১৯
গভীর ঘুমে আছন্ন ছিলাম সবাই।
আধো ঘুমের মধ্যে শুনতে পেলাম বলি দেয়া পাঁঠার মত গোঁ গোঁ করছেন উনি।
বিজলি বাতি জ্বেলে দেখি মেঝেতে পড়ে আছেন । মুখ ভর্তি ফেনা। চোখের দৃষ্টি শূন্য ।
আহা !
এক জ্যান্ত দুঃস্বপ্ন শুরু হল আমাদের ।
সামনের মাসে দুর্গা পূজা। আর এই সময়টাতে...।
চিকিৎসা চলল।
গ্রামের বাড়ি থেকে বাবার ছোট বোন, আমাদের পিসি এসে উনাকে গ্রামে নিয়ে গেল।
গ্রামের পরিবেশে থাকলে না কি ভাল হবে জলদি ।
আমাদের বাড়িটা ছেড়ে আমরা শহরতলীর দিকে চলে গেলাম ।
আগের বাড়ির দ্বিগুণ বড় এটা। কিন্তু ভাড়ার অর্ধেক। আমি মা আর ছোট ভাই বোনেরা সবাই মিলে মালপত্র গুছিয়ে নতুন বাড়িতে গেলাম।
খুব বেশি দূরে যাই নি। তারপরও মনে হল সভ্য জগৎ ছেড়ে বহু দূরে চলে এসেছি।
নতুন বাড়িটা বেশ সুন্দর।
বাড়িওয়ালা শৌখিন মানুষ। চব্বিশ শতাংশ জায়গার উপর ছয়টা করটেয টাইপের বাড়ি করেছেন।
সবগুলোর রঙ নীল । এক একটা বাড়ির বাইরের গেইট বন্ধ করে দিলেই সবাই সবার চেয়ে আলাদা।
এক একটা কটেযে তিনটে করে কামরা । রান্নাঘর। চৌবাচ্চা সহ স্নানঘর আর বাথরুম। পেল্লাই সাইজের উঠান আর বারান্দা।
বেশ কিন্তু ।
আমাদের বাড়ির উঠানে আবার বেলি ফুলের গাছ আছে একটা। সারারাত মিষ্টি সৌরভ ছড়ায়।
এই বাড়ির একটা মজার ব্যাপার আছে।
মা বিয়ের পর জীবন শুরু করেছিল এই বাড়িতে । কোণার দিকের শেষ কটেযে উঠেছিল। এখানেই আমি হাঁটা শিখেছিলাম।
আবার ফিরে এসেছে মা।
অনেকটা লেদারব্যাক কচ্ছপের মত । বা লেমন শার্কের মত। ওই দুই প্রাণী বাচ্চাদের নিয়ে ফিরে যায় সেই সাগরে যেখানে তার সুন্দর সময় কেটেছিল।
আমার মা লেদারব্যাক কচ্ছপ।
আসলে সব মা এক।
আমরা চরম অর্থকষ্টে পড়লাম।
বাবার কোন সঞ্চয় ছিল না। সঞ্চয়ে বিশ্বাস ছিল না উনার। মুখ যে দেয় সে খাওয়ার ব্যবস্থা করেন এই নীতি বিশ্বাস করতেন উনি।
মায়ের কিছু গয়না ছিল। দিদিমার দেয়া। সেইসব বিক্রি করে সংসার চালাতে লাগলো মা।
বাবা গিয়ে উঠেছেন হাসপাতালে।
বিকেলে মা আর ছোট ভাই টিফিন ক্যারিয়ারে করে বাবার জন্য ভাত নিয়ে হাসপাতালে যায়।
খুব খারাপ লাগে তখন।
মা কখনই ঘরের বাইরে বের হয়নি।
মা আমার গৃহলক্ষ্মী ।
দীর্ঘদিন পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে এলেন বাবা ।
তবে পুরোপুরি সুস্থ হলেন না ।
ফিরে আসার পর উনার কাজ ছিল মোড়ের সামনের মুদির দোকানে বসে বসে খবরের কাগজ পড়া। সারাদিন গভীর মনোযোগ দিয়ে তাই করতেন । দোকানে খবরের কাগজের অভাব ছিলো না।
সদাইপাতি দেওয়ার জন্য দোকানদার ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে পুরনো খবর কাগজ সের দরে কিনে।
সেরে সেরে খবরের কাগজ পেয়ে বাবার খুশি দেখে কে।
উনার ধারনা , হয়তো আলেকজান্দ্রিয়ার সেই বিখ্যাত লাইব্রেরিতে পৌঁছে গেছেন । শুধু খিদে পেলে চলে আসতেন বাড়িতে। এক গামলা ভাত খেলে আবার চলে যেতেন খবরের কাগজ পড়তে ।
সংসার কিভাবে চলছে ভুলেও জিজ্ঞেস করতে না ।
খেতে বসে কখনই বুঝতে পারিনি আমাদের কোন সমস্যা আছে । যেই মৌসুমের সেটা সেটা ঠিকই পাতে পড়ছে।
শুধু কবি বা বিপিন নয়। আমি আমার সব বন্ধু হারিয়ে ফেললাম ।
ক্ষয়ে যাওয়া পুরনো পয়সার মত সবাইকে হারালাম ।
আমার বন্ধুরা জীবনের দৌড়ে হয়তো খানিক এগিয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় কখনো কখনো বিপিনের সাথে দেখা হতো।
অবাক হতাম, আমাকে দেখলে বেশ বিব্রত হত ।
অথচ অমন হবার কোনো কারণ নেই ।
আমার বয়স তখন উনিশ !
উনিশ বছরের এক টগবগে তরুনের কাছে জীবনটা যতটা মায়াবী আর সোনালী থাকে, আমার কাছে কিন্তু তেমন না।
সব সময় মনে হয়, বোধহয় কোনরকম দুঃস্বপ্ন দেখছি ।
স্বপ্নটা একটু বড়, এই যা !
যেকোনো সময় হঠাৎ করে ঘুমটা ভেঙ্গে যাবে ।
আবিষ্কার করব পুরাতন বাড়িতেই আছি। বিছানার পাশে জানালা খোলা। দূরে কোথাও ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। দমকা বাতাসে জানালার পর্দাগুলো পুরনো দিনের জাহাজের পালের মত ফুলে উঠছে।
অমনটা হতে পারে না?
সময় সারারাত জেগে বই পড়তাম।
দুপুর বেলা ঘুম থেকে উঠে বিকেলে হাঁটতে যেতাম শহরে ।
অনেকখানি পথ হেঁটে যেতে হতো। পুরনো বাড়ির সামনে দিয়ে কখনও কখনও হেঁটে গেলে কেমন বিবাগী হয়ে যেতাম ।
রাতে বেলা নির্জন একটা পথ ধরে বাড়ি ফিরতে হত ।
হাঁটাহাঁটির এই অংশটা ছিল রোমাঞ্চকর ।
কারণ বাড়ি ফিরছি।
বাড়ি ফেরা । বাড়ি ফেরা । বাড়ি ফেরা । আমার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অনুভূতি। যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকব এই সুন্দর অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকব।
পৃথিবীতে কত মানুষ আছে যাদের বাড়ি ঘর নেই। ফেরার জায়গা নেই। মাথার উপর ছাদ নেই।
প্রিয় কোন মানুষ নেই, অপেক্ষায় থাকবে।
খুব হতভাগা এই মানুষগুলো ।
বেশ খানিকটা খোলা জায়গা হেঁটে বাড়ি ফিরতে হত।
দুই পাশে ডোবা। নামহীন গোত্র হীন জলজ ঘাস। বনতেজপাতার দঙ্গল। পিচ্চিবেলায় অবাক হতাম। এত তেজপাতা , তারপরও দোকান থেকে কিনে আনি কেন?
সব মউসুমে শির শির করে বাতাস বইত এই জায়গায়।
দূরে বউ বাজার।
ঘন অন্ধকারে কুপি আর হারিকেলের বিন্দু বিন্দু কমলা হলুদ ফোঁটা।
সবজি আর মাছের মিশ্র বাজারি ঘ্রাণ।
একটা চায়ের দোকান। উনুনের উপর ক্লান্ত কেতলি। পিতলের থালায় খবরের কাগজ বিছানো। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বিকেলে ভাঁজা আলুর চপ, বেগুনী।
আরও খানিক গেলেই আমার বাড়ি।
দূর থেকেই দেখা যায় কালাই করা টিনের শেডে পারসিমন ফলের মত ষাট পাওয়ারের বিজলির বাতি জ্বলছে।
টিনের শেডটা বাতাসে অল্প অল্প দোলে।
কিম্ভুত সব আলো ছায়ার নাচানাচি । মনে হয় বড্ড রহস্যময় চারিদিকটা।
উঠানে পা দিয়েই রান্নাঘরের লোভনীয় ঘ্রাণ পাই।
মা রান্না করছে।
সিমেনটের চৌবাচ্চার জল মেরুর জলের মত ঠাণ্ডা । ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
ভোর পর্যন্ত জেগে কত আবোল তাবোল ভাবি।
অবাক হয়ে দেখি কখন যেন রেণুর কথাও ভাবছি।
অথচ ওর কথা মনে আসার কোন কারণই নেই। আমাদের মধ্যে কখনই কোন সংলাপ দেয়া নেয়া হয়নি। নার্ভাস হয়ে যাই ওর সামনে।
পুরানো এলাকা ছেড়ে আসার পর আর দেখাও হয় না। শেষ কবে দেখেছিলাম?
মনে আছে, এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে গিয়ে
এপথ অপথ করে কী ভাবে যেন ওদের বাড়ির সামনে চলে গিয়েছিলাম।
চমক ভাংতেই লজ্জা পেলাম।
এখন যদি কেউ জিজ্ঞেস করে , কী করছি এখানে?
কোন সাফাই দিতে পারব না।
ভীষণ লজ্জার একটা ব্যাপার হবে।
পালিয়ে আসতে যাব, তখনই অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখলাম বাড়ির ওখানে একটা বেল গাছ। ওটার নীচে রেণু দাঁড়িয়ে। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। প্রদীপ হাতে সন্ধ্যা পূজা দিচ্ছে রেণু।
পরে জেনেছি । সেটা ছিল শিব রাত্রি।
আর সব মেয়েদের মত উপোষ থেকে শিবের মত পতির প্রাথনা করছিল রেণু।
দেবতাদের মধ্যে শিব সবচেয়ে সৎ চরিত্রের। যাকে পার্বতী ভালবেসেছিল।
যদিও মধ্যযুগে কিছু ফালতু তান্ত্রিক শিবকে নিয়ে ফালতু নোংরা গাল গল্প চালু করেছিল।
কিছু সব মিথ্যা।
বাঘের ছাল পরা শান্ত এই আদিম দেবতার চরিত্রের কোন খুঁত নেই।
হাজার হাজার বছর আগে ও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। বিষ্ণু বা অন্য কোন দেবতার আরাধনার আগে প্রাচীন মহেনজোদারোতে এই দেবতার মূর্তি পাওয়া গেছে।
তিনি দেবতা আর অসুরদের সমস্ত বিরোধ মিটিয়েছেন অকাতরে।
সমুদ্র মন্থনের সময় শুধু অমৃতই উঠেনি। হলাহল নামে ত্রিভুবনের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষও উঠেছিল।
সেই বিষে স্বর্গ মর্ত পাতাল সব অন্ধকার হয়ে সৃষ্টি বিপন্ন হয়ে যাবার পথে।
তখন তিনি সেই বিষ পান করেছিলেন।
তাই তার কণ্ঠ নীল।
বাঙালি সমাজে আর কোন দেবতা শিবের মত আপন হয় না।
পার্বতী তাদের নিজের মেয়ের মত আর শিব যেন তাদের মেয়ের জামাই। বড় আপন।
বৈদিক যুগের আর সব দেবতাদের তুষ্ট করতে কত শত ঘি আর চন্দন কাঠ লাগে। শিবকে খুশি করতে শুধু বেলপাতা , নদীর জল আর ধুতরা ফুল হলেই চলে। এই প্রাচীন জনপদে যত রকম প্রাচীন দেব দেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে, সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে শিবের।
সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় শিব মন্দির।
এই শিব সবার দেবতা।
এমন কী ধান চাষ করতে গেলেও শিবের গীত গায়।
যা আপাতত অর্থ হীন মনে হতে পারে।
গল্প গাঁথা কী বলে?
সেই প্রাচীন কালে কোন এক অতীতে শিব পাহাড় ছেড়ে সমতল ভূমিতে চলে এসেছিলেন ।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি গৃহস্থের দরজায় দরজায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতেন । সন্ধ্যায় ফিরে যেতেন ভিক্ষার ঝুলি হাতে।
তুলে দিতেন গিন্নি পার্বতীর কাছে ।
রান্না করা খাবার, দুই পুত্র গনেশ আর কাত্তিক প্রায় সবটুকু খেয়ে ফেলত।
পার্বতী সামান্য কিছু অন্ন তুলে দিতে পারতেন শিবের পাতে । একদিন পার্বতী দুঃখ করে স্বামীকে বললেন, ' ভিক্ষাবৃত্তি করে আর তো সংসার চলে না প্রভু । কত দিন হয়ে গেল তোমার পাতে মুঠো ভর্তি করে ভাত তুলে দিতে পারি না । মতো তুমি বাঘের ছাল পরে থাকো । আমার খুব কষ্ট হয় । তুমি চাষ করো প্রভু। ফসল ফলাও । অঞ্জনলক্ষী , অমৃত শালী , রূপশালি ধান ফলাও । তুলা আর কার্পাসের গাছ বুনো । তন্তু দিয়ে পোশাক বানানো যাবে। দিনের শেষে থালা ভর্তি ভাত দিতে পারবো তোমায়।'
শিব নিজের ত্রিশূল দিয়ে লাঙ্গল তৈরি করলেন। ভাদ্র মাসের শুরুতে তিনি জমিতে লাঙ্গল দিলেন।
শিবের একটা গরু তো ছিলই, হাল চাষ করতে সমস্যা হলো না। শস্য দানা সংগ্রহ করে রোপণ করলেন ।
নদী থেকে নালা কেটে এনে সেচের ব্যবস্থা করলেন । কার্পাস আর শিমুল গাছ বুনলেন তন্তু বানানোর জন্য।
শেষে একদিন ক্ষেত ভরে গেল সোনালি ফসলে । পাকা ধানের ঘ্রানে চারিদিকে মৌ মৌ করতে লাগল।
পার্বতী শঙ্খে ফু দিয়ে ফসল কাটার সূচনা করলেন । ফসল তোলা হল ঘরে । শিবের পাতে থালা ভর্তি অন্ন তুলে দিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসলেন মাতা পার্বতী ।
লোক কাহিনি আর উপকথাতে প্রাচীন কবি লেখকগণ ইচ্ছে করে দুনিয়ার সব দেব দেবীকে টেনে আনতেন। যুক্তি থাকুক আর নাই থাকুক ।
তবে আদিম দেবতা শিবের এই চাষবাসের গল্পটা আমার পছন্দ হয়েছে ।
বাঙালি রমণীর চিরন্তন চাওয়া-পাওয়ার আকুতি রয়ে গেছে কাহিনীতে।
অপূর্ব রোমান্টিক জুটি এই শিব আর পার্বতী ।
পার্বতী ছিল বলেই তো যাযাবর থেকে শান্ত পুরুষ হয়েছিল আদিম দেবতা শিব।
স্বর্গ বা পাতালে না গিয়ে রয়ে গিয়েছিল মাটির পৃথিবীতে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন