২০
এই শহরে আমি আর রেণু কতবার মুখ মুখি হয়েছি।
ঠিক যেন হ্যান্ড ক্রিচিয়ান অ্যান্ডারসনের সেই টিনের সেপাই গল্পটার মত।
অ্যান্ডারসনের রূপকথার বৈশিষ্ট্য হল , গল্পগুলো আপাতত ছেলেমানুষি রূপকথা ।
কিন্তু ভেতরে দারুন সব মেসেজ থাকে বড়দের জন্য ।
টিনের সেপাই গল্পটা অনেক আগে টিভিতে দেখেছিলাম । অনেক আগে। রবিবারের সকালে।
একটা টিনের বাতিল চামচ গলিয়ে ছোট ছোট খেলনা সেপাই বানিয়েছিল এক কারিগর।
মোট পঁচিশটা সৈনিক। কিন্তু শেষ সৈনিকটা ছিল খোঁড়া।
একটা পা ছোট। কারণ ওটা বানানোর সময় টিন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাতে অবশ্য কোনো রকম অসুবিধা হতো না । খোঁড়া সৈনিকটা এক পায়েই দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো।
এক গাদা পিচ্চি সেই উপহারের বাক্স খুলে সৈনিকদের পায়। সাজিয়ে রাখে বসার ঘরে।
সেই কামরাতে আরও অনেক খেলনা ছিল।
তবে সবচেয়ে দারুণ ছিল পিচ বোর্ডের একটা দুর্গ। দুর্গের বাইরে কয়েকটা গাছ। কাচের একটা পুকুর। পুকুরে আবার মোমের হাঁস সাঁতার কাটছে। দুর্গের দরজার সামনে খুব সুন্দর একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো সব সময় । মেয়েটাও পিচ বোর্ডের।
টিনের সেপাইটা সব সময় মেয়েটার দিকে চেয়ে থাকতো। ওর চোখের পলক আর পরে না। মেয়েটাকে দারুণ পছন্দ ওর। কিন্তু একটা সৈনিক হয়ে গায়ে পড়ে কী ভাবে একটা মেয়ের সাথে যেচে কথা বলে সে ?
মেয়েটাকে প্রথমে ওর মত খোঁড়া ভেবেছিল ।
মেয়েটা আসলে নর্তকী। নাচের ভঙ্গীতে পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। সেইজন্য এই ভুল বুঝাবুঝি ।
তাছাড়া ওরা পচিশ সৈনিক ভাই সবাই মিলে একটা জুতার বাক্স থাকে ।
একদম গাদাগাদি ঠাসাঠাসি পরিবেশ ।
মেয়েটার সাথে যদি বিয়ে হয় তবে সৈনিক ওকে এনে রাখবে কোথায়?
আবার চিন্তা কর ! মেয়েটা থাকে দুর্গে । কত অভিজাত উচ্চবংশের মেয়ে । আর ও থাকে জুতার বাক্সে। তার উপর একটা পা আবার খোঁড়া !
দিনগুলি এমনিতেই যায় ।
টিনের খোঁড়া সৈনিক সারাদিন শুধু দুর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পরীর মত মেয়েটার দিকে চেয়ে থাকে।
ওদের মধ্যে কোন কথা বার্তা হয় না।
একদিন সেই বাড়ির এক দুষ্টু ছেলে, খোঁড়া সৈনিককে তিন তালার উপর থেকে ফেলে দেয় । নীচে।
সৈনিক পথের মধ্যে পড়ে থাকে ।
বাড়ির কাজের বুয়ার ছেলেটা অবশ্য সাথে সাথেই নিচে নেমে এসেছিল। সৈনিককে খুঁজতে ।
কিন্তু কী কাণ্ড ! তখনই টিপটিপ করে বড় বড় ফোটার বৃষ্টি ঝরতে থাকে আকাশ থেকে ।
আর বৃষ্টির ভয়ে কাজের বুয়ার ছেলেটা বাড়ি ফিরে যায়।
টিনের সৈনিকটা সারাটা দুপুর বৃষ্টিতে ভিজে।
বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর দুটো ছেলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ।
ওদের একজন পাথরের উপর পড়ে থাকা টিনের সৈনিকের দেখে খুশি হয়ে অন্যজনকে দেখায়।
তুলে নেয় সৈনিককে। খবরের কাগজ দিয়ে নৌকা বানিয়ে সেটার উপর সৈনিককে রেখে ভাসিয়ে দেয় নৌকাটা।
পথের পাশেই বৃষ্টির জল জমে কেমন কুল কুল করা একটা পিচ্চি নদীর মত হয়ে গেছে । সেখানেই ভেসে চলল সৈনিক।
স্রোতের বেগ বাড়তে বাড়তে ভয়ানক বেড়ে গেল।
বড় একটা ড্রেনের তলায় ঢুকে পরল কাগজের নৌকা।
চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার ।
আর এদিকে খবরের কাগজের নৌকা জলে ভিজে নরম হতে হতে গেল ছিঁড়ে। টুপ করে সৈনিক ডুবে গেল বরফ শীতল জলে।
এত বিপদের মধ্যে সৈনিক কারও কথা ভাবেনি । বাড়ির অন্য সব খেলনা। বাড়ির সব বাসিন্দা , না কারও কথাই না।
দুর্গের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার কথাই ভাবছিল।
আর কখনই দেখা হবে না ওর সাথে।
টিনের সেপাইটা ডুবে যেতেই মস্ত একটা মাছ এসে টুপ করে গিলে ফেলল ওকে।হারিয়ে গেল সে মাছের পেটের ভেতরে। ওখানে শুধু অন্ধকার । আর অন্ধকার ।
তারপরও টিনের সৈনিকটা একটুও ভয় পেল না। কাঁধে বন্দুক নিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
শুধু ভাবতে লাগল , দুর্গের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটার কথা।
যার পিঠে আবার সোনালী কাগজ কেটে আঠা দিয়ে জোড়া দেয়া সোনালী ডানা ও আছে।
মাছটা ধরা পড়লো।
জেলেরা সেটা বিক্রিও করে দিল ।
কাজের বুয়া মাছটা কাটতে গিয়ে বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলো - আরে দেখ । দেখ । মাছের পেটের ভেতরে আমাদের সেই খোঁড়া টিনের সেপাইটা।
বাড়ির সবাই চলে এলো দৌড়ে।
আর টিনের সৈনিক অবাক হয়ে আবিস্কার করলো , সে ফিরে এসেছে । তার পুরানো বাড়িতে।
ওই তো আলমারির উপর জুতার বাক্সে তার বাকি ভাইয়েরা দাঁড়িয়ে আছে।
আর সেই পিচ বোর্ডের দুর্গের দরজার সামনে সুন্দর মত মেয়েটা নাচের মত ভঙ্গী করে দাঁড়িয়ে আছে।
ফায়ার প্লেসে গনগনে আগুন জ্বলছে।
সব আগের মত।
আহ কি দারুণ ব্যাপার !
মনটা ভাল হয়ে গেল টিনের সৈনিকের।
ভালো মতন পরিস্কার করে , তোয়ালে দিয়ে মুছে আগে জায়গাতে রাখা হলো টিনের সৈনিককে।
সারিবদ্ধ ভাবে ওরা পচিশ ভাই দাঁড়িয়ে রইল। এখান থেকে মেয়েটাকে দেখতে সুবিধে হতো সৈনিকের । সবসময় দেখত । কিন্তু কিছু বলতো না।
নর্তকী মেয়েটা এক পা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। সৈনিক ভেবেছিল মেয়েটা হয়তো ওর মত খোঁড়া । সে তো আর আসল সত্য জানতো না।
সবসময় মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকত দুর্গের দরজায় দাড়ানো মেয়েটার দিকে।
হঠাৎ করে একদিন।
বাড়ির এক দুষ্টু বাচ্চা এসে তুলে নিলো খোঁড়া সৈনিককে । কোনো কারণ ছাড়াই ছুঁড়ে ফেলে দিল ফায়ারপ্লেসের ভিতরে।
গনগনে আগুন জ্বলছিল। ওখানেই পুড়তে লাগল টিনের সৈনিক।
ছোট বাচ্চাটা কেন অমন করলো কে বলবে?
আগুনের আঁচে রং চটে গেল সৈনিকের। ধীরে ধীরে গলতে লাগলো । খুব কষ্ট হচ্ছিল। তখনও সে চেয়ে আছে দুর্গের বাইরের দাঁড়ানো নর্তকী মেয়েটার দিকে।
আর ঠিক তখনই কামরার জানালাটা ঠকাস করে খুলে গেল । দমকা ঠান্ডা বাতাস হু হু করে ঢুকে পড়ল ভেতরে ।
সেই বাতাসে দুর্গের মেয়েটা উড়তে উড়তে সোজা চলে এল টিনের সৈনিকের পাশে । দুজনেই পুড়তে লাগল ফায়ারপ্লেসের গনগনে আগুনে ।
পরদিন বাড়ির ঠিকে ঝি , ফায়ারপ্লেসের ছাই পরিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার করল, একদম হরতনের আকৃতির খানিকটা টিন গলে জমে আছে । পাশেই পোড়া কাগজ । খানিকটা সোনালী ডানা রয়ে গেছে।
অপূর্ব গল্প !
তাই না?
আগেই বলেছি কার্টুনটা খুব ছোটবেলায় দেখেছিলাম। তখনো এত কিছু বুঝতাম না । তবে বেশ খারাপ লেগেছিল বেশ।
নর্তকী মেয়েটা উড়ে চলে আসে সেটা ভালো লেগেছিল । যদিও শেষ পর্যন্ত দুজনে পুড়ে মরে যাওয়াতে মনের ভেতর অদ্ভুত এক বিম্বিসা চলে এসেছিল ।
বড় হয়ে আবার পড়লাম। মনে মনে মুচকি হেসে ছিলাম ।
এমন সুন্দর রোমান্টিক গল্প হয় না। হতেই পারে না।
ঠিক যেন রেণু আর আমি !
তখন বাজার দখল করে ছিল এক শ্রেণীর 'লাভস্টোরি' মার্কা রোমান্টিক বই দিয়ে।
কয়েক পাতা পর পর স্যাত স্যাতে নোংরা বর্ণনা সহ।খুব চলতো সেইসব। লেখকরা বেশ ভাব মার্কা।
কাহিনিতে নায়কেরা সবাই জিনসের প্যান্ট আর সাদা কেডস পরত।নায়িকারা সবাই হত অনিন্দ্য সুন্দরী। পুরো উপন্যাস হাস্যকর স্থুল আর ন্যাকামি মার্কা সংলাপ দিয়ে ভর্তি থাকতো।
একই কথা ফেনিয়ে প্যাচিয়ে বলা হয় বারবার।
যেমন-
কেমন আছ?
ভাল ।তুমি?
'আমিও ভাল।'
দেরি হল যে ।'
'জানো, আজও রিক্সা পাইনি।'
'অপেক্ষার কষ্ট যদি তুমি বুঝতে !'
সিগারেট খাওয়া কমিয়েছ?'
মোট কথা পড়তে গেলে দিশা হারিয়ে ফেলতে হয়। অর্ধেক বই শেষ হবার পর বুঝতে পাড়া যেত - নায়ক বেকার। বড় ভাইয়ের উপর খায় দায়। নায়িকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে সামনের শুক্র বার। দেন মোহর এক লক্ষ টাকা মাত্র।বিয়ের পর আমেরিকা চলে যাবে !
নায়িকা এসেছে নায়ককে বিয়ের কার্ড দিতে।
কোন এক অদ্ভুত কারনে বইগুলো চলতো বেশ।
সেইসব বই এখন রদ্দি মাল ছাড়া কিছু না।
কবি-সাহিত্যিকরা বলেন দারিদ্র্য সর্বগুণনাশিনী ।
ত্রিকালদর্শী নিষ্কাম সাধু ও পরিস্থিতির জন্য ব্যাংক ডাকাতি করতে পারে । আমার কথা না। জ্ঞানী-গুণীজনরা অমন কথা বলেন।
পৌরাণিক যুগে অনেক সাধু সন্ন্যাসী রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে ওভাবে পড়ে।
টাকার লোভে রাজা পরীক্ষিতের শত্রু তক্ষক নাগের সাথে হাত মেলায় বিষচিকিৎসক কাশ্যপ ।
আমার সেই দিনগুলি কোন এক অচেনা ডাইমেনশনে ছিল।
সারা রাত জেগে ভোরে ঘুমাতাম।
মায়াবী হলুদ বিকেলে হাঁটতে বের হই ।
সারা শহর টইটই করে রাত সাড়ে আটটায় বাড়ি ফিরি। ফেরার আগে পুরানো বইওয়ালার কাছে যাই। আগে গুলশান সিনেমা হলের সামনে বসতো বুড়ো। ওখান থেকে উঠিয়ে দেয়ায় দিগু বাজারের মুখে এসে বসেছে। পেপারব্যাকের গুপ্তচর সিরিজের বইগুলো আজও আট টাকা করে , আমার জন্য !
এই ছিল রুটিন।
বড্ড ধূসর।
অপরাজিতা নামে ফুলের একটা দোকান বেশ চুটিয়ে ব্যবসা করতো আমার শহরে।
মানুষ ছিল বেশ শৌখিন।
কারনে অকারণে ফুল কিনত।
দোকানের মালিক ওরা একটা গোলাপ তিন টাকা করে কেনে। বিক্রি করে পাঁচ টাকা। দুই টাকা লাভ গোলাপ প্রতি।
বাড়ি এসে মা আর আমি মিলে ঠিক করলাম গোলাপের চাষ করব।
জীবনে একটা দূর্বা ঘাস বুনে দেখিনি। কিন্তু এখন বানিজ্যিক ভিত্তিতে গোলাপের চাষ?
সমস্যা কি? ইংরেজরা নীল চাষ করার জন্য আমাদের দেশে আসেনি? জাপানিরা আখ চাষের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ দখল করেনি?
তো?
হাজিগঞ্জ নামে একটা জায়গা আছে বেশ দূরে।
পনের টাকা লাগে রিক্সা ভাড়া।
ওখানে পোড়া মাটির টব বিক্রি করে। ইটের মত লাল আর কাকের পালকের মত কালো।
বহু দূর দূরান্ত থেকে লোকজন এসে সেই টব কিনে নিয়ে যায়। মাত্র দশ টাকা করে। শহরের যে কোন নার্সারিতে পনের টাকা।
মোট কুড়িটা টব কিনে বাড়ি ফিরলাম।
ছোট দিয়েই শুরু হোক।
পরদিন থেকে শুরু হল আমাদের কর্মযজ্ঞ।
বেশ খেটে পিটে মাটি যোগাড় করলাম।
পচা কচুরি পানা আর শুকনো গোবর মিশিয়ে দারুণ রকমের কম্পোস্ট বানিয়ে বিশটা টব ভর্তি করে ফেললাম।
এবার গোলাপের চারা লাগিয়ে দিলেই কাজ শেষ ।
নিয়মিত যত্ন নিলেই লকলক করে কুড়িটা গাছ বেড়ে উঠবে। একটা গাছে তিনটে করে গোলাপ ফুটলে মোট ষাটটা ফুল।
তিন টাকা করে হলে একশো আশি টাকা, রোজ । খারাপ কি?
এবার নার্সারিতে গেলাম। গোলাপের কলম কিনতে।
মাথায় আন্দেজ পর্বত ভেঙ্গে পড়লো যখন শুনলাম একটা গোলাপের কলমের দাম আশি টাকা করে। শুধু তাই না নিয়মিত দামি সব ওষুধ পত্র দিতে হবে।
নইলে সালাদ মনে করে পোকায় সব গোলাপ খেয়ে ফেলবে। নিমন্ত্রণ না দিলেও ওরা আসবে।
শুকনো মুখে বাড়ি ফিরলাম।
আমাদের মাতা পুত্রের যৌথ ব্যবসা সেটাই প্রথম । আর সেটাই শেষ। অথচ গত এক মাস ধরে কী উম্মাদনাই না ছিল আমাদের মধ্যে।
বস্তায় বস্তায় গোলাপ সংক্রান্ত বই পড়েছি। এমন কি একটা সাইকো থ্রিলার উপন্যাস পড়লাম , যেখানে খুন করে খুনি মৃত দেহের পাশে একটা মেরুন রঙের গোলাপ রেখে আসে।
কী কাণ্ড !
যাক সেসব ।
দশটা টব কেনা দামে বিক্রি করে দিলাম।
বাকিগুলোতে পুঁইশাক ঘৃতকুমারী আর মানিপ্লান্ট বুনলাম । বেশি জল দেয়ায় ঘৃতকুমারী কুমারী অবস্থায় মারা গেল।
তবে মাত্র কিছুদিনের মধ্যে মানিপ্ল্যান্ট আমাদের বাড়িটা ঘিরে ফেলল অক্টোপাসের মতো । খুব সুন্দর লাগত দেখতে।
আমাদের উঠানটা প্রায় বাগান হয়ে গেল।
আস্কারা পেয়ে এক ঝাঁক পাটকিলে রঙের চড়ুই এসে বাসা বানিয়ে ফেলল ঘুলঘুলিতে।
কয়টা চড়ুই পরিবার এসেছে বলতে পারব না।
ঠিক জানি না।
সারাদিন কিচির মিচির করে। যখন তখন সোনালী রঙের খড়কুটো খসে পড়ে মাথার উপর। চায়ের পেয়ালায়। জামা কাপড় শুকাতে দিলে ওখানে বসে হাগু মুতু করে দেয়।
মা বলতো, ওদের কিছু বলিস না। ভাগ্যবানের বাড়িতে পশু পাখি আশ্রয় নেয়। দেখবি খুব জলদি আমাদের ভাগ্য বদলে যাবে।
আমার বিশ্বাস হত না।
মনে হত দুঃখের অরন্যে সারাজীবন বসবাস করতে হবে আমাদের।
ফাল্গুনের রাতে খোলা বারান্দায় বসে কালপুরুষ খুঁজতাম।
কালপুরুষের কোমরের বেল্ট খুঁজে পেতাম সহজে।
তিনটে তারা ওখানে।
আফ্রিকান এক উপজাতির নাম ডোগান। ওরা বলে , ওখানে তিনটে নয় , চারটে তারা আছে। আর চার নাম্বার তারা থেকে ওদের পূর্বপুরুষ এসেছিল পৃথিবীতে।
পুরাই গালগল্প।
কিন্তু মাত্র কিছুদিন আগে বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছেন- ওখানে সত্যিই আরেকটা তারা আছে। খালি চোখে দেখা যায় না।
এত সুপ্রাচীন কালে আফ্রিকার আদিম এক জনগোষ্ঠী এই তথ্যটা জেনেছিল কিভাবে?
কেন পুরানো অনেক জনপদে বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করে - আকাশের তারা আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে?
সেই গুহা যুগেই মানুষ জন রাতের আকাশ দেখে বিহ্বল হয়ে যেত।
আজও।
আজও উপকথায় শুনি - গভীর রাতে ঈশ্বর জেগে থাকেন। চোখ মেলে তাকান মাটির পৃথিবীতে।
মানুষের কষ্ট দুর্দশা দেখে দুঃখ বোধে আক্রান্ত হন তিনি।
তিনিও কাঁদেন।
ঈশ্বরের অশ্রু টুপ টাপ করে ঝরে পড়ে পৃথিবীতে। আর সেই অশ্রু জমাট বেঁধে তৈরি হয় হীরা, পান্না, পোখরাজ , চুনি ।
আরও সব দামি পাথর।
উপকথাটা কোন দেশের , আজ আর সেটা মনে নেই।
ঈশ্বর একটু ব্যস্ত।
একটু হয়তো অলস।
কিন্তু সিরিয়ালে আপনার নাম আসতেই সে দেখাবে তার ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা।
একদিন মুখ ভর্তি পান নিয়ে জ্যাঠা আমাদের বাসার দরজা নক করলেন।
হাতে এক গাদা কাগজ পত্র। অ্যামেরিকান পোস্ট স্ট্যাম্পের ছাপ সহ কিছু চুক্তিপত্র।
অনেক আগে শখ করে নারকেল গাছওয়ালা চিনির মত সৈকতওয়ালা চারটে পোস্টার কিনে বসার ঘরে সেঁটে দিয়েছিলাম।
স্বপ্ন দেখতাম - দূর সাগরের দ্বীপে চলে যাব। সারাদিন কাজ শেষে সৈকতের একটা বারে বসে নারকেলের মদ খাব। সামনে ঝলসানো হবে বড় বড় গলদা চিংড়ি আর লাল কাঁকড়া।
লেগুনের বাইরে ঘুর ঘুর করবে হাঙর !
আমার হাতের কাগজ আর পাসপোর্ট বলছে - আগস্ট ২৭, ১৯৯৬ । অর্থাৎ পাঁচ দিন পর দেশ ছাড়তে হবে আমাকে।
যেতে হবে দূরে।
বহু দূরে।
নর্দান মারিয়ানা আইল্যান্ড!
প্রশান্ত মহাসাগরের স্বপ্নের মত একটা দ্বীপ ।
আমাকে?
হয় নাকি অমন?
মা সব সময় বলে- হঠাৎ করেই নাকি ভাগ্যের চাকা খুলে যায়। বিশ্বাস রাখতে হয় ঈশ্বরের উপর। অপেক্ষা করতে হয় ধৈয় ধরে ।
অসুস্থ বাপকে নিয়ে ঢাকায় ঘুরে ঘুরে কেনা কাটা করলাম।
ভালমানের একটা ট্র্যাভেল ব্যাগ ও তখন পাওয়া যেত না আমার শহরে !
দামদামি করতে পারি না। পথ ঘাটও ভাল মত চিনি না। সাথে অসুস্থ বাপ।
ঠকে মকেই জিনিস পত্র কিনে বাড়ি ফিরলাম।
ঘুরে ঘুরে শেষ বিদায় নিতে গেলাম পরিচিত সবার কাছে।
কবিকে পেলাম না। ঢাকা গেছেন । ফিরবেন পাঁচ ছয় দিন পর।
বিপিনকে পেলাম ওর বাড়িতেই।
কোন এক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদককে নিমন্ত্রণ করে এনেছে খাওয়ানোর জন্য, যদি কবিতা-টবিতা ছাপানো যায় !
আমাকে দেখেই যারপরনাই বিরক্ত হলো। বাড়িতে কোনো মেহমান এলে বাইরের লোক দেখলে বরাবর বিরক্ত হয়ে বেচারা ।
কেন এসেছি দুই লাইনে বললাম।
সব শুনে চেহারা লাল হয়ে গেল বিপিনের।
বিরক্তি মাখা গলায় বলল, ' তোর কাছ থেকে এর চেয়ে ভাল কিছু আশা করিনি। দেশে কিছু করার মুরোদ আছে তোর? একদম নেই। তোর মত মানুষগুলোর জন্যই দেশের এই অবস্থা। থাকবি এখানে মন পড়ে থাকবে সামাজ্যবাদি কোন দেশের পায়ে। যা চলে যা। তোর জন্য সেটাই ভাল। দালাল কোথাকার।'
বিপিনের রাগ তখনও বুঝিনি।
এতগুলো বছর পর আজও বুঝে উঠতে পারিনি।
শেষ অবতার শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, প্রচন্ড রকমের ধার্মিক ব্যক্তির ভেতরে অহং বোধ ঢুকে যায়, সে একজন ধার্মিক ।তার ভেতর অহংকার বোধ তৈরি হয় , পঙ্কিল এই পৃথিবীতে সে সৎ ভাবে বেঁচে আছে।
বিপিনের সমস্যা সেইরকমই ।
কবিতা লিখে কিছু সংগঠনের বেগার খেটে ওর ভেতর অমন বোধ জন্ম নিয়েছে যে দেশের জন্য মস্ত কিছু করছে।
পরবর্তীতেও অমন চরিত্র হাজারে বিজারে পেয়েছি। কেউ উনাদের দায়িত্ব না দিলেও শিল্প সংস্কৃতির স্বঘোষিত ধারক বাহক হয়ে গেছে নিজে নিজেই।
তবে এরা আর কেউ বড় বড় বল চাল মারতে পারেনি।
বন্ধুত্বের ছন্মবেশে কাছেও আসতে পারেনি।
শেষ বারের মত পুরো শহরটা একা একা ঘুরে বেড়ালাম।
নিউ মেট্রো সিনেমা হল। পৌর পাঠাগার। লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির। জিউস দিঘি। রামবাবুর পুকুর। সস্তাপুরের সেই নির্জন পথ। দুই পাশে বনতুলসির ঝোপের ঝাঁঝাঁলো ঘ্রাণ।
বড় বড় কড়ই গাছ। পাউডার পাফের মত ফুল ধরে । ল্যাম্পপোস্টের কমলা আলো মাখা নির্জন পথ। শহরের এক মাত্র পুরানো বইয়ের দোকান থেকে শেষ লট বই কেনা।
রেল লাইন।
এত কিছু আছে আমার শহরে? সেই টালু মালু করে হাঁটতে শেখা শৈশব থেকে এত কিছু সঙ্গ দিয়েছে আমাকে?
কই জানতাম না তো?
বিদায় ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন