৫
কবির বাড়ির সামনে এসে অবাক হলাম।
পুরানো দিনের বাড়ি দোতলা বাড়ি। একসময় অবস্থা ভাল ছিল বোধ হয়। এখন নেমে গেছে। শেষ কবে চুনকাম করা হয়েছিল কে জানে। দেয়ালে নোনা ধরা। বাইরে অনেক জায়গা, বনমেথি, গিমাশাক আর পয়সা ফুলে ভর্তি। বড় বড় বাক্সা ঘাসের দঙ্গল।
উনারা বোধ হয় অনেক টাকা পয়সার মালিক ? জানতে চাইলাম।
মনে হয়। বিড়বিড় করে বলল বিপিন।
একজন কালো মত লোক গুল দিয়ে দাঁত মাজছিল। আমাদের দেখে খেঁকিয়ে উঠলো - কী চাই?
ইয়ে মানে কবির সাথে দেখা করব। কোন মতে ঢোক গিলে বললাম।
সেটা আগে বলবে তো। বাসি খিচুড়ির মত নরম হয়ে গেল লোকটা।
আগে আর বলি কেমন করে ? আমাদের দেখেই তো খেঁকিয়ে উঠছিল লোকটা। চুপ করে রইলাম।
সোজা ভিতরে চলে যাও। গুলমাখা আঙুল দিয়ে সামনে দেখিয়ে দিল।
আমরা ঢুকে পড়লাম।
আমার মনে হয় পৃথিবীর সব কবি- র এমন বাড়িতেই থাকা উচিত। সরকারের উচিত কবিদের জন্য আলাদা বাড়ি দেয়া। যেখানে শুধু কবিরা থাকবে। তাদের দেয়া হবে পরীদের রুমালের মত কাগজ।আর চন্দন কাঠের কলম। কবিরা শুধু লিখবে সুখ দুঃখের কবিতা।
বাগানের বাক্সা ঘাসের উপর গত রাতের নীল শিশির জমে আছে। সকালের সূর্যের আলোতে ঝিকিমিকি করছে সেই শিশির কণা। অচেনা কোন মুল্যবান রত্নের মত।
আমরা দিশে হারিয়ে চারিদিকটা দেখছিলাম।
মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ডের আপণ এভিনিউয়ে শেক্সপীয়রের বাড়িতে চলে এসেছি। সামনে পুরানো দিনের বাড়ি। নদী থেকে ঠাণ্ডা শীতের হাওয়া ভেসে আসছে। পরিবেশটা মায়াবী। বাড়ির দরজা জানালা সবুজ রঙ করা। ঢেঁকি শাকের মত সবুজ। আজকাল এমন সবুজ রঙ করে না কেউ । জানালা আর দরজার উপরে অর্ধ গোলাকার কাঁচের জানালার মত। নানান রঙের কাঁচ বসানো ওখানে। রাতের বেলা কামরার ভেতরে আলো জ্বললে বাইরে থেকে দারুণ দেখাবে।
ঘুলঘুলিতে সোনালী হলুদ খড়কুটো। পাখীর বাসা। চিরিপ চিরিপ করে পাটকিলে রঙের চড়ুই পাখী ডাকছে। টানা বারান্দা চলে গেছে শেষ পয়ন্ত। ওখানে লোহার গোল প্যাচ্যাঁন সিঁড়ি। উঠে গেছে দোতলায়। বারান্দায় লাল আর কালো রঙের সিমেন্ট দিয়ে প্রলেপ দেয়া। জলপদ্মের নকশা করা।
মস্ত কারিগর না হলে এমনটা করা যায় না। পুরো বাড়িটা মাথায় করে তুলে রেখেছে ইয়া বড় বড় গোল থাম। বারান্দার ঠিক মাঝখানে কালো গোল একটা টেবিল। কয়েকটা চেয়ার। ওখানেই কবি বসে আছেন।
কবিকে দেখাছিল, একজন কবির মতই।
পায়ে চপ্পল। পাঞ্জাবি-পায়জামা।
পুরানো দিনের জমাট বাঁধা পনীরের রঙের চাদর কেমন আলস্য করে গায়ে দিয়ে রেখেছেন। মনে হচ্ছে অন্য কোন পোশাকে কবিদের মানায় না। আসলে এমন একটা নিয়ম করা দরকার কবিরা শুধু পাঞ্জাবী আর পায়জামা পরবে, শীতে গায়ে থাকবে পুরানো দিনের পনীরের রঙের চাদর। কোন কবি যদি গায়ে কোট টাই চাপায় সাথে সাথে তাকে লেংটা করে ফেলা হবে।
লেংটা অবস্থায় চৌ রাস্তার মোড়ে বসে বসে কবিতা লিখবে।
এটাই হবে শাস্তি।
আমাদের দেখে হাসলেন কবি। উনার চোখ দুটিতে সব সময় বিষাদ মাখা।
বসতে বললেন।
টেবিলের উপর বেতের ঝুড়ি। ঝুড়ি ভর্তি কমলা। একটা লেখার খাতা। হয়তো লিখছিলেন।
টেবিলের পায়ের নীচে ধূসর রঙের একটা বিড়াল। বিড়ালটা চোখ বন্ধ করে ভাঁজা মাছের স্বপ্ন দেখছিল হয়তো।
পুরানো বাড়িতে গেলে আমি কথা বলতে পারি না।
আরও অনেকবার দেখেছি। কেন যেন কথা বলতে ইচ্ছা করে না। এইসব বাড়িতে কত রকম গল্প থাকে।
অনেকবার দিগুবাবুর বাজারের পাশের সেই জমিদার বাড়িতে গেছি। যেটা একটা ব্যাঙ্ক হয়েছে পরে।প্রায় চৌদ্দ একর জায়গারর উপর বাড়িটা। চারিপাশে ঝুপসি ঝুপসি শাল, জাম আর কাঁঠাল গাছ ভর্তি। বাইরে, বাজারের কত হই চই । মাছের আঁশটে গন্ধ।
কিন্তু এখানে কত সুনসান। কেমন বুনো একটা ঝাঁঝাল ঘ্রান।
কোন জমিদারের বাড়ি ছিল কে জানে? ওরা চলে গেছে কবে । কিন্তু কান পাতলে যেন ওদের কথা বার্তা শুনতে পাই। চোখের সামনে যেন আজও দেখতে পাই পুরানো দৃশ্য কিছু।
কবির বাড়িতে বসে কত কিছুই মনে হচ্ছিল। বড় ভাল লাগে এই হিম হিম ঠাণ্ডা শীতের সকাল। বাইরে রোদ উঁকি দিচ্ছে। দূরের নদীর পার থেকে ভেসে আসছে ইস্টিমারের অলৌকিক শব্দ।
অদ্ভুত সব জিনিস আনা হল আপ্যায়নের জন্য।
সাদা রুটি। আলু ভাঁজা। আলু জল দিয়ে ভেঁজেছে নাকি তেল দিয়ে ভেঁজেছে কে বলবে? একদম সাদা। খোসা সহ ঝলসানো আলুর দম।হাতির কানের মত বড় পাপর ভাঁজা -তাতে আবার প্রচুর কালিজিরা দেয়া। চিনা মাটির পেয়ালা ভর্তি একমুঠো করে কাঠ বাদাম।
আর সব শেষ এক পেয়ালা চা। চায়ের রঙ ক্যারাবিয়ান দ্বীপের সূর্যাস্তের মত। তাতে লেবু আর অচেনা গুল্মের মিষ্টি ঘ্রান।
জীবনে বহু জায়গায় নিমন্ত্রণ খেয়েছি। কিন্তু এমন বিচিত্র পদ দিয়ে জলখাবার খাওয়া এই প্রথম।
বিপিনের খাওয়া দেখে মনে হল বহু বছর অনাহারে ছিল। ছয়টা রুটি,দুই হাঁতা আলু ভাঁজা , দশটা পাপর ভাঁজা,পুরো পেয়ালা বাদাম আর পর পর তিন কাপ সুগন্ধি চা শেষ করে দম নিল বেচারা।
মায়াই লাগল ওর জন্য।
আরও অনেকবার খেয়াল করেছি খালি পেটে যত ভাল কথাই হোক না কেন, ভাল লাগে না।
একবার উপবাস করে মন্দিরে গিয়েছিলাম । কী একটা পুজার সময়। হিন্দুদের তো পুজার অভাব হয়না। বার মাসে তেরো পার্বণ।
আমার সামনে রোগামত পুরোহিত বসে কি সব অং বং করছিল। আর চামচ ভর্তি করে ঘি ঢেলে দিচ্ছিল সামনের আগুনে।
আমার পেট ভর্তি খিদে। মনে হচ্ছিল পুরোহিতের মাথাটা ঠেসে ধরি সেই আগুনে। কত মানুষ না খেয়ে মরে।
আর ব্যাটা কেজি খানেক ঘি ভগবান বিষ্ণু কে খুশি করার জন্য আগুনে ফেলে নষ্ট করলো।
কবির বাড়িতে যুতমত জলখাবার পেটে ঢোকার পর আমরা কাব্যরস আস্বাদন করার জন্য চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসলাম।
কবি বলে যেতে লাগলেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন