তখনও লেখা পড়া ধরিনি। ধরার ইচ্ছা ছিল না।
বাংলোর মাঠে রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম। কক্ষনো হাঁটতে হাঁটতে শীতলক্ষ্যার তীরে।
শীতলক্ষ্যা টগবগে নদী ছিল তখন। জোছনার মত জল। স্টিমার গেলে বড় বড় ঢেউ উঠে দৌড়ে আসত তীরে।
নদীর একটা বাহু একদম রাস্তার কিনারে চলে এসেছিল। ওখানে দাঁড়িয়ে মাছ দেখতাম। শামুকের বস্তি।
জোয়ার ভাঁটার মত রহস্যময় জিনিসটা তখনই দেখলাম। সে এক মহা রহস্য। জলগুলো সব যায় কই ?
তখনই বাসায় মোটা টিনের একটা তোরঙ্গে কিছু বই ছিল। বাংলা না। ইংরেজি। পৃষ্ঠাগুলো খানিক তেলতেলে। আপেলের মত একটা সৌরভ সেই কাগজে ! ভেতরের পাতায় পাতায় দূর দেশের ছবি। কাঠের বাংলো। সাদা বরফ। কাঁসার রঙের মত শুকনো পাতা। তিমি মাছ। চেরি ফুল।
বইগুলো উলটে পাল্টে ছবি দেখতাম।
স্লেট পেন্সিল আনা হল।
মায়ের হাত ধরে একদিন কালো কুচকুচে স্লেটে লিখে ফেললাম- অ। আ।
একদিন ইশকুলে ভর্তি।
ক্লাস টু -তে যখন পড়ি তখন গোয়াল পাড়ায় মায়ের ঠাকুর মার বাসায় চটের একটা ব্যাগে পেলাম পেলাই সাইজের বই - রাক্ষসের মায়াপুরি।
নিউজ প্রিন্টের কাগজ। বড় বড় হরফে গল্প। ভেতরে অলংকরণ। মাত্র চারটে গল্প। প্রচ্ছদে ভয়াল চেহারার এক রাক্ষস। রাজকুমার পঙ্খীরাজে বসে আছে। হাতে তলোয়ার। পিছনে রাজকুমারী। তলোয়ারটা পছন্দ হল ।
নাওয়া খাওয়া প্রায় বাদ দিয়ে টানা তিন দিনে শেষ করলাম বইটা।
সেই সাথে নিজের বারোটা বাজিয়ে ফেললাম।
এইসব কি ? হায় হায়।
পদ্মদিঘি। ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী। সাতটা তাল গাছের সমান গভীর পদ্মদিঘির জল। ওটার তলায় পিতলের একটা কৌটা। কৌটার ভেতরে একটা ভ্রমর। ভ্রমরের ভেতরে রাক্ষসের প্রাণ।
তালগাছ কত বড় সেটা তো আমি জানিই। মোড়ের সামনে সিদ্ধিগোপাল আখড়া। ওখানেই তো একটা তালগাছ আছে।
অমন সাতটা তালগাছ ? হায় হায়। জিয়স দিঘি দেখছি। কাজেই ধারনা আছে ভালই।
পরের বইটা ধার করা। রাজকন্যার মাণিক মালা। ভেতরে রঙ্গিন কালি দিয়ে ছাপা। সুচ কুমার। চালাক চাষির বোকা বউ।
পরের বইটা নিজেই কিনলাম। ভূত পেত্নি দৈত্য দানো। বিশ টাকা দাম। দোকানি গায়ের দামই রাখল। বেশ মোটা বই। তবে ১৯৮৩ সালে বিশ টাকা নিয়ে অনেকেই বাজারে যেত। দশ টাকায় একটা ইলিশ। আট আনা মানে পঞ্চাশ পয়সায় এক ফালি কুমড়া। চারআনা মানে পচিস পয়সায় ধনেপাতার আঁটি। পাঁচ টাকা ভাগা কুঁচো চিংড়ি সহ গুড়ো মিক্স ক্যাচ মাছ ।
এই বইটা প্রায় এক মাস লাগল শেষ করতে।
আমার জন্য অনেকগুলো প্যারালাল জগত খুলে গেল। গল্পগুলোর কিছু মনে আছে। কিছু নেই। তবে আবছা আবছা সবই মনে পড়ে। সেই শব্দগুলো। জাদুর বাক্স। চকমকি পাথর। কঙ্কালের পাহাড়। ধু ধু তেপান্তর।
মায়ের কাছে টাকা ধার চাইতাম। বই কেনার জন্য। পরেরটা ছিল বন্দে আলী মিয়ার - গুপ্তধন। পাতলা বই। পোষায় না। কেমন দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
টেলিভিশনে রোববার সকালে বই পরিচিতি নামে একটা অনুষ্ঠান দেখাত। মাত্র তিন বা চারটে বই। আহা কোথায় পাব এইসব ?
তখনও বই পড়ুয়া কোন ছেলে পিলে পাইনি। পাঠাগারে ভর্তি হব সেই উপায় নেই। আমাদের ইশকুল সেটা অনুমোদন করে না! ভাবা যায় ? একটা কিনডার গারটেন ইশকুলে কোন লাইব্রেরি নেই। এবং উনারা উনাদের কোন ছাত্র ছাত্রীকে এলাকার লাইব্রেরির সদস্য হতে দেন না । রেজাল্ট খারাপ হবার ভয়ে !
দারুণ না ?
টুনটুনির বইটা কিনলাম এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায়। খাজা সুপার মার্কেটের মমতা বুক ষ্টোর থেকে। চ্যাপ্টা বড় বই। শক্ত বাধাই। হোয়াইট প্রিন্ট। দাম ওই বিশ টাকা। ভেতরে বেশ কিছু ব্লকে ছাপা অলঙ্করণ।
বাইরে কোমল সন্ধ্যা। বৃষ্টি ইলশেগুড়ি। রাস্তা ঘাট তখন কত ফাঁকা। অনেক ক্ষণ পরপর একটা বাস ছুটে যায়। রিক্সা- তাও অমন একটা । খালি বা সওয়ারি সহ।
এটাও এক সপ্তাহ লাগল।
আচমকা সেই দোকানে পেয়ে গেলাম। দস্যু বনহুর সিরিজের প্রথম বইটা। আট টাকা। মা-কে বলতেই মা মহাখুশি। বলল - কিনে আন বাবা । টাকা ? আবার মা দিল।
তখন এই এক কাজ শুরু হল। সপ্তাহ খানেক লাগত সিরিজের একটা বই শেষ করতে । শেষে লেখা থাকতো আগামী বইয়ের নাম । শেষ হলেই আবার কিনে আন। আমার চেয়ে মায়ের উৎসাহ বেশি। টাকাও দেবে মালতী গাঙ্গুলী।
এই সিরিজের সব বই খাজা মার্কেতে পেতাম না। চারার গোপের ওখানে ক্ষুদে একটা দোকান, নাম সম্ভবত শহীদ মনির বইঘর। মনে পড়ছে না । কারন ওদের সাইন বোর্ড ছিল না। আধ বুড়ো দুই ভাই মিলে চালাত। দুইজনের মুখেই খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গোঁফ। সাদা পাকা। সামান্য বেচাকেনা। কিছু পাঠ্য বই। জ্যামিতি বক্স। কালির দোয়াত। ঝর্না কলম।
দোকানটা এমন বেকায়দা জায়গায়। পথিক চলাচল করত না তেমন । উল্টা দিকে ছিল দুটো লেদ মেশিনের দোকান। আর দেশ ভাগের সময় ফেলে যাওয়া পেল্লাই এক জমিদার বাড়ি। সন্ধ্যার পর একদম ভুতুরে পরিবেশ। মারাত্নক !
চাষারা আমার বাড়ি থেকে অনেক দূরের পথ।
বই নিয়ে ফেরার সময় পড়ত নিউ মেট্রো সিনেমা হল। বাইরে সিনেমার পোস্টার বিক্রি হত দুই টাকা করে। তখনও এই হলে নিশান সিনেমাটা চলছিল। ইয়া বড় একটা চিংড়ীর মাথা বেসনে গুলিয়ে ভেঁজে এক টাকায় বিক্রি হত। কুমড়ার ফালি দেয়া কুমড়ানী। ক্যারাম বোর্ডের জুয়া চলত সেই বিকেল থেকে রাত্র পর্যন্ত।
ততদিনে সিরিজের পঞ্চাশ খানেক বই কেনা পড়া হয়ে গেছে।
বনহুরের সাথে চলে যেতাম কান্দাই নগরে। নির্জন বাংলোর অভ্যন্তরে। কস্তূরই বাঈ। দিল্লি শহরে সেই নীল হীরা। খিদিরপুর ডক। ঝিন্দ শহর । ফৌজন্দিয়া দ্বীপে।
সময়ের সাথে হাতে আসা শুরু হয়েছে অন্য সব বই। প্রথম বইটা ছিল শিকার কাহিনি জঙ্গল। এটার প্রচ্ছন্দ দেখেই মুগ্ধ । এক ইশকুল বন্ধুর বাড়িতে পেলাম। ওর বড় ভাই পড়ে। ধার চাইলাম। দিল । বদলে উনাকে একটা বই দিতে হবে।
রাজি।
শীতের দুপুরে শেষ করলাম। কী সুন্দর ! খোঁড়া শিকারি। নিঃসঙ্গ বাঘ। জঙ্গল ভালবেসে ফেললাম।
পরের বইটা নোঙর ছেঁড়া। জুল ভারন সাহেবের।
আবিস্কার করলাম আগে যা পড়েছি সবই সময় নষ্ট। দুনিয়ায় আরও কত কত বই রয়ে গেছে। যোগার করলাম, চাঁদে অভিযান। সাগর তলে। পাতাল অভিযান। নাইজারের বাঁকে। বেগমের রত্নভানডার। আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ। মরুশহর। মাইকেল স্তগ্রফ। রহস্যের দ্বীপ। ক্যাপ্টেন হ্যাটেরাস।
তখন একটা সমস্যা হত।
কোন লেখকের একটা বই পছন্দ হয়ে গেলেই আমি শেষ।
সেই লেখকের সব বই একটার পর একটা পড়েই যেতাম। যেন পি,এইচ, ডি করার জন্য মাঠে নেমেছি। একটা ঘোর। কেমন একটা অনুভূতি।
অপারেশন কাঁকনপুর । লেখা আলী ইমামের। শীত কাল। ১৯৮৫ সালের এক বিকেলে বসে রাত্র আটটার মধ্যে শেষ । পড়ার পর থেকে যে কী হল। উনার সব বই জোগাড় করে পড়ে ফেলতে লাগলাম।
দ্বীপের নাম মধুবুনিয়া। নীল শয়তান। ভয়াল ভয়ংকর।
মোহাম্মদ নাসির আলীর - তিমির পেটে কয়েক ঘণ্টা দিয়ে শুরু। তারপর উনার সব বই শেষ। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা। আকাশ যারা করল জয়।
কেন যে অমনটা করতাম আজও জানি না।
বই পাওয়া অনেক কষ্ট তখন। পুরো শহরের মাত্র তিনটা দোকানে পাঠ্য বইয়ের বাইরে এইসব হাবিজাবি বই পাওয়া যেত। সংখ্যায় অনেক কম। উনারা একটা বইয়ের ডাবল কপিও আনত না । ভয়ে।
যদি বিক্রি না হয় !
গুলশান সিনেমা হলের বাইরে এক বুড়ো লোক ছিল। জয়নাল ভাই। উনার কাছ থেকেই বিখ্যাত একটা পেপারব্যাক প্রকাশনীর বই পেতাম। নিয়মিত। মানে প্রতি সপ্তাহে দুটো। সাত টাকা করে এক একটা বই।
সব পড়ছি তখন।
সত্যেন সেন এর মসলার যুদ্ধ পড়ছি। আবার বুনো পশ্চিমের কাউবয়দের দেশান্তরী গল্প ও পড়ছি। ক্লাসিক পড়ছি। আবার একই সঙ্গে কিশোর গোয়েন্দা গল্প পড়ছি।
এখনকার সপ্রতিভ পাঠকদের মত কোন বইটা পড়ব ? - সেটা নিয়ে দিশেহারা হয়ে যেতাম না।
পড়তেই হবে , যা পাই।
ক্লাসিক পড়া শুরু হয়েছিল দুর্গেশনন্দিনী দিয়ে। তখনকার নাম করা এক পেপারব্যাক প্রকাশনী শুরু করেছিল ক্লাসিক সিরিজ। গড়ে দেড় মাসে একটা করে বেরত। বেন- হুর। রবিনসন ক্রুসো। হাকলবেরি ফিন। সী উলফ। কালো তীর। প্রিজনার অভ জেনডা। দুঃসাহসী টম সয়ার। কাউন্ত অভ মনটি ক্রিস্তো। প্রবাল দ্বীপ।
বইগুলোর অনুবাদ ছিল ঝরঝরে। ঠিক অনুবাদ না ।
রূপান্তর। প্রতিটা বই আমাকে নিয়ে যেত নানান জায়গায় । উত্তাল সাগরে। পালতোলা জাহাজে। ইউরোপের ছোট্ট কোন দেশে। নাবিকদের বিদ্রোহ। কয়লার আগুনে ঝলসানো শূয়রের মাংস। ঝিনুকের ভেতরের গোলাপি মুক্তা।
মার্ক টোয়েন সাহেবের টম সয়ার আর হাকলবেরি ফিন থেকে কত কত কিশোর অ্যাডভেঞ্চার লেখা হয়েছে পরে তার হিসেব পাওয়া মুশকিল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন