সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্রেরা মরে গেলে চুমকি হয়ে যায় ৮

 

 

 

 

মনে হয় কত গল্প ছড়িয়ে আছে চারিপাশে 

 

রামকৃষ্ণ মঠের পাশে একটা বিশাল ফাঁকা মাঠ মাঠের ঠিক মাঝখানে একটা নিঃসঙ্গ কবর   অচেনা হরফে কী  সব লেখা কোন এক পাদ্রির  কবর  কবে এসেছিল দূর অচেনা  শীতের এক   দেশ থেকে আমাদের জলে ভেজা এই বাংলায়

 

 আর ফিরে যায়নি অনুরোধ করেছিল নিঃসঙ্গ এই সবুজ মাঠে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে

শুয়ে আছে আজও 

 

 

কোন এক জিন্দাপীরের গল্প শুনেছিলাম-মায়ের মুখে

আকন্দ লতা আর বন তুলসির ঝোপে ছিল তার কবর পাড়া গাঁয়ের বধূরা সন্ধ্যাবেলা তার কবরের উপর রেখে দিত মাটির পিদিম মানত করত- তাদের সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে

 

খারালি কালে সব শুকিয়ে যেত ভোরের আকাশের মত কচি কলাপাতা শুকিয়ে হলুদ হত মাঠ ঘাঁট শুকিয়ে ফেটে যেত অচেনা গ্রহের জমিনের মত শুকিয়ে যেত রসালো ঘাস আর মানকচুর দঙ্গল পদ্মদিঘি শুকিয়ে হত থিরথিরে নর্দমা আকাশের রঙ হত সীসের মত বানকুড়ালি হাওয়ায় ভাসতো অচেনা পাখীর ধূসর পালক

 

মানত করে কেউ কেউ যেত জিন্দাপীরের কবরে এক ঘটি ঠাণ্ডা জল কবরে ঢেলে দিয়ে ফেরার পথেই দেখত আকাশে জমেছে অভিমানি মেঘ কাকের পালকের মত কালো মেঘ

তারপর নামত রিমঝিমি বৃষ্টি

 

 

বৃষ্টি ! বৃষ্টি !! বৃষ্টি !!!

 

 

খারালি শেষের বৃষ্টি দেবতাদের আশীর্বাদ মাঠ ঘাঁট সব হয়ে পড়ে কচি কলাপাতার মত সবুজ তকতকে রাতারাতি ঘাস বেড়ে লম্বা হয়ে যায়  ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে পাগল হয়ে যায় দেশান্তরী পথিকের মন 

 

মনে পড়ে যায় ফেলে আসা পরিবারের কথা 

 

ওদিকে নদীতে বান ডাকে আল ভেঙ্গে ফসলের ক্ষেতে ঢুকে পড়ে আখের রসের মত  নদীর ঘোলা জল  সেই সাথে ভেসে আসে রয়না, ট্যাংরা, শোল আর দুধের সরের মত সরপুঁটিচলে আসে  পিরালি বোয়াল আর মাগুর মাছ  

ঘন বর্ষার দিনগুলোতে নিঝুম হয়ে যায় গ্রামের পরিবেশ 

 

 

গ্রামগুলো  হয়ে যায় কেমন বিচ্ছিন্ন দিনমান বৃষ্টিতে ভেজে পাটের খেত আর বাসক পাতার ঝোপ

 

 আকাশে কালি গোলা মেঘ শিনশিনে পূবালী হাওয়া খেয়াঘাঁট বন্ধ হয়ে যায় আগে ভাগে পারাপারের লোক নেই মহাজনি নৌকা ভিড়ে থাকে ঘাটে গুদারা ঘাটের ছোট্ট বেড়ার ঘরে ঘুমিয়ে থাকে বুড়ো চৌকিদার পাশে একটা ঘিয়া রঙের কুকুর 

 

মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে অযথাই হাঁক দেয় চৌকিদার- কে যায়?

 

সন্ধ্যার পর কমলা রঙের টিমটিমে হারিকেন নিয়ে মাছ ধরতে বের হয় গ্রামের দুই একজন মাছ শিকারী হাতে কোঁচ আর কোমরে বেতের ঝুরি 

বিচিত্র এই অলৌকিক গল্পগুচ্ছ বিবশ করে দেয় আমাকে

 

বর্ষার দিনে মাছগুলো কেমন পাগল হয়ে যায়

 

 

ওরা হয়তো ভাবে পৃথিবীতে মহাপ্লাবন নেমে এসেছে আর কখনই খরালি কাল আসবে না ধুলো মাটির এই পৃথিবীতে

গাঙ্গ বেয়ে মাছেরা চলে আসে পাগলের মত টলটলে পদ্মপুকুর আর ধানের ক্ষেতের জমা জল  আভিজাত্যের গৌরব ভুলে- বিবাদ ভুলে এক হয়ে যায় শ্যাওলায় মাঝে ঘাই দেয় জিয়ল মাছের পোনা 

 

মাছদের বড় সুখের সময় সেটা

 

কিন্তু কেউ জানে না সুখের সময় স্বপ্নের চেয়েও ক্ষণস্থায়ী

 

ক্ষণিকের বিহব্বলতায় অবাক হয়ে মাছেরা দেখে কমলা রঙের কেমন যেন মায়াবী আলো

কিসের আলো ওটা ? কেন এতদিন  রকম জাদুকরী আলো দেখেনি জলের স্রোতে ভেসে ভেসে?

 

 অচেনা অনুভূতি ওদের পালাতে দেয় নামুহূর্তের ঘোর লাগা অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায় শক্ত কোঁচের ঘায়েফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে  মোরগ ফুলের মত লাল হয়ে যায় আশেপাশের জল

 

 

ব্যাথা নিয়ে আবিষ্কার করে কোঁচে গেঁথে আছে মাছের শরীর

 

 

বেতের ডুলাতে পড়ার আগে মনে পড়ে গাঙ্গের ঘোলা জলে কথাবর্ষার নতুন জলে  ভিজে মাছ ধরে মৎস্য শিকারীরা

কিংবদন্তীর মত কয়েক নদীর মোহনায় জমা হয় বোয়াল মাছ রূপার ফালির মত মাছের টুকরো ভর্তি বেতের ঝুরি নিয়ে বাড়ি ফেরে ওরা

 

গ্রামের সব রান্না ঘর ভিজে সপসপে থাকে এই মৌসুমে মাটির চুলার ভেতরে আস্তানা গাড়ে কোলা ব্যাঙদাওয়াতে আলগা চুলার ব্যবস্থা   করা হয় শুকনো বাবলার ডাল আর জমা ঘুঁটে নিয়ে রান্নার আয়োজন করে বাড়ির মেয়ে  মরচে রঙের বাটা মসলা গায়ে মেখে কালো কড়াইয়ে রান্না হয় মাছের তরকারি

বৃষ্টি ধরে আসে 

বাইরে নীল অন্ধকার

 

লাল চালের ফ্যানসা ভাত আর ঝাল মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেতে খেতে গ্রামের শিকারী পুরুষ প্রশংসার চোখে চায় গিন্নির দিকে ভাবে-হাতে কিছু পয়সা হলেই গিন্নিকে একটা নাকছবি বানিয়ে দিতে হবে

 

বাদলার মৌসুমে সব গ্রামের দৃশ্য কিন্তু এক না

 

আমি কল্পনা করি কোথাও কোন জংলা ভিটায় রোগা এক মেয়ে শুয়ে আছে বিছানায় ওষুধ, পথ্য কিছুই নেই


ছোট ভাইকে ফিস ফিস করে বলছে- অপু, সেরে উঠলে আমাকে একদিন রেলগাড়ি দেখাবি?


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...