৪
একদিন বিপিন এসে হাজির ।
বলল- কিরে কাল যাবি নাকি কবির বাসায়?
কবির বাসায় যাবার কথা একদমই মনে ছিলা না। বিপিনের আছে।
নিমন্ত্রণ মিস করতে চায় না । ওর কবিতা লেখার খাতায় সুন্দর করে লেখা থাকে, কবে কোথায় কার বাসায় নিমন্ত্রণ আছে। কুলখানি হতে সুন্নতে খৎনা । অন্নপ্রাশন হতে জন্মদিন। ইফতার পার্টী হতে লক্ষ্মী পুজোর নাড়ুমুড়ি খাওয়া, কিছুই মিস করতে চায় না। সুকুমার রায়ের খাই খাই ছড়ার মত সবই খেতে চায়।
পরীক্ষা শেষ। আমার কাছে অল্প বিস্তর সময় আছে। কাজেই শুক্রবার কবির বাসায় ঢু মেরে আসা যায়।
তোমরা জানো না তখন শুক্রবারের দারুন একটা আমেজ ছিল। সকালে ঘুম ভাংলেই টিভি দেখতে বসে যেতাম।কারন অন্য দিনগুলোতে শুধু বিকেলে টিভি চলতো।কাজেই সবার বাসায় টিভির শব্দ শুনা যেত শুক্রবারে।
আমার শহরটাও বেশ নিঝুম ছিল তখন। এত হাউ কাউ ছিল না।
আর শীতের সকালগুলো খুব সুন্দর হত।সকাল এগারোটার আগে কুয়াশা কাটতো না। সীসের মত রঙ হত আকাশটার। বেশ অলস সময় পার করতো বাগানের হলুদ কমলা গাঁদা ফুলগুলো।প্রায় সবার বাড়ির সামনে শীতের সময় গাঁদা ফুলের চারা দেখতাম।
সকাল দশটায় আমাদের দাওয়াত। আসলে বলা দরকার কবি গৃহে নিমন্ত্রণ। ওটা শুনতে ভাল।
এত সকালে ঘুম ভাঙ্গা কষ্টের। তারপরও উঠে পড়লাম। কবির বাসা দেখার শখ।
আহ্লাদের চোটে শীতের সকালে স্নান করে নিলাম দারুন করে। প্রচুর শ্যাম্পু মাথায় দিলে আমার মাথার চুলগুলোতে বাবরিওয়ালা একটা ভাব চলে আসে। নইলে পাখির বাসার মত লাগে।
রাস্তায় যখন হাঁটছি তখন ও লোকজন তেমন নেই। সকাল সাড়ে নয়টা। মোড়ের চায়ের দোকানে মাত্র কেতলি বসিয়েছে । একটা লোক হাভাতের মত পাউরুটি নিয়ে বসে গরম চায়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছে। পাশেই গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে বাদামের খোসার রঙের একটা কুকুর ।
বেলের শরবত বিক্রি করছে একজন। বুড়ো মত একলোক অমৃত খাওয়ার মত করে বেলের শরবত খাচ্ছে। দেখেই বুঝা যায় অযথাই দৌড়ে এসেছে। ওটাকে জগিং বলে। বেলের শরবত নাকি উপকারি। একজনকে দেখলাম টিনের বালতি ভর্তি মধু নিয়ে বসে আছে। মধু ভর্তি মৌমাছি আর আর হাউজ অভ অয়াক্স মুভির মোমের মত মৌচাক।
মনে হল মাঝে মাঝে শীতের সকালে উঠা দরকার।
সব কিছু কেমন অচেনা লাগে। কত কিছু দেখার বাকি।
হিন্দু এক বুড়ি রামবাবুর পুকুর থেকে স্নান করে ফিরছিলেন। হাতে তুলসির মালা। বিড়বিড় করে ইষ্ট দেবতাদের স্মরণ করছিলেন। শীতে আর বয়সের কারনে কাঁপছিলেন মৃগি রোগীর মত। বিপিনের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত থাকায় বুড়ির সাথে ধাক্কা লেগে গেল। বুড়ির তম্বি দেখে কে। মুহূর্তেই মুখ দিয়ে গালিগালাজের তুবড়ি ছুটতে লাগল। সেই সাথে লাগাতার অভিশাপ। অভিশাপের মূল কথা হল- আমারা ভস্ম হয়ে যাবো।
বুড়ির রাগ দেখে আমরা দৌড় দিলাম। আর বুড়ি আবার স্নান করতে পুকুরে নেমে গেলেন।
দিগুবাবুর বাজারটা এই শীতের সকালেই জমে গেছে।
কত ধরনের সবজি। ঝুড়ি ভর্তি লাল টম্যাটো। বাদামি রঙ্গের আলু।
বড় ট্রাক ভর্তি হয়ে সবজি এসেছে নানান যায়গা থেকে। কামলা টাইপের মানুষগুলো সবজি নামাছে।একজন আছে ট্রাকের উপর। ওখান থেকে মস্ত বড় বাঁধাকপি নীচে ছুড়ে মারছে। নীচের জন ক্যাচ ধরে পাশের জনের কাছে দিচ্ছে। পাশের জন ক্যাচ ধরে তার পাশের জনের কাছে ছুড়ে দিচ্ছে। এই ভাবে একেবারে আড়ত পযন্ত চলে যাচ্ছে।
বেপারি টাইপের লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছে আর কামলাদের গালিগালাজ করছে- ওই হমুন্ধির পোলারা এতক্ষুণ লাগে রে মাল খালাস করতে। মন ডায় কয়…।
বেপারিদের গলায় লাল হলুদ চেক মাফলার।কেমন টাউটদের মত লাগে।
ঝুড়ি ভর্তি ধনেপাতা নামাছে কয়েকজন।
ধনেপাতা ইংরেজি কি রে ? জানতে চাইল বিপিন।
থ্যাঙ্ক ইউ লিফ। অম্লান বদনে জবাব দিলাম।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন