সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্রেরা মরে গেলে চুমকি হয়ে যায় ১৬

 ১৬

 

 

দেখতে দেখতে মেট্রিক পরীক্ষা চলে এলো।

 

 

পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

 

রোজ রাতে স্বপ্নে দেখি , পরীক্ষায় ফেল করে রিক্সা চালাচ্ছি। দরদর করে ঘমাছি রিক্সা টানতে গিয়ে। বারবার রিক্সার চেইন পরে যাচ্ছে। পুলিশ এসে মোটা গজারি কাঠ দিয়ে আমার পাছায় কয়েক ঘা বসিয়ে দিচ্ছে।

 

ঘুম ভেঙ্গে আবিস্কার করি ঘামে শরীর ভেজা।

 

মাথার পাশে ইয়া মোটা টেস্ট পেপার। সিলিঙ ফ্যানের বাতাসে ফড়ফড় করে উড়ছে।

 

সে সময় রাত জেগে পড়া শুরু করলাম। সারা বছর পড়ার নামে ঘণ্টা ।

 

ভোর সাড়ে চারটা পর্যন্ত জাগতাম।

 

ক্রাফটওয়ার্ক, বনি এইম, ইরুপশন বা মডার্ন টকিং  ক্যাসেট বাজিয়ে বীজ গণিত করি। ভূগোলের মানচিত্র আঁকি । নদ-  নদীর দৈর্ঘ্য মুখস্ত করি । খনিজ সম্পদের হিসাব রাখি। জাবেদা মিলাই।

 

ক্লান্ত হলে ছাদে চলে যাই।

 

আমাদের ছাদটা পুরো এলাকার মধ্যে বিখ্যাত। বাড়িওয়ালী প্রায় পঞ্চাশটা ফুলের টবে গোলাপের চাষ করেছেন।

 

এত হাজারে বিজারে গোলাপ যে দুনিয়ায় আছে জানতাম না।

 

কোটের বোতামের সাইজের হতে শুরু করে হাতের তালুর মত সাইজেরও গোলাপ হয়েছে।

 

কয়েকটার পাপড়ি শারটিন কাপড়ের মত। আবার কয়েকটার পাপড়ি পেঁয়াজের খোসার মত !

 

 জুলিয়াস রোজ । পাপামিলা। কুইন এলিজাবেথ ।   আইসবারগ।  ডাচ গোল্ড।

 

বিচিত্র সব নাম।

 

ছাদে গিয়ে সোজা জলের ট্যাংকির উপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকি।

 

 সারাদিনের গরমে সিমেন্টের ট্যাঁঙ্কিটা কেমন তেতে থাকে। এই শেষ রাতেও কেমন প্রিয় মানুষের  হৃদয়ের মত উষ্ণ !

 

আকাশ ভর্তি নক্ষত্রের হাট বাজার।

 

কালচে নীল চাদরের উপর মুঠো মুঠো খই ছিটিয়ে রেখেছে যেন কেউ।

 

অনেক ক্ষণ চিৎ হয়ে শুয়ে খোলা আকাশের দিকে চাইলে পরিষ্কার বুঝা যায় পৃথিবী ঘুরছে।

 

এটা কোন ভ্রান্তি না।

 

বুঝা যায় ।

 

মিল্লাত ভাই আসেন মাঝে মাঝে । পরীক্ষার অজুহাতে আজকাল চিঠি লেখার কাজ থেকে রেহাই পেয়েছি

 

 তবে সে তো আসল কারণ নয়।

 

 রেণু  বাইরে আসে না  আজকাল ।

 

সামনে পরীক্ষা।

 

কবি আর বিপিনের কোন খোঁজ নেই । কেন যেন মনে হয় মারা গেছে ওরা দুজন। অনেক বার বিপিনের বাড়িতে গেছি।

 

ওর বাড়ির কেউ বলতে কখনই বলতে পারে না বিপিন এই মুহূর্তে কোথায় আছে।

 

ওর মা, দিদি বা বৌদি সব সময় হাসি মুখে বলে , ' হায় হায় বিপিন তো মাত্র বাইর অইয়া গেল।'

 

 মাঝে মাঝে কবির বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে।

 

 মনে হয় ওখানে গেলে বোধহয় ওদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাবে।

 

 মানুষ হিসেবে আমি খুব লাজুক ।

 হুট করে কারো বাড়িতে চলে যেতে পারি না।

 

 শুধু উড়ো খবর পাই মাঝেমাঝে। ঢাকার কোন এক পত্রিকার আপিসে যায় বিপিন । ঘন ঘন । কবিতার খাতা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে পত্রিকার সম্পাদকের সামনে। সাহিত্যপাতার সম্পাদকের সাথে আড্ডা দেয়।

 

 এক দিন কোন এক সাহিত্য সম্পাদককে ধরে এনেছিল বাসায়। ডাল  ভাত খাওয়ার জন্য।

 

কী   সব হচ্ছে কে জানে?

 

মিল্লাত ভাই বলেন - ওরাই খায় মাইজ্ঞা। নিমন্ত্রণ খাওয়াইব হাইজ্ঞা?

 

ছি !

 

সাহিত্য সম্পাদক পাঁঠার মাংস আর বাগদাদি আলুর দম দিয়ে ভাত খেয়ে দাঁত খিলাই করতে করতে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপিনের পিঠ চাপড়ে বিদায় নিয়েছেন।

 বিপিনের লেখা ছাপেনি ।

 

 ওই দিকে কবির অবস্থাও ভাল না। শহরের সব ব্যর্থ  কবি লেখকরা একজোট হয়ে গেছে ওনার বিরুদ্ধে । কবি নাকি কার লেখা চুরি করেছেন।

 

 দেশ পত্রিকায় পুজো সংখ্যার কোন কবিতার সাথে নাকি তার কবিতার হুবহু মিল ।

আমি জানি এসব মিথ্যা।

কারণ এই কবিতা বছরখানেক আগে কবির খাতায় দেখেছি। মূল থিম এক হলেও আলাদা দুটো কবিতা ।

 আসলে প্রেমের কবিতা যে ভাবে লেখা হোক না কেন, সব এক ।

 এসব কোন কিছুই দাগ কাটে না।

 

 আমি ভূতের মত পড়ি। পাশ না করলে শেষ।

 

সবকিছুরই শেষ আছে ।

এই বিশ্বজগত ব্রহ্মাণ্ড সেটা একদিন থমকে যাবে।

 নক্ষত্রেরা ও একদিন মরে গিয়ে চুমকি হয়ে যাবে।

 আমার পরীক্ষা শেষ হলো ।

 

হাতে অফুরন্ত সময় । ছুটি। এমন মুক্তির আনন্দ আর জীবনে পাইনি । ডানা ছাড়াই  যেন উড়ে বেড়াতে পারব ।

 

এক মুঠো টাকা দিল মা, যাতে ইচ্ছে মতন পুরনো বই কিনতে পারি। গুলশান সিনেমা হলের সামনে বসে থাকা বুড়োর কাছ থেকে আক্ষরিক অর্থেই  বস্তা ভর্তি বই কিনলাম।

 

 ঠিক এই সময় আবার ফিরে এলো ওরা।

 

বিপিন। কবি। মিল্লাত ভাই।

 

শুধু তাই না । রেণু ও।

 

 

 

 

রেনু আর ওর দুই বান্ধবীর সাথে যখনই দেখা হতো, আমাকে দেখে হাসতো ওরা।

 

 আমার কান লাল হয়ে যেত লজ্জায়।

 সব সময় প্রার্থনা করতাম ওদের সাথে যেন পথে ঘাটে দেখা না হয়।

 

 

প্রার্থনা এমন একটা এনার্জি বা  প্রাচীন শক্তি আজ বা কাল সেটা কাজে লাগবেই ।  কিন্তু রেনু সান্যাল এর ক্ষেত্রে আমার প্রার্থনা কাজে লাগতো না ।

দেখা হতোই।

 

 পরীক্ষার পর ওর হাতে ও অঢেল সময় বোধহয়।

 আমার মত বস্তাপঁচা বই পড়ে সময় নষ্ট করত না ।

 

কোথায় গিয়ে যেন বেহালা শিখে আসতো । রেণু আমাদের শহরের একমাত্র মেয়ে যে,  লিচুর দানার রঙের সুন্দর একটা বেহালা নিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতো!

 

মায়াবী কমলা বা ঘন হলুদ রঙ্গের বিকেলগুলোতে  অবাক হয়ে দেখতাম, প্রায় পরীর মত একটা  মেয়ে গোলাপি  রঙের  কার্ডিগান গায়ে চাপিয়ে শুকনো শ্যামা ঘাস মাড়িয়ে বাড়ি ফিরছে।

 

ও হেঁটে গেলে অদ্ভুত সুন্দর একটা সৌরভ আসতো ওর চুল থেকে।

 

 কে জানে কি শ্যাম্পু দেয় মাথায়?  কোন  কোম্পানির সাবান দেয় গায়ে।

 

 এমন কী   প্রবল শীতের সময় বিপিণের হাত পা ফেটে যখন খিরাই বা বাঙ্গির মত হয়ে যায় ,  রেণুর হাতের আর গালের চামড়া তখনও মোমের মত মসৃণ। ক্রিট দ্বীপের জলপাইয়ের মত লাবন্য মাখা । কী   করে  এমন হয় কে জানে?

 

তবে মিল্লাত ভাইয়ের  প্রতিদ্বন্দ্বী বেড়ে গেছে।

 ভিন মহল্লার অচেনা কিছু ছেলে ছোকরাকে দেখি ঘুরঘুর করে রেণুদের বাড়ির সামনে ,

ওদের পোশাক-আশাক বড় বিদঘুঁটে । শুধুমাত্র ঝাল মুড়িওয়ালা বা মুম্বাই নায়ক গোবিন্দ এই ধরনের জামা কাপড় প়রতে পারে।

 

 এরা কিসের আশায় সারাটা দিন রোদে পুড়ে অন্য মহল্লার একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, কে জানে?

 

 ভাবতাম , এদের কেউ কি রেণুকে জয় করে ফেলতে পারে না?

অত  ভক্তদের মধ্যে একজন ঠিকই রেণুর কাছাকাছি চলে যেতেই পারে।

এটা তেমন বয়স ।

 

কত গল্প অমন দেখি তো।

 

প্রতিবেশী সুন্দরী এক তরুণীকে চিনতাম। একদিন শুনলাম বাড়ি ফেরেনি।

কোন এক ছেলের সাথে ভেগে গেছে। ওই ছেলের একটা হোন্ডা আর জিনসের জ্যাকেট ছাড়া কিছু ছিল না।

কী   দেখে মেয়েটা অমন করল কে জানে।

মেয়ের শোকে বাবা মারা গেল ।

 

রেণু অমন করতে পারে না?

 

 তবে পূজারীদের কেউ কখনই রেণুর কৃপা দৃষ্টি পায়নি। রেণুর মত রাজকন্যারা তাদের ডালিম ফুলের মতো রূপ নিয়ে দূর দেশের রাজকুমারের ঘোড়া চেপে বহুদূরে চলে যায়।

 

আমাদের দেখা হতো।

 চোখাচোখি হতেই রেণু হেসে ফেলত ঠোঁট টিপে।

ইটালিয়ান টম্যাটোরমত লাল হয়ে যায় আমার  চেহারা।

 

 দিনগুলো এভাবে কেটে যাচ্ছে।

 

বরাবরের মতো মিল্লাত ভাই উনার  মাছ মার্কা ছুরি নিয়ে আমার কাছ থেকে চিঠি লিখিয়ে নিয়ে যান।

 

 আর আমি আবোল-তাবোল যা মনে আসে লিখে দেই।

 

 পরীক্ষা ছুটি শেষ হলে খুব দ্রুত ।

 

এত দ্রুত সময় যায় জানতাম না ।

 

কলেজে উঠে গেলাম ।

 

রেণুর জন্য গাড়ি কেনা হল । ওদের তো  অনেক টাকা , তাই।

 

 শুনেছি কলকাতায় ওদের দুটো বাড়ি আছে। ওর বাবা লবণের ব্যবসা করে বহু টাকা কামিয়েছে। একটা তেলের পাম্পের মালিক ও।

 

আমাদের শহরে একমাত্র রেণুদের বাড়িতেই মালি আছে ।

 

বেতন দিয়ে একজন লোক পোষা। যে কিনা সারাক্ষণ খুপরি দিয়ে বাগানের মাটি উলটপালট করে। কলম কেটে নানা ফুলের চারা বুনে। গা গাছে জল দেয় । আর সময় পেলেই নরম নরম দূর্বা ঘাস টেনে তোলে।

 

 ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর।

 

ফিকে আকাশী  রঙের বাটুল ধরনের একটা গাড়ি কেনা হলো রেনুর জন্য।

 

তম্বা রাগি চেহারার একজন ড্রাইভার রেণুকে  গাড়িতে করে নিয়ে যেত।

 

 জানালার কাঁচ বন্ধ ।

 

 কে জানে বাইরে কোন শব্দ হয়তো ভিতরে যায় না ।

 

সারাক্ষণ দূরে কোথায় যেন তাকিয়ে থাকে রেণু । তারপর  এক অচেনা যোগাযোগে চোখে চোখ পতো আমাদের।

 

 ঠোঁটের কোণে আর চোখের তারায় হাসি ফুটে উঠত মেয়েটার।

 

 লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যেত আমার। বই দিয়ে চেহারা আড়াল করে পালিয়ে যেতাম ।

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...