সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চৈতালি হাওয়ায় বিষ

এক 

 

 

ভোর পাঁচটা সাতান্ন মিনিটে শিশিরের  ঘুম ভেঙে গেলএকদম কোন কারণ ছাড়াই।

বাইরে গরম

হালকা ঘেমে গেছে সে

শিশিরে বয়স আটত্রিশলম্বাশ্যামলা  বেশ মজবুত শরীরব্যায়াম ট্যায়াম করে  যে কারও নজর কাড়তে পারে এক দেখায় তারপরও অটোগ্রাফ শিকারীরা চট করে ধরতে পারে না এটাই সেই শিশির চৌধুরী

ওর চেহারার সাথে ঢাকাই   সিনেমার এক অভিনেতার সাথে এত মিল , বেশির ভাগ সময় অটোগ্রাফ শিকারিরা ওকে  সেই অভিনেতা হিসাবে ভুল করে।

 

ব্যাপারটা শিশির পছন্দ করে না।  ওর নিজের একটা  পরিচয় আছে।

 

 গত দশ বছর ধরে শিশির বিখ্যাত

বছরে মাত্র একটা উপন্যাস লেখে যাই লেখে,  বাজারে হিট হয়বই মেলাতে পাঠক লাইন ধরে বই কিনে  না  আর টাকা কামান   শুরু করেছে লেখালেখি  তিন নম্বর বছর থেকে সেই বছর  শিশিরের একটা বইয়ের কাহিনি নিয়ে সিনেমা বানানো হয়েছিলধুম ধারাক্কা খুন খারাবি মার্কা কাহিনিতাতেই নাম ছড়িয়ে যায়

 

সেই সিনেমাটা  হিট হওয়ার পর প্রতিবছর ওঁর বই বের হওয়া মাত্র আবার  সিনেমাওয়ালারা ওর কাহিনি নিয়ে সিনেমা বানাতে শুরু করেনাম এবং কড়ি দুটোই কামায় শিশিরচাকরি ছেড়ে পুরোপুরি লেখায় নেমে পড়ে

 

সফলতা  আর   টাকা-কড়ি  মাথা ঘোলা করে দেয়নি ওরবিনয় আর নরম মনের মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে নিয়েছে  লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকে মাঝখানে ধুম করে  আটাশ বছরের সুন্দরী মেঘাকে বিয়ে করে ফেলেছেআর হ্যাঁ,  দশ মাসের তুলতুলে একটা বাচ্চাও রয়েছে ওদের

 

 

আজ ভোরের এই ভয়াল  কাহিনি শুরুর দুই মাস আগে সিদ্ধান্ত নেয় শিশির,   কিছুদিন নিরিবিলিতে কাটাবেফোন ধরবে না ফোনের শব্দ মাথায় যন্ত্রণা দেয়।  বিকেলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা নামে সময় নষ্ট করবে   না  -মেলের উত্তর দেবে নারাত জেগে মুভি দেখবে না

একদম বিচ্ছিন্ন থাকবে সবার কাছ থেকে

 

সেই সময়টাতে দম  খিঁচে লেখালেখি করে ফাটাফাটি  হাতির সাইজের একটা  রোমাঞ্চ  উপন্যাস নামিয়ে ফেলবে দারুণ চনমন করা একটা প্লট মাথায় ঘুরছে। লিখে না ফেললে ওটা গায়েব হয়ে যাবে।

 

বন্ধু বান্ধবদের আড্ডাই যত নষ্টের গোড়াওদের জন্য লেখালেখি হচ্ছে না বাসায় চলে আসলে বিদায়ও করা যায় না।

 

পরিচিত কয়েকজনের সাথে কথা বলে বুদ্ধিটা  পেল

 বেশ কয়েকজনকে লাগিয়ে দিয়েছিল- তিন মাসের জন্য কোথাও বাসা ভাড়া নিতে পারে কি না?

শর্ত একটাই,  নির্জন-  নিঝুম জায়গা হতে হবেদূরে কোথাও।

 

মাত্র দুদিন পর খবর পাওয়া গেল -  আছে !  এমন একটা জায়গা আছেনবীগঞ্জ  ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ   ছাড়িয়ে আরও বেশ  কয়েক মাইল দূরে গ্রাম ও না আবার  মফস্বল  ও না - দুইয়ের  মাঝামাঝি কেমন একটা জায়গাহঠাৎ করেই যেন সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে

হাতে গোনা  কয়েকটি  মুদি দোকান  কলা পাউরুটি ঝুলে  থাকা  বিচ্ছিন্ন   চায়ের দোকান  আর  নিঃসঙ্গ একটা  তেলের পাম্প ছাড়া আর কিছু নেই

 

সব ছাড়িয়ে আরও ভেতরে গেলে  বাংলো কিসিমের একটা বাড়িবাড়ির নাম-  নির্জনবাসবাড়িটার মালিক  বুড়ো এক  দম্পতিশখের বশে বানিয়েছিলকিন্তু আজকাল ঢাকায় থাকেন তাঁদের বাচ্চাকাচ্চাদের সাথে

 

বুড়ো বুড়ি আনন্দের সাথেই শিশিরকে বাড়ি ভাড়া দিয়েছে বিখ্যাত একজন লোক তাদের বাড়িতে তিন মাস থাকবেভাগ্য আর কাকে বলে !  

পরে সবাইকে বলে বেশ একটা ভাব নেয়া যাবে

 

সমস্যা হল -নির্জনবাস বাড়িটা মূল রাস্তা থেকে আরও অনেক  ভিতরে পড়ে গেছেপুরো পথটা ধুলায় ভর্তি৷ চারিদিকে চিকচিকে  হলুদ বালিনদী ছিল আগে  মরে শুকিয়ে  গেছে  ৷ এখন বালির স্তূপপ্রায় মাইল পনের জায়গা জুড়ে শুধু বালি আর বালিমাঝে মাঝে বগলের চুলের মতো ঝোপ ঝাড়  বেত আর শেয়াল কাঁটা।

 

এত কিছু বাদ দিয়ে গেলে তবেই মূল রাস্তা

আক্ষরিক অর্থেই বিচ্ছিন্ন জায়গাশিশির যেমনটা চায়

 

ভাড়া নেওয়ার আগে মেঘাকে নিয়ে এসেছিল ,  জায়গাটা জরিপ করতেপছন্দ হওয়ার পর কোন রকম দর কষাকষি না করে  কাগজপত্রে তিন মাসের জন্য এগ্রিমেন্ট করে নিয়েছে  বাড়িটায় বড় একটা লিভিং রুম, ডাইনিং রুম- বই পড়া রুম- তিনটি বেড রুম, তিনটে বাথরুমএকদম গোছানো, রান্নাঘর এমন কী    কাজ চালানোর মত শৌখিন একটা সুইমিং পুলও আছে বাড়ির সামনে

 

চারটি গাড়ি ঢুকে যাবে এমন সাইজের  গ্যারেজপিছনে টেনিস খেলার কোর্টএবং দুইশ গজ দূরে পাঁচ রুমের কোয়ার্টার টাইপের বাসা আছে কাজের লোকদের জন্য

 

নির্জনবাসের ভাড়া অনেক বেশিকিন্তু শিশির প্রচুর কামায় আর জায়গাটা ওর পছন্দ হয়েছে দারুণ রকমের সেটাই আসল কারণ।  ভাড়া নিয়ে তর্ক করেনি

 

পরিচিত কাছের লোকজন  অবশ্য শিশিরের আইডিয়াটা  পছন্দ করেনি তিন মাস সবাইকে ছেড়ে বিচ্ছিন্ন থাকার চেয়ে ঢাকা শহরে নিজের ফ্ল্যাটে বসে লিখলে ভাল হতো

 

কিন্তু শিশির আসলে ছুটি চায়

 

বাড়ি দেখতে এসে  মেঘাকে  বলেছিল, তোমার আসার দরকার নেইযতদিন লেখা শেষ না হবে আমি  এখানেই থাকব ব্যাপারটা তোমার জন্য একঘেয়ে হয়ে যাবে লোকজন নেই। প্রতিবেশী নেই। বাজার দূরে।  তুমি ঢাকাতেই থাকো

 

 

মেঘা রাজি হয়নি

 

যুক্তি দেখিয়েছে, শিশিরকে ছেড়ে একা থাকা মানেই হয় নামেঘা এই সময়টাতে পিচ্চির দেখাশোনা করবে রান্না করবেএমন কী বাকি সময়টা তেল রঙের কিছু ছবি আঁকা শেষ করতে পারবেছবি আঁকার হাত ভালো মেঘার৷ হলুদ আর কমলার মিকচার দারুণ করেদেখার মত  ফুলদানি ভর্তি বুনো গোলাপ  ঝাড়ের একটা ছবি আঁকছিল। সেটা না হয় শেষ করবে এই ফাঁকে !

 

কাজের লোক থাকবে সাথেসিদ্ধান্ত নিল কাজে ছেলেটার নাম দুঃখীরাম এক বছরের বেশি হল  ওদের সাথে আছে প্রায় ছোকরা বলা যায় বিশ্বস্তজুতা সেলাই থেকে ইলিশ মাছের পাতুরি রান্না মত কাজ   দুঃখীরাম কে দিয়ে করানো যায় ছোকরা  একটা সম্পদ।

 

 

 

 

 

দুই মাস আগে শিশির আর মেঘা এসেছে নবীগঞ্জে

তুমুল গতিতে লিখছে লেখাটা  নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট।  রিভিশন দিতে গিয়ে বুঝতে পারল,  দুই এক সপ্তাহের মধ্যে উপন্যাসটা শেষ হবেবারবার কাটাকাটি করতে হচ্ছেনতুন করে সংলাপ বসাচ্ছেওর  বিশ্বাস ,  আগের  লেখাগুলোর চেয়ে ভালো হবেপাঠক পছন্দ করবেই আর সিনেমাওয়ালারা তো অগ্রিম টাকা দিয়েই রেখেছে- চিত্রনাট্যের জন্য

 

নির্জনবাস এসে লাভই হয়েছেফোনে আড্ডা দেওয়ার বদঅভ্যাসটা দূর হয়ে গেছে চিরতরেমেঘার সঙ্গ নতুন করে উপভোগ করতে পেরেছে হানিমুনের পর এই প্রথম মেঘার সাথে এতটা আবেগি  সময় কাটাতে পারল।   শহরে থাকলে তো সিনেমাওয়ালা আর প্রকাশকদের    ফোন রিসিভ করতে করতেই মেঘার অর্ধেক দিন চলে যেত

 

এখানে এসে বেচারা দুঃখীরাম কয়েক দিন বেশ  মন  খারাপ করে বসেছিল

 

ওর একটা বদভ্যাস ছিলহলে গিয়ে সিনেমা দেখতো প্রতি শুক্রবারেযত অখাদ্য সিনেমাই হোক , দেখবেইএখানে এসে বেচারা গভীর সমুদ্রে পড়ে গেল যেনএর মধ্যে ফাঁকতালে  একবার শহরে গিয়ে নতুন সিনেমা নাগ নাগিনীর অনন্ত প্রেম দেখে এসেছেকিন্তু ত্রিশ মাইল দূরে গিয়ে সিনেমা দেখে আবার বাসে করে ফিরে আসা মস্ত বড় হ্যাপা, সেটা বুঝে গেছে বেচারাআর বিরক্ত করেনি

 

অবশ্য এই তিন মাসের জন্য দুঃখীরামকে বোনাস দেওয়া হবেওকে দেখলেই বোঝা যায়,  বেচারা শহরের চকমকে জীবন ভীষণ  মিস করছে চেহারায় উদাসীন বাউলের ভাব।

 

 

ভয়ঙ্কর এই ঘটনার শুরু হল চৈত্র মাসের ভোরে

আজ 

ভোর সাড়ে পাঁচটার একটু পরে যখন  শিশিরের ঘুম ভেঙ্গে আবিষ্কার করল ঠাণ্ডা ঘামে  শরীর ভিজে   গেছে  হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে ,  কোনও কারণ ছাড়াই জিনিসটা বুকের খাঁচার ভেতরে  এত দ্রুত  ধুকপুক  করছে  ,    শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর

চুপচাপ শুয়ে রইল কিছুক্ষণ  

 ঘড়ির কাঁটার শব্দ শুনতে পাচ্ছে   ফ্রিজের গুড় গুড় শব্দ ভেসে আসছে রান্নাঘর থেকেনিজে নিজেই চালু আর বন্ধ হয় ওটাএয়ার কন্ডিশনের হালকা গুঞ্জনএ ছাড়া পুরো বাড়ি নিঝুম

 

মনে করার চেষ্টা করল, কোনও দুঃস্বপ্ন দেখেনি তো ?

এক ঘুমে রাত পাড় করে সেকখনোই জাগে না

 

মাথা তুলে দেখলপাশে ঘুমিয়ে আছে মেঘা নিশ্চিন্তেখানিক দূরে ছোট্ট বিছানাতে পিচ্চি বেঘোরে ঘুমোচ্ছেদুজনকে খানিকটা সময় নিয়ে দেখলো বালিশের তলা থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে নিল শিশির

নিঝুম কামরা  , পরিচিত দৃশ্য দেখে ওর হৃৎকম্পন স্বাভাবিক হয়ে গেল সব ঠিক আছে।

 

দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম বোধ হয়

 

 ভাবল

 

 কিন্তু কী দেখেছে মনে পড়ছে নামন থেকে অস্বস্তি বোধ দূর হচ্ছে নাউঠে বসল বিছানার পাশেঢোলা টি শার্ট গায়ে চাপাল নিঃশব্দে  পায়ে নরম তলার স্যান্ডেলমেঘা আর পিচ্চি যাতে না জেগে ওঠে , সে রকম হালকা পায়ে বেডরুমের দরজা খুলে বাইরে চলে এলো

 

বাইরে চারকোণা বিশাল হলরুম

 

এখন ওর  হৃপিণ্ডের কম্পন স্বাভাবিককিন্তু মনের অস্বস্তি দূর হচ্ছে না কেন ? অবচেতন মন কিসের যেন ইঙ্গিত দিচ্ছেহলরুমটা ঘুরে দেখলসবকিছু স্বাভাবিকগত রাতে যেমন রেখে গিয়েছিল তেমনই

 

বারান্দার দিকের কাচের জানালাগুলি ভাল করে বন্ধ করলবাইরে ঝর্ণা থেকে টিপটিপ করে জল ঝরছেকয়েকটা চেয়ার সুন্দর করে সাজানোএকটা চেয়ারের উপর ম্যাগাজিন পড়ে আছেমেঘা পড়ছিল বিকেলেএখন বাতাসে পাতা ওলটাচ্ছে

 

পুরো বাড়িটা ঘুরে এল   স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে তাকাল জানালা দিয়ে দুইশো গজ দূরে স্টাফ কোয়ার্টার  একদম সুনসান প্রাণের কোন চিহ্ন নেই।   কারণ আছেদুঃখীরাম সকাল সাড়ে সাতটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না

 

অস্বস্তির কারণটা ধরতে না পেরে নিজের উপরই খানিক বিরক্ত হয়ে  কিচেনে গেল শিশির  এই মুহূর্তে বিছানায় ফিরে যাওয়ার কোনও মানে হয় নাএক পেয়ালা কফি খেয়ে কাজে লাগা যেতে পারে কফি পারকোলেটর প্লাগ ইন করে  ঠোঁট গোল করে শিষ দিল বাইরে ওদের পোষা এলসেশিয়ান কুকুর টিংকু ঘুরে বেড়াচ্ছেসারারাত বাড়ি পাহারা দেয়ভোরের দিকে কোয়ার্টারের পিছনে ছোট্ট কুকুরের বাসায় ঘুমিয়ে পড়ে

 

টিনের বাউলের টিংকুর  জন্য খাবার নিল শিশির বাউলটা  দরজার বাইরে রেখে আবার শিষ দিল

 

তারপর বাথরুমে চলে গেল দশ মিনিট পর দাড়ি গোঁফ কামিয়ে , শাওয়ার শেষ করে সাদা টি- শার্ট  ,  নীল সুতির প্যান্ট  আর  সাদা স্নিকার্স, পরে আবার রান্নাঘরে  চলে এল

 

 কফি পারকোলেটরের সুইচ অফ করে   দরজা খুলে বাইরে আসতেই ভ্রু কুঁচকে গেল ওর   বাউল ভর্তিটিংকুর খাবার ধরা হয়নিআশেপাশে কোথাও কুকুরটার কোনও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে নাকুকুরটার খাবার বাউলের দিকে তাকাতেই আবার ভয়টা ফিরে এলোশিরশির করে মেরুদণ্ড দিয়ে ভয়ের স্রোতটা ঢুকে পড়ল শরীরের ভেতর

 

 আগে কখনও হয়নি এমনটাযতদিন ধরে ওরা নির্জনবসে আছে, হালকা শিষের শব্দ পেলেই টিংকু  দৌড়ে চলে চলে আসে

 

আজ এমন হচ্ছে কেন ?

 

বাইরে চলে এলো শিশিরসোজা এসে থামল কাঠের তৈরি টিংকুর ঘরের সামনে উঁকি দিলভেতরে কুকুরটা নেই

খুব সকাল সকাল খোঁজ নিচ্ছি নাকি?- ভাবলকুকুরটা এ সময় হয়তো বাইরে দৌড়ঝাঁপ করেএর আগে জলখাবার তো এত জলদি দেওয়া হয়নি

তারপরও ব্যাপারটা কেমন বেখাপ্পা লাগছে  আরও কয়েকবার শিস দিল। দূরের পাতলা ঝোপ ঝাড় আর বালিয়াড়ির দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। কুকুরটার কোন চিহ্ন নেই।  

 

কিচেনে এসে  পেয়ালাতে  কফি নিয়ে  ক্রিম ঢেলে  লেখার কামরাতে ফিরে এললেখার টেবিলে বসে এক চুমু  কফি খেয়ে সিগারেট ধরাল

 

পাণ্ডুলিপি পড়তে লাগলখানিক পর আবিষ্কার করতে পারলো পড়ায় মন বসছে নাএকই লাইন বারবার পড়ছে বারবার আগে লাইনে ফিরে যাচ্ছেমনের ভেতরে টিংকুর  কথা ঘুরছেগেল কোথায় কুকুরটা?

 

পাণ্ডুলিপি পড়া বাদ দিয়ে কফি শেষ করলআবার ফিরে এল বাইরে   টিংকুর   ব্রেকফাস্ট আগের মতোই পড়ে আছেকুকুরটার ঘুমানোর জায়গাতে খোঁজ নিল

নেই

শিস দিল আরও কয়েক বার কোনও ফল না পেয়ে ফিরে এল রুমেসোফায় বসে খানিক রিল্যাক্স হবার চেষ্টা করলোপূর্ব দিকে মুখ করে বসেছেখানিক পরে দেখতে পেল লাল উলের বলের মতো সূর্য উঠছেআকাশের রং গোলাপি গোলাপির কয়েকটা শেড।  সাথে খানিকটা আবীরের মত রঙ।

সারাজীবন সূর্য উঠার দৃশ্য ওকে মুগ্ধ করে। আজ করল না।

 

এই প্রথম আবিস্কার করল জায়গাটা অতিরিক্ত বিচ্ছিন্ন। বড্ড বেশি অনিরাপদ।

হঠাৎ করে পিচ্চির কান্না শুনতে পেল

 

দ্রুত বেডরুমে ফিরে এলপিচ্চিটা ওর রুটিন মেনে সকালে  প্রথম চেঁচামেচি শুরু করেছেমানে খাওয়ার সময় হয়ে গেছেমেঘা বিছানায় বসাওকে দেখে হাসলো

 

এত জলদি যে ? হাই তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল মেঘা বাজে কটা ?

 

সাড়ে ছয় জবাব  দিয়ে  বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে পিচ্চিকে কোলে তুলে নিলপরিচিত স্পর্শ আর বাবার চেহারা দেখে দাঁতবিহীন মুখে ফোকলা হাসি হাসল পিচ্চি

 

ভাল ঘুম হয়েছে তোমার ?’ আবারও মেঘার প্রশ্ন।

 

ভালই।

 

 

মেঘা বাথরুমে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওর দিকে চেয়ে পুলক অনুভব করল শিশির পাতলা নাইট ড্রেসের জন্য মেঘার শরীরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে আকর্ষণীয়লম্বা সুন্দর পা

 

পনের মিনিট পর

মেঘা পিচ্চিকে দুধ খাওয়াচ্ছে  বিছানায় শুয়ে শুয়ে দৃশ্যটা দেখছে শিশির এই দৃশ্যটা দেখতে খুব ভাল লাগে ওর

 

কাল রাতে মোটর সাইকেলের   শব্দ পেয়েছ ? আচমকা প্রশ্ন করে বসল মেঘা

 

দুধ খাওয়ানো অনুষ্ঠানটা দেখা  এতই মগ্ন ছিল শিশির যে খানিক আগের সব ভয় ভীতি গায়েব হয়ে গিয়েছিল ওর মন থেকেমেঘার প্রশ্নে এক লহমায় বাস্তবে ফিরে এল

 

মোটরসাইকেল ? কিছু শুনতে পাইনি আমি

 

কাল রাতে কেউ মোটর সাইকেল করে এসেছিল পিচ্চিকে বিছানা রাখতে রাখতে  বলল মেঘা  রাত দুটোর সময়আর ফিরে যাওয়ার শব্দ পাইনি

 

মানেটা কী? নিজের মাথা চুলে হাত চালাতে চালাতে বলল শিশির

 

মোটরসাইকেলের শব্দ পেয়েছি রাতে বিছানার পাশে বস   বলল মেঘা মোটর সাইকেলটা  বাড়ির কাছে এলোইঞ্জিন বন্ধ হলব্যস আর কোন শব্দ পাইনি 

 

 

ওটা হাইওয়ে পেট্রল পুলিশের মোটরবাইকের শব্দ  পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলল শিশির  প্রতি রাতে একবার করে ঘুনটি দিয়ে যায়মনে নেই ?

 

কিন্তু এই মোটরসাইকেল  আর ফিরে যায়নি

 

অবশ্যই চলে গেছেতুমি শুনতে পাওনি ঘুমিয়ে পড়েছিলআর লোকটা যদি না গিয়ে থাকে তবে

কি এখন আমাদের বাড়িতে আছে নাকি?

 

মেঘা চেয়ে রইল ওর দিকে

 

তোমার কেন মনে হচ্ছে লোকটা বাড়িতে নেই ? মেঘার গলা শান্ত

 

দেখো খানিক বিরক্ত হল শিশির  বাড়িতে অন্য লোক এসে ঘাপটি মেরে থাকবে কেন ? টিংকু   আছে না ?চিৎকার করবে না?

কথা শেষ করেই থেমে গেল শিশিরইয়ে টিংকুকে  সকাল  থেকেই দেখছি নাআমি ওঁকে শিস দিয়ে ডাকলামআসেনি

 

 

উঠে বাইরে চলে এলো শিশিরদরজার বাইরে টিনের বাউলের খাবার আগের মতোই পড়ে আছেআবার শিস দিয়ে ডাকল

সারা নেই

 

কোথায় গেল খুব কুকুরটা ?’ মেঘার প্রশ্ন 

বেডরুমে ফিরে এসেছে শিশির

সম্ভবত বিড়াল ফিরাল ধাওয়া করতে করতে দূরে চলে গেছেআমি খোঁজ নিচ্ছি

 

আবার বাইরে চলে এলো শিশির

সকাল সাতটা

এখনও ওঠেনি দুঃখীরাম আরও আধা ঘণ্টা পর উঠবে

যতক্ষণ হাঁটল লাগাতার শিস দিতে লাগল স্টাফ কোয়াটার সহ পুরো বাড়িটা চক্কর কেটে বাড়ির মেইন গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই বেশ ধাক্কা খেল

 নরম বালিতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে শিশিরের গাড়ির টায়ারের দাগতার পাশে হালকা হলেও মোটর সাইকেলের টায়ারের দাগ দেখা যাচ্ছেদাগগুলো মেইন রাস্তা থেকে সোজা চলে এসেছে ওদের নির্জনবাস বাড়ির মূল গেইটেতারপর গেইটের কাছ থেকেই একেবারে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে

 

একদম ভৌতিক ব্যাপার যেন

 

দিশেহারা বোধ করল শিশির

 

মাথার ভেতর  বিপদের ঘণ্টা বাজছে ওরপা বাড়ালো স্টাফ কোয়াটারের দিকেতখনই দেখতে পেল মেঘা বারান্দায় দাঁড়িয়েওর দিকে চেয়ে হাত নাড়ছে

শিশির , বন্দুকগুলো নেই  ফ্যাকাসে মুখে বলল মেঘা

 

বন্ধুক ? নেই? কি বল ?

 

হ্যাঁ , স্টাডি রুমে তোমার বন্দুকগুলি নেই

 ব্যস্ত পায়ে দুজনেই স্টাডি রুমে চলে এলো 

প্রচুর বইতে ঠাসা এই রুমটা দেওয়ালে কাছের গান  ্যাকে   পয়েন্ট ফোরটি ফাইভ  শটগান আর  একটা  পয়েন্ট টু-টু রাইফেল ছিল 

 এখন নেই 

শূন্য গান ্যাকের   দিকে  তাকিয়ে শিশির আবিষ্কার করল - ওর  ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো সর সর  করে দাঁড়িয়ে গেছে

 ঘুরে  দেখলো, মেঘা  চেয়ে আছে ওর দিকে

 

 জিনিসগুলো কাল রাতেও ছিল কাঁপা গলায় বলল মেঘা

 

 ঠিক মাথা ঝাঁকাল শিশির এগিয়ে লেখার টেবিলের   ড্রয়ার   খুলল   ওর নিজস্ব পয়েন্ট  থার্টি ফোর  অটোম্যাটিক পিস্তল থাকার কথা 

 

 নেই 

 

তোমারটাও নেই ?’  দ্রুত পাশে এসে দাঁড়াল মেঘা

 

 জোর করে ফ্যাকাসে হাসি হাসলো  শিশির  কাল রাতে বাড়ির ভেতরে কেউ ঢুকেছিল আর  বন্দুকগুলো  সব চুরি করে পালিয়ে গেছে আমি বরং পুলিশকে ফোন করি

 

আমার মনে হয় লোকটা এখনও এই বাড়িতেই আছে   কাঁপা কাঁপা গলায়  বলল মেঘা   মোটরসাইকেল ফিরে যাওয়ার শব্দ পাইনি কাল রাতে

 

 টেলিফোন হাতে নিয়ে চমকে উঠল  শিশির  ডায়াল টোন নেই  ফোন ডেড

  

ফোন কাজ করছে না  রিসিভার  নামিয়ে রাখতে রাখতে রাখতে বলল   শিশির 

 

কিন্তু কাল রাতেও ঠিক ছিল আমরা ফোন করেছি ঢাকায় ফ্যাঁকাসে মুখে বললো মেঘা আর এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই সবসময় তো  ল্যান্ড লাইন দিয়েই   ফোন  করি

 

জানি কিন্তু ফোন  এখন কাজ করছে না চিন্তিত মুখে বলল শিশির  কাল রাতে যেই আসুক বন্দুক চুরি করেছে সে টেলিফোন লাইন কেটেছে এবং সম্ভবত  টিঙ্কুর কোন ক্ষতি করেছে

 

 আমার ভয় করছে  শিশিরের  হাত শক্ত করে ধরে ফেলল মেঘা 

 

ভয় পেয়ো না  তুমি পিচ্চির দিকে    খেয়াল রাখ  আমি দেখি দুঃখীরামের কী অবস্থা

 

বেডরুমে ফিরে এল দুজন পিচ্চি ওর দোলনায়  শুয়ে মোটা মোটা পা  শূন্যে তুলে লাথি মারছে অদৃশ্য কিছুকে মুখ দিয়ে লাগাতার অর্থহীন শব্দ  করেই যাচ্ছে 

 

তুমি এখানে থাকো আমি কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিরে আসছি

 

না চেঁচিয়ে উঠল মেঘা  আমাকে একা রেখে কোথাও যাবে না  তুমি

 

 ঠিক আছে  ঠি আছে  তুমি  তোমার কাজ করো নার্ভাস হবে না

  

জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল শিশির  পাল্লা খুলে উঁচু গলায়  হাঁক  দিল,  ‘দুঃখীরাম শুনতে পাচ্ছো ?’

 

 এখান থেকে আগেও হাক  দিয়ে দুঃখীরামকে প্রয়োজনে ডেকছে ওরা

 প্রত্যেকবার   জবাব পেয়েছে আজ হল না ব্যাটা  মড়ার মতো ঘুমোয়

 

আমার সাথে চলো তুমিপিচ্চিকে  সাথে নাও

 

 তিন জনের দলটা বাড়ির পেছনের   কোয়াটারের    দিকে চলে এলো 

 

 দুঃখী রামের কামরার দরজায়  নক কর কিছুক্ষণ  অপেক্ষা করল ওরা বাইরে সাংঘাতিক গরম   গরমের জন্য চোখ পিটপিট করছে পিচ্চি  ওর দুই হাতের মুঠো আরও শক্ত হয়ে গেছে।

 

 

আমি ভেতরে গিয়ে দেখছি , তুমি এখানে দাঁড়াও

 

 হাতল ধরে টান দিতেই বিনা প্রতিবাদে খুলে গেল দরজাজোড়ে হাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল সে

ভেতরে কেউ নেইরান্নাঘরের সিঙ্কের উপর একটা ট্যাঁপ খোলাওখান থেকে টুকটুক করে নিয়মিত ছন্দে জল ঝরছে

 

কয়েক মুহূর্ত দোনামোনা করল সেতারপর দুঃখীরামের বেডরুমে ঢুকে পড়লভেতরে অন্ধকারসুইচে চাপ দিতেই আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠলকামরাটা ছোটকিন্তু দারুন করে সাজানোবিছানার চাদর কুঁচকে আছেকিন্তু দুঃখীরাম নেইপাশের সবগুলো কামরা  চেক করে ফিরে এলো মেঘার কাছে

সে নেই

 

মানে দুঃখীরাম বন্দুক আর টিঙ্কুকে চুরি করে চলে গেছে ? পিচ্চিকে শক্ত করে কলের সাথে চেপে ধরে জানতে চাইল মেঘা

 

হতে পারে জবাব দিল শিশিরমনে মনে ব্যাপারটার পাজল মেলাতে চাইছেদুঃখীর জন্য ব্যাপারটা একদম সহজটিঙ্কুকে যত্নআত্তি দুঃখী নিজেই করতকাজেই টিংকু কোন রকম ঘেউ মেউ করবে নাকাল রাতে পালিয়ে গেছে বন্দুক চুরি করে

 

হঠাৎ করে বন্দুক চুরি করতে যাবে কেন?

 

নিজের মাথায় চুলে আঙুল চালাতে চালাতে শিশির বলল , আর  এই সব চাকর বাকর কিসিমের মানুষগুলোকে বিশ্বাস করা ঠিক নাউজবুকটা বোধহয় কোন আন্তঃজেলা ডাকাত দলে যোগ দিয়েছেডাকাতি করবে কোথাওতাই বন্দুকগুলো নিয়ে গেছেযাওয়ার আগে বুদ্ধি করে ফোনে লাইনও কেটে দিয়েছেআর কিছু না হলেও ডাকাতদলের কাছে বন্দুকগুলো বিক্রি করতে পারবে তো?

 

কিন্তু কেউ যদি মোটরসাইকেলে করে ওকে নিয়ে যায়, তবে দুজন মানুষ বন্দুক আর কুকুর সবাই এক মোটরসাইকেলে যাবে, সম্ভব সেটা ?

 জানতে চাইল মেঘা

 

অত মাথা ঘামিয়ে লাভ নেইআমরা বরং গাড়িতে করে মেন রোডে যাইনবীগঞ্জে একটা পুলিশ স্টেশন আছেওখানে গিয়ে রিপোর্ট করিতুমি পিচ্চিকে নিয়ে রেডি হওআমি গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করছি

 

এতক্ষণে যেন মেঘার ধরে প্রাণ ফিরে এলপ্রায় দৌড়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেল

কী মনে করে শিশির আবার ঢুকে পড়ল দুঃখীরামের বেডরুমেআলনাতে দুঃখী জামাকাপড় সব রয়েছেটেবিলের উপর দাঁড়ি কামানোর সরঞ্জামগুলো ও রয়েছেঢাকাই সিনেমার নায়িকার ছবি সাঁটানো সস্তা আয়নারেজারসেভিং ব্রাশক্রিম।

 

পাশে দামি রেডিওটা দেখে থমকে গেল সেশিশির উপহার দিয়েছিল জিনিসটাদুঃখীরামের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসবালিশের তলায় পেল দুঃখীরামের মোবাইল ফোনটাসস্তা ধরনের বাঁটুল ফোন

 

এই প্রথম ব্যাপারটা নিয়ে নতুন কিছু ভাবতে লাগলো শিশিরদুঃখীরাম যাই করুক অন্তত মোবাইল বা রেডিও না নিয়ে ভাগতে পারে নাঅনেক প্রিয় জিনিস ছিল এ দুটো বিশেষ করে রেডিওটা সারাদিনই কানের গোড়ায় ধরে থাকতো

কেন যেন মনে হচ্ছে দুঃখীর কপালেও খারাপ কিছু হয়েছে

 

গ্যারেজের ভেতরে নীল রঙের ক্যাডিলাক গাড়িটা পার্ক করা

মনের ভেতরে আবার স্বস্তির ভাব ফিরে পেলইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে একইসাথে গ্যাস প্যাডেলে পা দিল - ইঞ্জিন চালু করার জন্য

হাঁপানি রোগীর মতো শব্দ করল গাড়িটা কিন্তু চালু হল না

কারণ কী  ?

 

কাল রাতেও গাড়িটা ভাল ছিল দুঃখীরামকে নিয়ে শহর থেকে বাজার সওদাই করে ফিরেছে৷

 ঠিক সেই অর্থে গাড়ির দক্ষ মেকানিক না । তারপরেও দরকারি প্রায়  সব কিছুই মোটামুটি   জানে।

 

নেমে বনেট তুলে পরীক্ষা করল

সবগুলো স্পার্কিং প্লাগ টেনে খুলে ফেলা হয়েছে

আবারও দিশেহারা অনুভূতি হল ওরকপাল থেকে ঠান্ডা ঘাম নেমে এলো ফোঁটায় ফোঁটায়

পুরো ব্যাপারটা আতঙ্কজনক

একা হলে অতটা ভয় পেত নাপিচ্চি আর মেঘার কথা মনে হতেই দুর্বল মনে হল নিজেকে

টিঙ্কুকে পাওয়া যাচ্ছে না

দুঃখীরাম নেই

বন্দুকগুলো নেই

টেলিফোন নষ্ট

গাড়ি নষ্ট

কেন যেন মনে হল- সাংঘাতিক কিছু হতে যাচ্ছে মস্ত বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে ওরাহঠাৎ করে মনে পড়ল, বাড়ির ভেতরে মেঘা আর পিচ্চি একা রয়েছেঝড়ের বেগে ছুটলো সে

 

ছোট্ট একটা ব্যাগ গোছাচ্ছে মেঘাপিচ্চির দুধের বোতল আর হাবিজাবি সহশিশিরের ভাব ভঙ্গি দেখে বুঝতে পারল, মস্ত কোন ভজকট হয়েছে কি ব্যাপার?

 

মনে হয় কোন সমস্যায় পড়েছি জবাব দিল শিশির  গাড়ি নষ্টকায়দা করে আমাদের বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে কেউ

 

ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল মেঘা গাড়ির আবার কি হয়েছে? 

 

প্ল্যাগ টেনে খুলে ফেলেছে কেউদুঃখীরাম ওর দামি জিনিসপত্র যেমন- রেডিও আর মোবাইল, সেভ করার জিনিসপত্র রেখে গেছেতোমাকে ভয় দেখাতে চাইছি না৷ কিন্তু মন বলছে, কোন বড় রকমের কোন সমস্যায় পড়তে যাচ্ছি আমরাকেউ একজন বাড়িতে এসে...

 

বলতে গিয়েও থেমে গেল সেমনে হচ্ছে বেশি কথা বলছেভয় পাবে মেয়েটা

 

তোমার মনে হয় দুঃখীরাম এ সব করেনি ? অনেকক্ষণ পর বলল মেয়েটা

 

নাকারণ ওর সব জিনিসপত্র আগের মতোই আছে

 

তবে দুঃখী কোথায় গেল?

 

জানি না

 

আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকব না

 

এখান থেকে হাইওয়ে তিন  মাইল দূরে পিচ্চি আর তোমাকে নিয়ে এত দূর হেঁটে যেতে পারব নাগরম দেখেছ ? আর এই তিন  মাইলের মধ্যে একটা টং এর দোকান পর্যন্ত নেই৷

 

 আমি কিছু শুনতে চাই নাএই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকব নাতুমি পিচ্চিকে  কোলে নেবে আমি ওর জিনিসপত্র ব্যাগে ভরে নেবোকিন্তু এ বাড়িতে থাকব না

 

কয়েক মুহূর্ত ভেবে মাথা ঝাঁকালো শিশির  ঠিক আছেবে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে জল দরকার হবেআমি ভ্যাকুয়াম ফ্ল্যাক্স ভর্তি ঠান্ডা জল নিয়ে নিকয়েক ঘন্টার মধ্যেই জায়গাটা নরকের মতো গরম হয়ে উঠবে জানোই তো

 

যা খুশি করোতবে জলদি

 

কিচেনে এসে বরফ ঠান্ডা জল দিয়ে ফ্ল্যাক্সটা ভরে নিল শিশিরলেখার রুমে গিয়ে ড্রয়ার থেকে দুই প্যাকেট সিগারেট, ক্রেডিট কার্ড  আর ব্যাঙ্কের চেকবইটা তুলে নিলনগদ টাকা সব মেঘার কাছেইওর ব্যাগে ভরে নিয়েছে

 

বেডরুমে মেঘা ব্যাগ গোছাচ্ছে তখনও

 

হাতে করে ছাতা নিও একটা বলল শিশির পিচ্চিকে ঢেকে রাখতে পারবেগয়নাগুলো মনে করে ব্যাগে ভরে নাও আর গোল টুপিটা মাথায় পরে নিও।

 

আচমকা  ওঁকে চমকে দিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল মেঘা সোজা চেয়ে আছে শিশিরের পায়ের দিকে

বোকার মতো নীচের দিকে তাকাল শিশিরওর ডান জুতায় কোণার দিকে  লালচে দাগ দেখা যাচ্ছেমেরুন লাল বাইরে হাঁটাহাঁটির সময় কখন যেন  জমাট বাঁধা রক্তে পা দিয়েছিল সে

 

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...