‘মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আর নির্বাসনে পাঠানো এই দুটোর মধ্যে আমি কোনও তফাৎ পাই না।’ হঠাৎ করেই বলে উঠল আব্দুল লতিফ।
দাবার চালটা নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল রাশেদুল হাসান যে প্রথমে বুঝতেই পারল না প্রিয় বন্ধু কি বলছে । প্রসঙ্গটাই বা কি ?
‘কী বললে ?’ জানতে চাইলেন তিনি।
‘বললাম, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আর নির্বাসনে পাঠানোর মধ্যে আসলে পার্থক্যটা কী? আমার তো তেমন কিছুই নজরে পড়ে না।’
নিজের চাল দিতে দিতে বলল আব্দুল লতিফ।
‘ধরা যাক তোমাকে দুটোর মধ্যে বেছে নিতে বললে কোনটা নিতে ?’ শুকনো গলায় বললেন রাশেদুল ।
‘উম্ম, মরে গেলে, মানে মৃত্যুদণ্ড দিলে একেবারেই মরে যেতাম। কিন্তু নির্বাসনের ব্যাপারটা চিন্তা করো। ভয়ঙ্কর । আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব সবাইকে ছেড়ে সেই কোথায় ফেলে রাখা হবে। ভাবতেই খারাপ লাগে। এই চেনা জানা পরিবেশ ছেড়ে ... নাহ। এক কথায় ভয়ঙ্কর। আমার জন্য দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই না।’
‘তার মানে মৃত্যুদণ্ডটা ভালো তোমার মতে ?’
‘ না তাও নয়।’
‘ তাহলে ? মৃত্যুদণ্ড তো নিষিদ্ধ। অমানবিক।’
‘ নির্বাসন ও তো অমানবিক।’
‘ সেটা তো তোমার কাছে। ক্রিমিনালদের তো সারাজীবন জেলখানায় রেখে দুধ ভাত খাওয়াতে পারি না। তাছাড়া দ্বীপান্তর বা নির্বাসন বহু আগেই ছিল। বৈদিক যুগের আর্যরা এই শাস্তি দিত। অপরাধীকে তার বাস্ত ভিটা ছেড়ে চলে যেতে হত। তারপর ধর স্প্যানিশরা তাদের সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ছেড়ে দিয়ে আসত প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলিতে। বৃটিশরা করতো এ কাজ। ইংল্যান্ড থেকে চোর - ছ্যাঁচড়া - বদমায়েশ তাবড় সব অপরাধী গুলোকে জাহাজ ভর্তি করে অস্ট্রেলিয়া পাঠাত। এটা খুব পুরাতন একটা শাস্তি। তোমার তো মন খারাপের কিছু নেই এতে।’
এক নাগাড়ে কথা বলে থামলেন বিজ্ঞ আইনজীবী রাশেদুল হাসান।
বকবক করতে গিয়ে দাবা খেলা থেকে মনঃসংযোগ কমে যাচ্ছে৷ লক্ষ্মণ খারাপ।
হেরে যেতে পারেন বন্ধুর কাছে । সবাইকে বলে দেবে ব্যাটা।
ওরা দু জন বসে আছে অসম্ভব রকমের ছোট্ট একটা কামরাতে । আধুনিক হোটেল স্যুইটের মতো অনেকটা। বিছানা চেয়ার টেবিল সবই প্লাস্টিকের মতো অচেনা পদার্থ দিয়ে তৈরি। কামরার দেয়ালে গোল জানালা আছে কয়েকটা। বাইরের দৃশ্য দেখা যায় না। ত্রিমাত্রিক ছবি সাঁটানো ।এমনকী একটা দেওয়ালও এরকম করে তৈরি।
ফুলের বাগানের দৃশ্য। অসম্ভব রকমের জীবন্ত । হলুদ ফুলের উপর শিশির জমে আছে। হাত দিলেই বোধহয় ভেজা ভেজা লাগবে।
জানালাগুলো তেও এরকম প্রাকৃতিক দৃশ্য সাঁটানো। ইচ্ছেমতো বদলানো যায়। এখন দেখা যাচ্ছে, জানালার বাইরে একটা যুবতী নদী। ওখানে আধা চেরা পটলের মতো কতগুলো ডিঙি নৌকা। একগাদা ছেলে বুড়ো মাছ ধরছে জাল দিয়ে। নৌকার পাটাতনে রূপালি মাছগুলি পরে লাফ ঝাঁপ দিচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে খেয়াল করলে দেখা যাবে অল্প কয়েকটাই দৃশ্য বারবার রিপ্লে হচ্ছে।
‘তুমি কি কুখ্যাত অপরাধী হাফিজের কথা মাথায় রেখে এ সব বলছ ?’ জানতে চাইলেন রাশেদুল হাসান।
‘ঠিকই বলেছো ।’ জবাব দিল আবদুল । ‘আজকে রায় দেওয়া হবে। কী যে হবে?’
‘কী আর হবে ?’ কাঁধ ঝাঁকালেন রাশেদুল হাসান। ‘সবচেয়ে কাছের গ্রহটায় ছেড়ে দেওয়া হবে ওকে। বাকি জীবন ওখানেই থাকবে।’
‘ব্যাপারটা ভাবতো ?’ অলস সুরে বলল আবদুল ।
‘না। ভাবার কিছু নেই।’ বিরক্ত হল রাশেদুল । ‘মৃত্যুদণ্ড আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি না। হাফিজের মতো অপরাধীদের শাস্তি না দেওয়াটা ও অন্যায়৷ আমরা এখন এমন অবস্থায় পৌঁছে গেছি যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাটাই সবচেয়ে বড় কাজ । নতুন করে আমরা তৈরি করেছি আমাদের এই সভ্যতা। এই বাসভূমি।
আজকে হাফিজের মতো অপরাধীকে ক্ষমা করে দিলে কাল নতুন সব অপরাধের জন্ম দেবে। এই ছোট্ট বাসভূমিতে আমরা থাকব কী করে তখন।’
কিছু না বলে চুপ করে রইল আব্দুল ।
খেলার মুড শেষ। কার চাল ছিল সেটা বোধহয় ভুলে গেছে দুজনেই । চুপচাপ বসে আছেন দাবার বোর্ডের সামনে। দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন রাশেদুল হাসান ।
‘এইরে, কোর্টের রায় দেওয়ার সময়ে গেছে।’ দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ‘চলো পরে এসে খেলা শেষ করব।’
দ্রুত উঠে দাঁড়াল আব্দুল। মনে মনে ঠিক জানে ফিরে এসে আবার নতুন করে এই খেলাতে মন বসাতে পারবেন না দুজনের কেউই।
কামরার এক পাশে দরজা খুলে গেল।
দুজনে ব্যস্তসমস্ত ভঙ্গিতে ঢুকে পড়ল পাশে কামরাতে। এটিই আদালত। মাত্র দুই তিন জন বসে আছে ।
সরকারি লোক।
বিচারেকর আসনে এসে বসলেন বুড়ো মতো একজন মানুষ। গায়ের রংটা অসম্ভব ফর্সা। আলুর মতো । তার মানে এখানেই জন্ম নিয়েছিল বুড়ো।
পাশের দরজা খুলে যেতেই আসামি হাফিজকে টানতে টানতে নিয়ে এল দুটো পুলিশ রোবট। হাফিজের চেহারা শুকিয়ে গেছে আতঙ্কে।
মনে মনে ঠিকই জানে, ওর শাস্তির রায় কী হবে । ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠছে বারবার। এর চেয়ে মৃত্যুদণ্ড বোধ হয় অনেক ভালো৷ কিন্তু নিজের মৃত্যু নিজে কী কেউই কামনা করতে পারে ?
আতঙ্কিত চোখে চেয়ে আছে বিচারকের দিকে। বদ্ধ এয়ারকন্ডিশন্ নিয়ন্ত্রিত কামরাতেও দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামছে সে।
বিচারক বুড়ো ফিরে তাকালো পাশের রোবটটার দিকে । কফ ভর্তি বিরক্তকর ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘রায় পড়া হোক।’
জ্যান্ত হয়ে উঠল রোবটটা। হর হর করে বলে যেতে লাগল আসামি হাফিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো। সমস্ত তথ্যপ্রমাণ তারিখ সব মুখস্থ ওর। বলে যেতে কোনও অসুবিধে হল না।
অনেক ধরনের অভিযোগ হাফিজের বিরুদ্ধে। তার মধ্যে সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট আর শান্তিপ্রিয় মানুষদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করাটা সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসাবে ধরা হল।
রোবটটার একঘেয়ে বকবকানি শেষ হতেই কাগজে প্রিন্ট হয়ে রায়ের কপিটা বের হয়ে এলো ঘসঘস শব্দ করে।
রায় হাতে তুলে নিলেন বিজ্ঞ বিচারক। চেহারাতে কোনও ভাব নেই। রোবটের সাথে কাজ করতে করতে উনিও রস কষ হীন হয়ে গেছেন ।
তোম্বা মুখে রায় ঘোষণা করলেন।
‘আমাদের এই নতুন বাসভূমির জন্য হাফিজ ভয়ংকর এক চরিত্র। ওকে নির্বাসন দেওয়া হল। এই মুহূর্তে ওকে মহাকাশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হবে। তার পর প্রথম যে স্পেসশিপ টা পাওয়া যাবে ওটাতে করে সবচেয়ে কাছের নীল গ্রহটাতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বাকি জীবন ওখানেই থাকতে হবে। এর আগে আমরা কুখ্যাত অনেক অপরাধীদের পাঠিয়েছি। সেই ধারাবাহিকতায় এবার...।’
বিচার সাহেব বলে যাচ্ছেন।
কিছুই যেন কানে ঢুকছে না অপরাধী হাফিজের । সামনে চেয়ে আছে। ওখানের জানলা খুলে গেছে। মোটা কাচের বাইরে দেখা যাচ্ছে দূরের কালো ঘুঁট ঘুঁটি আকাশ। সেই আকাশের গায়ে দেখা যাচ্ছে এক টুকরো নীল আলোর মতো গ্রহটা। পুরোপুরি গোল না । অর্ধেক।
গত কয়েকশো বছর ধরে ওখানেই ফেলে রাখা আসা হচ্ছে দণ্ডপ্রাপ্ত ভয়ঙ্কর সব কয়েদীদের। আজ কাল আকাশের ওই দিকে ভুলেও কেউ তাকায় না। কারো বাড়ির জানালা দিয়ে ভুলে ওই নীল গ্রহটা কেউ দেখে না। ঘৃণা আর আতঙ্ক মিশে আছে ওটাকে ঘিরে।
বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে হাফিজ। যতক্ষণ পারো নিতে চায় এই ধুলোমুক্ত গন্ধবিহীন কৃত্রিম বাতাসটা । ওর জীবনের দুঃস্বপ্ন শুরু হতে যাচ্ছে।
হাফিজের জন্য দুঃখবোধ হল সবার।
হাফিজ এমন একটা গ্রহে যাচ্ছে যেখানে দিনে সূর্যের আলোতে পুড়বে । রাতের শীতল বাতাসে কষ্ট পাবে। রয়েছে দুর্গন্ধ ধুলাবালি আর জীবাণু ভর্তি বাতাস । ওর চারপাশে অসংখ্য কুৎসিত চরিত্রের মানুষ ঘোরাঘুরি করবে । ওঁকে বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। সাগরে ভয়ঙ্কর গর্জনে ভয় পেতে হবে। রাতের বেলা আকাশের দিকে তাকিয়ে হাহাকার করতে হবে, বাড়ির কথা মনে করে ।
আরও সমস্যা আছে।
ভরবেগ। ও নিজের ওজন যাবে বেড়ে। চলা ফেরা করতে সমস্যা হবে। গায়ের রং দেখে লোকজন বুঝতে পারবে ও চাঁদের কলোনিগুলোতে জন্ম নিয়েছে। পৃথিবীর মানুষজন ওকে ঘৃণা করবে।
হ্যাঁ, হাফিজকে নির্বাসন দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হচ্ছে । দুঃখজনক, করুণ আর ভয়াল একটা শাস্তি।
বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন