২২
টুলে মুখো মুখি বসলাম । দূরে শীতলক্ষ্যা। শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। ওর অসুখ হয়েছে। অভিমানে জল না খেয়ে শুকিয়ে গেছে।
একদিন মারা যাবে? অনেক নদী যেমন যায় ।
নদীর বুকে নৌকা । চাঁদপুর গামি লঞ্চ। ষ্টীমার।
ওরাও সংখ্যায় কম।
সব কমে যায়। কেন অমন হয়। রোজ কত গ্যালাক্সির জন্ম হয়। অথচ আমাদের প্রিয় আর পছন্দের জিনিস কেন কমে?
কবি বোধ হয় মুখিয়ে ছিলেন কথা বলার জন্য।
ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলতে লাগলেন, ' বড্ড সোনালী সময়ে দেশ ছেড়েছ তুমি। তুমি চলে যাবার পর নানান রকম ধান্ধা করলাম কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য। নিজের টাকা খরচ করে একটা বই বের করলাম। চারগুণ বেশি টাকা নিয়েছিল প্রকাশক ...বাচ্চা।
চলল না বইটা। একশোর বেশি সৌজন্য কপি বিলিয়ে দিয়েছি নানান মহারথীদের। পত্রিকার বন্ধুদের দিয়েছি - যাতে বই সমালোচনা ছাপে। লাভ হয়নি কিছু।
সব বই বাসায় পড়ে রইল । দোকানে যে দিয়েছিলাম সব বিবর্ণ হয়ে গেল ধুলাবালিতে। দোকানদার বিরক্ত। আমার বই বেচা হয় না। জায়গার অভাবে অন্য বই রাখতেও পারে না। জায়গা নষ্ট।
জোড় করে ফিরিয়ে দিল সব।
আগারে বাগাড়ে ফিরিয়ে দিলাম সব বই। খারাপ লেগেছিল । পরিবার থেকে জোড় করে ঘ্যান ঘ্যান করে টাকাগুলো নিয়েছিলাম।
তবে লাভের মধে এই লাভ হল - কবি হিসাবে অনেকেই চিনল। এই টুকুই ।
ঘোষ কেবিনে বসে চা খাওয়ায় যোগ্যতা অর্জন করলাম। পৌর পাঠাগারে কবিতা উৎসব মার্কা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণের কার্ড পেতাম।
ওতেও লাভ তেমন হল না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।
পরের বইও কোন প্রকাশক বের করতে চায় না।
আগের বারের মতই টাকা চায়। প্রকাশকদের মত অমন বিচিত্র জানোয়ার অন্য কোন পেশায় আছে কি না কে বলবে। উনাদের কথা আগের বার পয়সা খরচ করে বের করেছেন এবার ও করুন।
পত্রিকার আপিসের সামান্য একটা চাকরির জন্য যে কত জায়গায় ধর্না দিয়েছি বলতে পারব না।
শেষে নাম করা এক লেখকের সাথে কথা হল । উনি বের করবেন আমার বই । নিদিষ্ট একটা বিষয়ে লিখে দিতে হবে । কিন্তু উনার নামে ছাপা হবে? ভাবা যায়?'
একটু থেমে আবার বলতে লাগলেন কবি ।
'সে সময় একটা জিনিস ভাল হল। কবি বা সাহিত্যিক হবার ভুত নেমে গেল মাথা থেকে। সিনিয়র যাদের সাথে মিশে জাতে উঠার চেষ্টা করতাম তাদের সবার সাথে সম্পর্ক নষ্ট হল । নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। আমার চামচাগুলো চলে গেল একে একে। বাপ মারা গেল সেই সময়। একদম অকূল সাগরে পড়লাম ।
বিপিনের মুখে শুনেছিলাম তুমি দেশান্তরী হয়েছ। খুব ঈর্ষা করতাম তোমাকে। সেই সময় আমরা সবাই ঘৃণা করতাম তোমাকে।'
' সেটা আমিও জানি।' এই প্রথম কথা বললাম।
'খুব কষ্টে দিন গেছে তখন।' কেমন মন খারাপ করা গলায় বলল কবি। ‘ শীতকালে যখন দশ টাকা করে হত এক একটা বাঁধাকপি তখন দিনের পর দিন বাঁধাকপি ঘ্যাঁট রান্না করে ভাত খেতাম। কী কষ্ট !'
দিনগুলো হয়তো একই ভাবে যেত। আচমকা এক ডেভেলপ কোম্পানি যোগাযোগ করল । আমাদের পুরানো বাড়ি ভেঙ্গে মার্কেট বানাবে। সত্তর পারসেনট ওদের। বাকিটা আমার।
'রাজি হলাম। উপায় নেই। দুই বস্তা সিমেন্ট আর দশটা ইট কিনে পুরানো বাড়ি মেরামত করব সেই মুরোদ নেই আমার। মাঝ খান দিয়ে বাড়ির মালিক। ক্ষতি কি? এখন শুধু খাই দাই। ঘুমাই। ভাড়া তুলি।'
কবি হাসতে লাগলেন। অচেনা পাগলামি হাসি।
' বইগুলো বিক্রি করলেন যে ।' জানতে চাইলাম।
' ওরা আমার কাছে এখন আবর্জনা। বাড়ি ভাঙ্গার আগে বিদায় করেছি। অথচ সেই শৈশব থেকে কেনা। বাবার কেনা বইও ছিল। বাপই নেই। '
'কবিতা লেখেন আর?'
'কবিতা একটা পরীর মত। সবাইকে ধরা দেয় না।'
'আপনাদের পুরানো বাড়িটা এত সুন্দর ছিল। অনেক গরমের রাতে আপনাদের বাড়ি, জানালার কাঠের সেই সবুজ ঝিলিমিলি আর লাল সিমেন্টের বারান্দা স্বপ্নে দেখেছি।'
সিগারেট দূরে ছুড়ে কবি বলল, ' হু। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি। কিন্তু কী আর করা। একদিন আসবে? কোন এক সন্ধ্যায়। শুনেছি প্রথম জীবনে তুমি বারটেন্ডার ছিলে। সবুজ শয়তান, লম্বা দ্বীপের ঠাণ্ডা চা । এই সব খাওয়াতে পারবে না?'
'পারব। যদি বিপিনকে পাওয়া যায়। পুরানো দিনের মত আবার একসাথে বসতাম।'
'মনে হয় না ও আসবে।'
'কেন? আজও ঘৃনা করে আমাকে?' অবাক হলাম।
'কেন তুমি জানো না?' আরও বেশি অবাক হলেন কবি। বড় বড় চোখে চেয়ে আছেন। ' লিউকেমিয়া হয়েছে ওর। লাস্ট স্টেজ ।'
'আর এই কথাটা এতক্ষণে বললেন?' চেঁচিয়ে উঠলাম।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন