ছয়
বৃহস্পতিবার রাতে কাজে লাগল পোকা।
মগবাজারের ময়লা একটা গলিতে সস্তা বাসায় ও আর রুইতন থাকত।
মোটরসাইকেল নিয়ে সোজা রওনা হল।
চাঁদনী রাত। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে হু হু করে চলে এলো। প্রথমে গাজীপুরে । হাজারে বিজারে ময়লা গলি আর বড় বড় রাজপথ শেষ করে সোজা নবীগঞ্জে।
নির্জনবাস খুঁজে পেল সহজেই। ম্যাপ দিয়েছিল কেশু । সবচেয়ে বড় কথা আশেপাশের বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে কোনো বাড়িঘর নেই।ফাঁকা।
মূল ফটকের সামনে অনেকটা সময় ঘাপটি মেরে বসে রইল সে।
চৈত্র মাসের গরম। দরদর করে ঘামছে। আকাশে ভরা চাঁদ।
দুই ভাইবোন সারা সপ্তাহ আলোচনা করে নিশ্চিত হয়েছে , কাজটায় সফল হতেই হবে ওদের। টুকটাক কাজ করে পোষাচ্ছে না আর।হাত একদম খালি। আক্ষরিক অর্থেই দুই ভাই বোন একদম বেকার।
গেট খুলে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ল পোকা । সতর্ক। কুকুরটা কোথায় ?
আচমকা ঘেউঘেউ করে উঠলে কিন্তু বিপদে পড়ে যাবে। ভাগ্য ভাল ।ওকে দেখার আগেই কুত্তা হারামজাদাটাকে দেখতে পেল । বাতাসের উল্টা দিকে ছিল বলে রক্ষে ।
উপুর হয়ে ঘাসের মধ্যে শুয়ে পড়ল পোকা। পলিথিনের একটা ব্যাগ নিয়ে গেছে সাথে। ওটা ভেতর থেকে বিষ মাখানো মাংসের টুকরো বের করে ক্রিকেট বল ছোঁড়ার মতো করে ছুড়ে দিল কয়েকটা টুকরো।
তারপর আবার মাথা গুঁজে শুয়ে রইল।
বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। রাতের বেলা কাজের সুবিধে হবে, ভেবে কালো জিন্সের প্যান্ট, কালো টি- শার্ট আর উপরে হাতা কাটা কালো লেদারের জ্যাকেট চাপিয়ে এসেছে।এখন মাত্রারিক্ত ঘামছে।তাছাড়া মানসিক চাপ তো আছেই। রাস্তা ঘাঁটে গুণ্ডামি করা আর মহাপরিকল্পনা করে মস্ত কোন ক্রাইমে অংশ নেয়া সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার।
মাথা গুঁজে শুয়ে আছে এখনও। সময় কাটছেই না।
কয়েক হাজার বছর পর , আসলে পাঁচ মিনিট পর মাথা তুলে দেখল ,দূরে কুকুরের আকৃতির একটা কালো বিন্দু পরে আছে। আরও খানিকটা সময় ঘাপটি মেরে শেষে উঠে সামনে চলে গেল পা টিপে টিপে। মড়ে পরে আছে কালো বিশাল অ্যালসেশিয়ান কুকুরটা। দশ মিনিট লাগল, নরম বালি খুঁড়ে ওটাকে দাফন করতে। ব্যাগে করে ক্ষুদে সাইজের বেলচা এনেছিল সঙ্গে করে।
অন্ধকারে বিশাল একটা বাদুরের মত একপাক ঘুরে এলো পুরো বাড়িটা ।
টেলিফোনের লাইন পেয়ে কেটে দিল। কালো সুতা দিয়ে এমন ভাবে বেঁধে রাখল যাতে খুব কাছ থেকে দেখলে মনে হয় লাইন ঠিকই আছে।বাড়ির বাম দিকে ফ্রেঞ্জ উইন্ডো ছিল একটা। সেটা খুলে বাড়ির ভিতর ঢুকতে মোটেও সময় লাগল না। তবে জীবনের এই প্রথম একটু নার্ভাস লাগছে। এর আগে চোরের মত কোন বাড়িতে ঢোকেনি।
বন্দুকগুলো হাপিশ করতে বেশি সময় লাগল না। এমন কী কপালগুণে ড্রয়ারের ভেতরে শিশিরের পিস্তলটাও পেয়ে গেল। পেল্লাই একটা তোয়ালের মধ্যে সব রেখে পোঁটলা করে চাঁদের আলোয় ভিজতে ভিজতে বালির মধ্যে পুঁতে ফেলল সব।
শুধু শিশিরের পয়েন্ট থার্টি পিস্তলটা প্যান্টের পেছনে গুঁজে রাখল।জিনিসটা পছন্দ হয়েছে।
কাজ শেষ করে গ্যারেজের গিয়ে গাড়ির স্পার্কিং প্লাগগুলো সব খুলে রুমালে প্যাচিয়ে অন্য আরেকটা জায়গায় নরম বালির তলায় পুঁতে রাখল।
ততক্ষণে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাস এসে গেছে পোকার ভিতরে। মানিক দাদার কথামতো সব কাজ হয়েছে - এটা ও একটা স্বস্তির ব্যাপার।
শুরু ভাল মানে সবই ভাল যাবে- বিশ্বাস করে ও।কুত্তাটা গেছে। বন্ধুকগুলো কবর দেয়া হয়েছে। গাড়ি অচল। টেলিফোন ডেড। বাকি রইল শুধু চাকর দুঃখীরাম।
কোমরের বেল্টের সাথে জড়ান সাইকেলের চেইন খুলে হাতে নিল । পোকার প্রিয় অস্ত্র৷ সব মারামারিতে এটাই ব্যবহার করে। সেই ছোটবেলা থেকে । ডান হাতের তালুর মধ্যে ব্যান্ডেজের মত ভাল করে পেঁচিয়ে নিল চেইনটা।কয়েকবার মুঠো খুলে - বন্ধ করে দেখে নিল চেইনটা শক্ত হয়ে এঁটে আছে কি না।
*************************
দুঃখীরাম চিংড়ির মতো রোগা ভোগা ছোটখাটো মানুষ।
রাত দুটোর সময় কারণ ছাড়াই বেচারার ঘুম ভেঙে গেল। স্বচ্ছ এক ঘুমে রাত কাবার করে সকালে উঠে যায়। কিছুক্ষণ অন্ধকারেই শুয়ে রইল। ভাবছে- আজ কেন ঘুম ভাঙল?
ঘুম ঘুম চোখে উঠে ফ্রিজ খুলে ঠাণ্ডা বোতলটা পেয়ে মনটা ভাল হয়ে গেল।তেষ্টা পেয়েছে। ছিপি খুলে চুমুক দিতে দিতে বাইরে চলে গেল।
ঘন হলুদ চাঁদের আলো। গরম বাতাস । গহন জ্যোৎস্না।
বোতলটায় চুমুক দিয়ে নামাতে যাবে, তখনই আড়াল থেকে সামনে এসে দাঁড়াল পোকা। দুজন একে অপরের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। চাঁদের উল্টো দিকে ছিল দুঃখীরাম। ওকে ভাল করেই দেখতে পেল পোকা।কিন্তু দুঃখী শুধু দেখল- পেল্লাই একটা কালো ছায়া।
আতঙ্কে প্রথমেই দুঃখীর হাত থেকে জলের বোতলটা খসে পড়ল। সেই বোতল পড়ার শব্দটা ট্রিগার সুইচ হিসাবে কাজ করল পোকার শরীরে।
দুঃখী চেঁচিয়ে ওঠার আগেই সাপের মতো লাফ দিল পোকা । সাইকেলের চেইন প্যাঁচানো ডান হাত দিয়ে গায়ের জোরে ঘুষি মারল ক্ষুদে ভৃত্যের ঘাড়ে।
মাটিতে পরে যাওয়ার আগেই ক্যাচ ধরে ফেলল দুঃখীর শরীরটা। টানতে টানতে নিয়ে এল সারভেনট কোয়াটারের ভিতরে । ছোটখাটো পটকা শরীরের লোকটার জন্য মায়াই লাগলো পোকার। বাইরে আসার আর সময় পেল না ? আঘাতটা অনেক জোরে হয়ে গেছে। উপায় ছিল না আঘাত না করে। চিৎকার করতে পারত লোকটা। ফাঁকা জায়গায় চিৎকারের শব্দ বহু দূর দুরান্ত পর্যন্ত যাবে।
হাতের চেইনটা ভেজা ভেজা লাগছে। বালিতে ঘষে পরিষ্কার করে জিনিসটা আবার কোমরে পেঁচিয়ে রাখল। অনুশোচনায় ভুগছে-রোগা লোকটাকে এত জোড়ে মারা ঠিক হয়নি।মরে টরে গেলে মস্ত বিপদে পড়ে যাবে। তখন হয়তো পুলিশ নামবে। কেশু আর মানিকদা ওর পক্ষে থাকবে না।
টর্চের আলো ফেলল দুঃখীর চেহারায়। লাফ দিয়ে উঠল পোকার কলজে ।
মারা গেছে দুঃখী।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন