সতেরো
সাবধানে বালিশ থেকে মাথা উঁচু করল সাবিহা।
জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে লুটিয়ে পড়ছে কামরার ভিতর। মরার মতো ঘুমাচ্ছে মেঘা আর পিচ্চি। নিঃশব্দে ভূতের মতো বাইরে চলে এল সাবিহা।
কালু মানিক জেগে আছে কিনা কে জানে। ঝুঁকিটা নিতে হবে। কোনও ভাবে পোকার কাছে যেতে পারলেই হল। পোকা ওকে রাজকুমারের মতো উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেবে।
পুরো বাড়িটা নিঝুম৷ থমথমে ।
ফ্রিজের গুঞ্জন আর ঘড়ির টিকটিক ছাড়া কোনও শব্দ নেই। রান্নাঘরের দরজা খুলে বাইরে চলে এল সাবিহা। এখান দিয়ে চাকরদের কোয়াটারে যেতে সুবিধা। পথ সংক্ষিপ্ত।
গলা উঁচু করে বারান্দার দিকে চাইল। মানিক বসে আছে।
রাত একটা পর্যন্ত জেগে ছিল মানিক । সারাদিনে দৌড়ঝাঁপ আর মায়ের মৃত্যু শোক ওকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। বেতের নরম সোফাটা বেশ আরামদায়ক। মধ্য রাতের পর গরম কমেছে একটু।
পিস্তলটা উরুর উপর রেখে ঘুমিয়ে গেছে বেচারা। হাল্কা নাক ডাকছে।
বিড়ালের মতো নিঃশব্দে পেছনের কোয়ার্টারে চলে এল সাবিহা।
কোয়াটারের ভেতরে দুই ভাইবোন আদৌ ঘুম আধো জাগরণে ছিল। উৎ পেতেই ছিল পোকা। খানিক পর পর জানালার ফাঁক করে মানিককে দেখছিল । মানিক ঠায় বসে আছে।
মাঝরাতের পর হঠাৎ করেই চাঁদটা উল্টো দিকে চলে গেছে।
পুরো বারান্দা ছায়া ছায়া অন্ধকার হয়ে গেছে। এত দূর থেকে বোঝার উপায় নেই, মানিক জেগে না ঘুমিয়ে । সাহসে কুলাচ্ছে না পোকার। কয়েকবারই ভেবেছিল কোন একটা অজুহাতে বাইরে বের হবে নাকি? কানের ব্যথাটা বারবার মনে করিয়ে দিল, দ্বিতীয়বারে মানিক মাথায় গুলি না করলেও পায়ে গুলি করে ল্যাংড়া বানিয়ে দেবে।
আধো ঘুমের মধ্যে রুইতন শুনতে পেলো, ওদের দরজা খুলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। কে যেন ভূতের মত ভেতরে ঢুকে পোকার বিছানার সামনে দাঁড়াল।
সাবিহার ফিসফিসে গলা শুনতে পেল, ‘পোকা আমি এসেছি।’
বিছানা থেকে উঠে সাবিহাকে কাছে টেনে নিল পোকা। ‘মানিক ঘুমিয়ে গেছে নাকি ?’
‘হ্যাঁ।’ ফিসফিস করে লোভনীয় গলায় বলল সাবিহা। ‘ চলো, আমরা পালিয়ে যাই।’
বাইরে তাকালো পোকা । মানিক পিস্তলের জাদুর কথা আবার মনে পড়ে গেল । ওকে ঠিকই খরগোশের মত ধরে ফেলবে মানিক ।
‘হারামজাদার কাছে পিস্তল আছে।’ ঢোক গিলে পোকা। ‘দেখনি তখন কী অবস্থা করেছে আমার।’
কামরা চারদিকে তাকাল সাবিহা। ‘রুইতন কোথায় ?’
‘ পাশের রুমে ঘুমাচ্ছে। আস্তে কথা বল।’
সাবিহাকে জড়িয়ে ধরল পোকা। অন্ধকারে মিশে গেল দুই শরীর ।
পাশের কামরাতে দাঁড়িয়ে সব শুনল সব দেখল রুইতন। সাবিহার উপর যুক্তিহীন ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেল সে। ওর ভাইকে কেড়ে নিয়েছে হারামজাদি মাগি। এই মুহূর্তে যতটা কষ্ট হচ্ছে ঠিক ততটাই কষ্ট দিতে হবে মেয়েটাকে। সেই সাথে আলাদা করে ফেলতে হবে দুজনকে।
জানালার পাশে চলে গেল রুইতন। কাচের ফালিগুলো আস্তে করে খুলে নিতেই ফাঁকা হয়ে গেল জানালা। বের হয়ে এল বাইরে। আস্তে আস্তে এগিয়ে ঢুকে পড়ল গাড়ির গ্য্যারেজের ভিতর। কয়েক মুহূর্ত খুঁজতেই পেয়ে গেল - যা খুঁজছিল।
বেলচা।
জিনিসটা নিয়ে সাবধানে বাইরে চলে এলো ।
এক ঘণ্টা সময় লাগল দুঃখীরামের কবরটা খুঁজতে। আরও আধা ঘণ্টা লাগল বালির তলা থাকে লাশটা বের করে আনতে।
ততক্ষণে রাত দুটো বেজে গেছে। চাঁদ মাথার উপরে। মানিক নাক ডাকছে । মেঘা ঘুমিয়ে আছে। স্বপ্ন দেখছে শিশিরকে। পিচ্চি ঘুমের মধ্যে হাসছে।
পোকা আর সাবিহা বিছানায় শুয়ে আছে । ক্লান্ত।
নির্জনবাস বাড়ির বারোশো ফুট দূরে বালির উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে আব্দুল হাই। পাশে দুজন অফিসার । বদরুল আর মনোজ। ঘুমোচ্ছে ওরা। সাথে রাইফেল। ঢাকা থেকে একটা পেরিস্কোপ পাঠিয়েছেন গাউস চৌধুরী। ওতে চোখ রেখে বাড়ির উপর নজর রাখছে আবদুল হাই
বালির সাথে মিশে শুয়ে আছে আবদুল । নির্জনবাস থেকে কেউ দেখতে পাবে না ওদের।
রুইতন প্রায় ভূতের মতোই নিঃশব্দে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে রইল। কেউ জানল না, দেখল না। এমনকি আব্দুল হাই ও না৷
অভিমান নিয়ে অন্ধকারে শুয়ে রইল রুইতন। পাশে কামরাতে ফিসফিস করে কথা বলছে পোকা আর সাবিহা ।
‘এবার তুমি তোমার রুমে চলে যাও।’ ফিসফিস করে বলল পোকা। ‘সূর্য উঠে যাবে খানিক পরেই। মানিক কাউলা দেখলে খবর আছে।’
‘আমি ভেবেছিলাম চুপি চুপি দুজনে ঢাকা চলে যাব। তোমার তো হোন্ডা আছে।’ পোষাক পরতে পরতে বলল সাবিহা।
‘গুলি খেতে চাও না কি?’ বিরক্ত হয়ে বলল পোকা। ‘মানিক কুত্তার হাত ভালো। মাথা ফুটো করে ফেলবে।’
‘মোটা বাঁটুল একটা মানুষকে অত ভয় পাও তুমি ?’ অবাক হল সাবিহা।
‘বান্দির পোলাকে ভয় পাই না।’ খেঁকিয়ে উঠল পোকা। ‘ওর পিস্তলের জন্য কিছু করতে পারছি না। চলে যাও তুমি । দেখি কী করা যায়। মাথাটা খাটাতে দাও আমাকে।’
খুব কষ্ট পেল সাবিহা। সারা জীবন মানুষকে তোয়াজ করে চলেছে। এমন ভাবে কথা বলেনি কেউই।
‘তুমি আমাকে ভালোবাসো না বাসো না।’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল সাবিহা ।
‘নিশ্চই। নিশ্চই।’ যাও তো এখন। দেঁতো হাসি হাসল পোকা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে ঘন ঘন।
রতনে ভয় এখন আজরাইলের ভয়ের চেয়ে বড় ভয় ওর কাছে ।
দরজা খুলে বাইরে চলে এল সাবিহা । চারিদিকে থইথই চাঁদের আলো। জ্যোৎস্না । চৈতালি হাওয়া আর চাঁদের আলো সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক পরিবেশ। স্বপ্নপুরীর মতো।
দ্রুত হাঁটতে লাগল।
এগিয়ে গেছে মাত্র কয়েক কদম । তখনই বালির উপর পড়ে থাকা জিনিসটা দেখতে পেল । কলজে হিম করা চিৎকার করে উঠল সাবিহা।
তারপর চেঁচাতে লাগল একটানা। ট্রেনের হুইসেলের মত।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন