সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মাছ

 দেশে থাকতে বাজার করিনি কক্ষনো ।



বাপ করতো । বড়  জোর বৃষ্টির দিনে মহল্লার মোড় থেকে দুই হালি ডিম কিনে আনা পর্যন্ত ছিল আমার দৌড় । 

একদম ছোট বেলায় কাপড় কাঁচার জন্য নীলের গুড়া আনতে পাঠাতো । বা একটা গোল্লা সাবান । 

ব্যস। আমার দৌড় শেষ ।

একদম কিশোর বয়সে দেশ ছেড়েছি বাজার করার ঝক্কি বুঝিনি  ।

তবে বাজার করা যে প্রায় কুরুক্ষেত্র  থেকে  জ্যান্ত  ফিরে আসার মত কোন ব্যাপার সেটা বুঝেছি ।

প্রতিবেশি বাসন্তী পিসির বাবা বাজার থেকে প্রায়ই মেজাজ গরম করে ফিরত । 

বাজারে নাকি আগুন লেগেছে । রোজই চেঁচিয়ে বলতেন ।

ব্যাপারটা সাঙ্ঘাতিক । রোজই আগুন লাগে কি ভাবে ?  আর উনি বেঁচে ফেরেন কিভাবে ?

অনেক সময় লাগত উনার ঠাণ্ডা হতে । প্রায় এক লোটা মিসরির জল গিলত ঢকঢক করে   ।  

মাথার তালু ঘেমে যেত ।  অনেকক্ষণ দাওয়ায় বসে  বড় বড় করে শ্বাস নিত । 

উনার গিন্নি শুধু মাঝে মাঝে বিনবিন করে বলতেন - ভাল মাছ পাইলা না ?

এই । আর কোন অভিযোগ নেই ।

বেশির ভাগ সময় কুঁচ চিংড়ি , টেঙরা, কাচকি আর চেউয়া মাছ আনত । 

বাজারের  থলে রাখলেই মিনি গিয়ে  কেমন বিষাদ মাখা গলায় মিউ মিউ করতো ।

মিনির গায়ের রঙ বাদামি শাদা ডোরা কাটা । ও বাঘের কেমন  অ্যান্টি হয় ।

চটের থলে থেকে মাছ বের করে একটা মাছ মিনির সামনে রেখে চাপা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়তেন বাসন্তী পিসির মা ।

মিনি সেটা মুখে তুলে চম্পট দিত । ভাব দেখে মনে হচ্ছে ভুলে যদি আবার আবার ফেরত নিয়ে নেয় ?

অনেকগুলো বছর পর দেশে গিয়ে এক শীতের বিকেলে বাজারে গেলাম ।  মুসি গুড় কিনতে । সাথে আমাদের এক  কর্মচারী । মুসি গুড় দিয়ে চা বানালে কেমন চায়েস চায়েস লাগে ।

মানে চা আর পায়েসের মিকচার ।

তখন আবিস্কার করলাম বিরাট  সংখ্যক মানুষ মাছের বাজারে মন খারাপ করে ঘুরঘুর করে । উজ্জ্বল আলোর নিচে রুপালি মাছের আঁশ ঝিকিমিকি করে  কুবেরের রত্নভাণ্ডারের মত । মাছের চোখগুলো দামি কোন রত্ন  বলে ভ্রম হয় । 

এরা   শুকনো কলাপাতার মত চেহারা করে  পুরো মাছের বাজার ঘুরে ।

পেল্লাই মাছ নিয়ে যারা বসে আছে তারা এদের চেহারা দেখে   পকেটের অবস্থা বুঝে ফেলে । তাচ্ছিল্য করে । বাজে জবাব দেয় । 

একজন দাম বলার পর মাছ   বিক্রেতা কেমন ট্যাঁসরা হেসে  জবাব দিল- 'সাব ওই দামে তো মাছ পাইবেন না। মাছের আইস্তা ( আঁশ ) লইয়া যান ।'

সম্ভাব্য ক্রেতা লজ্জায় লাল হয়ে দ্রুত চলে গেল । 

সারা জীবন মাছ খেতে বসলে তার হয়তো মনে পড়বে এই অপমান ।

অথবা ভুলে যাবে নতুন নতুন অপমানে ।

মাছ  বিক্রেতার ব্যবহারে অবাক হলাম না । 

এই দেশে কলেজের শিক্ষক , সরকারী কর্মকর্তা , জ্ঞানী প্রকাশক  হতে  মন্ত্রী লেভেলের মানুষ পর্যন্ত চাঁছাছোলা কথা বলে ।

আর এ তো ভেজা লুঙ্গি পড়া গলায় গামছা দেয়া  মাছ বিক্রতা ।  

 সাধারন ক্রেতাগুলো    শেষে গিয়ে বাসি  রয়না আর  লাল দাগওয়ালা তিতপুঁটি দামাদামি করে ।  

এক আধ ভাগা নিয়ে বাড়ি ফেরে । 

পুরো ব্যাপারটা  শাদা চোখে দেখলে খুব কষ্টকর । যদি আপনি দেখতে পান আর  কি ।

মাছের প্রতি আমার নোলা নেই । যদি মা রান্না করে সেটা ভিন্ন 'কাহানি' 

মাছ কি এক কায়দা করে ম্যারিনেট করে নেয় মা । পরে সেটা বেগুন , পটল , শর্ষে , বরবটি বা সিম দিয়ে জাদুকরী কায়দায় রান্না করে ।

আমার মা যদি  পিরানহা বা  মেগালোডন ও রান্না করে সেটা খেতে লা জবাব হবে । আমি নিশ্চিত ।

অনেকগুলো বছর সি ফুড  সেফ হিসাবে কাজ করেছি । প্রায় সব মাছ খেয়েছি । মারলিন , টিউনা, ম্যালেট , প্যারট ফিস , নাইল পারচ , ব্যারামানডি , হেইক ' লেমন শোল, ম্যাকরেল , মিল্কফিস    ...।ইত্যাদি ইত্যাদি ।

বললে বিরক্ত হবেন মাছের প্রতি আর তেমন আগ্রহ কাজ করতো না ।

নরডিক দেশগুলোতে আসলে মাছ খাই । কারন সস্তা ।

মাঝে মাঝে জলের দামে ছেড়ে দেয় । তাই  বাজারে গেলে মাছের জায়গায় এক বার হলেও ঢু মারি ।

অবাক হই  যখন পাঁচ ইউরো করে স্মোক স্যামন ছেড়ে দেয় । 

অবিশ্বাস্য ।

প্যাকেট এত সুন্দর করা যেন কাউকে উপহার দেয়া যাবে । ভেতরে মাছের তেলের মধ্যেই থাকে ওটা । নিজের শরীর  থেকে তেল ছাড়ছে ।

 শুনেছি,  নরওয়ের জাহাজগুলোতে  ধরার পর  অর্ধেক মাছ বরফ দিয়ে রাখে । বাকি অর্ধেক স্মোক চেম্বারে ঢুকিয়ে ঝলসে ফেলে । বহনের  সুবিধের জন্য ।  বিক্রির সুবিধের জন্য । 

  ধোঁয়া দিয়ে স্যামন শুকানোর সময় নানান কিছু ব্যবহার করে । হিকরি , আপেল, পেকান   বা ওক কাঠের কুঁচি । সাথে তেজপাতা , রসুন ,  লবণ , লালচিনি   দেয়া যেতে পারে স্বাদ আর সৌরভের জন্য ।

আমি সস্তা পেলেই মাছ এনে ফ্রিজ ভর্তি করে রাখি ।

বাইরে বরফ পরে । আমি স্মোক স্যামন আর  চনমন করা কোন পানীয় খাই ।

নিজেকে অপরাধী মনে হয় ।  বাংলাদেশের মাছের বাজারের সেই হতাশ ক্রেতাদের কথা কোন কারন ছাড়াই মনে পড়ে ।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...