সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্রেরা মরে গেলে চুমকি হয়ে যায় ৯

 

 

 

 

 

শহরের শেষ মাথায় ছিল গুলশান সিনেমা হলটা

 

গুলশান সম্ভবত ইরানী শব্দ মানে গোলাপ   বাগান ?

 

সিনেমা  হলের গায়ে গা ঠেকিয়ে   দোতালা  মার্কেট একতলায় মনিহারি দোকান দোতলা ভর্তি গানের রেকডের দোকান সুন্দর সব নাম গীত বিতানসরগম গানের ডালি 

 

দি মান ব্যাস্ত থাক ওরা খদ্দেরে গিজগিজ 

 

মোটা মোটা খাতা ভর্তি গানের কথা লেখা থাকতো ভাল জামা কাপড় পড়া শৌখিন  মানুষজন অনেক সময় নিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে গান পছন্দ কর বিশ টাকা করে নিত রেকডিঙের খরচমুড়ির টিনের মত বিশাল কালো স্পিকারে জোরে জোরে গান বাজ-পাপা ক্যাহতে হ্যায় ড়া নাম কারে গা..

 

 

মার্কেটের নিচে   বুড়ো এক  লোক পুরানো বই বিক্রি কর

শীতের বিকেলগুলোতে হেঁটে যেতাম বই কিনতে পুরো শহরে এই একজনই পুরানো বই বিক্রি করত 

 

কত দুর্লভ বই যে থাকত বলার মত না রাদুগা প্রকাশনীর দারুন সব বই পেতাম মালাইকাইটের ঝাঁপি বৃষ্টি আর নক্ষত্র সাগরতীরে রুপের ডালি খেলা আমার পশু বন্ধুরা সোনার পেয়ালা সার্কাসের ছেলে  অন্যান্য গল্প  

 

 

অনেক সময় ঘেঁটে মাত্র একটা বা দুটো বই কিনে বাড়ির পথ ধরতাম

 

 

চারিদিকে গহন  কমলা রঙের রোদ

 

 উলটো দিকেই পৌর পাঠাগার বড় একটা কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে 

বাইরে পুরানো দিনের দুটো ভিক্টোরিয়ান ল্যাম্পপোস্ট সন্ধ্যার পর পচা পনিরের মত আলো জ্বল 

 

ওখানে মাঝে মাঝে কবিকে দেখতে পেতাম

 

পৌর পাঠাগার ভর্তি ইয়া বড় বড় কাঠের আলমারি সামনে কাঁচ পুরানো হতে হতে কাচ গুলো গাঙ্গের জলে মত ঘোলা হয়ে গেছে ভেতরে ঠাসা বই নতুন বই কম, সবই ছেঁড়া আর বিবর্ণ চর্যাপদের সংগ্রহশালা যেন পাঠাগারের ভেতরে আলো একদম কম

 

ষাট পাওয়ারের লাল বাল্বগুলো টিনের শেডের ভেতরে ঘাপটি মেরে আছে পাঠকদের অবস্থা কাহিলওখানে বসে নিয়মিত যারা খবরের কাগজ পড়ে তারা এক মাসের মধ্যে রাতকানা- দিন কানা এমনকি দুপুর কানা  হয়ে যায়

 

আরও একটা সমস্যা ছিল

 

বাথরুমের দরজা নেই সেখানে চটের একটা বস্তা ঝুলে ভেতর থেকে প্রস্রাবের ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে আসে সব সময় বিচ্ছিরী গন্ধে অ্যামোনিয়া  ফেল মারে 

 

 রকম পাঠাগার পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ

 

প্রায়ই সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ দাদা চলে যায় টেবিলে টেবিলে রক্তশূন্য কড়ির মত সাদা রঙের মোমবাতি জ্বেলে দেয়  মোমবাতির জণ্ডিসের মত পাণ্ডুর আলোতে দৈনিক সংবাদপত্রগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে অলস-বেকার আর ভবঘুরে পাঠককবিকে প্রায় সময় খবরের কাগজ হাতে বসে থাকতে দেখতাম পাঠাগারের ভেতরে এক কোনে বসে থাকতেন

শুনেছিলাম চাকরি খুঁজতেন কবি

 

একদম বেকার তিনি বাইরে থেকে কবিকে দেখতে পেলে আর ভেতরে ঢুকতে চাইতাম না, লজ্জা পেতেন তিনি

 

 

শীতের সন্ধ্যার হেঁটে যেতাম 

 

ল্যাম্পপোস্টের নরম আলোতে সব কিছু বড্ড বেশি মায়াবী লাগত 

 

পাঠাগারের দোতলায় বড্ড বেশি হৈ চৈ হত শীতের সন্ধ্যাগুলোয় মঞ্চ নাটকের কতগুলো ছেলে পিলে রোজ এসে রিহারসেল কর টানা দেড় দুই মাস রিহারসেল শেষ করে নাটক মঞ্চস্থ করতো বেশির ভাগই রক্তকবরী, পায়ের আওয়াজ শোনা যায় বা যৌবতী কন্যার মন,  এই রকম নাম থাকতো

 

টিকিট বিক্রি হত সারা বিকেল

 

 শহরের রুচিবান মানুষজন কুড়ি থেকে পঞ্চাশ  টাকা খরচ করে নাটক দেখত

 

 

পাঠাগারের বাইরে কয়েকটা ঠেলা গাড়ি  হরেক কিছু বিক্রি হত বিশাল একটা অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচির মধ্যে নানান রকমের ডাল আর গরু ছাগলের বট দিয়ে বানানো হালিম বিক্রি হতো ইয়া মোটা একটা লোক সারাক্ষণ লোহার একটা বিদঘুটে চামচ দিয়ে নাড়াচাড়া করতো হালিমগুলো 

 

পাশেই লম্বা টুল ওখানে বসে ক্ষুধার্ত মানুষগুলো চামচে করে ফুরুত ফুরুত করে হালিম খেত খাওয়া শেষ হলে সবার প্লেট একটা বালতির মধ্যে ডুবিয়ে রাখত বিক্রেতা নতুন কোন খদ্দের পেলে বালতির ভেতর থেকে হাত ডুবিয়ে প্লেট তুলে আনত হালিমওয়ালা

গা ঘিনঘিনে একটা ব্যাপার

 

পাশে সারাক্ষণ দুই তিনটে কুকুর বসে থাকতো আশায় আশায় যদি কেউ হাড্ডি গুড্ডি ফেলে!

 

 

 

কবি সপ্তাহে একদিন সময় দিতেন আমাদের

 

আমরা তিনজন রেল লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম বহুদূর 

 

রেললাইনের দুই পাশে ঘন ঝোপঝাড় বনতুলসি, বনকলমি আর আকন্দের দঙ্গল বন তুলসির ঝোপ থেকে কেমন বুনো একটা ঝাঁঝাঁলো গন্ধ বের হয় সব মৌসুমে আর আছে একগাদা কড়ই গাছ সংখ্যায় কত কেউ জানে না সারাবছর কড়ই গাছের শুকনো গোল ছোট পাতা ঝরে পড়ে 

মনে হয় খুশি হয়ে কোন রাজা মুঠো ভর্তি করে মোহর ছুড়ে দিচ্ছে

রেললাইন ভর্তি সাদা চকচকে ছোট ছোট পাথর

 

 

এক ভরা জোছনার রাতে আমরা রেললাইন ধরে হাঁটতে দিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম

চাঁদের আলোতে পাথরের টুকরোগুলো চকচক করছে মনে হয় আরেকটা চাঁদ ভেঙ্গে ওটার টুকরোগুলো ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ রেললাইনের মাঝে

 

 

কী সুন্দর !  কী  সুন্দর !!  কী  সুন্দর !!!

 

 

সে এক অলৌকিক দৃশ্য

 

দারুন দৃশ্য না ? জানতে চাইলেন কবি

 

আমরা বিবাগী হয়ে মাথা নাড়লাম

 

কিছু বললাম না

 

 

আমরা প্রায়ই রাতে বের হয়ে পড়তাম রেল লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে কত দূর দুরান্ত পযন্ত চলে যেতাম

 

হাজার বলেও শেষ করা যাবে না আশেপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা ভরা  জোসনার রাতগুলোতে  গাছপালা-ঝোপঝাড় সব কিছুই চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজত চাঁদের আলোতে আবার অমাবস্যা রাতেও মুগ্ধ হতাম আকাশ ভর্তি চুমকির মত লক্ষ লক্ষ তারা ঝিকিমিকি করছে দূরের ঝোপঝাঁড়ে  লক্ষ লক্ষ তারা ঝিকিমিকি করছে

 

ওগুলো আসলে জোনাকি

 

 

দেখতাম অন্ধকারে কলা বাগানে ডানা ঝাপটে নেমে আসে সোনালী  বাদুড় পাকা ফসলের ক্ষেতে ঘুরঘুর করে  লোভী ইঁদুর ফসলের ঘ্রানে মাতাল ইঁদুর।  শুনি রাতজাগা পাখি ডাক   শেয়ালের ডাক শুনে অদ্ভুত রকমের শিহরন লাগতো মনে তক্কে তক্কে আছে সোনালী শয়তানটা  কার  বাড়ির মুরগি চুরির তালে আছে  কে বলবে ?

 

 

গতবছর  এই রেললাইনের পাশে এক জায়গাতে শেয়াল ধরা পড়েছিল বহুদিন ধরে মানুষকে জ্বালাছিল ব্যাটা শেয়ালটাকে ধরার পর এলাকার যুবক ছোকরা সবাই মিলে কেটে রান্না করে খেয়েছিল দূর দূরান্ত থেকে  কয়েক জন বুড়ো হাবড়া এসে মাংসের জন্য ঘ্যান ঘ্যান করছিল বারবার বলছিল- ওই বিল্লাল দে না দে না বাপ এক টুকরো হিয়ালের গোস

 

 

শেয়ালের মাংস খেলে নাকি বাতের ব্যাথ্যা ভাল হয়ে যায়

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...