চোত বৈশাখ মাসের এক দুপুরে মস্ত একটা কাণ্ড হল।
শীতলক্ষ্যার পাড়ে কালী মন্দিরের বাইরে । এক বুড়িকে দেখা গেল । হাউমাউ করে কাঁদছে ।
বুড়ি বয়সে কোন গাছ পাথর নেই । মুখটা আতা ফলের মতো ছোট। ময়লা সাদা একটা শাড়ী পরণের। মুখে দাঁত নেই একটাও।
ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছে ।
এ শহরের অমন কত মানুষ কাঁদে। কে তার খবর রাখে ?
তারপর ও মজারু আর তামাশা দেখার মানুষজনের অভাব হয় না কখনোই । ভিড় করে বুড়ির তত্ব তালাশ নিতে গেল লোকে। কেনই বা বুড়ি কাঁদছে নিদারুন শোকে ? বুড়ি কাঁদছিল বারবার দুটো নাম উচ্চারণ করে, নুরুদ্দিন আর আইনুদ্দিন । এই দুই উদ্দিন বুড়ির দুই ছেলে।
ত্রিভুবনে আর কেউ নেই বেচারীর।
কত কত বছর আগে তার বিয়ে হয়েছিল কোন এক গ্রামে। দুই ছেলে হওয়ার পর স্বামী মারা যেতেই শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয় । দেবর ননদরা বোঝা মনে করে তাকে। তখন সে ছিল কুড়ি বছরের যুবতী।
কেন, পৃথিবীতে সবাই সবার বোঝা হয় ? এক মাত্র বাপ মায়ের কাছে সন্তান কখনই বোঝা হয় না। শাস্ত্রে তো বলে , পিতা মাতা পৃথিবীর চেয়ে বেশি ভার বইতে পারে !
নিজ গ্রামে ফিরে আসে বুড়ি । ক্ষুদে দুই সন্তান সহ। দুই সন্তানকে নিয়ে বাপ মার সাথে বসবাস করতে থাকে সেই যুবতী।বাপের অবস্থা তত ভালো ছিল না। জমি-জিরাত নেই ।পরের জমিতে খেটে খায় । আর এক ভাই ছিল, সেও কাজ করে পরের জমিতে।সদ্য ফেরত আসা যুবতী বাপের সংসারে বোঝা না হওয়ার প্রচেষ্টায় দিনমান কাজ করে।
চাইলে কি আর কাজের শেষ আছে ?
মাঠে মাঠে গরুর পিছে পিছে হেঁটে গোবর তুলে আনে চাঙ্গারি ভর্তি করে । গোল রুটির মত করে সেই গোবর সেঁটে দেয় মাটির দেওয়ালে।
শুকিয়ে গেলেই জ্বালানি ।
ভাত কি আর এত সহজে হয় ? কত কষ্ট করতে হয় একমুঠো ভাত থালে তোলার জন্য !
আবার ফসল কাটা শেষ হয়ে গেলে কৃষকরা যখন ধানের আঁটি মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরে, তখন পথে-ঘাটে ঝুরঝুর করে ধান ঝরতে থাকে । চারদিকে স্বর্ণকুঁচির মত ধান আর ধান ।এক ঝাঁক মানুষ লেগে যায় সেই ধান খুঁটে খুঁটে তোলার কাজে।
দেখতে দেখতে ধামা ভর্তি হয়ে যায়।
জমির মালিককে অবশ্য কুড়িয়ে পাওয়া ধানের তিন ভাগের এক ভাগ দিতে হয় !
তারপরও যে ধান থাকে সেটা দিয়ে ছয় মাসের মত বা চার মাসের মত চলে যায়। যদি একবেলা করে ভাত খায় ।
আরো নানা কাজে লেগে থাকে সে । সাথে দুই সন্তান নুরুদ্দিন আর আইনুদ্দিন বড় হতে থাকে।
কিছু মানুষের জীবন বেহালার মতন। বেহালা যেমন শুধু কাঁদতে জানে। আনন্দে কোন সুর সে তুলতে পারে না ।তেমনি কিছু মানুষের জীবনে শুধু কান্নাই থাকে।
যুবতীর বাপ-মা মারা গেল একটা সময় ।
সেটা ছিল খরালি কাল।
মাঠে ফসল নেই। মাঠ ঘাট সব ফুটি ফাটা হয়ে গেছে। ডোবার জল গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে।
খাবারের অভাব । কাজের অভাব। মাঠে-ঘাটে সবুজের কোন চিহ্নই নেই। ধূসর । আকাশের দিকে চাইলেই বুক কেঁপে ওঠে।
ভাই আর ভাইয়ের বউ বেচারিকে বাড়তি বোঝা মনে করতে থাকে।
নিরুপায় অভাবি ভাই, বোনকে অনুরোধ জানায়, সে যেন নিজের ভাত আর আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে নেয়।
ভাবতে অবাক লাগে যুবতীর। ছোটবেলা নিজের জমানো পয়সা দিয়ে কত কদমা আর তিলের গজা কিনে দিয়েছিল ভাইকে।
কতবার ঘুড়ি আর নাটাই বানিয়েছিলো সে।
অভাব সব সুখ স্মৃতি নষ্ট করে দেয় !
আবার দুই সন্তানকে নিয়ে পথে নামার পালা ।
তারপর কত দিন কত রাত চলে গেছে জীবন থেকে।
আকাশের চাঁদটা কতবার ক্ষয় হতে হতে অমাবস্যার হাতে হেরে গেছে আবার নতুন করে গোলগাল হয়ে আকাশে উঠেছে, কে তার খবর রাখে ?
অনন্ত আকাশ প্রতিরাতে তার ঝুড়ি থেকে কত কত বাতিল নক্ষত্র ফেলে দিয়েছে, কে তা জানে ?
কত শ্রম দিয়ে নুরুদ্দিন আর আইনুউদ্দিনের পাতে ভাত তুলে দেয় এক দুঃখিনী মা, কে তার খোঁজ রাখে ?
মায়েরা জনম দুঃখী হয়। জগত সংসারের এটা ও একটা নিয়ম।
সময় সবচেয়ে বড় ওষুধ ।
আইনুদ্দিন আর নুরুদ্দিন বড় হয় ।
খুব একটা লেখাপড়া শেখাতে পারেনি ওদের । তবে হাতে কাজ শিখেছে দুজনেই। একজন লেদ মেশিনের কাজ শিখেছে আরেকজন দর্জির।
গঞ্জের বড় দোকানে কাজ করে।
সময়মতো দুজনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে । তাদের নতুন বংশধর এসে গেছে পৃথিবীতে।
ততদিনে সেই সংগ্রামী যুবতী, পরিণত হয়েছে বৃদ্ধায় ।
সময় কাউকে ক্ষমা করে না।
তার শরীরে এখন রাজ্যের ক্লান্তি ।পা দুটো শরীরের ভার বইতে পারে না। সামনে ঝুঁকে গেছে শরীরটা। জিয়ল গাছের ডাল ভর করে ঠুক ঠুক করে হাঁটতে হয় । সময় অসময়ে খিদে পায়। প্রহর মেপে মেপে ওষুধ লাগে সারাবেলা। চোখে ছানি না কি যেন পড়েছে । ঠিক দুপুর বেলা মাঠার মত জোসনা দেখে দুচোখে।
বুড়ি আরো একবার বুঝতে পারে, ছেলে আর ছেলের বউদের বোঝা হয়ে গেছে সে।
কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সমাজ এখনো আদিম যুগের সমাজ এর মতো রয়ে গেছে। গুহা আর প্রস্তর যুগে কেউ যখন শিকার করতে পারতো না বা শারীরিকভাবে অর্থব হয়ে যেত। তখন তাকে বোঝা মনে করতো সবাই। পুরানো আবাসভূমি ছেড়ে নতুন জায়গাতে যাবার সময় সেই সব বুড়ো আর অর্থবদের ফেলে রেখে যেত ।
বুড়ো বুড়ি দেখত, চোখের সামনে দিয়ে পাথর আর হাড়ের অস্ত্র নিয়ে দলটা চলে যাচ্ছে নতুন বসতির খোঁজে ।
বুড়ি কার কাছে থাকবে এই নিয়ে দুই সন্তানের মধ্যে বাদানুবাদ হতো প্রায়ই । দুজনেই দাবি করেছে, তাদের সংসারে খাওয়ার মুখ অনেক। যা উপার্জন করে তাতে আজকাল চলা খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। তাছাড়া মায়ের জন্য ওষুধ পথ্যও লাগে অনেক বেশি।
কানে কম শুনলেও বুড়ি বুঝতে পারে সবই।
বেচারি লজ্জা মারা যায়।
তিনবেলা খুব একটা খায় না সে । মাঝে সাঝে একটু ভাল মন্দ খেতে ইচ্ছে করে এই যা। করলা দিয়ে চাপিলা মাছ রান্না করলে সাথে যদি লাল চালের ফ্যানসা ভাত হয় তবে খানিক ভাত বেশি খায়।
কুমড়ো ফুলের বড়া ভাজা হলে ও একমুঠো ভাগ বেশি নিতে ইচ্ছে করে । তবে ছেলের বউরা দেয় না ।
ওষুধ লাগে , কথা সত্য । এটার উপর তো তার কোনো হাত নেই । রোগবালাই উপরওয়ালা দেয় । আর খুব দামী ওষুধ তো পোলাপান তাকে কিনে দেয় না । পানি পড়া বা কবিরাজি দিয়েই তো বেশিরভাগ সময় কাজ চালায়।
ওষুধের যে দাম সেটা কি সে জানে না ?
তারও খুব ইচ্ছে করে পরিবারের জন্য কিছু কাজ করতে । কিন্তু শরীরে দেয় না । বেশিরভাগ সময় মন খারাপ হয়, যখন দুপুর গড়িয়ে গেলেও ছেলের বউরা ভাত দেয় না তাকে। খিদেয় পেটের ভেতরটা জ্বলে।
লুকিয়ে শশা মুলা চুরি করে খেয়েছে কয়েকবার। ধরা ও পড়েছে। তিরস্কার জুটেছে যৎপরোনাস্তি ।
তাই মন খারাপ হলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় বুড়ি।
প্রায়ই।
দূরের কলাই খেতে ধারে চুপচাপ বসে থাকে। খিদের জ্বালায় আপন-মনে বকবক করে। গালি দেয় । ছেলের বউদের । নিজের ভাগ্যকে ।
বিধাতাকে ।
প্রায় সময় নিজের মরণ কামনা করে।
উদাস চোখে চেয়ে থাকে দূরের বুড়িগঙ্গা দিকে। ফেলে আসা জীবনটাকে মহাকাব্য বলে মনে হয়।
মাঝে মাঝে পূব পাড়ার বাতেন মিয়া বউ ডেকে বলে, ‘ও, বুড়ি আহ আমাগো বাড়িতে । দুগা ভাত খাইয়া যাও।‘
পেটে খিদে কাছে অভিমান হার মানে।
বাতেনের বাড়িতে গিয়ে ইলিশ মাছের ডিম ভাজা আর পোড়া মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে আসে। রোজ অমন হলে খারাপ হত না। কিন্তু রোজ তো কেউ কাউকে খাওয়ায় না।
তারপরও দিন যায়।
কম খেলে একটা সমস্যা । শরীর আর প্রাণ পাখি একসাথে থাকতে চায় না । দুটোই দুর্বল হয়ে পড়ে ।
ওই দিকে চোখে ছানি কাটানো দরকার। বুড়ি মাঝেমাঝেই ঘ্যান ঘ্যান করে, চোখের ছানি কাটানোর জন্য।
ছেলেরা কানেই তোলে না।
একদিন দুজনের মন পরিবর্তন হল। আদর করে এসে বলল,’ চল মা । তোমারে টাউনে লইয়া যাই । ডাক্তার দেখামু ।'
আনন্দে নেচে উঠে বুড়ির মন। মাতৃ হৃদয়ে খুশির ঢেউ বয়ে যায় । আহারে , কষ্ট পায় ! কে জানে , ছেলে দুটো হয়তো তত ভাল কামাই করছে না । তাই হয়তো মায়ের জন্য ভালবাসা দেখাতে পারছে না ।ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও।
দুই ভাই বুড়ি মাকে নিয়ে গ্রামের বাইরে চলে গেল।
যেখানে অজগর সাপের মত বড় রাস্তাটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে বহুদূর। কোন অচিনপুরে। যেখানে ভাল ডাক্তার থাকে । বড় বড় মানুষ থাকে। হোটেল থেকে নাকি কত খাবার ফেলে দেয়, রোজ। গ্রামে কে একবার শহরে গিয়েছিল ভিক্ষা করতে । তার মুখে বুড়ি শুনেছিল , কোন এক নিরাক পাড়া দুপুরে।
বাসে করে দুই ভাই মাকে নিয়ে চলে আসে অচেনা এক গঞ্জে ।
যেখানে সারা দুনিয়ার বাস এসে থামে। হই চৈ আর কোলাহল চলছে সারাক্ষণ ।যেন দুনিয়ার শুরুর সময় থেকেই এই জায়গাটা এমন গোলমেলে।দুনিয়ার সব ষড়যন্ত্র এখান থেকেই শুরু হয়। কেয়ামত পর্যন্ত অমন থাকবে।
বুড়ি অবাক হয়ে যায়। সারা দুনিয়া মানুষ কি এই একটা জায়গায় থাকে ?
বাসগুলো যাত্রীদের বমি করে ফেলে দিয়ে নতুন যাত্রী তুলে আবার দৌড় দিয়েছিল ।
বাস স্টেশনের উল্টা দিকে একটা মিষ্টির দোকান।
বাইরে পিতলের এক খালার উপর স্তূপ করে রাখা আমিত্তি । পাশে কালো কড়াইতে ভাজা হচ্ছে ড্রাগনের প্যাচের মত জিলাপি । ব্যস্ত হাতে পরোটা ভাজছে কুস্তিগিরের মত মোটা সোটা গাট্টাগোট্টা একজন। ভেতরে এক গামলা গ্রিজ। আসলে হালুয়া।
দোকানের ভেতরে বুড়ি মাকে যত্ন করে বসাল দুই ভাই ।
নরম গলায় জানতে চাইল , 'কী খাইবা মা ?'
চোখে জল এসে গেল বুড়ির । আনন্দে।
দুটো চমচম আর এক দলা ছানা আনা হল। অনেকটা সময় নিয়ে খেল বুড়ি। অমন গরম গরম চমচম আর মাঘ মাসের জোছনার ছানা জীবনেও খায়নি সে। খাওয়া শেষ করে কালী মন্দিরের বাইরে এল তিনজনে। বুড়িমা কে বসিয়ে বড় ভাই আইনুদ্দিন বলল, ‘ নুরা তুই মারে দেহিস ।আমি ডাক্তার সাহেবের খোঁজ নিয়া আহি।'
আইনুদ্দিন চলে গেল।
মিনিট দুয়েক পর বিরক্ত গলায় নুরুদ্দিন বলল, ' মিয়া ভাই যে এত সময় ক্যান নিতাচ্ছে বুঝি না। মা বও তো আমি দেইক্ষা আহি মিয়া ভাই কই গেল।'
বুড়িকে রেখে বড় ভাইকে খুঁজতে ( !) চলে গেল নুরুদ্দিন।
ঘন্টা তিনেক অপেক্ষা করল বুড়ি । তার অবচেতন মন বুঝে গেছে আসল সত্যটা । বোঝা খালাস করে দুই ভাই চলে গেছে নিজ গ্রামে ।
সেই থেকে কাঁদছে বুড়ি । হাহাকার করে উঠছে , ‘ নুরারে বাজান...। আইনু... বাজান ...। আমারে লইয়া যা তগ লগে। বাজান ...।'
হায় সেই কান্না।
ঈশ্বরের বাস্তভিটা পর্যন্ত কেঁপে যায় দুঃখিনী মায়ের সেই কান্নায়।
সেই দুপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর হওয়া পর্যন্ত থমকে ছিল কাচের মতো। যে নিমপাখিটা সারা দুপুর অলস সুরে ডাকত, সেটাও ছিল চুপ।
অনেকেই ভিড় করে মজা দেখছিল। জ্ঞান গর্ভ মন্তব্য করছিল এক একজন।কেয়ামত যে খুব সামনে সেই ব্যাপারে একমত উপস্থিত সুধী মহল।
তারপর যে যার বাড়ির পথ ধরে।
মন্দিরের বাইরে থেকে একচুল নড়েনি বুড়ি।নড়ানো যায়নি তাকে।
বুড়ি অপেক্ষায় থাকে ।
তার বিশ্বাস, দুই ছেলে ফিরে আসবে। ডাক্তারের বাড়ি থেকে ফেরার সময় পথ হারিয়ে ফেলেছে ওরা। ওরাও তো শহরে নতুন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পথ খুঁজে পেয়ে ঠিকই ফেরত আসবে। অথবা যদিও গ্রামে চলে যায় তবেও মায়ের জন্য মন খারাপ হবে। তখন ঠিকই ফেরত আসবে।
যারা হাজার হাজার বছর আগের প্রাচীন ধর্মগুলোতে বিশ্বাস করেন , তারা এও বিশ্বাস করেন , সব শহরেই ঈশ্বর থাকেন।
ছন্মবেশ নিয়ে!
পাশের দোকানদারেরা খাবার দিল বুড়িকে ।
টানা পাঁচ দিন সেই রুটি ভাত সব পাশে পড়ে রইল। অনাদরে।
নিঃসঙ্গ একটা কুকুর এসে খেয়ে যেত সেসব।
বুড়ি কিছুই খেতো না।
ছয় দিনের দিন দেখা গেল, একই কলাপাতা থেকে বুড়ি আর কুকুর খাবার খাচ্ছে। সন্ধ্যা বেলা আরতি শেষে মন্দির থেকে খাবার দিত পুরোহিত ।
দিন চলে যায় দিনের নিয়মে।
মন্দিরের দরজায় ঠেস দিয়ে বুড়ি বসে থাকে।
মলিন বেশ ভূষা দেখে সিকি আধুলি দূর থেকে কেউ কেউ ছুড়ে দেয়। দয়া করে। বা পুণ্যের লোভে। বুড়ি সে সব ছুয়েও দেখে না। পাশেই পড়ে থাকে। দুষ্টু ছেলেরা সেই পয়সা তুলে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
বুড়ির কোন বিকার নেই।
শুধু হঠাৎ হঠাৎ দুই এক জনকে দূর থেকে দেখেই বুড়ি পাগলনির মত ছুটে যায়। চেঁচাতে থাকে- নুরারে ... আইনু বাজান।
কাছে গিয়ে বুঝতে পারে , এরা অন্য মানুষ।
তন্দ্রার ঘোরে স্বপ্ন দেখে দুই ছেলের। স্বপ্নে ওরা ছোট হয়ে ফিরে আসে। শৈশবের যেমন ছিল ঠিক তেমন। আধো-আধো খন্ডিত স্বপ্নে স্মৃতিরা জ্যান্ত হয়ে আসে বারবার।
আইনুদ্দিন মারা যেতে বসেছিল একবার। ডায়রিয়া হয়েছিল।
এক মহাজনের আড়তে কাজ করতো বুড়ি । মহাজনের ডালের আড়ত । বস্তায় বস্তায় মুগ মসুর কলাই আর খেসারির ডাল ভর্তি করে রাখত গুদামে । ওখানে আরো কিছু মহিলার সাথে বস্তা উঠাতো নামাত সে।
বাইরে চার বছরের আইনুদ্দিন বসে থাকতো। একা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
সুদীর্ঘ এই সময়টা বসে থাকার খিদে পেত ক্ষুদে আইনুদ্দিনের । সারা উঠার ভর্তি গোলাপি হলুদ আর কমলা রঙের ডাল পড়ে থাকত । অবুঝ বাচ্চা সেগুলি কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেত। তারপর প্রায় মরে।
টানা দশ মাইল হেঁটে কবিরাজের কাছে গেছে বুড়ি । কোলে আইনুদ্দিন ।কী সব দিন গেছে । নুরুদ্দিন একবার হারিয়ে গেছিল খেলার মাঠে খেলতে গিয়ে । কত খুঁজে ফিরে পেয়েছিল বাপটাকে ।
ওদের অসুখ হলে সারা রাত বসে থাকতো মাথার কাছে। শিয়রে জ্বলত ভেন্নার তেলের প্রদীপ । পীরের কাছে মানত করতো মনে মনে । বলতো , কাউনের জাউ রাইন্ধা দরগায় দিমু । বাজানরে আমার ভালা কইরা দাও ।
কত দুঃখ কষ্ট এটুকু জীবনে।
ঘুমের মধ্যে বুড়ি কাঁদে।
যতদিন আমি ওখান দিয়ে গেছি ততদিন বুড়িকে দেখেছি মন্দিরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকতে। পচা লিচুর মত দুই চোখে কোন ভাব নেই। তবে খুব কাছে কেউ গিয়ে দাঁড়ালে চমকে উঠে বুড়ি। আশা ভরা চোখে তাকায়। আশা ছাড়েনি বুড়ি।
বুড়ির সেই দৃষ্টির সামনে নিজেকে অসহায় লাগে। মনে হয় , ঈশ্বরের সাথে খানিক কথা বলা দরকার। বলা দরকার , আপনার জগৎ সংসার ভালমত চলছে না।
এক সকালে মন্দিরের বাইরের রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছিল বিহারী ঝাড়ুদার।
মুখ ভর্তি পান চিবুচ্ছে। হাতে লম্বা শলার ঝাড়ু । সরসর শব্দে পরিষ্কার করছিল পথের আবর্জনা। বুড়ির সামনে এসে প্রতিদিনের মত শুভেচ্ছা জানালো , সালাম মাইজি।
আবিস্কার করলো গতরাতে সবার অজান্তে অভিমান নিয়ে চলে গেছে বুড়ি।
ভিন্ন এক দুয়ার দিয়ে পৌঁছে গেছে নক্ষত্রের উঠানে।
মমির মত শুকনো প্যাঁকাটি বুড়ির লাশটা এসে নিয়ে গেল আঞ্জুমানে দাফন কমিটি। মন্দিরের বাইরের জায়গাটা শূন্য হয়ে গেল। তারপরও যতবার হেঁটে গেছি, মন্দিরের ফিরোজা রঙের দরজাটার দিকে চোখ গেছে।
ক্রিমিনাল সাইকোলজি একটা অদ্ভুত কথা বলে।
অপরাধী সব সময় অপরাধের ঘটনাস্থলে ফিরে যেতে চায়। ঘটনাস্থলের প্রতি তীব্র অমোঘ এক আকর্ষণ বোধ করে অপরাধী।
এর সঠিক ব্যাখ্যা আমি জানি না। কেউ দিতে পারেনি।
সবার অলক্ষ্যে একবার হলেও ঘটনাস্থলে ফিরে আসে অপরাধী। বুড়ির দুই সন্তানের একজনও কি কখন ফিরে আসেনি সেই দরজার সামনে ?
একবারও না ?
খুব জানতে ইচ্ছা করে। আজীবনের সমস্ত সঞ্চয় বিলিয়ে দিতে রাজি আছি এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য।
খুব জানতে ইচ্ছা করে !

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন