৬
কবিতার জন্ম কবে ?
কে কবে আবিষ্কার করে ছিল রূপসী এই মেয়েটাকে? কেউ জানে না।
সবাই জানে কবিতা হচ্ছে সুখ আর দুঃখের অলৌকিক পংতি মালা। কবে কে দিশা হারিয়ে ছুটেছিল কবিতার পিছে ?
‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ/ যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতমঃ’
প্রাচীন ভারতের মহান ঋষি বাল্মীকি । শিকারির হাতে ধবল সাদা পাখির মৃত্যু দেখে গভীর শোকে যে উচ্চারন করেছিলেন সেটাই কি আদি কবিতা না ?
মনে পড়ে সেই অন্ধ কবির কথা। গ্রিসের পাথুরে পথ ঘাঁট যে হেঁটে বেড়াত। ছন্দে ছন্দে যে বলে বেড়াত গ্রীক আর ট্রোজানদের বীরত্বের কথা। সুন্দরী হেলেনের কথা। সেই কাহিনীগুলো আমরা চিনি ,ইলিয়াড আর অডেসি নামে। অন্ধ কবির নাম- হোমার।
অপূর্ব সেই কাহিনী। সমুদ্র -দ্বীপ আর জলপাইয়ের ঘ্রান পাই সেই সব পড়ার সময়।
হাজার বছর আগের চর্যাপদের কবিতা -
টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী। / হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।”
অর্থাৎ- টিলার উপর আমার ঘর, কোনও প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতেও ভাত নেই, তবু নিত্য অতিথি আসে।
কবিরা কী করেন ?
সামান্য সুখ দুঃখের কথা কেমন করে একটু গুছিয়ে বলেন। আর আমরা বিবাগী হয়ে যাই।
সবার কথা কি ভাল লাগে ? না। লাগে না। ইস্কুলের কোন কোন স্যার কী সুন্দর করে ক্লাস নেয়। একটু ও বিরক্তি লাগে না। আবার দুই একজন স্যার কী সব বলে মাথায়ই ঢুকে না। বাংলা স্যার বলেন- আইজগে তুমাদের পরাব ভাংলা পত্তম পইত্রর। তুম্রা বই কুলেছ ?
কি বিচ্ছিরি তাই না?
আবার তামিল সিনেমার ভিলেনদের মত দেখতে ফেরদৌস স্যার যখন বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ পড়াতে গিয়ে কিভাবে টাকি মাছের ভর্তা বানাতে হয় বলেন, তখন আমাদের দারুন লাগে। কারন উনি সুন্দর করে বলেন যে।
কবিদের সবার লেখা কিন্তু ভাল হয় না। ওইয়ে কবি বলেছেন না- সবাই কবি নয়। কেউ কেউ কবি।
একসময় রাজাবাদশারাও কবিতা লেখা আর পড়ার প্রতি ঝুকে পড়েছিল।
কবিতা লেখাকে কেউ কেউ রাজরোগ ও নাকি বলতো।
সব রাজার দরবার ভর্তি থাকতো গণ্ডায় গণ্ডায় কবি। উনারা কবিতা লিখত । রাজাকে পড়ে শোনাত। শুনে রাজা আহা উহু করতেন। পোঁটলা ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিতেন কবিকে। বা নিজের গলা থেকে মুল্যবান মোতিদানার মালা খুলে ছুড়ে দিতেন কবির দিকে।সবচেয়ে আদর পেত রাজকবি।
সবাই এই রাজকবি বা সভাকবি হবার জন্য লালায়িত হয়ে থাকতো।
নিজের মধ্যে চলতো-লোভ-ঈর্ষা-হিংসার নোংরা খেলা।
সব কবিই রাজার কাছে গিয়ে কান ভারি করতো সভাকবির নামে।
মাঝে মাঝে সভাকবি হারাতো নিজের মর্যাদা। প্রাণদণ্ড পেত। বা রাজ্য ছেড়ে চলেও যেতে হতো।
সেই নোংরা খেলা আজও চলছে কবি আর লেখকদের মধ্যে। মোটামুটি পশুর স্তরেই রয়ে যায় প্রিয় কবিগন।
ইরানের বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ্ নসরের সভাকবি ছিলেন রুদাকি( ৮৭০-৯৫৪) এই রুদাকি ছিলেন জন্মান্ধ। শুধু মদ নিয়েই এই রুদাকি লিখেছিলেন একশো খণ্ডের এক কবিতা। কবিতাটিতে শ্লোকের সংখ্যা ছিল-তেরো লক্ষ।
একটা কবিতা এমন–
নিয়ে এসো নীল রঙের পানপাত্র।
তলোয়ারের ফলার মত ঝকঝকে মদ ভর্তি।
গোলাপের পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরের মত লোভনীয় মদ।
ঘুমিয়ে থাকা প্রেমিকার গোলাপি পাতার নীচে লুকিয়ে থাকা চোখের মনির
মত প্রিয় মদ…।
আসলে বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ্ নসর নিজেও মদ খেতে পচ্ছন্দ করতেন। তাই কবি রাতদিন এই মদ নিয়েই কবিতা লিখতেন।
আপাতত মনে হতে পারে ঝোপ বুঝে কোপ মারা কবি। আসলে না। চরম প্রতিভাবান কবি ছিলেন এই রুদাকি।
অনেকে মনে করে কবি মাত্রই মদ গেলে বালতি বালতি। যেমন – মাইকেল মধুসুদন দত্ত। উনি এত পরিমানে গিলত যে প্রায়ই উনার হাতে টাকা পয়সা থাকতো না। তখন ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে টাকা ধার চাইতে যেতেন। বিদ্যাসাগর বাবুকে উনাকে টাকা পয়সা ধার দিতেন। কখনই ফেরত নিতেন না। আহা, এমন একজন বন্ধু পেলে আমিও মদ খেতাম।
ওমর খৈয়ামের অনেক কবিতায় কিন্তু মদের ব্যাপার এসেছে। কিন্তু এর মানেই না উনি পাড় মাতাল। অসম্ভব ধরনের প্রতিভাবান এই কবি। উনার আসল নাম-গিয়াদ আল-দিন আবুল-ফাত্তাহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-নিশাবুরী খৈয়াম । উনি শুধু কবিই না জ্যোতির্বিদ এবং গণিতবিদ হিসাবেও বিখ্যাত ছিলেন।
বীজগণিতের অনেক সুত্র উনি আমাদের দিয়ে গেছেন।
উনার একটা কবিতা-
সেই নিরালা পাতায় ঘেরা
বনের ধারে শীতল ছায়
খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে
ছন্দ গেঁথে দিনটা যায় !
মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে
গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর –
সেইতো সখি স্বপ্ন আমার,
সেই বনানী স্বর্গপুর !
এক ধরনের পিচ্চি পিচ্চি কবিতা আছে। ওদের বলে হাইকু। নামেই বুঝা যায় জাপানের জিনিস । জাপানী কবিদের দিয়েই হাইকুর জন্ম। আর ওনাদের জন্যই জনপ্রিয় এই ধরনের কবিতা।
The Old pond
a frog jumps in
plop!
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটাকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। অনুবাদটি –
পুরোনো পুকুর,
ব্যাঙের লাফ,
জলের শব্দ।
আরেকটা হাইকু।
সাগরতীরে মাছ ভাঁজার দোকান,
সীসের মত আকাশ।
খদ্দের নেই।।
আপাতত মনে হতে পারে- আরে ভাই, এটা কবিতা হয় কেমন করে ?
আসলে এখানে কবি মাত্র কয়েকটা শব্দ ব্যবহার করে একটা দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন পাঠকের চোখের সামনে। পাঠককে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে হয়। হাইকুকে অসমাপ্ত কবিতা বলে। কবি লেখা শেষ করেনি। পাঠককে শেষ করতে হয় তার হৃদয় দিয়ে। পাঠক তার নিজের আবেগে ঘুরপাক খায়।
বিবাগী হয়ে যায় তার মন। পুরো ব্যাপারটাই পাঠকের কল্পনার খেলা। পাঠকের হাতেই সব।
যেমন—-
গাছের পাতা পরে আছে কাকের ছায়ার মত।
নিঃসঙ্গ চাঁদ থেকে খসে পরা। (কবি-কাগা নো ছাইয়ো ১৭০৩-১৭৭৫)
অথবা—-
ঘুড়ি উড়ে ।
একই আকাশে।
গতকাল অন্য ঘুড়ি উড়েছিল।
বা
প্রজাপতি উড়ে।
বুনো অর্কিডকে ভালবেসে…
মধ্যযুগ থেকে কত কবি এসেছে আমাদের ভাষায়। এরা অদ্ভুত সব কবিতা লিখে রেখে গেছেন আমাদের জন্য।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত হতে মদনমোহন তর্কালঙ্কার,কালিপ্রসন্ন ঘোষ ,নবীনচন্দ্র সেন হতে জসীমউদদীন। এবং আজ পযন্ত ।
মনে পড়ে ?
পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।।
বা
মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে
তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে, পাশে।
প্রায় সব বাঙ্গালী ছোট বেলায় কবিতা লেখা শুরু করে- ‘’একটা ছোট কাকে। আমায় শুধু ডাকে’’
- মার্কা কবিতা লিখে। কিন্তু কবিতার নকশী কাঁথা অত সহজ না আসলে।
একজন মানুষ ধনী হয় কি করে ?সহজ উত্তর , তার কাছে বেশি মুদ্রা থাকে।
কবি কবিতায় প্রাচুর্য তখনই আসে যখন সে তার কবিতায় নতুন ছন্দ আর উপমা প্রযোগ করতে পারে। আর সেইজন্য কবির স্টকে প্রচুর শব্দভাণ্ডার থাকতে হয়। প্রচুর জানতে হয় তাকে। তার জানার ভাণ্ডারে করতে যোগ করতে হয় নতুন নতুন শব্দ।
আমাদের ভাষাটা মজার। হরেক রকম শব্দ আছে আমাদের ভাষাতে। এমন কি প্রচুর বিদেশী শব্দও ঢুকে গেছে। মনেই হয় না বিদেশী। যেমন আরবি ভাষা থেকে এসেছে আইন, আদালত, তারিখ, ফসল, জাহাজ, হাকিম, উকিল, শয়তান, আসল, জিনিস ।
ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে কারবার, খরচ চাবুক, দোকান, খাতা, পর্দা, রুমাল, কারখানা , চশমা, কুস্তি, মজুর, হাজার, শিকার, পোশাক, বরফ ।
পর্তুগিজ ভাষা থেকে এসেছে আলমারি, আলপিন, জানালা, চাবি, পেয়ারা, কামিজ, সাবান, বোতাম,, ইস্পাত, তোয়ালে
ইত্যাদি।
অনায়াসে ব্যবহার করা যায় সেই সব শব্দ।
বৈচিত্র সবাই আনতে পারে না।
দুই একজন আনে। বদলে দেয় সব কিছু। যখন জীবনানন্দ দাস কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন অনেকেই বেশ বিরক্ত হয়েছিল।
কিন্তু কে জানত জীবনানন্দ দাশ একাই পাল্টে দেবেন বাংলার কবিতা ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন