বারো
মানিকের অবস্থা খুবই খারাপ।
দুই পোকা পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করছে।
ফ্রিজের সব বিয়ার মদ শেষ করে পিকনিক মার্কা মুডে আছে ওরা। ওদের সাথে যোগ দিতে পারছে না মানিক ।
বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে আছে একা। মায়ের কথা ভাবছে। এক মিনিট... না আসলে মাত্র কয়েক সেকেন্ড যদি মায়ের সাথে কথা বলতে পারত ! কেমন আছে বুড়িটা। সারাটা জীবন পাখির মতো ডানা দিয়ে আড়াল করে রেখেছে ওকে। অথচ মায়ের জন্য কিছুই করতে পারেনি।
এখান থেকে ফোন করলে সমস্যা হবে। কেউ ওরা মোবাইল ব্যবহার করছে না। কেশুর কড়া হুকুম। হাসপাতালে মানিকের মায়ের কাছে কোত্থেকে থেকে ফোন আসছে, সেটা জানলেই লোকেশন ধরতে পারলেই তো সব শেষ। বাড়ির ছবি পর্যন্ত এসে যাবে পুলিশের হাতে।
এখান থেকে গাড়ি নিয়ে যদি বেরিয়ে যায় তবে মাইল ছয় গেলেই একটা দোকান পাবে। ওখানে পয়সা দিলে ফোন করা যাবে ফুটপাত থেকে। সহজে ধরতে পারবে না কেউ। গাড়ি নিয়ে গেলে এক ঘণ্টার মধ্যে ফোন করে আবার ফিরে আসতে পারবে।
ঘামতে ঘামতে উঠে দাঁড়াল মানিক ।
‘শোন আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।’ দুই পোকার সামনে দাঁড়িয়ে বলল সে। ‘ জরুরী কাজ আছে । এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব।’
‘সমস্যা নেই।’ বাঁকা হাসি হেসে বলল পোকা । ‘ফিরে এসে আমাদের এখানেই পাবেন মানিকদা। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’
অবাক হয়ে মানিক চেয়ে রইল পোকার দিকে। এমন ভাবে কথা বলছে কেন ছোকরা ? মনে পড়ল, অতীতে কেউ এমন করে কথা বললে এতক্ষণে সবগুলো দাঁত ফেলে দিত সে।
‘ঠিক আছে। এই জায়গায় বসে বাড়ি পাহারা দেবে। কোন ঝামেলা যেন না হয়।’
‘ঝামেলার কথা আসছে কেন বড়ভাই ?’ বিরক্ত মুখে বলল পোকা । ‘ যান আপনার জরুরি কাজ শেষ করে ফিরে আসুন।’
রেগে উঠতে গিয়ে ও সামলে নিল মানিক । মনের ভিতর কেমন যেন কু- ডাক দিচ্ছে। অস্বস্তি বোধ লাগছে। পোকার চোখে অশুভ কী যেন ঝিকিমিকি করে দেখল সে মুহূর্তের জন্য।
ধুলো উড়িয়ে মানিক গাড়ি চলে যেতেই উঠে দাঁড়াল পোকা অলস ভাবে।
‘যাচ্ছো কোথায় ?’ কড়া গলায় বলল রুইতন।
‘একটু মৌজ মস্তি করে আসি। বোরিং লাগছে।’ নোংরা দাঁত বের করে হেসে ফেলল পোকা।
***************************************
সাবিহা বাচ্চা পছন্দ করে না। একদমই না ।
বসে বসে দেখছিল মেঘা কীভাবে পিচ্চির ন্যাপি বদলে দিচ্ছে। বমি আসছে ওর ।মেঘাকে পছন্দ করে। মেয়েটা সুন্দরী। কিন্তু টোপলা তুলতুলে ক্ষুদে বাচ্চাটা একদম না পছন্দ।
পিচ্চিকে দোলনায় রেখে মেঘা বলল , ‘বাবু এখন ঘুমিয়ে থাকবে। রান্না করা দরকার। তুমি কি আমাকে একটু হেল্প করবে?’
সাবিহার বিশ্বাস হচ্ছিল না নিজের দুই কানকে।
‘আমাকে কাজ করতে বলছেন আপনি?’ চেঁচিয়ে উঠল। ‘ আমি কাজের বুয়া নাকি? কাল আব্বু টাকা দিলেই আমি চলে যাব এখান থেকে।’
‘নিশ্চয়ই।’ তিক্ত গলায় বলল মেঘা। ‘তা খাওয়া তো গিলবে নাকি ? না কি উপোস থাকবে ?’
‘নিশ্চয়ই খাব। আমি ঝাল বেশি খেতে পারিনা। খেয়াল রাখবেন।’
তখনই বেডরুমের দরজা খুলে বাইরে গেল।
বাইরে ঘামে ভেজা চকচকে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পোকা। মেঘা- সাবিহা দুজনেই চমকে উঠল।
‘চলো জানেমান।’ নোংরা হাসি হাসল পোকা। ‘তুমি আর আমি একটু ফুর্তি করি পাশের রুমে গিয়ে।’
তড়াৎ করে উঠে দাঁড়াল মেঘা।
‘বেড়িয়ে যাও এখান থেকে।’তর্জনী তুলে পোকাকে শাঁসাল।
‘সরে যান বউদিমণি।’ খিক খিক করে হাসল পোকা। ‘ না হলে আপনাকে দিয়ে শুরু করব।’
গায়ের জোরে মেঘাকে ধাক্কা দিলে পোকা। উড়ে গিয়ে কামরার শেষ প্রান্তে পড়ল মেঘা। ঝটকা মেরে সাবিহাকে কাঁধের ওপর তুলে নিল পোকা, যেন কোলবালিশ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাবিহা চেঁচিয়ে দুই পা ছুঁড়ছে।
পাশের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল পোকা।
বারান্দায় বসে সবই শুনল রুইতন। ভাইকে ভাল করেই চেনে। এই মুহূর্তে পোকাকে বাধা দিতে গেলে ওকে খুনও করে ফেলতে পারে পোকা।
***********************************************
ফোন বুথের সামনে দাঁড়িয়ে ঘামছে মানিক । দোকানদার যাতে সন্দেহ না করে, একটা কোকের বোতল কিনে সহজ ভঙ্গিতে চুমুক দিতে দিতে বুথের ভিতর ঢুকে ফোন করলো।
রিসিপশনে মেয়েটা ওকে অপেক্ষা করতে বলল।
খানিকপর অন্য একটা মেয়ের গলা শোনা গেল, ‘ মানিক দাদা আমি নার্স মল্লিকা বলছি । খুব খারাপ লাগছে খবরটা দিতে। আপনার মা গত রাতে স্বর্গ লাভ করেছেন। কোনও রকম যন্ত্রণা পায়নি বেচারি।’
কথাটা ঠিক মতো বুঝতে পারল না মানিক ।
আসলে ওর অবচেতন মন বুঝতে চাইছে না ।
‘কী বললেন আপনি ?’ ফোনের রিসিভার কানের সাথে জোড়ে চেপে ধরে বলল মানিক । ‘মানে আমার মা মারা গেছে ?’
‘হ্যাঁ, গত রাতে। আমরা খুব দুঃখিত...।’
রিসিভার নামিয়ে ধীরে ধীরে গাড়িতে গিয়ে বসল মানিক ।
প্রথমেই মনে হল, এখন আর টাকা দিয়ে কী হবে ? সে একা। মা নেই। মারা গেছে। মায়ের জন্যই তো টাকা কামাতে চেয়েছিল। ওর একার পেট চালাতে কত টাকা আর লাগবে ? এখনও সময় আছে, সে সব ছেড়ে চলে যেতে পারে। বেঁচে যাবে এই মহা ঝামেলা থেকে। কিন্তু ওস্তাদের কী হবে? উস্তাদ ওর ভরসায় এই কাজে নেমেছিল।
জেলের দিনগুলোর কথা ও মনে পড়ল। তবে এখন চলে গেলে আবার সেই ভাতের হোটেলে দৈনিক বারো ঘন্টা করে কাজ করতে হবে। মালিকের চামারের মত ব্যবহার। আবার সেই জীবনে ফিরে যেতে চায় না। টাকাটা পেলে একটা হোটেল নিজেই দিতে পারবে। কোনও মেয়ে ও জুটে যেতে পারে বউ হওয়ার জন্য। চুমকি মেয়েটা পছন্দ করত ওকে। হয়তো এখনও বিয়ে হয়নি চুমকির।
সবচেয়ে বড় কথা, ওস্তাদকে বিপদে ফেলে মানিক ভাগতে পারবে না। কখনোই না।
নির্জনবাসের দিকে গাড়ি হাঁকাল মটকু মানিক ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন