সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চৈতালি হাওয়ায় বিষ ৮

 আট

 

 

 

তোমার পায় এটা রক্ত দাগ, তাই না? কাঁপা কাঁপা গলায় বলল  মেঘা।

 

  মনে হয় না।খানিকটা থতমত খেয়ে জবাব দিল শিশির।    চলো দ্রুত বের হয়ে পড়ি, বাড়ির ভেতরটা  কেন জানি না ,    নিরাপদ লাগছে না একটু 

 

মেঘা কিছু বলত  থেমে গেল

 

নিচতলা থেকে  ফ্রিজ খোলার শব্দ পেয়েছে দুজনে

 

 শুনেছো?’ চোখ বড় বড় করে বলল সে রান্নাঘরে  কেউ  আছে

 

তুমি এখানে থাকো আমি দেখেছিজুতার ফিতে বাঁধতে বাঁধতে  চাপা স্বরে বলল শিশির

 

না, না, তুমি যাবে না  আমার সাথে থাকো

 

শান্ত হও তুমি পিচ্চির সাথে থাক  আমি আসছিদুঃখী হয়তো  ফ্রিজ খুলেছে।

 

 নিঃশব্দে নীচে নেমে এসে শিশির

 

  বৈঠকখানা   পার  হয়ে  কিচেনে আসতেই ধাক্কাটা খেল আতঙ্কে শরীর অবশ হয়ে গেল ওর

 

 উস্কোখুস্কো চেহারা আর ময়লা পোশাক পরা কুৎসিত চেহারার পোকা  ডাইনিং টেবিলে  বসে ঠাণ্ডা মুরগির ঠ্যাঙ চিবোচ্ছে  শিশিরের চোখে চোখ পড়ামাত্র শেষ কামড় দিয়ে হাড়টা ছুঁড়ে মারল  দূরে, কার্পেটের উপর   ভেংচি কেটে বলল, ‘ কী  খোকা ভয় পেয়েছ  ? ভয় পেও না ভয় পেও না তোমায় আমি মারব না

 

 এক লহমায় ভয় পরিণত হল ক্রোধে।  কঠিন গলায়  শিশির বলল , তুমি কে ? কী      করছো  এখানে ?’

 

কোমর থেকে সাইকেলের চেইনটা  বের করল পোকাশূন্যে কয়েক পাক ঘুরিয়ে সেটা দারুণ একটা কায়দা করে মুঠোর মধ্যে পেঁচিয়ে ফেলল।  আমি কয়েকটা দিন তোমাদের  বাসায় থাকব কোনওরকম ট্যাঁ ফোঁ করবে না তাহলে সমস্যা হবে না কারও? তোমার পুতুল মার্কা বউকে বল  আমাকে কফি বানিয়ে দিতে  কড়া  কফি চিনি একটু  বেশি আমি চিনি বেশি খাই।মিষ্টি মনের মানুষ তো তাই। ’

 

 বের হয়ে  যাও এখনই  চেঁচিয়ে উঠল  শিশির  ততক্ষণে   মেঘা  চলে এসেছে শিশিরের পাশে  পোকার চেহারা সুরুত  দেখে ফুঁপিয়ে উঠল

 

আরে বউদি যে কুৎসিত হাসি হাসল পোকা কফি বানিয়ে দিন না  এক কাপ না এক কাপ না এক মগ  না দিলে  আপনাদের বাবুটাকে কিন্তু মারব  ছোট ছোট বাচ্চা  মারতে আমার খুব ভাল লাগে

 

আর সহ্য করতে পারব না শিশির তেড়ে সামনে এগিয়ে গেল নিয়মিত ব্যায়াম কর  শিশির  কিন্তু মারামারি করে না কলেজ জীবনে শখের খেয়ালে বালু ভর্তি বস্তাতে গ্লাভস হাতে নিয়ে ঘুষাঘুষি করেছে। ব্যস। অতটুকই।  

 

 পোকার ব্যাপারটা আলাদা৷ সেই ছোটবেলা থেকেই  বস্তির পোলাপানদের   সাথে মারামারি করে বড় হয়েছে পেশার খাতিরে আজও পেশী ব্যবহার করে।  শিশির  ওর কাছে ঘাস  ফড়িঙের 

 

গায়ের জোড়ে ঘুষি  মারল শিশির আশ্চর্য একটা ভঙ্গিতে   বাউলি কেটে সরে গিয়ে সাইকেলের চেইন প্যাঁচানো হাতে   শিশিরের চোয়ালে মেরে বসল পোকা শিশিরের মনে হল  হাতুড়ি দিয়ে কেউ মেরেছে  ওর মুখে  চিৎ হয়ে পড়ল  পোকার পায়ের সামনে  গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে   ওর  বুকে বুট দিয়ে লাথি মারল পোকা 

 

চিৎকার করে উম্মাদিনীর  মত   পোকার উপর  ঝাঁপিয়ে পড়ল  মেঘা ।মেয়েটার  চুলের মুঠি ধরে পোকা ওকে  আছড়ে ফেলল মেঝেতে  সাইকেলের চে উঁচু করে হিসহিস করে বলল, ‘কফি  শুনেছেন?  কফি   নইলে আপনার  ভাতারের  চেহারা আলু ভর্তা বানিয়ে দেব

 

 

 

 

 ****************************************

 

 

 

রিনরিন করে  টেবিলের টেলিফোনটা বেজে উঠল  

 

 রিসিভার ঠেকিয়ে উনি  বললেন-  ‘ক্রাইম ব্রাঞ্চ গাউস চৌধুরী বলছি

 

স্যার, আমি আব্দুল হাই বলছি কেশু হারামজাদাকে   অনুসরণ করেছিলাম কিন্তু দ্ভুত ব্যাপার কী ভাবে  যেন গায়েব হয়ে গেছে   লোকটা একদম ম্যাজিকের মত  ওপাশ থেকে বোকা বোকা গলায় বলল  আবদুল হাই

 

 কয়েকটা মুহূর্ত চুপ করে রইলেন গাউস চৌধুরী 

 

 আবিষ্কার করলেন রাগে   ভিতরটা টগবগ করছে 

 

 ঠিক আছে শান্ত গলায় বললেন   তিনি মটু  মানিকের  পিছনে যে দুই  অফিসার সেঁটে ছিল ওরা ?

 

সরি স্যার ওরাও মানিক  হারিয়ে ফেলেছে লজ্জিত গলায় বলল  আব্দুল হাই 

 

জানতাম  তিক্ত গলায় বললেন গাউস চৌধুরী তার মানে সত্যিই কিছু হতে যাচ্ছে

 

স্যরি স্য  শয়তানটা এমন ভাবে অদৃশ্য গেল যেআমি লজ্জিত ভাবে  তখনও সাফাই গাইছে আবদুল হাই বেচারা মরমে মরে যাচ্ছে

 

 বাদ দাও তুমি কোথায় আছো   তোমাকে পিক কর   এক জায়গায় যেতে হবে

 

 কোথায় স্যার ?

 

‘কেশু   হাওলাদারের বাড়িতে

 

 

 

 

 

 

 বিশ মিনিট পর 

 

আমি বাজি ধরে বলতে পারি, শূয়রের  বাচ্চাটা বাড়িতে নেই   গাড়ি থেকে নামতে নামতে  বললেন গাউস চৌধুরী  কিন্তু ওর  বৌকে পাবো । অনেক আগে এই  মহিলা   চিটাগাং- এর একটা নাইট ক্লাবে গান গাইত।   বেশ কয়েক বছর  আগে একবার দেখেছিলাম   এখন অবশ্য বেশ ভদ্রমহিলা হয়ে গেছেন  দেখি,   আমাদের পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়ে কোন খবর বের করতে পারি কিনা

 

 মাখনের মত স্টাইলে আছে ব্যাটা   বাড়িটা দেখতে দেখতে আক্ষেপ করল আবদুল হাই 

 

এক সময়ে ডন ছিল  তিক্ত গলায় বললেন চৌধুরী  ঘাস পাতার মতো পয়সা কমিয়েছে। আমরা এক টাকা কামালে ওরা কামার এক হাজার টাকা 

 

ঝকঝকে পালিশ কড়া লোহার গেইটের বাইরে   গাট্টাগোটটা দারোয়ানটা  চেয়ে    আছে  দুই অফিসারের দিকে ।সতর্ক আর সন্দেহ ভরা  চোখে ওদের দেখছে 

কেশু হাওলাদার বাড়ি আছে কি না জিজ্ঞেস করায়   সাফ বলে দিল মালিক বাসায় নেই

 

 তোমার ম্যাডামকে  গিয়ে বল ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইনস্পেক্টর গাচৌ মানে গাউস চৌধুরী  দেখা করতে চায়

 

 

 

 কয়েক মিনিট পর

 

 ড্রইং রুমে বসে আছে দুই অফিসার  

দোতলা থেকে  হেলেন নেমে এলো  ভয়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে মস্ত কিছু  ঘটতে যাচ্ছে,  বুঝে গেছে  

 

কেশু   বাসায় নেই বোধহয় আসর জমানোর  মতো  একটা  ভঙ্গিতে বললেন  চৌধুরী   সমস্যা নেই কোথায় গেছে জানেন ?

 

ঠিক  জানি না ব্যবসার কাজে ঢাকা গেছে শুনেছি নার্ভাস গলায় বলল হেলেন 

 

 

দীর্ঘ সময় ধরে হেলেনকে দেখলেন গাউস চৌধুরী পনের  বছর আগে এই  মহিলাকে দেখেছিলেন  নাইট ক্লাবে গান গাইত  একটু  বিবর্ণ হয়ে গেছে তবে আজও সুন্দরী গানের গলা ছিল অপূর্ব আচ্ছা , মহিলা  এত ভয় পাচ্ছে কেন?

 

 মানিক নামের একজন ঘাঘু    অপরাধী কয়েক সপ্তাহ আগে আপনাদের  বাড়িতে এসেছিল মনে আছে নিশ্চয়ই ? কেন এসেছিল ফটকাটা ? তীক্ষ্ণ চোখে হেলেনের উপর নজর ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন  চৌধুরী 

 

  এসেছিল সতর্কতার সাথে শব্দ বাছাই করে কথা বলছিল  হেলেন উনি আমার স্বামীর পরিচিত  অনেক পুরনো বন্ধু নারায়ণগঞ্জে একটা রেস্টুরেন্ট   খুলতে চায় মানিক সাহেব

 

 রেস্টুরেন্ট !  এই প্রথম হেসে ফেললেন গাউস চৌধুরী মানিক রেস্টুরেন্ট খুলতে চায় ?  দারুণ জিনিস  শোনালেন ম্যাডাম মানিক নিজেই   থার্ড ক্লাস একটা  ভাতের হোটেলে ওয়েটারের কাজ করে নিজের বলতে শয়তানটার পকেটে এক হাজার টাকা  আছে কিনা সন্দেহ

 

এতকিছু আমি  জানি না শান্ত গলায় বলল হেলেন আমি যা শুনেছি তাই বললাম

 

 দেখুন ম্যাডাম আপনার স্বামীর সাথে আমার কোনও শত্রুতা নেই অতীতে সে কী করত সে ব্যাপারেও আমার কোনও আগ্রহ নেই তবে নতুন করে যদি খেলায় নামতে চায় আমি উনার পিছু লাগবে ইচ্ছে হলে আপনি কিন্তু ব্যাপারটা সামাল দিতে পারেন ভাল করে ভদ্রলোককে বুঝিয়ে শুনিয়ে বলুন আচ্ছা  গেলাম  আমরা আরেক দিন এসে চা খেয়ে যাব

 

 গট গট করে দুই অফিসার চলে গেল 

একা হতেই হাউ মাউ  করে কাঁদতে লাগল হেলেন 

 

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...