সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চৈতালি হাওয়া বিষ ৭

 সাত 

 

 

 

কপাল ভাল সাবিহার,  কোটিপতি তৈমুর খন্দকারের মেয়ে নইলে হয়ত গার্মেন্টসে কাজ করতবা কোনও বাড়ির কাজের বুয়া হতলেখাপড়া শিখলে বড় জোর টাইপিস্টের চাকরি পেত এবং প্রচুর বানান ভুল করত এক পাতা টাইপ করতে গিয়ে

 

কিন্তু কপাল ভালো তৈমুর খন্দকারের একমাত্র মেয়ে ও

 

ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথরুমে নগ্ন হয়ে নিজের শরীর দেখে দেখে সাবিহা আবিষ্কার করছে,  ও মোটেও সুন্দরী না ফ্যাকাশে জৌলুসহীন চেহারা রুক্ষ পাথরের মত চামড়া বিড়ালের মত  বাদামি বড় বড় চোখ দুটো বড্ড অস্বস্তিকর   ফিগারটাও যাচ্ছে তাইলাকড়ির মত। আকর্ষণীয় মেদ নেই।তবে ওর পা দুটো সরু আর লম্বা লম্বা। এটাই যা শুধু  সান্তনার।

 

 

জন্ম থেকে লাই পেতে পেতে নষ্ট হয়ে গেছে ওএখন বয়স চলছে আঠারোদিন দুনিয়ার উপরে মহাবিরক্ত  মেজাজ সব সময় খিটখিটে  ক্লান্ত।  একটা জিনিস ভাল করেই বুঝে, রাজ্যের  যত হালি হালি সুদর্শন যুবক ওর পিছে ঘোরাঘুরি করে সবই ওর বাপের টাকার লোভে করেভালোবাসা বা প্রেম ট্রেম কিছু না

 

ছেলেদের বিশ্বাস করে না ওসারাদিন ম্যাগাজিন আর সিনেমা  দেখে সময় কাটায়যেসব ম্যাগাজিনগুলোতে খালি গায়ের সুদর্শন পুরুষের ছবি ছাপা হয় সেগুলি ওর প্রিয়

 

টাকার অভাব নেইবাপ দুই হাত ভর্তি টাকা দেয় ওকেখরচ করে বেশুমারসপ্তাহে চারবার পার্টি দেয় এক গাদা বান্ধবী নিয়ে মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে সিনেমা দেখে পার্টিতে অফুরন্ত দামি খাবার আর মদ সরবরাহ করেমাগনা খাবারের লোভে প্রচুর যুবক ওর পার্টিতে আসেবিনামূল্যে খাওয়া পানীয় পাবার লোভ বড্ড  সাংঘাতিক।   আর কিছু নাআড়ালে ওকে নিয়ে সবাই হাসে

 

দিনগুলি সাবিহার এক ঘেয়ে যাচ্ছিল

 

চৈত্র মাসের সেই সকালের কথাই বলছি

সকালের জলখাবার খেয়ে  গাড়ি নিয়ে বের হলো সাবিহাপার্লারে যাবে চুলে রঙও করাবে।  ভাবছে জিমে ও ভর্তি হবে। জিম করলে যদি ফিগারটা খোলতাই হয় !আর কোন গুণ  না থাকলেও গাড়ি ড্রাইভ করার গুণটা আছে ওরইচ্ছে করলে রেসিং কারের ড্রাইভার হতে পারতগেটের বাইরে বের হয়েই রুইতনকে দেখতে পেলবাপরে ! কী সুন্দর ফিগার মেয়েটার !

 

আহা , আমার ফিগারটা যদি এমন হতোভাবল সাবিহা

 

গাড়ির বনেট খুলে সামনে ঝুঁকে আছে রুইতনবিশ গজ দূরে ঝোপের আড়ালে হিসু করার ভঙ্গিতে বসে আছে মানিক মায়ের কথা ভাবছে, এই সময়েও গত রাতে নার্সকে ফোন দিয়ে বলেছে, মায়ের দিকে খেয়াল রাখতেকয়েক দিন পর ফিরবে ও

 

নীল রঙের মধ্যে সাদার বল প্রিন্ট শাড়ি পরে আছেন  রুইতন   পণী টেইল করা চুলগুলো বেঁধেছে নীল ফিতা দিয়ে।   অপূর্ব লাগছে 

 

 সাবিহার চোখে চোখ পড়ামাত্র হাত নেড়ে মিষ্টি হেসে বলল, আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবেন? আমার গাড়িটা নষ্ট হয়ে  গেছে

 

মেয়েটার সহজ সরল আচরণে মুগ্ধ হল সাবিহা

 

  ঈশ,  কী   একটা মেয়ে রে বাবা। একদম সাবলীল। যে কোন মডেল ফেল ।  

 সামনে মোটর গ্যারেজ আছেএসো, আমি তোমাকে নামিয়ে দেবোবলল।

 

আড়াল থেকে সবই শুনছিল মানিক বাহব্যাপারটা অত সহজ হল ?

 

গাড়িতে বসার মতো গ্যাস প্যাডেলে চাপ দিয়ে গতি বাড়িয়ে দিল সাবিহাস্পীড তুলে অন্যকে ভয় দেখাতে পছন্দ করে

 

তোমার গাড়ি ছিল ওটা ? সাবিহাই প্রথম কথা শুরু করল  খুব সুন্দর তো

 

আপনার পছন্দ হয়েছে ?  কথা চালানোর জন্য কথা বলছে রুইতনবিরক্ত হচ্ছে মনে মনে এত জোড়ে গাড়ি চালালে তো মানিকদাদা  ওদের অনুসরণ করতে পারবে না

 

তাড়াতাড়ি  দু হাতের তালু দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করে বলল, ‘আরে, আরে  এত জোরে চালাবেন না আমার ভয় করে

 

 আত্মতৃপ্তির হাসি হাসল  সাবিহা

 

 লুকিং গ্লাসের পিছনটা খেয়াল করল রুইতন  দেখা যাচ্ছে  না মানিক মোটকুটাকে   ব্যাটা  ঠিক মতো অনুসরণ করতে পারবে তো?

 

ভয় পেয়েছিলে ?’   হাসি মুখে প্রশ্ন করল  সাবিহা

 

হ্যাঁ, ভীষণ  আপনি কোথায় যাবেন ম্যাডাম?’

 

আমি যাব পার্লারে  গুলশানের দিকে

 

 আমাকে ওখানে নামিয়ে দিন  না  অনুনয় করল রুইতন    খুব জরুরি কাজ আছে ওখানে কাজ শেষ করে আবার ট্যাক্সি নিয়ে গাড়ির মেকানিকের কাছে যেতে পারব৷

 

সমস্যা নেইহাসি মুখে  বলল সাবিহা  সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠলো  হায়, হায় সর্বনাশআবার?’

 

 ‘কী  হয়েছে?’  তীক্ষ্ণ গলায় বলল রুইতন

 

  পুলিশ   সাবিহার গলায় হতাশা  ওভার স্পিডে গাড়ি চালিয়েছি

 

 হাত পা জমে বরফ হয়ে গেল  রুইতনেরপলক ফেলতে না ফেলতেই   ওদের  গাড়ির পাশে চলে এল পুলিশের মোটরসাইকেলটা ইয়া মোটা আলকাতরার মত  কালো অফিসারের মুখ দেখা গেল হাসছে

 

গাড়ি থামা ম্যাডাম  আপনি বেশি স্পিডে গাড়ি চালিয়ে ফেলেছেন তেলতেলে হাসি উপহার দিল  কালো অফিসার

 

পথের এক পাশে সাবিহা গাড়ি থামাতেই নেমে এল পুলিশের ইউনিফর্ম পরা কালো অফিসারগরমে বগল ঘেমে গেছে বেচারার।

 

জাহান্নামের চৌরাস্তায় যান আপনি   খেঁকিয়ে উঠল সাবিহা 

 

আপনার  আব্বু কেমন আছেন ম্যাডাম?’  আগের মতোই তেলতেলে হাসি হাসছে অফিসার

 

 সেটা উনাকেই  জিজ্ঞেস করবেন দেখা হলে রাগী গলায় বলল  সাবিহা

 

খসখস করে লিখে  ফাইনে রিসিটটা সাবিহার হাতে ধরিয়ে দিল  অফিসার   হাসি  দুই কানের   লতিতে গিয়ে ঠেকেছে সাবিহাকে ভাল করেই চেনে প্রত্যেক সপ্তাহে একবার করে  ফাইন  ধরিয়ে দেয় মেয়েটাকেবেশ লাগে ওর। মুম্বাই সিনেমা মার্কা একটা ভাব আছে না ?  এই মেয়েটাকে যদি পটাতে পারত !

 

হাসতে হাসতেই  অফিসারের   চোখ পড়ল  রুইতনের উপর  সতর্ক চোখে চেয়ে রইল   বাড়তি কয়েকটা মুহূর্ত  

 

আতঙ্কে গলা শুকিয়ে গেল রুইতনেরহাত দুটো হাঁটুর উপর শক্ত করে চেপে ধরে মুখটা পাথুরে করে অন্যদিকে চেয়ে রইল।

 

 সাবিহাকে লক্ষ্য করে লম্বা স্যালুট   ঠুকল অফিসার   তোষামুদে স্বরে বলল, ‘ স্যরি ম্যাডাম,  গাড়ি থামানোর জন্য  আপনি তো জানেন ডিউটিতে আছিঅনেক বেশি স্প্রিড তুলেছেন আজকেও।

   

জাহান্নামের চৌরাস্তায় যান আপনিগলায় কলসি বেঁধে ডুবে মরতে পারেন না ?’   আবারও   খেঁকিয়ে উঠল  সাবিহা 

 

অমলিন হাসি বিলিয়েই যাচ্ছে অফিসার।ডিউটি শেষ হলে আফিসে বসে কেমন রসিয়ে রসিয়ে ঘটনাটা বর্ণনা করবে সেটা আগাম ভেবে বেশ পুলকিত।   

 

 

কথা শেষ করেই এক টানে গাড়ি বড় রাস্তায় তুলে ফেলল  সাবিহা   গজগজ করছে 

 

 

 

 তখনই পিছন থেকে হুশ করে কমলা রংয়ের  একটা  গাড়ি চলে গেল

 

 আরে ওটা তোমার গাড়িটা না ?’   উঁচু গলায় অবাক  করা সুরে বলল সাবিহা

 

 ঢোক গিলল রুইতন  মানিক গাড়ি নিয়ে গেছে পরিষ্কার দেখেছে

 

 আরে না আমার গাড়ী হবে কেন?’

 

কী জানি!  আমার তো মনে হল তোমার গাড়ি !’  বোকার মতো বলল সাবিহা যাকগে   তোমাকে নামিয়ে পার্লারে  ফিরে যাই  ব্যাটা  পুলিশ অনেক দূর থেকে আমাকে অনুসরণ করবে  আমি জানি হাঁদাটা  আমার  প্রেমে পড়েছে

 

 দ্রুত ভাবছে  রুইতন  পুলিশের গাড়িটা দেখা যাচ্ছে নাকিন্তু সাবিহা যখন বলছে তখন নিশ্চয়ই পিছন পিছন আসবে।  দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে নতুন কোনো ঝামেলায় ফেঁসে যেতে পারে যে কোনও মুহূর্তেএটাই সবচেয়ে নির্জন রাস্তা। বড় রাস্তায় উঠলেই সব সুযোগ শেষ।

 

 ব্যাগ খুলে  কাচের  বোতলটা বের করে আনল  রুইতন   চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘শোনো মেয়ে , কোন রকম চালাকি করলেই  বিপদে পড়বে তুমি


 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...