নয়
দুই অফিসার যখন হেলেনের সাথে কথা বলে বের হচ্ছিল , কেশু তখন ঢাকায়। হোটেল ব্লু স্টারের দারুণ ছিমছাম কামরাতে বসে জিন টনিক গিলছিল। আর মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিল।
কত সুন্দর করে পিছনে লেগে থাকা টিকটিকি দুটোকে ফাঁকি দিয়েছে। উফ! তারমানে এখনও মরচে ধরে যায়নি !
ব্যালকনিতে বসে অনেক সময় নিয়ে আয়েশ করে ড্রিংক শেষ করে হোটেলের ল্যান্ডলাইন থেকে ফোন করল মানিককে। হোটেলে উঠেছে ভুয়া নাম পরিচয় দিয়ে ।
মানিকের নাম্বার চোরাই। পুরানা পল্টনের রাস্তা থেকে সিম সহ চালু একটা ফোন কিনে নিয়েছে। পুলিশ আর ছিনতাইকারিরা ভাগে বিক্রি করে।
সংকেতে কথাবার্তা বলল। পুরোনো দিনের মানুষ ওরা। নিজেদের কথা শুধু নিজেরাই বুঝতে পারবে।
‘শুটকির প্যাকেট ঠিক মত পেয়েছি স্যার।’ বলল মানিক । ‘ শুধু প্যাকেট নেওয়ার সময় একটা বাচ্চা গাড়ি থামিয়ে ছিল। জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল ডেলেভারি বয় । তাই। বাচ্চাটা আমাদের রুই মাছটা দেখে ফেলেছে।’
‘ব্যাপারটা মনে ভাল হল না।’ অস্বস্তি নিয়ে বলল কেশু । ‘ এই গরমে দই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বাচ্চাটা রুই মাছের সাইজ চেহারা মনে রাখতে রাখবে বলে মনে হয় না। রিল্যাক্স । কেমন আছে বড় লোকের বেটি ?’
‘ওর মাথায় লাল গেন্ধা ফুল গুঁজে দিয়ে কব্জায় রেখেছে রুই মাছ। শর্ষের তেলের বোতল দেখাতেই ভয়ে একদম খিঁচে গেছে।’
‘সব ঠিক আছে ৷ একঘণ্টা পর নবীগঞ্জের দিকে যাত্রা শুরু করব।’
ফোন কেটে নীচে গিয়ে ভরপেটে খাবার খেল কেশু । নিজের কামরার বারান্দায় ফিরে এলো হুইস্কির পেটমোটা একটা বোতল নিয়ে।
লম্বা সময় ধরে ধীরে ধীরে মদ খেল। কার্নিশে কাকদের ঝগড়া আর পায়খানা করতে দেখল।
আবার পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আগাগোড়া ভাবল। ধাপে ধাপে সব ঠিকই যাচ্ছে।
আচ্ছা পুলিশ অফিসার কি রুইতনের চেহারা মনে রাখবে ? সাবিহা কিডন্যাপ হওয়ার আগে সাথে একটা মেয়ে ছিল - এই তথ্যটা পুরো ব্যাপারটা জটিল করে তুলবে না ?
ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল কেশু ।
যে পুলিশ সাবিহার পিছনে পিছনে অনুসরণ করছিল সেই গাধাটা হেডকোয়ার্টারে গিয়ে রিপোর্ট করেনি , যে ওদের সে হারিয়ে ফেলেছে ? পার্লারের ওরা অবাক হয়নি ? প্রতি সপ্তাহে সাবিহা আসে । এই সপ্তাহে এলো না যে ! মানিক পারবে পুরো ব্যাপারটা সামাল দিতে ?
পকেট থেকে নোট বইটা বের করল কেশু। অসংখ্য দরকারি নাম্বারের সাথে খন্দকারের বাড়ির নাম্বার জোগাড় করেছে , বহু কাঠখড় পুড়িয়ে।
নাম্বারটা ডায়াল করতে গিয়ে থমকে গেল। ইশ কি করতে যাচ্ছিল সে ! হোটেল থেকে ফোন করা একদম বোকামি হয়ে যাবে। মাত্র এক মিনিট তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে ফোন করা হয়েছিল কোত্থেকে।
হোটেলের বেশ খানিকটা দূরে রাস্তার পাশের একটা ওষুধের দোকানে ফোন করার জায়গা আছে। টাকা দিলেই মিনিট হিসাবে ফোন করা যায়।
ওখান থেকে খন্দকারের বাড়িতে ফোন করল কেশু ।
মিহি গলায় ফোনের ওপাশে কেউ বলল, ‘খন্দকার ভিলা। কে বলছেন ?’
‘খন্দকার সাহেবের সাথে কথা বলতে চাই। খুব জরুরি।’
‘কে বলছেন ?’
‘রুস্তম আমার নাম । ওনাকে বলুন উনার মেয়ের ব্যাপারে কথা বলব আমি।’
‘একটু ধরুন।’
খন্দকার মাত্র বাড়ি ফিরছিলেন। এক গাদা ফাইল দেখছিলেন স্টাডি রুমে বসে । ব্যবসা সংক্রান্ত কাজ। হাতে ডাবল মার্টিনর গ্লাস। জলপাই সহ।
তৈমুর আলম খন্দকার বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা মানুষ । চেহারা দেখে মনে হয় সারা দুনিয়ার সবার প্রতি বিতৃষ্ণা নিয়ে বেঁচে আছেন । চোখ দুটো কালোজামের মতো কুঁতকুতে। মুখের চোয়ালটা ব্যারাকুডা মাছের কথা মনে করিয়ে দেয় খামাখাই । চেহারা দেখলে বোঝা যায় এই লোক দুনিয়া এসেছে এক টাকাকে একশো টাকা বানানোর জন্য।
কয়েকটা মুহূর্ত কটমট করে কাজের লোকটা দিকে চেয়ে রইলেন। ফোন তোলার আগে বাম হাতে ফোনের সাথে অ্যাড করা কল রেকর্ড করার লাল সুইচটা অন করে দিলেন।
‘হ্যালো, কে বলছেন ?’
‘খন্দকার সাহেব ?’
‘বলছি।’
‘মন দিয়ে শুনুন। অস্থির হওয়ার কিছু নেই। আপনার মেয়ে আমাদের হাতে আছে।’ শান্ত মাপা পেশাদারি গলায় বলতে লাগল কেশু । ‘ একদম নিরাপদে আছে। যদি পুলিশকে এইসব জানান তবে আর নিরাপদে থাকবে না। বাকি জীবনে দেখতে পাবেন না মেয়ের চেহারা । এতি পেতি দল না আমরা। ইন্টারন্যাশনাল পেশাদারি পুরনো দল। ঠিক এই মুহুর্তে আপনার বাড়ির উপর নজর রাখা হচ্ছে। আপনার ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে। কাকে ফোন দেখেন, কী বলবেন সব শুনতে পারব আমরা। অপেক্ষা করুন। আবার ফোন দিয়ে বাকিটা বলব।’
ফোন কেটে দিয়ে অলস পায়ে রাস্তা পাড় হয়ে উল্টা দিকে এলো কেশু । ট্যাক্সি নিল, হোটেলে ফিরবে।
**************************************************
কয়েকটা মুহূর্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন খন্দকার। চেহারা খানিকটা লাল হয়ে গেছে।
ফোন রেখে চিৎকার করে বললেন, ‘আমজাদকে খবর দাও জলদি।’
আমজাদ কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলো।
পেটানো তাগড়া শরীর। নীল জিনস আর সাদা স্পোর্টস শার্ট পরনে। খন্দকার সাহেবের সেক্রেটারি। মহা ধুরন্ধর লোক। ঠান্ডা মাথার জন্য বিখ্যাত।
গম্ভীর মুখে অডিও রেকর্ডটা বাজিয়ে শুনল কয়েকবার।
শান্ত ভাবে মোবাইল নিয়ে দ্রুত কয়েকটায় ফোন করল । শেষে বসের দিকে ফিরে বলল, ‘ রাস্তার ফোন বুথ থেকে ফোন দিয়েছিল স্যার। আর স্যার, ম্যাডাম আজকে পার্লারে বা কান্ট্রি ক্লাবে খেতে যায়নি। আমি কি ক্রাইম ব্রাঞ্চে ফোন করবো স্যার ? ওখানে পরিচিত লোক আছে আমার।’
জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন খন্দকার সাহেব।
‘না।’ ফিসফিস করে বললেন । ‘কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। তুমি যাও। খানিকটা সময় একা থাকতে দাও আমাকে।’
**********************************
নির্জনবাসের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে পোকা।
গাড়িটা দেখা যাচ্ছে । অনেক দূরে। এ দিকে আসছে।
প্যান্টের পকেটে রাখা শিশিরের পয়েন্ট থার্টি এইট পিস্তলটায় আলতো করে হাত বুলিয়ে নিল। বাড়ির ভেতরে শিশির মেঘা আর পিচ্চিকে আটকে রেখে বাইরে থেকে লক করে রেখেছে পোকা। পালাতে পারবে না। ওদের মোবাইলগুলো পর্যন্ত জব্দ করেছে। দুঃখীর রুমে মোবাইল জ্যামার রেখে অন করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে অবস্থা ভালো৷
অন্য সময় হলে মৌজে থাকত পোকা। এখন পারছে না । বারবার দুঃখীরামের চেহারাটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। কাজ শুরু করার আগে একটা লাশ পড়ে গেছে। সন্দেহ নেই , খুব খারাপ হয়েছে ব্যাপারটা। নিজেকে সান্ত্বনা দিল পোকা- ইচ্ছে করে খুন করেনি সে চিংড়ি মাছের মতো রোগা কাজের লোকটাকে। আঘাত করে অজ্ঞান করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যাটা দুঃখীরাম আসলেই দুঃখী। মরেই গেল ?
গাড়িটা এসে থামল।
মানিক চালাচ্ছিল।
পিছনের সিটে রুইতন আর জিম্মি মেয়েটা বসে আছে। মেয়েটাকে দেখে বেশ হতাশ হল পোকা৷ আরও চকমকা সুন্দরী আশা করছিল। বড়লোকের মেয়ের এমন কুৎসিত হয় নাকি?
প্রায় দৌড়ে গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়াল পোকা।
‘সব ঠিক আছে ?’ কুশলাদি জানতে চাইল মানিক ।
মাথা ঝাঁকাল পোকা।ডান হাতের বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল। ইংরেজি মুভি দেখে শিখেছে।
‘গাড়িটা কোথায় লুকিয়ে রাখা যায় ?’
‘গ্যারেজে নিয়ে যান প্রচুর জায়গা আছে ৷’
মানিক চলে গেল ওদের নামিয়ে রেখে। সাবিহা কৌতূহলের সাথে পোকাকে লক্ষ্য করছিল ।নোংরা পোশাক পরা মারকুটে পোকাকে বেশ পছন্দ হয়েছে । আসার পথে গাড়িতে মানিক ওকে বুঝিয়ে বলেছে, ওর বাবা টাকা দিলে দিলেই ওর কোনও ক্ষতি হবে না।
‘হ্যালো, আমার নাম পোকা।’ আগ বাড়িয়ে কথা বলল লোকটা । ‘ খুকি তোমার নাম ক কী ?’
এহহে। এটা যদি একটু সাফসুতরো হত , কী যে লাগত না । ভাবলো সাবিহা। কী ফিগার ব্যাটার। মুম্বইয়ের মারদাঙ্গা নায়কগুলোর মতো লাগছে।
‘তুমিও কী এদের লোক না কি ?’ জানতে চাইল ।
‘নিশ্চয়ই।’ মধুর হাসি হেসে পোকা হাত বাড়িয়ে দিল সাবিহার দিকে। বুঝতে পেরেছে মেয়েটার মনে ও লাডডু ফুটিয়েছে। খপ করে সাবিহার হাত ধরে ফেলল।
কাছে আসতেই পোকার ময়লা জামাকাপড়ের দুর্গন্ধ সাবিহার নাকে আঘাত করল ।গা ঘিন ঘিন করে উঠল নোংরা কালো নখ আর হলুদ দাঁত দেখে । ঠাস করে চড় কষে বসল পোকার গালে।
চড় খেয়ে থমকে গেল পোকা।
পোকা সেই ধরনের মানুষ যারা সাপের মতো। আঘাত পেলে হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে ছোবল মারতে চায়। তাছাড়া মেয়েটার কাছ থেকে প্রত্যাখান আশা করেনি। ভেবেছিল মেয়েটা ওর ছক্কাবাজ ইমেজ দেখে মজে গেছে।
রাগে দিশাহারা হয়ে পোকা এক কদম সামনে এগিয়ে গেল। মারবে মেয়েটাকে।
‘সামলে নাও পোকা।’ ভাইকে খোলস ছাড়তে দেখে সামনে চলে এলো রুইতন। ‘মানিক দাদা আসছে এইদিকে।’
থমকে গেল পোকা। বিষ মাখানো চোখে চেয়ে রইল সাবিহার দিকে। তারপর সহজ গলায় বলল, ‘ব্যাপারটা, মনে রাখব সোনামণি। আমাদের এক সাথে অনেকটা দিন এখানেই থাকতে হবে।’
‘কী হচ্ছে এখানে ?’ পেছন থেকে মানিকের শান্ত গলা শোনা গেল।
‘কিছু না।’
‘বন্দিরা সবাই ঠিক আছে ?’ময়লা রুমালে মুখের ঘাম মুছে সতর্ক গলায় প্রশ্ন করল মানিক ।
‘ঠিক আছে মানিক দা।’
‘কুকুর আর চাকর ?’
‘কুকুরটা মরে গেছে। বিষ মাখান মাংস খেয়েছিল। আর চাকরটার হাত পা বেঁধে কোয়াটারে রেখে এসেছি। পালাতে পারবে না।’
মানিক কেন যেন মনে হলো মিথ্যে কথা বলছে পোকা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন