সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্রেরা মরে গেলে চুমকি হয়ে যায় ৭

 

 

 

কত কথা হল কবির সাথে আরও এক দফা চা খেলাম বিপিন তো পুরোপুরি চা -খোর আদমি তবে সব সময় তাড়াহুড়ো করে চা গিলতে গিয়ে জিভ পুড়িয়ে ফেলে

 

ততক্ষণে কুয়াশা কেটে গেছে হলুদ রোদ উঠেছে , সুন্দর নদী থেকে তখনও  ঠাণ্ডা হওয়া ভেসে আসছে

 

দূরে পুরানো হলুদ একটা দালান দেখা যাচ্ছে লম্বা লম্বা থাম আর খিলান ওটা হংস সিনেমা হল  আগে হংস থিয়েটার বলতো লোকে ইংরেজদের বানানো শহরে যখন ইংরেজরা ছিল তখন টমটম গাড়িতে করে ওখানে নাটক দেখতে যেত 

আমার শহরে ইংরেজদের ছায়া এখনো রয়ে গেছে

রেল লাইন আর পোস্ট অফিস আছে কয়েকটা   ইষ্টিশনের  পাশে লাল গুমটি ঘর লাল টালির ছাদ পাশে ঝাঁকরা নিম গাছ নিম গাছে চিরকি মিরকি পাতা কাঠ কয়লার মত কালো একটা কাক নিমফল খায় বসে বসে

 

 

গুমটি ঘরের ভেতরে পুরানো দিনের ইয়া ঢাউস একটা ঘড়ি নষ্ট কবে যেন সারে চারটার সময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আর মেরামত করা হয়নি  টেবিল ভর্তি হরেক কাগজ পত্র আর পেতলের অদ্ভুত একটা লন্ঠন ওটাতে লাল-হলুদ আর সবুজ কাঁচ বসানো পৃথিবীর সব রেল লাইন শেষ হয় স্বপ্নের মত একটা ইষ্টিশনে গিয়ে

 

আমার শহরেও তাই

 

ইষ্টিশনের দুই ধরে বনকলমির ঝোপ শেয়াল কাটার দঙ্গল হলুদ রঙের ফুল হয়ে আছে শেয়াল কাঁটার ঝোপে মেক্সিকান গাছ এটা পতুরগিজ জাহাজিরা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছিল এই ফুলটা

 

 

আমরা হেঁটে যাই

 

কাঁচা বাঁশ কেটে চায়ের দোকান বানানো হয়েছে একটা  সদ্য কাঁটা বাঁশের ঘ্রানে নেশার মত লাগে ভেতরে মাটির চুলায় ফটফট করে জ্বলছে সাই বাবলার ডালাপালা কালো কুঁচ কুচে ইয়া একটা কড়াইতে ভাঁজা হচ্ছে আলুর চপ আর বেগুনের ফুলুরি খদ্দেরের নাকের সামনে ঝুলছে বাসি পাউরুটি আর কালো ছিট পরা হলুদ কলা

 

চায়ের দোকানের বাঁশের চাটাইয়ের দেয়ালে সেটে আছে বাংলা সিনেমার বিদঘুটে সব পোস্টার নায়ক- নায়িকা- ভিলেন সবার হাতে পিস্তল আজব

 

 শীতের হাওয়া ঝুপ করে নেমে পরে আমার শহরে বৈচিঁ আর সোনালু লতা কাঁপে থর থর করে ভেজা মাটির মিষ্টি ঘ্রান

টায়ার পুড়িয়ে ভাত রান্না করে দুঃখিনী মা এক গাদা অচেনা পাখী ইংরেজি V হরফের মত উড়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও হয়তো ওদের প্রিয় কোন চারন ভূমিতে যেখানে নরম আর ভেজা ঘাস পাওয়া যাবে জলাভুমি ভর্তি গুগলি শামুক আর কচি লেবু পাতা রঙের পোকা পাবে অগুনিত

 

 

কবির সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল আমাদের

বিপিন কবি হতে চায় আমি চাই না কারন জানি কবিরা সারা জীবন কষ্ট করে আমি জানি,  বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস কবিরা মরার পর তাদের কবরে ফুল দেয়া হয় তাদের নামে আলোচনা সভা হয় তাদের নামে সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয় তাদের নামে রাস্তা ঘাঁট বাথরুম সব বানানো হয় তাদের কবিতাগুলো হয়  জাতীয় সম্পদ 

 

 

কিন্তু কবি যত দিন বেঁচে থাকে তার দিনরাত্রি হয় অনন্ত দুঃস্বপ্নের খামার

তার লেখা পাণ্ডুলিপি ধূসর থেকে ধূসর হয় বাক্স বন্দি হয়ে পরে থাকে তার কবিতা-যেগুলো সব ঘুমের দেশের নাম না জানা পরীর মত

কবি কোন বায়ুভুক রবীন্দ্রনাথ নয়

তাকে করতে হয় চালডাল -তেল নুনের বন্দোবস্ত  চাইলেও নতুন তামাক পাতার মত টাটকা কবিতা সে লিখতে পারে না রোজ

তাকে যোগার করতে হয় বাচ্চার স্কুলের ফী কে না জানে আজকাল গৌরীসেন নেই,  সবার খরচ যোগাবে ফেল কড়ি মাখো তেল যুগে আছি আমরা

 

 

আমার শহরে যে সব  কবি আছে তারা সবাই ধনী  নিজের পয়সায় বই বের করে কবি হয় নানান অনুষ্ঠানের সভাপতি হয় কী ভাবে-  কী ভাবে যেন আজব সব নামের সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে যায় উনারা মাত্র একটা বই লিখেই

আমি কবি হতে চাই না

জন্ম থেকেই অচেনা মানসিক রোগে আক্রান্ত আমি

এই বিবর্ণ ধূসর জনপদ ভাল লাগে না জুতার বাক্সের মত ঘর বাড়ি মরচে ধরা টিনের চালের উপর রুপালী অ্যালুমিনিয়ামের টিভি অ্যাণটিনা সরু দেয়াল তুলে প্রতিবেশীর সাথে বিভেদের প্রাচীরতোলা-কিছু ভাল লাগে না

 

কয়েক ঘর বসতবাড়ির পর ইয়া বড় বড় এক একটা আবর্জনার স্তূপ সারা বছর ওখানে মরা বেড়াল পরে থাকে পচে গন্ধ বের হবার জন্য

 

দিন রাত নষ্ট করা যাপিত এই জীবন অসহ্য আয়ুর তিন ভাগের দুই ভাগ সময় নষ্ট হয় শুধু চাল ডাল কেনার পয়সা যোগার করার জন্য শ্রম বিক্রি করতে করতে

 

চারিদিকে নষ্ট হবার প্রতিযোগিতা মফস্বলের দুঃখিনী মায়ের ছেলে উচ্চ শিক্ষার জন্য শহরে এসে রাজনীতিবিদদের পাশার ঘুঁটি হয়ে মারা যায়

 

তাই আমি কবি হতে চাই না

কারন কবিরা মিথ্যা স্বপ্ন দেখায় মিথ্যা স্বর্গের চেয়ে সত্যের নরক অনেক ভাল যদিও লোকে সেটা বলে নালোকে মিথ্যা নিয়ে বাঁচতে ভালবাসে আমি শুধু পালাতে চাই দূরে কোথাও পালাতে চাই

 

হয়তো দক্ষিনের কোন দ্বীপে-লাল চিনির মত সৈকত আর নারকেল গাছের ছায়ায় ছয় তারের গীটার বাজিয়ে বিবাগী সুর তোলে কোন আদিবাসি যুবক বিদেশী টুরিস্টদের হাঁক ডাক নেই সৈকত মাছ ভাঁজার নিঃসঙ্গ দোকান কেরোসিন কাঠের বাক্সে বরফের কুঁচি দিয়ে ঠেসে রাখা সারডিন আর টুনা

 

 

নারকেল গাছের পাতার ছাউনি দিয়ে বানানো শুড়িখানা কাঁচের লম্বা পানপাত্রে নীল মদ টুরিস্টদের মন ভোলানোর জন্য গ্লাসের কোনায় কায়দা করে গুঁজে দেয়া কাগজের রঙিন ছাতা  আর কাঠগোলাপ ফুল অথবা দূরের নাইরোবি শহর রোদেলা জানজিবার দ্বীপ হাতির রঙের মত কিলিমাঞ্জারো পাহাড় মাসাইমারা গ্রাম 

 

কেন যেন মনে হয় আমার শহরের শেষ ইসটিশনটা পার হলেই অচেনা নতুন দেশ

যেখানে গাছের পাতাগুলো পযন্ত অচেনা শুকনো বাকল থেকে দারুচিনির ঘ্রান বের হয়

সারা বছর কাঁঠালিচাঁপা ফুলের ঘ্রান ভেসে আসে অচেনা কোন আনন্দলোক থেকে

কল্পনা বিলাসীরা কষ্ট পায় হরদম

আমিও পাই 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...