিরামিড মামার প্রিয় বইগুলোর একটা সেটা সবাই জানে।
পিরামিড মামা অনেক অনেক বই কিনে জমিয়ে রাখেন। পড়া হয় না। এটাকে অ্যান্টিলিব্রেরি বলে। বিশেষ করে সাগর , হাঙর আর অমন হাবিজাবি নিয়ে একগাদা বই এখনও পড়ে আছে উনার সংগ্রহে।
পাঁচ
আজ বিকেলে ও হাঁটতে গেল আনন্দ।
এক একটা জায়গা কত সুন্দর হয়। শহরে ওদের মহল্লাটা কেমন দালান বাড়ি দিয়ে ঠাসা। বারন্দায় বসলে অন্য বাড়ির বারন্দায় দড়ির মধ্যে ভেজা কাপড় ছাড়া কিছু চোখে পড়ে না।
বাদলার দিনেও বাতাস দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে না । এখানে ওখানে ময়লার স্তূপ।
পর পর আরও তিন দিন হাঁটতে গিয়ে বৃষ্টির পাল্লায় পড়ল আনন্দ। প্রত্যেকবার কেমন গা ছমছমে অভিজ্ঞতা হল ওর ।
বাতাসের ঐ ফিসফিস শব্দ। আর কে যেন কাঁদে । বুড়ো মানুষের গলা। কাকে যেন ডাকে। এই জঙ্গলের পথটা কি তবে ভাল না ? পিরামিড মামাকে বলতে চায় না। হেসে ফেলে যদি। উনি কি অমন শব্দ টব্দ পান না ? রাতের বেলা যখন একা ফেরে ? নাকি শুধু বৃষ্টি নামার আগেই অমন অশৈলী ধরনের শব্দ হয়। সবই কি মনের ভুল ? নাকি দূরের পাহাড় আর বনের ভেতরের হাওয়ার শব্দ শুধু ?
সকালে উঠে জলখাবার খেয়ে বই পড়ে আনন্দ। রাতে বারান্দায় বসে দেখে নক্ষত্র। দূর থেকে ভেসে আসে অচিন পাখির ডাক। ঝুমঝুমির মত শব্দ করে দৌড়ে যায় সজারু।
জীবন এখানে কত সুন্দর ! শহরের মত মোটর গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে রাতের ঘুম দিশেহারা হয়ে যায় না।
আজ পথ হারিয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছিল আনন্দ।
ফেরার পথে সন্ধ্যা নেমে গেল কেমন করে।
নিঃসঙ্গ একটা ঘাসের বনে এসে থমকে গেল আনন্দ। চারিদিকে কেমন নরম ঘাস। কি নাম এই ঘাসের ? সারা দুনিয়ায় নাকি দশ হাজার ধরনের ঘাস আছে । এই বিজনপুরীর মায়াবী ঘাসের নামক কী ?
সূর্য ডুবে গেছে। আকাশে ধূসর আর শ্যামা মেঘ।
হালকা কুয়াশা নামছে মাঠের উপর।
তখনই মেয়েটাকে দেখল। ছোট্ট মত একটা মেয়ে। কয়েকটা ভেড়া নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ভেড়াগুলোর গলায় পোড়ামাটির ঘণ্টা। বাজচ্ছে টুং টাং করে।
হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটা হারিয়ে গেল দীঘল ঘাসের আড়ালে।
লোকটাকেও দেখল তখনই ।
বুড়ো মত লোকটা। মুখ ভর্তি দাঁড়ি। হাতে কেমন একটা আঁকাবাঁকা লাঠি। জিয়ল গাছের লাঠি। মাথায় শোলার টুপি। লোকটা সরু তীক্ষ্ণ গলায় কাকে যেন ডাকছে। কাঁদছে নাকি বুড়োটা?
আচমকা ঠাণ্ডা বাতাস বইতে লাগল। হিল হিল করে উঠলো যেন হাওয়া।
বাতাসে কেঁদে উঠলো শালবনের পাতারা।
নামলো বৃষ্টি।
রিমঝিম! রিমঝিম !
রুমঝুম । রুমঝুম ।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে লাগল আনন্দ। কোথাও কেউ নেই। কিচ্ছু নেই।
এ এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। ওকে ক্লাসের পড়া শেষ করতে হবে না। অঙ্ক কষতে হবে না। সম্পাদ্য-উপপাদ্য নিয়ে হিমশিম খেতে হবে না। শুধু বৃষ্টিতে ভিজে যাও ।
চারিদিকে বিজন ঘাসের বন। দূরে শালবনের হাতছানি ।
আকাশ ভর্তি নাইরোবির হাতির মত কালো মেঘ। শনশনে হাওয়া। আর নতুন টিনের কুচির মত বৃষ্টি।
তারপরও পুরো ব্যাপারটার মধ্যে কেমন একটা মন খারাপ করা ভাব আছে।
কেমন যেন বিষণ্ণতা।
কোথায় গেল খুকি ? আর ওকে খুঁজতে থাকা বুড়ো ?
কেমন মন উদাস করা সুরে ডাকছিল বুড়োটা। মনে হয় আগের সব সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় এই ডাক শুনেছিল আনন্দ।
বাড়ির পথ ধরল।
আজ উল্টা পথে চলে গিয়েছিল আনন্দ। বেশ দূরে।
ছয়
ফেরার পথে পেল সেই মিষ্টির দোকানটা। বাদলার দিনে অমন দোকান কেমন কবিতার মত লাগে।
দোকানটা একটা অচেনা গাছের তলায় । গাছের পাতা পয়সার মত গোল গোল। বিজলির টিমটিমে আলো জ্বলছে। পাকা আনারসের ফালির মত সেই আলোর রঙ।
দোকানের ভেতরে খদ্দের নেই কোন। বাইরে কয়লার চুলার পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে চিনা বাদামের খোসার রঙের একটা কুকুর।
দোকানের মালিক অবাক হয়ে চাইল আনন্দের দিকে।
‘ভেতরে এসো খোকা। তুমি ফরেস্ট বাবুর আত্মীয় না ? ভেতরে এসো। বৃষ্টির মধ্যে হাঁটছ কেন ?’ আন্তরিক গলায় ডাকল লোকটা। এখন তাকে খুব খারাপ লোক মনে হচ্ছে না।
টুল বেঞ্চিতে বসল আনন্দ।
‘মিষ্টি খাবে ? গুড়ের জিলিপি ?মিহিদানা ?’
‘নাহ ।’ মাথা নাড়ল আনন্দ।
‘চা নেবে এক পেয়ালা ? বৃষ্টির মধ্যে ভাল লাগবে। ঈশ একদম ভিজে গেছ।’
এইবার বারন শুনল না।
ছোকরা কর্মচারীটা চায়না মাটির পেয়ালাতে করে চা দিল।
ঘন দুধের চা। এলাচি তেজপাতা বা অমন কিছু দেয়া সাথে ।
‘চিনি আরও লাগবে ?না ঠিক আছে ? ’ জানতে চাইল দোকানের মালিক।
চুমুক দিয়েই বুঝল চিনি একদম মাপমত হয়েছে। যেন আনন্দের জন্যই বানানো হয়েছে এই চা।
বাইরে বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির মাপা ছন্দ। দূরে শালবন স্নান করছে বৃষ্টির জলে। পরে বাতাস ওদের চুল শুকিয়ে দেবে। চাঁদের আলোর লোশন মাখলেই আবার চকচক করবে ওদের শরীর।
পেয়ালা অর্ধেক হতেই বৃষ্টি থেমে গেল। যেন সুইচ চেপে বন্ধ করে দিল কেউ।
‘ শালবনের এই বৃষ্টি অবাক লাগে না তোমার ?’ জানতে চাইল দোকানি। হাসিমুখে।
‘অবাক কেন ?’
‘রোজ প্রায় একই সময়ে নামে আর প্রায় একই সময়ে থেমে যায়।’
‘হ্যাঁ, একটু কিম্ভূত তো।’
‘একটা গল্প আছে।’
‘কী গল্প?’
‘শুনবে ?’
‘বললেন একটা গল্প আছে। এখন আবার জানতে চাইছেন শুনব কি না ? এই অবস্থায় পাগল ও মানা করবে না। আর আপনি বলতে চান বলেই না আমাকে তথ্য দিলেন একটা গল্প আছে।’
‘ খুবই বুদ্ধিমান খোকা তুমি।’ তারিফ করার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল দোকানি।
‘অনেক কাল আগে পাহাড়ি এক বুড়োর নাতনি এক সন্ধ্যায় হারিয়ে গিয়েছিল। ভেড়া চড়িয়ে ফিরে আসেনি । ওকে খুঁজতে বুড়ো বের হয়েছিল। বুড়োর আর কেউ ছিল না তিনকূলে। কিন্তু খুকিকে আর পাওয়া যায়নি। কেউ বলে যাযাবর দল এসেছিল । ওরা চুরি করে নিয়ে গেছে খুকিকে। ’
‘তারপর ?’ হকচকিয়ে গেল আনন্দ।
‘যেইদিন খুকি হারিয়ে গিয়েছিল সেই সন্ধ্যায় বৃষ্টি হয়েছিল। তারপর রোজ সন্ধ্যায় বুড়ো খুকিকে খুঁজতে বেরুত। মড়ার আগের দিন পর্যন্ত। বুড়ো মারা গেছে সেও চল্লিশ বছর আগে। সব এলাকায় অমন স্থানীয় গল্প কাহিনি থাকে। এই বুড়োর নাম ছিল বৃষ্টি বুড়ো। ওরা আদিবাসী। কোন এক বৃষ্টির দেবতার পুজা করতো সেই বুড়ো। নতুন যারা শালবনে বেড়াতে আসে ওদের মধ্যে কেউ কেউ বুড়ো আর খুকিকে দেখে ফেলে। আমরা অবশ্য কখনই দেখিনি।তুমি কখনও দেখলে আমাকে জানাবে। খুব মায়া লাগে ওদের জন্য।’
শেষ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন