পাশের বাড়ির ডাইনি
….……………………………………………………………..
আমাদের মহল্লাটা ছিল একদম শান্ত আর নিঝুম। কোন রকম হই হল্লা কেওয়াজ কখনই ছিল না। একদম কাচের মত শান্ত পরিবেশ।
এর মধ্যে হল কী , কোত্থেকে যেন এক ডাইনি এসে হাজির হল।
তোমরা প্রশ্ন করতে পার , আমি জানলাম কেমন করে ? - উনি যে একজন ডাইনি ?
এটা ঠিক, উনাকে দেখলে ঠিক ডাইনি বলে মনেও হয় না। কালো কুচকুচে গাউন পরেছেন। সেটা তো স্টাইল করে আজকাল অনেকেই পরে। পায়ের জুতা লম্বা। সরু। প্রায় কোষা নৌকার সাইজের। অমন হয়তো সস্তা পেয়ে কিনেছেন।
মাথায় সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের মত টুপি। সেটাও কালো কুচকুচে। সেটাও হতেই পারে।
ভ্যাবলার সামনেই যখন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন , কী খোকা কেমন আছে ? তখনই উনার টুপির ভেতর থেকে ক্ষুদে পিচ্চি সাইজের দুটো বাদুড় উড়ে গেল। তখনও সন্দেহ হয়নি। অমন পিচ্চি বাদুড় উড়ে যেতেই পারে। চামচিকা বলে ওদের।
কিন্তু ধরতে পারলাম কখন ?
হয়তো তুমি ও ধরতে পারবে, যদি উনাকে মুদির দোকানে গিয়ে কেনাকাটা করতে দেখ।
উনি পাকরাশিদের দোকানে গিয়ে চিনির পোঁটলার দিয়ে আঙ্গুল তুলে বললেন , অ্যাঁই চিনি ? চলে আয়।
ও মাগো মা। সাথে সাথেই এক কেজি চিনির পোঁটলা উড়ে এসে উনার বেতের ঝুড়িতে চুপচাপ বসে রইল। আবার ডিমের ঝুড়ির দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন , এক গণ্ডা ডিম । চলে অ্যাঁয়।
ডিমগুলো লোহার তারের ঝুড়িতে ঝুলছিল। সাথে সাথে হাঁসের চারটে বড় বড় ডিম উড়ে চলে এলো উনার ঝুড়িতে।
অমন দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে উনি একজন ডাইনি।
তবে চুপি চুপি বলে রাখি । আমি কিন্তু প্রথম দিনই ধরতে পেরেছিলাম।
সেইদিন উনি ভ্যানে করে উনার মালপত্র নিয়ে আমাদের পাশের বাসায় নামলেন। ভ্যানের দরজা খুলে বললেন, তোরা সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকে যা।
হায় হায়। সাথে সাথে চেয়ার , টেবিল সহ বাকি সব আসবাবপত্র সবাই টুক টুক করে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। একদম এডগার এলান পোঁ সাহেবের গল্পের মত ! ব্যাপারটা দেখে আমি তো একে বারে ইয়ে হয়ে গেলাম। মানে যেটাকে সবাই বলে থ হয়ে যাওয়া। শুধু থ না । দ- ধ- ন সবই হয়ে গেলাম।
তখনই আমি বুঝে গেলাম। উনি একজন ডাইনি।
পরদিন পেল্লাই সব টিনের কৌটার রঙ নিয়ে এসে উনার বাড়ি রঙ করতে লাগলেন। বললে বিশ্বাস করবে না। উড়ে উড়ে বাড়ি রঙ করলেন। আলকাতরার মত কালো কুচকুচে রঙ। পাকা জামের মত কালো।
কালো রঙ আমার প্রিয় না। কিন্তু উনার বাড়ি। উনি কী রঙ করবেন সেটা উনার ব্যাপার। আমি বলার কে ?
আরও একটা জিনিস খেয়াল করলে তুমি ও ধরতে পারবে।
সেটা হল প্রত্যেক সোমবার সকালে উনি জামাকাপড় কেঁচে দড়িতে শুকাতে দেন। সবই কালো কুচকুচে গাউন। কালো মোজা। আর সেই সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের মত টুপি।
সন্ধ্যার পর উনি দড়িতে বাঁধা উনার পোষা ডাইনোসর নিয়ে হাঁটতে বেরন। একদম ছোট সাইজের ডাইনোসর। পিচ্চিসরাস আর কী । এই সময় উনার হাতে থাকে কাচের স্বচ্ছ বয়াম। ভেতরে একগাদা জোনাকি পোকা। সেই পোকার আলোতে পথ দেখেন উনি। জোনাকি পোকার আলো কী সুন্দর !
প্রতিবেশী হিসাবে উনার তুলনা নেই। উনার বাড়ি ঘর সব সময় চকচকে পরিষ্কার। উনার ঝাড়ুটা খানিক পর পর ঘুরে ঘুরে সব কিছু একা একাই ঝাঁট দেয়। এমন কী গাছ থেকে একটা পাতা খসে পড়লেও সেটা কাজ শুরু করে।
আজব কাণ্ড !
আমরা উনার নাম দিলাম আতুরি বুড়ি। সেটা ধর গিয়ে বিভুতিভূষণ বাবুর প্রতি সম্মান রেখেই।
এলাকার কেউ অসুস্থ হলে উনি সেই বাড়িতে ঝুড়ি ভর্তি বিস্কুট আর চিনামাটির বাউল ভর্তি গরম স্যুপ পাঠিয়ে দেন। বিস্কুটগুলো এত মজার। দুনিয়ার কোন বেকারিতে অমন বিস্কুট পাবে না। মাখন আর চকলেটের কুঁচি ভর্তি।
বিকেলে ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে যদি তোমার ঘুড়ি উঁচু গাছের ডালে আটকে যায়, তবে সাথে সাথেই উনি হাত বাড়িয়ে মানে হাত লম্বা করে সেই ঘুড়ি ছাড়িয়ে তোমার কাছে ফেরত দেবে।
যদি ঘুড়ি না থাকে ? তবে তোমার নাটাইয়ের সুতার সাথে নিজেকে বেঁধে উড়ে যাবেন আকাশে।
বেশ ভালই মন্ত্র তন্ত্র জানেন। একবার ভ্যাবলা চার আনা দিয়ে কাঠি লজেন্স কিনে বাড়ি যাচ্ছিল। সরু কাঠির মাথায় মার্বেলের সাইজের লজেন্স। উনি সুং সাং মন্ত্র পড়তেই সেটা হয়ে গেল পাঁচ সের ওজনের লজেন্স। কাঠিটা হয়ে গেল বাঁশ।
ছটাক শনপাপড়ি কিনে উনার কাছে গেলেই সেটা এক দেড় কিলো বানিয়ে দিতেন।
খুব চুপচাপ আর শান্ত জীবন যাপন করতেন আতুরি বুড়ি ।
রোজ রাতের বেলায় একদম ঠিক আটটার সময় ঘুমিয়ে যেতেন। ঘড়ি ধরে। কাটায় কাঁটায়।
একবার উঁকি দিয়ে দেখেছি। ঘরের মধ্যে বিশাল এক ঝাড় লন্ঠনের মধ্যে দুই পা উলটে বাদুরের মত ঝুলে ঘুমাচ্ছেন উনি। পাশে বড় বড় ডানাওয়ালা দুটো বাদুড় ঝুলছে। হালকা নাক ডাকছেন। নিয়মিত ছন্দে।
মাসে একবার উনার দুই বোন বেড়াতে আসে। বা উনার পুরানো বান্ধবীরা আসেন। সেইসব রাত্রে বেশ রান্না বান্না আর খাওয়ার আয়োজন হয়। পেল্লাই লোহার হাড়ি ভর্তি সবুজ সবজির স্যুপ। স্যুপ এরা বেশ পছন্দ করে।
সবাই মিলে বাচ্চাদের মত সেই ওপেনটি বায়স্কোপ খেলাটা খেলে।
ওপেনটি বাইস্কোপ
নাইন টেইন টেইস্কোপ
সুলতানা বিবিয়ানা
সাহেব বাবুর বৈঠক খানা
আজ বলেছে যেতে
পান সুপারি খেতে
পানের ভিতর মরিচ বাটা
স্প্রিং এর চাবি আটা
যার নাম রেনু বালা
তাকে দিবো মুক্তার মালা।
বাগানে বাদুরদের জন্য স্নান করার একটা বাথটাব বসিয়েছেন বেশ খরচ করে। বাথটাবে আবার চায়না মাটির ভাঙ্গা পেয়ালা তশতরী সুন্দর করে টাইলসের মত বসিয়েছেন।
সত্যি বলতে কী উনার সাথে আমাদের সময় বেশ ভালই কাটে।
এর মধ্যে একদিন একটা কাণ্ড হল। আমরা মানে আমি , ভ্যাবলা আর ভ্যাবলার দিদি উনার বাসায় বসে বিস্কুট খাচ্ছিলাম। সাথে চা।
অমন সময় বাইরের দরজা কে যেন ভীষণ শব্দে খট খট করল।
দরজা খুলতেই দেখি পাশের বাসার জনাব দাস্তগির আর উনার গিন্নী দাড়িয়ে আছেন। উনাদের চেহারায় রাগ, ক্ষোভ, বিরক্তি, ঘৃণা অমন হাবিজাবি অনেক কিছু।
রাগি গলায় দস্তগিরের গিন্নী বললেন , আপনাকে এই বাসা ছেড়ে চলে যেতে হবে।
পাশ থেকে পোঁ ধরলেন জনাব দস্তগির, হ্যাঁ চলে যেতে হবে। আমরা চাই না কোন ডাইনি আমাদের পাশে থাকুক। বিরক্তকর ব্যাপার।
এই প্রথম আমাদের ডাইনিকে এত রেগে যেতে দেখলাম। এত রাগতে কখনই দেখিনি উনাকে।
আমরা যে রাগ করিনি তেমনটা বলব না।
ডাইনি করলেন কি পাশের সেলফ থেকে কাচের একটা বোতল তুলে নিলেন। সেটা ভর্তি পাঁচনের মত একটা জিনিস। বোতলের সেই পাঁচন ছুড়ে দিলেন দস্তগির দম্পতির উপর। সাথে সাথে সাবানের ফেনার মত বুদ বুদে উনারা ডুবে গেলেন। বুদবুদ সব সরে যেতেই দেখলাম একজন সুন্দর মত রাজকুমার আর সুন্দরী রাজকন্যা দাড়িয়ে আছে। গায়ে চুমকির পোশাক। মাথায় তাজ।
হায় হায়।
উনারা বেশ খুশি। আর সঙ্গত কারনেই আগের সব কথা ভুলে গেছেন। খুশি হয়ে চলে গেলেন উনারা। কোন রাগ অভিমান নেই।
আমরা আতুরি বুড়িকে বললাম , আমাকে আর ভ্যাবলাকে সুন্দর রাজপুত্র বানিয়ে দিন। ভ্যাবলার দিদিকে রাজকন্যা।
ডাইনি হেসে বললেন, না। দরকার নেই। ভাল ছেলে মেয়েরা রাজপুত্র আর রাজকন্যার চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি সুন্দর !

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন