দক্ষিণ অ্যারিজোনার , লিটল ড্রাগন পর্বতমালাটা ঠিক যেন একেবারে ডাইনোসরের মেরুদণ্ডের কঙ্কালের মত ।
বাদামি । শুকনো। খটখটে।
বহুকাল আগে, এর রুক্ষ চুড়ার মাঝে অ্যাপাচিদের নেতা কোচিস, দুর্গ বানিয়েছিল। সেই থেকেই জায়গাটা বিখ্যাত।
আর এখানেই আছে বিশাল শুকনো এক জলাভূমি। দিগন্ত ছাওয়া, সাদা , সমতল, নিষ্ক্রিয় এবং মৃত।
বাতাসে বালি ছাড়া কিছুই নড়াচড়া করে না। একদম প্রাণহীন শুকনো খটখটে একটা জায়গা।
তারপরও নাকি , কোন কোন সুনসান রাতে এখানের খা -খা করা ঘন অন্ধকার দিয়ে একটা ট্রেন যায়। প্রায়ই।
শোনা যায় ঘণ্টার শব্দ ।রেলের উপরের চিমনি দিয়ে ফুটন্ত ধোঁয়া গলগল করে বের হয়, সেটাও দেখা যায়।
যারা রেলগাড়িটা দেখেছিল বলে দাবি করতো , তারা নাকি ইঞ্জিনের ঝিকঝিক আর লোহার রেল লাইনের সাথে চাকার ফ্ল্যাঞ্জের ঝনঝন শব্দও শুনতে পেয়েছিল।
ঝিলিমিলি করা নীল রঙের হ্রদ পাড়ি দিত রেলগাড়িটা । উড়ন্ত শাদা বালি কয়েক লহমার জন্য ঝিকিয়ে উঠে প্রাচীন স্মৃতি মনে করিয়ে দিত। যখন সুবিপুল জলাভূমিটা ছিল সাগরের মত উত্তাল।
ট্রেনটা যে পথে হারিয়ে যায় সেখানে জমাট পাহাড় ছাড়া আর কিছু নেই।
বলা দরকার, এখানে পাহাড় ছাড়া আর এমনিতেও আর কিছু নেইও।
রেলগাড়িটা কোত্থেকে আসে আবার কোথাই বা গায়েব হয়ে যায় সেটা কেউ বলতে পারেনি।
সবই গালগল্প।
পথ হারানো কাউবয়রা গল্পবাজ হয়।
তবে কাউবয়েরা কেউ এই ভূতুরে রেলগাড়িতে উঠার কথা জীবনেও ভাবেনি। আমাদের জনি কাউডেন তো অবশ্যই না।
জনি বয়সে তরুণ। পেশায় স্বর্ণ সন্ধানী।
সম্পদ বলতে ওর ছিল অমায়িক ব্যবহার , দৃঢ় বুদ্ধিমত্তা আর সব সময়ের জন্য তৈরি একটা হাসি।
এইসব গুণ একসাথে মিলে জনিকে প্রিয়পাত্র আর জন প্রিয় করে তুলেছিল।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খামারবাড়ি, বিচ্ছিন্ন খনি আর দক্ষিণ-পশ্চিমের ক্রমবর্ধমান শহরগুলিতে সবাই চিনত জনিকে। পছন্দ করত বেশ।
অল্প সময়ের মধ্যে অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকোর বেশিরভাগ জায়গায় স্বর্ণ সন্ধানী হিসাবে কাজ শেষ করে ফেলেছে আমাদের জনি ।
তবে আজকাল বেশ অস্থিরতায় ভুগছে ।
এত দীর্ঘ পরিশ্রমের পরও এক- একটা জায়গা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া স্বর্ণ বিক্রি করে কয়েকশো ডলারের বেশি উপার্জন করতে পারেনি।
কিন্তু আর সব স্বর্ণ সন্ধানিদের মত জনি ও স্বপ্নবাজ। মনে প্রানে বিশ্বাস করে, আর সব সময় ভাবে, সামনের যে কোন পাহাড়ে লুকিয়ে আছে ওর - এল ডোরাডো। স্বপ্নের স্বর্ণখনি।
যে কোন সময় পেয়ে যেতে পারে তাল তাল সোনা।
১৮৭০ সালের শেষের দিকে পশ্চিমের বাতাসে শোনা গেল ফিস্ফ । ডস কাবেজাস পর্বতমালার় সোনার খনির উত্তেজক সব গল্প। লোকজন বলাবলি করছে।
তখনই টম্বস্টোন ছেড়ে উত্তর-পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করল ।
তাড়াহুড়া করেই চলে এসেছে। এইসব গল্প অন্য খনি সন্ধানী মানুষের কানে গেলে আর রক্ষা নেই। দলে দলে সবাই চলে আসবে এই বিরান ভূমিতে। তখন কিছুই পাওয়া যাবে না। নিয়ম হিসাবে যে আগে পাবে খনির মালিক সে-ই হবে।
যতটা সংক্ষিপ্ত রাস্তা জানা ছিল সেইসব ধরেই চলে এসেছে জনি।
সময়টা গ্রীষ্মের মাঝামাঝি ।
গরম পড়েছে একশো দশ ডিগ্রি ফারেন হাইট।
চলার পথে জনি আবিস্কার করল, ওয়াটার হোল পেতে হলে ওকে আরও টানা সত্তর মাইল যেতে হবে !
তাতেও কুছ পরোয়া নেই জনির। মনটা আত্ন বিশ্বাসে টনটনে। পাহাড়ি একটা গাধার পিঠে করে যাত্রা করেছে।
সাথে হালকা মালপত্র। যতটুকু না হলে একদমই চলবে না, অমন মাল সামান নিয়েছে সঙ্গে । জলের ক্যান্টিনটা রেখেছিল ওর নিজের আবিস্কার করা ক্যানভাসের ব্যাগের মধ্যে। সুন্দর কায়দা করে ব্যাগটা বানানো। যত গরম পড়ুক ভেতরের জল থাকবে হিম হিম।
সীমান্তের কাছাকাছি শহরগুলোতে থাকার সময় বেশ কয়েকবার দেখেছে , মেক্সিকানরা বাড়ি ঘরের সামনের ফুটপাথের ছায়ায় বসে মাটির তৈরি বাসন পত্র বিক্রি করে।
ক্যানভাসের ব্যাগ বানানোর আইডিয়া পেয়েছিল ওখান থেকেই।
যাত্রার শুরুতেই হিসাব কষে দেখেছিল , একদিনেই ড্রাগন পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে শুকনো হ্রদের সামনে পৌঁছে যাবে।
হ্রদের তীরে ক্যাম্প করবে।
সামান্য বিশ্রাম নিয়ে রাতের বেলা কিচকিচে বালু ভর্তি শুকনো হ্রদ পাড় হয়ে যেতে পারবে অনায়াসে।
হ্রদটা একদম শুকনো খটখটে। আকারে বিশাল। রোদের তাপে শুকনা বালি আরও বেশি গরম হয়ে আছে।
উত্তর দিক দিয়ে গেলে সহজেই উইলকক্স স্টেজ রোড পেয়ে যাবে। কিন্তু সময় লাগবে বেশি।
সরাসরি শুকনা জলাভূমির উপর দিয়ে গেলে পথ অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়ে পুরো একটা দিন বেঁচে যাবে।
তবে পথভ্রষ্ট হবার সুযোগ আছে। চারিদিকে ধু ধু বালি ছাড়া দিগন্ত চেনার অন্য কোন রাস্তা নেই। কিন্তু রাতের বেলা অন্য কথা। তারার আলোতে সহজেই যেতে পারবে।
পথও হারাবে না।
মোটামুটি চিন্তা ভাবনা ছাড়া আয়েশি একটা ভাব ধরে জনি এগিয়ে যেতে লাগল।
মাঝে মাঝে বাম কাঁধের দিকে ফিরে এক দৃষ্টিতে দিগন্তের দিকে তাকাত। ওখানেই লাইম পিক পাহাড়টা ।
মনে প্রাণে চেষ্টা করত সূর্যের উপস্থিতি ভুলে থাকতে । ধাউস বারান্দাওয়ালা টুপিটা কপালের সামনের দিকে টেনে নামিয়ে রেখেছে। সূর্যের জ্বলন্ত রশ্মির হাত থেকে রক্ষা পাবার আশায় ।
পাহাড়ের গোঁড়ায় পৌঁছে গেল একটা সময়।হ্রদের একদম কাছে।
ক্ষুদে একটা গুহা পেয়ে ওখানেই ক্যাম্প বানাল। গুহা বলা ঠিক হবে না। পাহাড়ের গায়ের বড় একটা ফাটল আর কি।
সূর্যাস্ত পর্যন্ত যদি ঘুমাতে পারে তাহলে রাতের বেলা শুকনা হ্রদ পাড় হয়ে পরদিন দুপুরে বড় রাস্তায় পৌঁছে যেতে পারবে।
সহজ হিসাব।
গাধাটাকে জল পান করিয়ে নিজেও সামান্য পান করল ।সঙ্গে ঠাণ্ডা বিস্কুট ছিল। ছোট্ট প্রাণীটার সাথে ভাগ করে খেয়ে নিল ।
গাধাটার নাম ও রেখেছিল জেনি। জনি আর জেনি । মানিকজোড়।
জেনির পিঠ থেকে স্যাডেল , জিন আর মালপত্রের ব্যাগ নামিয়ে ওকে ছেড়ে দিল। খানিক বিশ্রাম নিক অবলা প্রাণীটা। দীর্ঘ চলার পথে শত শত মাইল পাড়ি দিয়েছে ওরা। কখনই খুঁটিতে বেঁধে রাখেনি জেনিকে ।
সাপ খেদানোর জন্য বড় লাঠি দিয়ে ঝোপ ঝাড়ে আঘাত করল কয়েক বার। শেষে পাহাড়ের খাঁজের মধ্যে আরামদায়ক একটা পজিশনে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
ওর ঘুম ভেঙ্গে গেল । ভয়াল এক চিৎকারের শব্দে।
ঘুম ভাঙ্গার পরও চুপ করে শুয়ে রইল কয়েকটা মুহূর্ত।
পাশে ঠেস দিয়ে রাখা রাইফেলটা তুলে নিল প্রথমে। সাবধানে উঠে গুহার ফাটলের সামনে দাঁড়াল। এতক্ষণে মগজ কাজ করা শুরু করেছে। বুঝতে পারল , চিৎকারটা ছিল বুনো মরু বিড়ালের । সন্দেহ নেই ওটার লক্ষ্য জেনি। ওর আদরের গাধাটা।
বাইরে ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকার।
ওর দ্বিতীয় চিন্তাটা হল , আরও আগেই পথে নামা উচিৎ ছিল। বড্ড বেশি সময় ঘুমিয়েছে ।ওর সমস্ত উদ্বেগ ছিল জেনিকে নিয়ে । অন্ধকারে কিছুই দেখতে পারছে না। কান পেতে সতর্ক ভাবে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
তবে শব্দ ঠিকই শুনতে পেল।
তাতেই বুঝল বুনো বিড়ালটা ওর কাজ শেষ করে ফেলছে। যেই জন্য এসেছে সেটা করেই ফেলেছে শয়তানটা।
অন্ধকারে শব্দ লক্ষ্য করে গুলি করতে পারে। কিন্তু মনে আশা! - জেনি বেঁচে আছে। অবলা প্রাণীটার শরীরে লাগতে পারে ওর গুলি।
যখন রক্তাক্ত ক্ষুদে জেনিকে খুঁজে পেল, ততক্ষণে পাহাড়ি বিড়ালটা হত্যাযজ্ঞ শেষ করে কয়েক খাবলা মাংস খেয়ে অগুনতি পাথরের আড়ালে হারিয়ে গেছে।
ওর পায়ের সামনে পড়ে আছে ছিন্ন ভিন্ন গাধাটা।
জনির গলার ভেতরে শক্ত কেমন একটা দলা পাকিয়ে উঠল।
কত দীর্ঘ নিঃসঙ্গ পথ ওরা দুইজনে এক সঙ্গে চলেছে। মাল পত্রের পোঁটলা নিয়ে অক্লান্ত ভাবে হেঁটে গেছে প্রাণীটা। ক্লান্ত হয়নি। জনিকে হতাশ করেনি একবারের জন্যও।
ক্যাম্পে ফিরে গেল। চোখ এখন অন্ধকারে অভ্যস্ত ।
থমকে তাকিয়ে রইল মাটির দিকে ।
বুনো বিড়ালের আক্রমণের সময় গাধাটা প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। তখন ওর পায়ের আঘাতে প্যাক স্যাডেলের থাকা মাল পত্র এখানে ওখানে ছিটকে পড়েছে। পুনরুদ্ধারের অযোগ্য হয়ে গেছে সবই ।
ফেটে যাওয়া ময়দার বস্তা আর বেকনের ফালিগুলো দানাদার মাটির সাথে এমন ভাবে মিশে গেছে যা দেখে জনি হাহাকার করে উঠল ।
ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে বা খিস্তি খেউর করে সময় নষ্ট করার বান্দা জনি না।
আধা ডজন শুকনো বিস্কুট আর সামান্য কিছু বেকন যত্নের সাথে তুলে নিয়ে জামার হাতায় মুছে নিল ভাল করে।
জলের ক্যানটিন পরীক্ষা করে দেখল ।
অর্ধেকেরও বেশি ভর্তি ছিল জিনিসটা।
ক্যান্টিনটা ধরে, শুকনো হ্রদের দিকে তাকিয়ে, সমস্ত সম্ভাবনা বিবেচনা করে দেখল।
চাঁদ উঠেছে।
সামনের সমতল ভূমি যেন বিশাল একটা রুপালি চাদর । দিগন্ত থই থই। এমনিতে দিগন্তের দিকে তাকালে সামান্য বাঁকা রেখা দেখা যায়। আজ এই রুপালি রাতে তেমন বক্র রেখা চোখে পড়ল না জনির।
বুদ্ধিমানের মত কাজ হবে এখন দক্ষিণে ফিরে যাওয়া। নতুন করে মালপত্র আর একটা ঘোড়া জোগাড় করে আবার চেষ্টা করা।
কিন্তু কে না জানে স্বর্ণ অনুসন্ধানকারীরা এক ধরনের জুয়াড়ি।
ওর চোখের সামনে শুয়ে থাকা মড়া হ্রদটি ঠান্ডা এবং মনোরম।
গাধা ছাড়া ঘণ্টায় ছয় বা সাত মাইল হাঁটতে সক্ষম হওয়ার কথা ।
জনি মাত্র এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। তারপর ক্যান্টিন থেকে ছোট এক ঢোক পানীয় গলায় ঢেলে বেরিয়ে পড়ল।
রাতের বেলা পথ চলা অনেক সহজ। আকাশের চাঁদ জনিকে দিক চিনতে সাহায়্য করছিল।
বুটের নীচে শক্ত বালি।
দিনের আলো যখন ফুটে উঠল তখনও দেখল, চারিদিকে বালির সমুদ্র।
পাথরের নিচু একটা সমতলভূমি থাকার কথা। ওটা দেখলে প্রমাণ হবে, বড় রাস্তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তেমন কিছু না পেয়ে খানিকটা অবাক হল জনি।
চিন্তা ভাবনা না করে এখন শুধু সামনের দিকে হেঁটে যেতে হবে ওকে। যতক্ষণ না সূর্য ওকে ক্লান্ত করে ফতুর করে দিতে পারবে ।
পূর্ব দিকের সূর্যটা যেন আগুনের গোলা। আগুনের গোলাটা গোলাপি রঙ ধরে যত উপরে উঠছিল তাপও ততই বাড়ছিল।
পায়ের নীচের বালি তেতে বাতাসে কেমন একটা গন্ধ। শ্বাস নিতে মনে হচ্ছিল পোড়া চুল্লির ভেতরের বাতাস টেনে ফুসফুসে নিচ্ছে।
সূর্য যখন একদম মাথার উপরে , জনি বুঝল ওর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর গরমটা আজকে উপভোগ করছে।
এতগুলো বছর এই বিরান দেশের নানান সীমান্তে খনি খুঁজে বেড়িয়েছে। কত শত বার রোদে পুড়েছে। কিন্তু এমন গরম আগে কক্ষনো পায়নি।
টের পেল অলস হয়ে পড়ছে ওর ইন্দ্রিয়গুলো। শরীরের পেশীগুলো একটাও কাজ করছে না। মুখের ভেতরটা শুকনো খটখটে ।
মুখের ভেতরে জিহ্বাটা ফুলে কয়েকগুণ বড় হয়ে গেছে। আপাতত সামান্য একটু ছায়া পেলেই খুশি হত। যদি ছায়ার নীচে দাঁড়াতে পারত !মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত!
কিন্তু নেই।
জলাভূমির তলা খটখটে। মাটি এমন ভাবে শুঁকিয়েছে যেন পেল্লাই একটা চাকু দিয়ে ওখানে মাটি ফালা ফালা করেছে কেউ।
হোঁচট খেতে খেতে থমকে দাঁড়াল । ক্যান্টিন মুখে তুলে চুমুক দিল। গত পাঁচ ঘণ্টায় কতবার জল খেয়েছে বলতে পারবে না। ক্যান্টিনটা একদম হালকা হয়ে গেছে। অনুভব করল ইচ্ছে করলেই এখন এক সমুদ্র জল গিলে খেতে পারবে। রেড ইনডিয়ানরা গরুর মাংস রোদে শুকিয়ে যেমন বীফ জারকি বানায় ওর শরীরের সব মাংস তেমন হয়ে গেছে।
বিকেল চারটার দিকে ক্যান্টিনের শেষ জলটুকু গিলে ফেলল। আক্ষরিক অর্থেই জলটুকু ছিল একদম ফুটন্ত। শূন্য ক্যান্টিনটা দূরে ফেলে দিতেই শরীর যেন আরও হালকা হয়ে গেল। যেন মস্ত একটা বোঝা কমে গেল।
নতুন প্রাণশক্তি পেয়ে গটগট করে হেঁটে গেল প্রায় সিকি মাইল ।
সূর্যাস্ত পর্যন্ত টিকে থাকতে পারলেই হল।
আচমকা মাটিতে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়াল।
ট্র্যাক।
আরেক জোড়া বুটের ছাপ !
ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। জনির নিস্তেজ মন অবিশ্বাস্য সম্ভাবনার উপর মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছিল।
এই বিশাল শূন্যতার মধ্যে অন্য একজন মানুষ আছে ! অন্য একজন মানুষ যার কাছে জল থাকতে পারে !
তারপর খুব ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে সন্দেহের দানা বাঁধল। সন্দেহ পরিণত হল ভয়ে ।
এক পা তুলে সামনের বালির উপরের বুট প্রিন্টে উপর রাখল।
যা ভেবেছিল।
বুটের ছাপগুলো ওর নিজেই।
রাউনড সার্কেল ধরে একই পথে হেঁটে বেড়াচ্ছিল সে। কতক্ষণ ধরে?- নিজেও জানে না। ক্লান্তির কারনে সূর্য দেখে দিশা ঠিক রাখতে পারেনি।
ক্লান্তি আর হতাশায় বসে পড়ল জনি। এবং কাঁদতে লাগল।
যদিও চোখের জলে আর কোনও আর্দ্রতা ছিল না।
বসে রইল, কারণ হাল ছেড়ে দিয়েছে ।
জানে না কোথায় আছে বা কোন পথ দিয়ে আবার শুরু করবে।
খামাখা হেঁটে লাভ কী ?
প্রতিটা পদক্ষেপ আবার তাকে নিয়ে যাবে ফেলে আসা গহীন মরুভূমিতে ।
বরং অপেক্ষা করবে।
অন্ধকারের জন্য অপেক্ষা করাই ভালো। তাহলে রাতের চাঁদ অন্তত কম্পাসের মত দিশা দেখাবে ।
ঠায় বসে থেকে দোদুল্যমান ইন্দ্রিয়গুলোকে ধরে রাখার চেষ্টা করল।
চেষ্টা করছে চিন্তা ভাবনা সহজ খাতে চালানোর।
এবং তখনই জনি দেখতে পেল।
মরুভূমিতে যেমন হয় আর কী ।
ওর মনের চাহিদা মরীচিকা হয়ে দেখা দিল।
প্রথম দেখল কেবল জল।
শুকনো বালি ভর্তি হ্রদটা এখন আর শুকনো নেই। নীলাভ ফিরোজা টলটলে জলে ভর্তি। ছল ছল করে ঢেউ বইছে।
জনি চেষ্টা করে উঠে দাঁড়াল। সামনের দিকে এগিয়ে গেল ।সহজাত ভাবে ।
তারপর হাত নামিয়ে দিল।
কারণ এত ভোগান্তির পরও এইসব কী জিনিস , চিনতে পারার মত যথেষ্ট বুদ্ধি ছিল ওর মাথায় ।
জিনিসটা মরীচিকা।
কিন্তু ছবিটি যেন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। আরও বাস্তব।
জনি চোখ বন্ধ করে ফেলল। এবং যখন চোখ খুলল তখন ট্রেনটা দেখতে পেল।
রেলগাড়িটা কোণাকোণি ভাবে ওর দিকেই আসছে।
প্রত্যেকটা জিনিস বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ।
বড় ইঞ্জিন।
পিছনে হলুদ রঙের বেশ কয়েকটা বগি।
প্রতিটি অংশ লিথোগ্রাফের মতো স্পষ্ট ছিল। ধোয়ার মোটা কুণ্ডলী উড়ে যাচ্ছে গল গল করে। হারিয়ে যাচ্ছে জলাভূমির দিকে।
এই দেশে আসার পর থেকেই জনি এই রেলগাড়ির গল্প শুনেছে । হাজার বার। হাজার মানুষের মুখে।
গাড়িটা ধীরে ধীরে ঝিক ঝিক করে যাচ্ছিল। অনেক ধীরে।
জনি কিন্তু রেল লাইন দেখতে পেল না। যেন জলাভূমির উপর দিয়েই রেলগাড়িটা এলো।
চেয়ে চেয়ে দেখছিল জনি। আতঙ্কে ওর অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। এমন কী তেষ্টার কথাও ভুলে গেছে।
আর অন্য কারও হলে কী হত, আমরা জানি না।
এই মুহূর্তে জনির মনে কেমন অচেনা অক্ষম একটা ক্রোধের জন্ম হল ।
যদি ? হ্যাঁ- যদি রেলগাড়িটা বাস্তব হত ? যদি জলাভূমিটা বাস্তব হত ?- সত্যি সত্যি প্রাণে বেঁচে যেত এখন।
নিশ্চিত মৃত্যুর সময় এই কিংবদন্তী ভূতুরে ট্রেনের দেখা পেল ?
এ কেমন রসিকতা ?
রেলগাড়ির তীক্ষ্ণ হুইসেল , ঘণ্টার ঝনঝন শব্দ আর অসম ট্র্যাকে চাকার ঘড় ঘর শব্দ শুনতে পেল।
হিস্টিরিয়া ওর সমস্ত ক্রোধ ধুয়ে ফেলল।
হাসতে শুরু করল পাগলের মত। দুই হাত উঁচু করে লাফাতে লাফাতে চিৎকার করতে লাগল । কিন্তু ওর শুকনো গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হল না।
একমাত্র শব্দ ছিল বেশ পরিষ্কার । চলন্ত ট্রেনের অবিরাম ধড় ফড়। কুউউ ঝিক ঝিক।
অবাক বিস্ময়ে আর খানিকটা ভয়ে আবিস্কার করল , সোজা ওর দিকেই আসছে রেলগাড়িটা।
আরও আরও বড় হচ্ছে আকারে ।
ঝিকিমিকি করছে হেড লাইটের সাথে জুড়ে থাকা পিতলের গোলাকার রিমটা । চাকার সাথে আঁটকে থাকা হাতলের মত পিস্টনগুলো ঘুরছে। সামনের ইঞ্জিন কেবিন থেকে কালি ঝুলি মাখা ময়লা একটা চেহারা উঁকি দিয়ে জনিকে দেখল।
জনির শরীরের প্রত্যেকটা পেশী চিৎকার করে যেন বলছিল, জনি পালাও। পালাও।
আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত পরেই রেলের চাকার ধাতব ফ্ল্যাঞ্জগুলো ওকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেবে।
মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত আগেও লাফ ঝাঁপ করা জনি এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
নড়াচড়া করতে পারছে না।
একদম শেষ মুহূর্তে ওকে না পিষে ঠিক চার বা পাঁচ ফুট পাশ দিয়ে রেলগাড়িটা চলে গেল। একদম চলে গেল বলা ভুল। গেল না।
ব্রেকগুলো এত জোড়ে চাপ দিয়েছিল, বিশালাকার লোহার চাকার সাথে ঘর্ষণে কুৎসিত ক্যাচ ক্যাচ শব্দে চারিদিক কেঁপে গেল। ইঞ্জিনের প্রত্যেকটা জোড়া এক সাথে মিলে মিশে প্রচণ্ড পরিশ্রম করে শেষে রেলগাড়িটা থামাতে পারল।
মস্ত একটা লোহার দানব ফুঁপিয়ে উঠে থামল যেন।
তখনও হিস হিস করছে ইঞ্জিন । প্রত্যেকটা বগির সাথে জোড়া লাগান আংটাগুলো টঙ- টাং শব্দ করছে তখনও।
জনি হাত বাড়ালেই অপার্থিব এই রেল গাড়িটা স্পর্শ করতে পারবে। কিন্তু ওর সাহসে কুলাচ্ছে না।
দ্বিতীয় বগির শেষ প্রান্তের দরজা খুলে গেল।
নীল রঙের কোট পরা একজন কন্ডাক্টর উঁচু সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন।
জনির পাশে দাঁড়িয়ে ডাকলেন: "উঠে পড়ুন। সবাই উঠে পড়ুন।’’
জনি পরিষ্কার দেখতে পারছে। শুনতেও পারছে সব। কিন্তু এক বিন্দুও নড়তে পারছে না।
নীল কোটের ভদ্রলোক খানিকটা অধৈর্য হয়ে তাগাদা দিলেন , ‘’ জলদি , জলদি। আমরা এমনিতেই অনেক দেরি করে ফেলেছি।’’
কন্টাক্টর কোটের পকেট থেকে শালগমের মত পকেট ঘড়িটা বের করে সময় দেখে বললেন, ‘’ পনের মিনিট দেরি হয়ে গেছে। এইখানে থামার কোন দরকারই ছিল না। অযথাই।’’
কন্টাক্টর ইঞ্জিনঘরের দিকে চেয়ে হাত তুলে পিতলের লণ্ঠনটা দেখালেন।
সঙ্গে সঙ্গে কয়লা মাখা চেহারার লোকটার মুণ্ডু ভেতরে চলে গেল। আবার চালু হল ইঞ্জিন।
কন্টাক্টর দ্রুত এগিয়ে এসে জনি হাত ধরে নিয়ে গেলেন ইঞ্জিনের পিছনের বগির দিকে। যেখান থেকে মাত্র খানিক আগে নীচে নেমেছিলেন তিনি।
ওরা দুইজন ট্রেনে উঠা মাত্র রেলগাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছুটতে লাগল।
ভেতরে লোহার দরজা। জনির সাধ্য নেই সেই দরজা খুলে যাত্রীদের বগির ভেতরে ঢুকবে।
কন্টাক্টর লোকটা নেহায়েত ভাল মানুষ। শক্ত হাতে দরজা খুলে বেশ আন্তরিক ভাবেই ধাক্কা দিয়ে বগির ভেতরে জনিকে ঢুকিয়ে দিলেন।
বগির ভেতরটা ভর্তিই বলা যায়। একগাদা ঝাপসা কৌতূহলী মুখ, কয়লার ধোঁয়া, আর তামাকের তীব্র গন্ধ জনিকে কেমন তন্দ্রালু করে ফেলল।
কন্টাক্টর যত্ন করে ওকে একটা সিটে বসিয়ে দিলেন।
জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে জনি অমনটা ও নিজেও বিশ্বাস করে না। অস্পষ্ট ধোঁয়ার মধ্যে একগাদা মানুষ ওর ব্যাপারে সহানুভূতি সুরে কিছু বলছে সেটা বুঝতে পারল।
একজনকে বলতে শুনল , ‘’বেচারা, অনেক কষ্ট হয়েছে ওর। তবে ভাল মত শেষ হয়েছে সব । পেরেছে শেষ পর্যন্ত। সাবাস। ’’
“জল।” জনির গলা থেকে অবোধ্য শব্দ বেরিয়ে এলো। ”জল দিন আমাকে।”
“ আরে বেঁচে আছে দেখি ।” বিস্মিত সুরে বলল একজন। “ জলদি করে এক পেয়ালা জল নিয়ে এসো। কিন্তু বেশি দিও না। মাত্র এক পেয়ালা।”
জনি চোখ খুলল। গাড়ির কন্টাক্টর বা যাত্রীদের দেখবে আশা করেছিল ।
অপরিচিত কিছু মানুষ। একটা ঘর। আর কাচের এক জানালা দেখতে পেল। জানালার উপর রঙ করে ইংরেজিতে কিছু লেখা।
জনি চোখ বন্ধ করে আবার খুলল। কী বিশ্বাস করবে বুঝতে পারছিল না।
কোনটা বাস্তব আর কোনটা কল্পনা?
কিন্তু জল যখন ওর ফাটা ঠোঁট আর ফোলা জিভের উপর দিয়ে ঢুকে পড়ল তখন সব হিসাব মিলে গেল । ওর শরীর এটাকেই বাস্তব হিসেবে মেনে নিল।
প্রথমে তারা খুব সামান্য পরিমাণে দিল। মাত্র এক ফোঁটা , এক ফোঁটা করে। ঢোক গেলার পরে আবার এক ফোঁটা জল। তারপর অনেক পর আবার এক ফোঁটা।
এবং অনেক সময় পর অবশেষে সব শব্দ মিলিয়ে প্রশ্ন করতে পারল, সে এখন কোথায় ?
লোকগুলো জানালো জনি এখন উইলকক্স শহরের শেরিফের অফিসে আছে।
মার্কহ্যাম নামে এক লোক শহরের বাইরে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে ওকে একই পথে গোল গোল করে ঘুরে বেড়াতে দেখে ধরে নিয়ে এসেছে। এই শহরের প্রায় সবাই জানতো জনির পরিচয় ।
শেষে সবাই ওর ব্যাপারেই জানতে চাইল। জনি কোথায় ছিল ? ফিরছিলই বা কোত্থেকে ?
জনি ওর কাহিনিটাই বলল।
ওর একমাত্র সঙ্গী গাধাটার অপমৃত্যু, শুকনো জলাভূমি পার হওয়া। ভূতুরে রেলগাড়ির কথাও বলল ।
সব।
উপস্থিত লোকগুলো সবজান্তার মত মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, অমন হয়। মরুভূমির চাঁদি ফাটা গরম আর তেষ্টা অমন অদ্ভুত কল্পনার জন্ম দেয়। নতুন কিছু না।
জনি শেষে জিজ্ঞেস করল , আজ কী বার ?
জবাব শুনেই ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
রবিবার। সকাল ।
হতেই পারে না। শনিবার সন্ধ্যার সময় মৃত শুকনো জলাভূমির কিচকিচে বালির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সে।
কাল সন্ধ্যার ঠিক পর পরই নাকি মার্কহ্যাম তাকে খুঁজে পেয়েছিল।
যদি শরীর একদম সুস্থ থাকত তারপরও শনিবার বিকেল চারটায় হাঁটা শুরু করে সূর্যাস্তের মধ্যে উইলকক্স শহরের কাছাকাছি যাওয়া ওর পক্ষে একেবারে অসম্ভব ছিল।
মাঝের দূরত্ব অনেক মাইল।
জনি আবার ওর গল্পটা বলে যোগ করল, সেই ট্রেন ওকে তুলে নিয়েছিল পথের মাঝখান থেকে।
লোকগুলো ওর কথা পাত্তাই দিল না। অমনটা হয় নাকি ? নিশ্চয়ই দিন তারিখের হিসাব গুলিয়ে ফেলেছে জনি।
এবার কিন্তু জনি জোর গলায় তর্ক শুরু করল। ওর পরিষ্কার মনে আছে কোন দিন কী বারে কখন টম্বস্টোন শহর ছেড়ে চলে গেছে, কখন সে শুকনো হ্রদে প্রবেশ করেছে। সব ওর মনে আছে।
কেউ কি আর ওর কথা মানে ?
সবার একই যুক্তি, অমন গরমে দিশা হারিয়ে কত মানুষ স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলে। এ আর নতুন কী ! এটা তো শুধু দিন তারিখের হিসাব।
কিন্তু জনি কাউডেন জানে ওর সাথে কী হয়েছিল। মানুষ যাই বলুক , ওর অভিজ্ঞতা ওর কাছে চরম বাস্তব। তখনও ওর যুক্তিবোধ কাজ করছিল।
সেই ভরা জোছনার রাতে অপার্থিব রেলগাড়িটা জনি সত্যিই দেখেছিল। চেপেছিল সেই ট্রেনের বগিতে।
উপস্থিত লোকজনের হাজার যুক্তি আর তোপের মুখেও নিজের গল্পে অটল রইল জনি।
আর এর ফলে লাভের মধ্যে এটাই হল, উইলকক্স শহরের শেরিফের অফিস ছেড়ে যাওয়ার আগে "পাগল জনি" ডাকনাম অর্জন করে ফেলল।
পাগল শব্দটা সারা জীবনের জন্য জুড়ে গিয়েছিল ওর নামের সাথে ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন