পাঁচ
হোটেল মধুমিতা।
লবিতে বসে আছেন গাউস চৌধুরী। চেহারার কোনও ভাব নেই। খানিক দূরে তাঁর সহকারী আবদুল হাই। খবরের কাগজে পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনগুলো খুঁটিয়ে পড়ছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনার ভান করছেন গাউস চৌধুরী। আসলে কথা শুনছেন কারও।
অন্যপক্ষের কথা শেষ হতেই বললেন , ‘ ঠিক আছে স্যার। আমি এবার আট ঘাঁট বেধেই নেমেছি। চব্বিশ ঘণ্টা আমাদের দুইজন ইনফরমার পালা করে কবুতরের উপর নজর রাখছে । দানা খেতে গেলেই ধরব। দুই কোয়েল পাখি হোটেল মধুমিতার। আমরা লবিতে।’
লাইন কেটে দিল অপর পক্ষ। এখন আবার হেডফোনে গান বাজছে !
সতর্ক চোখে চার দিকে নজর বুলিয়ে নিলেন।
এখনও সন্দেহজনক কোনও চরিত্র আসেনি হোটেলে। কিন্তু কেউ না কেউ আসবে। হোটেলে এসে নির্জন কামরাতে বসে দাবা খেলছে না ওই দুই শয়তান।কিছু না কিছু ঘটবেই।
ঘড়িতে সময় দেখলেন। এগারোটা বিশ। ইচ্ছা করলে এখানে টানা এক সপ্তাহ বসে থাকতে পারবেন। জানেন, আগে বা পরে কিছু একটা ঘটতে বাধ্য।
মাঝে দুইজন মোটা সোটা বয়স্কা মহিলা ট্যাক্সি থেকে নেমে হোটেলে ঢুকল।
মধ্যাহ্নের কয়েক মিনিট আগে ,অল্প বয়স্ক একটা মেয়ে আর এক যুবক হাঁটতে হাঁটতে এলো হোটেলের সামনে । ভাই বোন নাকি ? মেয়েটা চুলে রং করছে। দুইজনেরই জামা কাপড় বেশ সস্তা দরের। পায়ে কাপড়ের সাদা জুতো। দুইজনেরই চোখে সানগ্লাস।
অদ্ভুত ঢোলা বোতল সবুজ রঙের পাজামা আর সাদা জামা পরে আছে ছেলেটা। কাঁধের উপরে
রেখে দিয়েছে চড়ুই পাখির পালকের রঙের জ্যাকেট।
শকুনের চোখে জরিপ করলেন তিনি। কলেজের স্টুডেন্ট হবে। না, এত ছোট পুচকে আণ্ডা বাচ্চাদের সাথে কেশুর মতো ঘাঘু ক্রিমিনাল কিছুতেই খাপ খায় না।
হোটেলের লবিতে পা দিয়ে সতর্ক হয়ে গেল রুইতন। এত লোক লবিতে তারপরও রুইতন বুঝে গেল বিপদজনক কেউ আছে। বিপদের ঘ্রাণ পায় মেয়েটা।
‘ঠোলা আছে।’
‘হুম ।’ সায় দিল পোকা। ‘ বিষয়টা মানিকদাকে জানাতে হবে।’
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় চলে গেল ওরা। মানিকদা বলে দিয়েছিল রুম নাম্বার 149 - এর দরজায় নক করতে হবে।
মাত্র একবার নক করার সাথে সাথে খুলে গেল পেল্লাই কাঠের দরজা। দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল মানিক ।
সার্কাসের জানোয়ারেরা মঞ্চে যে ভাবে হেঁটে আসে ঠিক সেইভাবেই কামরার ভেতরে ঢুকল পোকা গ্রুপের দুই সদস্য।
আর ঠিক জানলার পাশে বিশাল এক সোফায় সিংহের মতো বসে আছে কেশু । মুখে সিগার। সোজা চেয়ে আছে পোকাগুলোর দিকে। তবে রুইতন ওর নজর কেড়ে নিয়েছে প্রথমেই। কী সাঙ্ঘাতিক মেয়ে রে বাবা !নিজের বয়সটা আর পাঁচটা বছর কম হলে মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা যেত।
‘বাইরে সম্ভবত পুলিশ আছে।’ কেশুকে পাত্তা না দিয়ে মানিকের দিকে চেয়ে দম নিতে নিতে বলল পোকা ।
মুহূর্তেই চেহারা সাদা হয়ে গেল মানিকের । ঝট করে ফিরে তাকাল ওস্তাদের দিকে।
‘ভুলে যাও ওদের কথা।’ নরম গলা কেশুর। ‘ মানিক আর আমাকে এক সাথে দেখলে যে কোনো ঘুঘু পিছু লাগতে পারে। লাগতে বাধ্য। সময় মত খসিয়ে ফেলব।গত চল্লিশ বছর ধরে আমার পিছু লেগে রয়েছে ওরা ।’
কেশুর কথা শুনে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেল রুইতন । এই না হলে ওস্তাদ। ছোটবেলা থেকেই কেশুর নাম শুনে এসেছে ওরা । পেপারে তখন কত কথা লেখা হত ! অপরাধ জগতের রাজা ছিল লোকটা।
তারপরও কেশুর দিকে ভালো করে তাকিয়ে বেশ হতাশ হল ভাই বোন । মোটা স্থুল মোষের মত একটা লোক বসে আছে চেয়ারে। গায়ের রঙটা রোদে পুড়ে হুইস্কির মত হয়ে গেছে। রোমাঞ্চকর কোন চরিত্র বলে মনে হচ্ছে না।
‘তোমরা বসো ।’ ভারি গলায় বলল কেশু । এখনও চেয়ে আছে পোকার দিকে । ওর মুখে কয়েকটা কাঁচা ফোসকা। যেখানে দুই সপ্তাহ আগে অ্যামোনিয়া পুড়িয়ে ফেলেছিল । ‘ মুখটায় কী হয়েছে তোমার ? কিসের দাগ ?’
‘কুত্তায় কামড় দিয়েছিল।’ সোফায় বসতে বসতে উত্তর দিল পোকা।
সময়টা যেন ঝুলে রইল ।
কেশুর মুখটা কাঁচা গরুর মাংসের মত টকটকে লাল হয়ে গেল এক লহমায়। দুই চোখ হয়ে গেছে বড় বড়।
‘ শোন হে নাবালক ছোকরা ।’ গর্জে উঠল কেশু। ‘আমি প্রশ্ন করলে ভদ্রভাবে জবাব দেবে। মনে থাকবে ?’
‘ ওহ, অবশ্যই।’ উদাস ভাবে জবাব দিল পোকা। ‘ আসলে মুখটা আমার । কাজেই আমার মুখে কিসের দাগ সেটা নিয়ে আপনার মাথা না ঘামালেও চলবে।’
বিব্রতবোধ করল মানিক ।
আগেরকার দিন হলে , ওস্তাদের সামনে ভুলেও কেউ এ ভাবে কথা বলতে পারত না। প্রশ্নই উঠত না। সামান্য হালকা পাতলা স্থুল রসিকতা যারা করেছে তাদেরকে এক ঘুষিতে মেঝেতে ফেলে দিয়েছে কেশু ।
কিন্তু এই মুহূর্তে সে রকম কিছুই হল না। শান্ত গলায় কেশু বলল, ‘ বেহুদা খেজুরে আলাপ করার মত সময় নেই আমার হাতে । দুজনেই কান পরিষ্কার করে শোন । তোমাদের জন্য কাজ ঠিক করছি একটা । একদম ঝুঁকি নেই। পাঁচ লাখ করে পাবে এক- একজন।
রাজি কিনা বলো ?’
ততক্ষণে রুইতন বুঝে গেছে ওর রূপ দেখে কেশু বেশ খানিকটা তরল হয়েছে। পুরুষের চোখের ভাষা ওর চেয়ে ভাল করে এই দুনিয়ার কেউ বুঝে না।একদম ছোট বেলা থেকেই পুরুষের চোখের সব আলো ছায়া পড়তে পারে ও।
বলল , ‘ কোনও রকম ঝুঁকি না থাকলে বাইরে পুলিশের লোক কেন ? রাস্তার উল্টা দিকে পুলিশের গাড়িও দেখেছি।’
‘ আমার নামই একটা ব্র্যান্ড । আমি আর মানিক এই মুহূর্তে একসাথে আছি, এটাই শহরের সবচেয়ে বড় খবর । আন্ডারওয়ার্ল্ড সবচেয়ে বড় ঘটনা । পুলিশ জীবনেও আমার চুল ছিঁড়তে পারেনি ।পারবেও না। রাজি হলে বলো। পাঁচ লাখ করে নিয়ে বাড়ি চলে যাও । রাজি না হলেও বলো। মানিক দরজা খুলে দেবে । সোজা বাড়ি। ’
‘কাজটা কী সেটা জানতে পারি ?’ এতক্ষণে কথা বলল পোকা ।
‘ যদি রাজি হও তবেই জানাবো ।’ বলল কেশু । ‘ সব শুনে যদি বলো, না খেলব না। তাহলে আমার প্ল্যান আর একজন জেনে গেল যে কিনা আবার আমার দলের না। অমন ব্যাপার আবার আমার পছন্দেরও না।’
পোকা গ্রুপের দুই পোকা একে অপরের দিকে তাকালো। গত দুই সপ্তাহ ধরে ওদের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে। সেই বাটুল লোকটা ওদের শিক্ষা দিয়ে যাওয়ার পর এলাকাতে ওদের মান সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে । অন্য গ্রুপের কেউ পাত্তা দেয় না। এখন অন্য দলের ঢুকতেও পারবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা কেশুর মতো পুরাতন এক সর্দার মার্কা লোকের সাথে কাজ শুরু করাই জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। টাকা পরিমাণ ও খুব খারাপ না।
‘আছি।’ বলল পোকা। ‘কাজটা কী?’
সাবিহা আর তৈমুর আলম খন্দকার এই নাম দুটি ছাড়া সবই বলল কেশু । সাথে যোগ করল - লোকটা বেশ ধনী। মেয়ের জন্য কোন রকম ট্যাঁ ফো না করে টাকা দিয়ে দেবে।
‘বড় ছক্কা মারতে যাচ্ছেন আপনি।’ সব শুনে অনেকক্ষণ পর নরম গলায় বলল পোকা। ‘ঝুঁকিও আছে বহুত।কিডন্যাপ আগের মত অত সহজ কাজ না। পাঁচে হবে না । দশ করে দিতে হবে এক একজনকে।’
আবারও কাঁচা মাংসের মতো লাল হয়ে গেল কেশুর মুখ। ‘বললাম তো। কোনো ঝুঁকি নেই।’
‘উহু ।’ পোকা মাথা নাড়ল । ‘ এটা মঞ্চনাটক না। যে কোনও সময় পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। নতুন সব ঝামেলা আসতে পারে। দশ করে না হলে কাজে হাত দেবো না।’
মানিকের মনে হল রাগে বুড়ো কেশু বোধহয় বোমার মতো ফেটে যাবে।মুখের শিরাগুলো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।
‘ বের হয়ে যাও তোমরা।’ গর্জে উঠল কেশু । ‘ মাত্র দুই লাখ টাকায় তোমাদের চেয়ে তুখোড় আর চমচম মার্কা মানুষ পাব আমি। । বের হও আমার সামনে থেকে।’
রুইতন অস্বস্তিতে ভুগছে। ভাই রাজি হয়ে গেলে বোধ হয় ভাল হত।
‘ আপনার টাকা না এটা ।’ কড়ে আঙুল দিয়ে কান চুলকাতে চুলকাতে বলল পোকা। ‘ রাগ দেখাচ্ছেন কেন? মুক্তিপণের টাকা থেকেই তো আমাদের দিচ্ছেন । নিজের পকেট থেকে চামড়ার মানিব্যাগ বের করে তো গুণে দিচ্ছেন না। মজুরি ঠিকমতো দিন। গরম গরম সার্ভিস পাবেন। চমচম না রসগোল্লা মার্কা সার্ভিস।’
‘ একটু কথা আছে ওস্তাদ।’ তীক্ষ্ণ গলায় বলল মানিক । ‘পাশের রুমে চলুন।’
ওস্তাদ সাগরেদ চলে গেল পাশের কামরায় ।
‘আমার কথা শুনুন বস।’ শান্তভাবে বলল মানিক । ‘ এই দুই পোকা দশ লাখ করেই পাওয়ার যোগ্য। ওদের কাজ যে ভালো সেটার গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি । তাছাড়া এক টাকার একটা কয়েন ও অগ্রিম দিচ্ছি না। কাজ শেষ হলে পয়সা পাবে। আমাদের প্ল্যান জানে ওরা। এখন সারা শহর ঘুরে বলে বেড়াবে আমরা কী বিরিয়ানি রান্না করতে যাচ্ছি । নিজেরা দল বানিয়েও এই রান্নাটা করে ফেলতে পারে। ওদের কোনও ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই এটা চোখে পড়ছে না আপনার ?’
কয়েক মুহূর্ত লাগলো কেশুর শান্ত হতে। দুই হাতের মুঠো শক্ত করে রাগি গলায় বলল, ‘ আমাদের প্ল্যান ফাঁস করলে ফকিন্নির বাচ্চা দুটোকে আমি খুন করব।’
‘ভাল আইডিয়া। কিন্তু কাকে দিয়ে করাবেন শুনি ?’ বিরক্ত হল মানিক । ‘ অমন টাকাপয়সাও আমাদের নেই যে ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে দেবেন। অথচ ওরা এখন বের হয়ে গিয়ে ফোন করে থানায় সব বলে দিতে পারে।’
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল কেশু। বুকের বাম পাশে চিন চিন করে ব্যাথা হচ্ছে। এমন হচ্ছে কেন আজকাল ? বুড়ো হয়ে গেল নাকি? দম নিতেও বেশ কষ্ট হল খানিকটা সময়।
‘ আমি রাজি ৷’ অনেক সময় পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল সে। ‘তবে বেশি টেণ্ডাই মেনডাই করলে খুন করে ফেলব ওদের।’
সমঝদার মানুষের মত মাথা ঝাঁকাল মানিক । বুঝল, ওস্তাদ ওর সামনে নিজের মান সম্মান রাখার জন্য কথাটা বলেছে। আসলে কিছুই করতে পারবে না।
‘একটু ও চিন্তা করবেন না ওস্তাদ। পোকাদুটো ওদের কাজ ঠিকমতই করবে। আমি গ্যারান্টি দিলাম।’
পাশের কামরায় ফিরে এলো মানিকজোড়।
অলস ভাবে বসে নাকের ময়লা বের করছে পোকা। রুইতন চোখ বন্ধ করে সোফায় বসা। ইচ্ছে করে পায়ের উপর পা তুলে বসেছে। যাতে ওস্তাদ ভাল করে ওর ‘সম্পদ’ দেখতে পারে।
‘আমরা রাজি।’ ওস্তাদ মুখ খোলার আগেই বলল মানিক । ‘ দশ করেই পাবে। কিন্তু সেরা কাজ দেখাবে। একদম সেরা কাজ চাই।’
পোকার কালো দুই চোখ জ্বলে উঠল ।কিন্তু মুখের ভাব রইল নির্বিকার।
‘আমার কথা হুবহু ফলো করবে সবাই।’ সোফায় বসতে বসতে বলল কেশু।
রুইতন তখনও অপলক চেয়ে আছে ওর দিকে। মেয়েটার রূপ ওকে আকর্ষণ করছে বুঝতে পেরে মনে মনে বিরক্ত হল কেশু।
‘চিন্তা করবেন না। আপনার কাজ ঠিকমতই হবে।’ ভাবলেশহীন গলায় বলল পোকা।
পোকার ক্ষত বিক্ষত চেহারার দিকে চেয়ে কেশুর মনে হল সাংঘাতিক বিরল প্রজাতির বিষাক্ত একটা সাপ নড়াচড়া করছে সে।এটাকে সাবধানে ঝাঁপির ভিতর ভরতে হবে ।সারাজীবন কত মানুষের সাথে লেনদেন করেছে। কিন্তু এই ছোকরা হিসাবের বাইরে।
সিগারেট ধরাতে ধরাতে কেশু বলল , ‘ভালো করে শোন। প্ল্যানটা একদম সহজ । প্রত্যেক শুক্রবার সকালে মেয়েটা পার্লারে যায়। চুল কাটাতে বা রঙ করাতে বা চামড়া ঘষতে । একাই যায়। বাড়ি ফেরার আগে কান্ট্রি ক্লাবে গিয়ে দুপুরের খাবার খায়। গত দু বছর ধরে একই রুটিন মেনে চলছে। মেয়েটা বাপের সাথে থাকে। হাতির ঝিলের পাশে ওদের বাসা। বাড়ির চারিদিকে ইলেকট্রিফায়েড তার আছে। দারোয়ান আছে সেটা বলার দরকার দেখি না । কেউ দেখা করতে গেলে গেটের দারোয়ান ফোন করে ভিতরে জানায়। মেইন গেইটের সামনে সিসি ক্যামেরা আছে।’
‘সকাল নয়টা বাসা থেকে বের হয় মেয়েটা।’ এইবার রুইতনের দিকে ফিরে বলল সে। রুইতন দুই হাঁটুর উপর দুই হাত রেখে হাতের তালুতে থুতনি রেখে মন দিয়ে কথা শুনছিল। ‘ এখানে তোমার ভূমিকা বেশি। গেইটের বাইরে সিসি ক্যামেরার রেঞ্জের বাইরে গাড়ি নিয়ে থাকবে তুমি। গাড়ির হুড তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে। ভাব দেখাবে, গাড়ি নষ্ট হয়েছে। খানিক দূরে মানিক গা ঢাকা দিয়ে থাকবে। জায়গাটা আমি আর মানিক খুঁটিয়ে দেখে এসেছি । গা ঢাকা দেওয়ার মতো প্রচুর গাছপালা আছে। মেয়েটা গেটের বাইরে এলেই তুমি সাহায্য চাইবে ওঁর কাছে । বলবে, গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে । সামনে পরিচিত এক মেকানিকের দোকানে তোমাকে নামিয়ে দিলে যারপরনাই কৃতজ্ঞ থাকবে। মেয়েটা তোমাকে নিরাশ করবে না,কোন রকম সন্দেহ ও করবে না। একা একটা মেয়ে তুমি। তোমরা চোখের আড়াল হওয়া মাত্রই মানিক ঝোপ থেকে বের হয়ে তোমার গাড়িতে চেপে তোমাদের অনুসরণ করবে।’
থামল কেশু। চেহারা কঠিন করে বলল, ‘ টাকাটা তোমাদের কামাতে হবে বুদ্ধি আর শক্তি প্রয়োগ করে । মেয়েটা যাতে ভয় পায় সেই ব্যবস্থাও আছে।’
জ্যাকেটের পকেট থেকে কাচের শিশি বের করল কেশু । ‘ এটা সালফিউরিক অ্যাসিড। ছিপিতে চাপ দিলেই এসিড বেরিয়ে আসবে। ভয় দেখাবে মেয়েটাকে। বলবে, কথা না শুনলে ওর মুখে এসিড ছুড়ে দেবে। ভয় দেখানোর জন্য খানিকটা অ্যাসিড গাড়ির সিটে ফেলে দিলে কাজ হবেই হবে।’
‘ মেয়েটাকে আমি সামলাতে পারব ।’ অ্যাসিডের শিশিটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে বলল রুইতন ।
‘ এরপর গাড়ি চালিয়ে সোজা সিটি পার্কের ওখানে যাবে।’ বলল কেশু। ‘ ওখানে অপেক্ষা করবে মানিকের জন্য । মানিক মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে নেবে । বাকি কাজ মানিকের । সোজা চলে যাবে নবীগঞ্জে ।’
‘ তাহলে আমার কাজ কী?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল পোকা।
‘ নবীগঞ্জের একটা নির্জন বাড়িতে মেয়েটাকে আঁটকে রাখব আমরা। তোমার কাজ পাহারা দেওয়া। আমরা কেউ মেয়েটার বাপের সাথে দেখা করে টাকা আনব না। মাঝে একটা লিংঙ্ক কাজ করবে। শিশির রায় নামটা শুনেছ তোমরা ?’
‘ সিনেমা নাটক বানায় ? সেই লোক ?’ প্রশ্ন করল রুইতন।ও সিনেমার পোকা। এইসব খবর বেশ রাখে।
‘হ্যাঁ, সেই। মেয়েটার বাপের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের জন্য টাকা নিয়ে আসবে শিশির বাবু।’
‘সে কেন আপনার কাজ করবে ?’ বিরক্ত হয়ে তিরস্কারের সুরে প্রশ্ন করলো পোকা। ‘ সে ও আপনার দলের লোক নাকি?’
‘কারণ বেচারা সুন্দরী বউ আর বাচ্চা নিয়ে সুখে আছে তাই।’ আস্ত একটা শয়তানের মতো হাসল কেশু । ‘ তোমাদের কাজ হবে ভদ্রলোকের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া , যাতে আমাদের কথা মতো কাজ করে সে।’
‘ ও। লেখক তাহলে আপনার দলের লোক না !’ অবাক হল পোকা।
‘ না।’ ব্যাখ্যা করল কেশু- শিশির আর মেঘা কেন ওখানে গেছে? কেন কেশু জায়গাটা ব্যবহার করতে চায়। কয়েক বছর আগে ওখানে গিয়েছিল কেশু । একদম নিরাপদ জায়গা।ভয়ংকর নিঃসঙ্গ আর বিচ্ছিন্ন। ওটাই মূল ব্যাপার।
‘তার মানে কুত্তা আর কাজের লোকটাকেও সামলাতে হবে ?’ প্রশ্ন করলো পোকা।
‘ঠিক।’ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল কেশু। ‘ দুটোকে চোখে চোখে রাখার সমস্যা হবে। স্টাফ কোয়াটারে ওদের বন্দি করে রাখবে। গাড়ি নষ্ট করবে। টেলিফোনের লাইন কেটে দেবে। মোবাইল সিগন্যাল পাওয়া যায় না। কাজেই নিরাপদ। সবচেয়ে বড় কথা মোবাইল ফোন জ্যামার । অর্ডার করে কিনেছি আমি। অনলাইন থেকে। সেটা ব্যবহার করবে। ও হ্যাঁ, ওদের কাছে বন্দুক আছে। ভালো হয় আগের রাতে ওখানে গিয়ে সব নিরাপদ করে রাখো যদি।’
‘নীচে পুলিশ দুটোকে এখন কী করি ?’
‘কিছু না। প্রথমে মানিক যাবে । তখন ওকে অনুসরণ করবে দুই ফাজিলের একটা। । মানিক ওটাকে খসিয়ে দিতে পারবে । তোমরা দুই ভাই বোন এরপর বেড়িয়ে গিয়ে বারে বসবে। দুটো ড্রিঙ্কস খাবে আধা ঘণ্টা ধরে। তারপর বাড়ি যাবে। মনে হয় না কেউ তোমাদের পিছু নেবে। নিলেও সন্দেহ করার মতো কিছু নেই । অনেক দেরি করে নীচে নেমে দুপুরের খাওয়া শেষ করে আমি বের হবো । এবং কেউ না কেউ আমার পিছনে যাবে। লাভের বেলায় জাম্বুরা। সারা জীবন আমার পিছু লেগে আছে ওরা।’
স্যুটকেস খুলে মোটা বাদামি খাম বের করে পোকার হাতে তুলে দিল কেশু । ‘ ওখানে ম্যাপ- সময়সূচি- আর প্ল্যানের খসড়া লেখা আছে। বাসায় গিয়ে মুখস্থ করো। তারপর সব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলবে। কাজটা সামনের সপ্তাহে ধরব। আগের রাতে মানিক তোমাদের বাসা থেকে গাড়িতে করে তুলে নেবে। ফাইনাল একটা ক্লাস দেবে তোমাদের।’
‘কিছু খরচাপাতি দিলে ভাল হয় ।’ নীরস গলায় বলল পোকা। ‘ খালি হাতে ঠিক জমে না।’
‘খামের ভেতর বিশ হাজার টাকা আছে।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল কেশু। ‘ যাও ভাগো এখন । মনে রেখো আমার সাথে ঝামেলা করলে পুলিশ তোমাদের ছেড়ে দিলেও আমি ছাড়ব না। মরে গেলেও কবর থেকে তুলে এনে আবার মারব। ভাগ।’

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন