সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্রেরা মরে গেলে চুমকি হয়ে যায় ১৪

 ১৪

 

 

 

 

কি রে?' দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বললেন মিল্লাত ভাই। ' কবির সাথে খুব ঘুর ঘুর করিস আজকাল। ঘটনা কী?'

 

 

ভয় পেয়ে গেলাম

 

 

রাস্তার মোড়ে দাঁড়া করিয়েছেন আমাকে। মিল্লাত ভাইকে কেউ পছন্দ করি না। বখাটে , রংবাজ টাইপের মানুষ। ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।

পরপর তিন বার ক্লাস নাইনে গোঁত্তা খাবার পর ক্লান্ত হয়ে বাদ দিয়েছেন।

 

মহল্লার মোড়ের মুদির দোকানের সামনে সকাল দশটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত নিয়মিত উনাকে পাওয়া যায়।

 

চোঙা জিনসের প্যান্ট  আর  চক্রা বক্রা হাফ হাতা জামা পরেন। শীতে মাফলার ঝোলে গলায়। মাফলারটা কত বড় কে জানে?

ছয় সাত বার প্যাঁচ দেয়ার পরও গলার দুই পাশ দিয়ে পায়ের হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে থাকে।

চোখে অন্ধদের মত কালো চশমা ।

ত্রিশ সেকেন্ড পর পর মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে ঠিক করছেন। পায়ে ইয়া বড় বড় সাদা কেডস।

 

সব মিলিয়ে বিচিত্র এক নমুনা বটে !

 

' না মিল্লাত ভাই এমনিতেই।' ভয় পেয়ে ঢোক গিললাম।

 

কায়দা করে সিগারেটের ধোয়া ছাড়লেন মিল্লাত ভাই।

 

'কবি হালায় একটা শুয়োরের বাচ্চা । বললেন তিক্ত গলায় ।' নিজেকে কাজী নজরুল ইসলাম মনে করে । তা তুই কবিতা ফবিতা লিখিস নাকি?'

 

'না মিল্লাত ভাই । লিখি না।'

 

' মিথ্যে কথা বলিস কেন? এক থাপ্পর মেরে সব দাঁত ফেলে দেবো। তখন এপির সাধন দর্শন চূর্ণ ব্যবহার করতে হবে।'

 

' না লিখি না কবিতা ।পারি না।' সত্য কথাই বললাম।

 

'শোন আমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে।' চারিদিকে সতর্ক চোখে চেয়ে বললেন মিল্লাত ভাই। ' তবে কাজটা করে দিতে হবে গোপনে। কোন কাক ,শালিক , শকুন, চড়ুই যেন টের না পায়।'

 

 

ভয়ে আরেকটা ঢোক গিললাম । উবব করে শব্দ হলো বেশ। আমি যে ভয় পেয়েছি সেটা বুঝতে পেরে মিল্লাদ ভাই তৃপ্তির হাসি হাসলেন।

 

কুৎসিত দাঁতগুলো দেখা গেল। একেকটার সাইজ একেক রকম ।

মুখ ভর্তি শাক আলুর দোকান যেন ।

 

' কি কাজ?' জানতে চাইলাম ।

 

' তেমন কিছু না । অলস সুরে বললেন মিল্লাত ভাই। ' আমি জানি তুই চেষ্টা করলে সুন্দর করে চিঠি লিখতে পারবি। কবিতার লাইন ঢুকিয়ে সুন্দর অলংকার গয়না , উপমা ফুপমা দিয়ে প্রেমের চিঠি লিখে দিতে পারবি?'

 

বড় রকমের ধাক্কা খেলাম ।

 

'আমি... প্রেমের ...চিঠি।' মাথাটা তালগোল পাকিয়ে গেছে।

 

' হ্যাঁ চিঠি...' খ্যাক খ্যাক করে হাসলেন মিল্লাদ ভাই । আমি তার ফাঁদ থেকে বেরোতে পারবোনা , পুরোপুরি নিশ্চিত তিনি।

 

' কাকে লিখবেন?' ঘামতে ঘামতে বললাম ।

 

'তুই রেণুকে চিনিস?' চালবাজি একটা সুরে বললেন তিনি।

 

 

' চিনবো না কেন?'

 

 

আমাদের পাশের মহল্লার উত্তর দিকের একদম শেষ বাড়িটা ওদের, হলুদ রঙের একতলা দালান।

তবে অনেক বড় এলাকা জুড়ে বাগান।

 

এই বাড়ির বাগানে এমন সব গাছ আছে যা পুরো শহরে আর কারো বাড়ির বাগানে নেই .

 

 সূর্যমুখী নামে অদ্ভুত সুন্দর একটা ফুল আছে । সেটা আগে জানতাম না ।

একগাদা সূর্যমুখী ফুলে দেখি এই বাড়ির বাগানে । মায়াবী ফুলগুলো দেখে মন ভালো হয়ে যায় ।

 

 পুরো বাড়ির মধ্যে মন ভালো করে দেয়া একটা ভাব আছে, কোনো কারণ ছাড়াই।

 

 বিদেশি  ক্যালেন্ডার ছাড়া অমন বাড়ি থাকতে পারে কে জানত ।

 

 দুটো পলাশ গাছ আছে বাড়ির বাইরে। কোন এক মৌসুমে লাল পলাশ ফুলে পড়ে থাকে, ওখানে এখানে ।

 

এটাই রেণুদের বাড়ি ।

আর রেণু  আমাদের শহরের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে।

 আর কিছু বলার দরকার নেই বোধ হয়?

 

 হঠাৎ হঠাৎ  পথের মাঝে রেণুকে দেখতাম।

 

 কোত্থেকে যেন ফিরছে। মাথা নিচের দিকে । পথের ওপর চোখ। মিষ্টি একটা পণী টেইল করে ওর ঘন কালো চুলগুলো বাঁধা।

কে জানে খোলা চুলে ওকে কেমন দেখায়?

 

আমার তো মনে হয় , চুল ছাড়লে আকাশ মেঘলা হয়ে যাবে।  

ওর হাতে সব সময় বই থাকে। পাঠ্য বই।

নইলে তো আমাদের মধ্যে বই অদল বদল করে বন্ধুত্ব হয়ে যেত।

 

অন্তত কথা হত আমাদের মধ্যে।

 

তবে আমি জানি কখনই রেণুর সাথে কথা বলতে পারব না। আমার সেই সাহস নেই।

আর আমি এও জানি, পুরো শহরের সব ছেলে ছোকরা রেণুকে ভালবাসে ।

 

পৃথিবীর সব দেশে সব  শহরে রেণুর মত একটা মেয়ে থাকে।

 

 যারা পুরুষদের ভোলানোর জন্য কোনো চেষ্টাই করেনা। অথচ আশেপাশে সমস্ত পুরুষ ওদের প্রেমে পড়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে।

 

 আমরা একই ক্লাসে পড়ি ।তাই হয়তো ভয় পাই ওকে।

 

 কখনো কথা হয়নি আমাদের ।

 

শুধু কখনও কখনও মুখমুখি হেঁটে আসার  সময় দেখতাম, দুপুরের হলুদ

কড়া রোদে অথবা হেঁটে আসার পরিশ্রমে ওর নাকের ডগা আর ঠোঁটের উপর ঘামের ফোঁটা় জমেছে । আর পায়ে নুপুর ছিল ওর।

 

 আসলে সব মেয়েদের নুপুর পরা দরকার ।

 

'রেণুকে চিঠি লিখবেন আপনি?' চেঁচিয়ে উঠলাম।

 

থাবা মেরে আমার মুখ বন্ধ করলেন মিল্লাত ভাই।

 

'শয়তানের নাতি । চিৎকার করে সারা দুনিয়াকে জানাবি নাকি?' চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন তিনি। উনাকে এখন দেখাচ্ছিল শোলে সিনেমার গব্বর সিং এর মত। ' তর এত জ্বলুনি কেন? অ্যাঁ? পুরানা আশিক না কি?'

 

বহু কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম।

 

'শোন ।' আঙুল তুলে শাসিয়ে বললেন । ' কাল এই সময়ের মধ্যে কবিতা সহ একটা প্রেমপত্র চাই। না পেলে পিটিয়ে হাড্ডি গুড্ডি ভেঙ্গে পাউডার বানিয়ে ফেলব। মনে থাকে যেন ।'

 

প্যান্টের পকেট থেকে ময়লা তেলতেলে চিরুনি বের করে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে চলে গেলেন মিল্লাত ভাই। গুণগুণ করে হিন্দি গানের সুর ভাঁজছেন। পেয়ার আর দিল শব্দটা বুঝলাম শুধু।

 

 

সারা রাত দুঃস্বপ্ন দেখলাম।

যদিও সেটা ছিল হেমন্তের এক রাত।

তারপরও।

দেখলাম, আমার বিছানাটা আসলে ক্ষুদে একটা দ্বীপ। চারিদিকে থই থই সমুদ্র।

দ্বীপের চারিদিকে সাঁতার কাটছে পেল্লাই সাইজের এক হাঙর।

 

ভাল করে চেয়ে দেখি হাঙরের চেহারাটা - হুবহু মিল্লাত ভাইয়ের মত। কুৎসিত ভঙ্গীতে দাঁত বের করে হাসছে।

সকালে ঘুম ভেঙ্গে আবিস্কার করলাম- সামনে মস্ত বড় বিপদ।

 

মিল্লাত ভাইকে রোমান্টিক চিঠি- কবিতা সহ লিখে না দিলে মস্ত বড় বিপদে পড়ে যাব। কোন ভাবেই বাঁচতে পারব না। উনি মহল্লার মোড়ের সামনে মুদি দোকানটার বাইরে বসে থাকেন। ওখান দিয়ে একটা ভারুই পাখি উড়ে গেলেও মিল্লাত ভাইয়ের নজর ফাঁকি দিতে পারবে না।

 

অথচ উনার বাপ কত নিরীহ আর ভাল মানুষ !

কারও সাতে পাঁচে নয়ে ছয়ে নেই। কিন্তু ছেলেকে লাই দিতে দিতে পূর্ণ দৈঘ্য শয়তান বানিয়ে ফেলেছেন।

 

মিল্লাত ভাইয়ের আসল নাম জানি না। ভুলে গেছি। খুব ছোট বেলায় দেখতাম গরমের মউসুমে ঘাড়ে গলায় প্রচুর সাদা রঙের ঘামাচির পাউডার মেখে পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।

এত বেশি পাউডার দিতেন , মনে হত আটা-ময়দা দোকানে কাজ শেষ করে মাত্র ফিরছেন ।

 

তখনই আমরা আড়ালে-আবডালে মিল্লাত নামে ডাকা শুরু করেছিলাম। এই নামে একটা ঘামাচি পাউডার নাকি যেন পাউডার পাওয়া যেত।

 টিভিতে বিজ্ঞাপন দিত, এই গরমে সবার জন্য মিল্লাতের উপহার... ...পাউডার। হেন তেন ।

 

দুপুরে কাগজ-কলম নিয়ে বসলাম।

 ঘন্টাখানেক মাথার চুল ছিঁড়ে , দারুন কাব্যিক ভাষা আর উপমা দিয়ে একটা চিঠি লিখে ফেললাম। আধ পাতা।

 

লেখা শেষ হতেই মনে হল ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে আমার ।

 

বাপরে লেখা তো দারুণ কঠিন কাজ।

 

 বিকেলের খানিক আগেই মিল্লাত ভাই এসে হাজির হলেন । চোখে সানগ্লাস । মাথার চুল টেরি  কাটা । গাক গাক করে চুইং গাম চিবুচ্ছেন ।  শীত পড়তে বহু দেরি । তারপর ও জিন্সের জ্যাকেট চাপিয়েছেন গায়ে । বব্ধ উম্মাদ না হলে কেউ এমন পোষাক পরে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে না।

 

' লেখা শেষ?' প্রথমেই কাজের কথায় চলে গেলেন মিল্লাত ভাই।

 

 চিঠিটা বাড়িয়ে দিতেই থাবা মেরে নিয়ে বিড়বিড় করে পড়ে বললেন , ' খুব একটা ভাল হয়নি । জীবনবাবুর কবিতার মত লাগছে। তবে চিন্তা নেই । একশো একটা নীল খাম কিনেছি । লাভ লেটার দেওয়া জন্য নীল খাম নাকি খুব লাকি। আর তুই এক সপ্তাহ পর পর  যে কোন বেজোড় তারিখে  আমাকে এমন একটা করে চিঠি লিখে দিবি , ঠিক আছে?'

 

' আমিতো ভেবেছি এই একটাই।' ঢোক গিলে বললাম ।

 

 হাঙরের মত দাঁত বের করে হাসলেন মিল্লাত ভাই।

 

 নাপিতেরা দাঁড়ি গোঁপ কামানোর সময় যেভাবে থুতনি নেড়ে দেয় সে ভাবে আমার থুতনি নেড়ে বললেন, ' এক চিঠিতে কি আর কাজ হয় রে পাগল? তবে যত কম চিঠিতে কাজ হবে, সেটা তোর জন্যই মঙ্গল।'

 

 বলে   খ্যাঁক খ্যাঁক  করে হাসতে হাসতে চলে গেলেন মিল্লাত ভাই।

 

 আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে লাগলাম।

 

 

 

 

 শেষ বিকেলে কোন এক নামকরা স্যারের কাছে পড়া শেষ করে হেঁটে বাড়ি ফিরে রেণু । সাথে দু একজন বান্ধবী থাকে।

 

পুলিশ ফাঁড়িটা পাড় হলে খানিকটা নির্জন মত জায়গা।

 

কতগুলো বোতলব্রাশ আর গগন শিরিষ গাছ হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। ওখানে কি রেনুকে পাকড়াও করবে মিল্লাত ভাই?

 

 অতখানি সাহস   মিল্লাত ভাইয়ের হবে?

 

 সেই বিকেলে আমি অদ্ভুত রকমের অস্থিরতায় ভুগতে থাকি। অস্থিরতা সহজে আর কাটতে চায় না ।

কবি বা বিপিনের সাথে দেখা করা দরকার।

অত দূর হেঁটে কবির বাড়িতে গেলেও আজকাল উনাকে পাওয়া যায় না।

 

বিপিন আজকাল কোন পত্রিকা অফিসে ধর্না দিচ্ছে । ওকেও পাই না ।

 

সন্ধ্যার আগে হাঁটতে বেড়িয়ে গেলাম।

 

সোজা গুলশান সিনেমা হলের ওখানে ডিআইটি মার্কেটে। উদ্দেশ্য ছাড়াই হাঁটলাম।

 সুরবিতান, গানের ডালি, সরগম দোকানগুলোতে এমনিতেই ঘুরে বেড়ালাম।

 

দারুণ ব্যস্ত।

নতুন নতুন এলপিঁ আসছে ঢাকার পাটুয়াটুলি থেকে।

 

মোটা খাতা ঘেঁটে ঘেঁটে গান পছন্দ করে অর্ডার দিচ্ছে মানুষজন । একটা খালি ক্যাসেট কিনতে হয়। ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেট বলে। বেশ দাম। অখ্যাত কোম্পানি হলে ত্রিশ আর সনীর মত বিখ্যাত কোম্পানি হলে পঞ্চাশ টাকা।

 

গান রেকর্ড করার মজুরি কুড়ি টাকা।

তারপরও দোকানের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দোকানের ছয় থেকে চার জন কর্মচারী।

এমন শৌখিন মানুষজন আগে পরে আর দেখিনি আমি।

 

জীবন বোধ হয় অন্য মাত্রায় ছিল তখন। ছিল ভিন্ন আমেজে।

 

প্রত্যেকটা গানের দোকানের বাইরে কালো রঙের ইয়া বড় বড় দুটো সাউন্ড বক্স বসানো । ধিম ধিম করে বাজে যখন ওদের মর্জি ।

সেই সময় বিনাকা ঝংকার গীত নামে ভারতীয় গানের প্রচুর ক্যাসেট আসা শুরু করেছে ।

ওরা কি এক অদ্ভুত কায়দায় মরা ধরা গানের সাথে বাড়তি শব্দ যোগ করে দিত ।

শ্রোতারা বেশ পছন্দ করত।

 

 সন্ধ্যার পরই নিউ মেট্রো সিনেমা হলের ওই পথ  দিয়ে ফিরতাম।

 

 অদ্ভুত রকম জায়গাটা ।

 

 যেন পুরনো সময় আটকে আছে ।

 

এই জিনিস আর কেউ পেয়েছে কিনা আমি জানিনা ।

আমি বহু জায়গায় পেয়েছি । সময় যেখানে থমকে থাকে। বাতাসটা পর্যন্ত পুরানো দিনের।

 

কালির বাজার থেকে একে বেঁকে পথটা গেছে মেট্রো সিনেমা হলের দিকে। পাশে নদী। লেদ মেশিনের দোকান। তিব্বতে ইউনিয়া দাওয়াখানা।

 

কত কিছু।

 

একটা অন্ধ কফির কেরসিনের কুপি জ্বালিয়ে বসে থাকে ভিক্ষার আশায় ।

 

বহু দূর দূরান্ত পর্যন্ত ফাঁকা।

 

মানুষজন নেই।

 

অমন নিরালা জায়গায় কী মনে করে বসে থাকে কে জানে ! লোকজন নেই পয়সা দেবে কে?

 

এলুমিনিয়ামের চ্যাপ্টা থালায় পরম অবহেলায় পরে থাকে দুই একটা অ্যালুমিনিয়ামের পয়সা। চারকোণা পাঁচ পয়সা। নয়নতারা ফুলের মত দশ পয়সা।

 

কে জানে কি নিয়ে চিন্তা করে অন্ধ ফকির ! একা একাই মিটিমিটি হাসে।

 

আরও খানিক দূরে একটা টিনের কালাই করার দোকান। ওখানে টিনের মগ, বালতি, আর বেসিন বানায়। মোটা কাচি দিয়ে কায়দা করে টিন কাটে এক লোক।

গুণ গুণ করে গান গায়-

 

সাঁওতালি পর্বতে ছিল লোহার বাসর ঘর।

তারই মাঝে শুয়ে ছিল সোনার লখিন্দর।'

 

আরও খানিক পর ডেকোরেশনের দোকান।

 

ইয়া লম্বা দাড়িওয়ালা এক বুড়ো মত মানুষ সারাক্ষণ ক্যাশে বসে পান চিবুয়।

কী কী    মশলা দিয়ে পান খায় কে জানে। অদ্ভুত মিষ্টি একটা সৌরভ আসে।

 

দোকান ভর্তি কাঠের ফোলডিঙ চেয়ার। আইভরি রঙের বড় বড় তশতরী গাদা করে রাখা কাঁচের শো কেসের ভেতরে।

বিঘৎ খানেক লম্বা সস্তা কাঁচের গ্লাস। ফুল লতা পাতা আঁকা। গ্লাসে লেখা - অনেক প্রেম অনেক জ্বালা।

 সিরামিক আর টিনের বেসিন আছে এক জোড়া করে। তেলের ড্রামের সাথে কি কায়দায় ফিট করা।

 

আজকাল এদের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে।

 

লোকজন কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে হুট হাট করে।

 

বাড়ির ছাদে বা উঠানে শামিয়ানা টানিয়ে এইসব ডেকোরেশনের জিনিস ভাড়া করে আজকাল মেজবানি কড়া কমে যাচ্ছে।

 

কাজেই চিন্তিত মুখে পান চিবোয় ভদ্রলোক।

 

আর এর পর আবার খানিক জায়গা ফাঁকা।

 

সারা বছর এক ঝাঁক জোনাকি ঝিলিমিলি করে এখানে।

 

অনেক অনেক আগে পৃথিবীর আকাশে দুটো চাঁদ ছিল।

একটা এখনও আছে।

 

আর দ্বিতীয়টা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।

 

সেই ভাঙ্গা চাঁদের টুকরোর অর্ধেক ফেলা হয়েছে রেললাইনের পাথর হিসাবে।

বাকি অর্ধেক দিয়ে জোনাকি আর জেলি ফিস বানিয়েছেন ঈশ্বর।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...