সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শহরতলী

 শহরতলীর জীবন যাত্রা কেমন ছিল তখন ?

 

জীবন যেমনই ,  ছিল ভালই ছিল।  দুধের বাটির মত সহজ।

আজকালের মত এত  অস্থিরতায় ভুগত না 

সন্ধ্যার পর,  মহল্লাগুলো হয়ে যেত  অদ্ভুত  রকমের নিঝঝুম   

 টুংটাং ঘন্টা  বাজিয়ে  এক আধটা রিক্সা  মাঝে মাঝে চলে যেত খালি  বা সওয়ারী  নিয়ে

 মাঝে মাঝে  অচেনা গ্রাম্য সুরে রিক্সাওয়ালা গেয়ে উঠত   কোন গান

'নাইযে আমার কানা কড়ি,

কেমনে উঠি তোমার তরী 

গুরু লইয়া যাও আমায়।।'

বুঝা  যায় , একদম সবুজ গ্রাম থেকে উঠে এসেছে এই রিক্সাওয়ালা    শ্বাস নিলে এখনো কড়াইশুঁটির গন্ধ পায়  এখনো স্বপ্নীল গ্রামের সবুজ কলাই আর কাউনের   ক্ষেত ওকে  ডাকে

 ভুলতে পারেনা 

সবুজ  গোল বেগুন দিয়ে  পাবদা মাছের ঝোল,  টাটকিনি মাছ  আর লাল ফেনসা  ভাতের    কথা মনে পড়ে ওর চট ঘেরা ভাতের দোকানে  খেতে বসলে  উদাসী হয়ে যায় 

তবে এই ইট কাঠ পাথরের শহরে থাকতে থাকতে একদিন সব ভুলে যাবে সে  একদিন গুনগুন করে ছবির হিন্দি ছবির কোন চটকদার গান গাইবে   আবার হয়তো সারাজীবন গ্রামের দুঃখ  বয়ে  যাবে অন্তরের  অতলান্তে !

 কে জানে ?

 

 হুট হাট করে   হঠাৎ হঠাৎ   বিজলী চলে যায়

 কখনো,  মাঝরাতে  বিজলি  চলে গেলে  শুনতে  পাই ,  দূরে কে যেন বাঁশি বাজাচ্ছে   বাঁশের বাঁশি খুব করুণ একটা  সুরে বাজায় 

 কে বাজায়,  কখনোই জানতে পারিনি  শুধু বিজলি পালিয়ে গেলে  অন্ধকারে বাজাতো  সে  মনে হতো বেচারার  একটা দুঃখের খামার আছে  

প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায় কষ্টগুলো 

 

শহরের ডিআইটি   মার্কেটের   সামনে একবার  এক তরুণ পেয়েছি

 ছেড়া জামা প্যান্ট পরনের   মাথাভর্তি উস্কোখুস্কো চুল  লালচে আর  জটা ধরা   জামার বোতাম    একটাও নেই গুড়ের  রঙের  প্যান্ট   পরা  পায়ের দিকে গুটিয়ে রাখা  স্যান্ডেল নেই  ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল সে  হাতে বাঁশের বাঁশি বাজাচ্ছিল অদ্ভুত একটা সুর 

 প্রত্যেকটা পথচারী মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে যাচ্ছিল সেই মোহনীয় বাঁশির সুরে

 মনে হচ্ছিল সে আরেক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা 

ভিক্ষুক না সে   টাকা পয়সা দিচ্ছিল না কেউ   সে বাঁশি   বিক্রি   করছিল না  

তবে ? কেনো অমনটা করছিল  ?

অপূর্ব বাঁশির সুর তুলে সবাইকে  বিবাগী  করে মানুষের জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিল সে

কত অদ্ভুত মানুষজন দেখি রোজ পথে 

খুব কথা বলতে ইচ্ছে করে ওদের সাথে  কিন্তু বলা হয় না  সংকোচ ঘিরে ধরে অক্টোপাসের মত    অথচ কৌতূহলে দম আটকে দশা হয় মাঝে মাঝে

 

 ব্যস্ত রাস্তার মাঝে গোল একটা জায়গা যেটাকে আইল্যান্ড বলে সবাই 

 সে আইল্যান্ডের সবুজ ঘাসের মধ্যে সংসার পেতে ছিল  কালো মত  এক মহিলা

 মনে হয়  দূর কোন বন পাহাড়ি এলাকা থেকে এসেছে বেচারী  এই সমতলভূমির  মেয়েমানুষ না সে    অদ্ভুত রকমের একটা ভঙ্গি করে কাপড় রে  অনেকটা সাঁওতাল রমণীরা যেমন করে  নাকে  নোলক  

মাথার চুল বেঁধে রেখেছে রং বিবর্ণ শুকনা ঘাস   দিয়ে !

 মহিলার তার কানে ঘাসফুল  গুঁজে  রাখত শখ করে

 সারাদিন কোথায় কোথায়  টই টই  করে ঘুরে বেড়াতো সে ,  কে তার  হদিস  রাখে ?

 সন্ধ্যার  আগে বিকেলটা যখন  হামাগুড়ি  দিচ্ছে  তখন ফিরে আসত আইল্যান্ডে  মাটির চুলা আর  দইয়ের খালি  একটা পাতিল আছে ওখানে  

দইয়ের খালি পাতিলটা  রান্নার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করতো সেই দেহাতি  মহিলা 

সারাদিনের কুড়িয়ে  সংগ্রহ করা বাতিল  কাগজ,  শুকনো পাতা আর হাবিজাবি  ব্যবহার করতো জ্বালানি হিসেবে

কী   অদ্ভুত আয়োজন করে  বেচারী  যে  রান্না  করত,   বলার মতো না

 ছোট্ট এক টুকরো  টিন , যেটা মশার কয়েল গেঁথে রাখার স্ট্যান্ড হিসাবে ব্যবহার করে লোকজন , আর কাজ শেষ হলে ফেলে দেয়  কারণ প্রত্যেকটা প্যাকেটে অমন  চকচকে একটা স্ট্যান্ড দেয়া থাকে

 ঠিক সেইরকম একটা বাতিল  টিনের টুকরো  বটি বা চাক্কু হিসাবে   ব্যবহার করতো সে 

 রান্না আয়োজন বলতে  কিচ্ছু না 

 সবুজ শাক 

সেটা  হতে পারে  কচু শাক   নুনিয়া শাক   হতে পারে  হেলেঞ্চা শাক  হতে পারে 

আমি ঠিক জানি  না 

 টিনের বাতিল সেই টুকরা দিয়ে যে  এত চমৎকার করে কোনো শাক  পাতা কাটা যায়,  না দেখলে বিশ্বাস করতাম না  

পরে অনেক খ্যাতিমান নামকরা বাবুর্চির  কাটাকুটির দক্ষতা দেখেছি   

আমাকে মুগ্ধ করতে পারেনি সেই রকম

শাক কাটা হলে সেই  পাতিলে  রান্না করতে বসে যেত 

নারকেলের একটা মালার মধ্যে লবণ জোগাড় করে আনত কোত্থেকে চেয়ে চিন্তে  ! অনেকটা সময় নিয়ে,  অনেক মমতা দিয়ে রান্না করতে থাকতো  শাকগুলো    

কেনো যেনো মনে  হত  , এই মহিলার  অতীত ছিল স্বর্ণ সমৃদ্ধিতে ভরপুর 

  তার বাসার ঘুলঘুলিতে ছিল  সুখ আর গৌরব

   হয়তো সে ছিল  কারও  বউ  কারো আদরের মেয়ে   

 নিশ্চয়ই ভাগ্য  তার সাথে বাজে ধরনের  রসিকতা করেছে  তাই আজ এই দশা 

 আর কে না জানে,  ভাগ্য কখনও কখনও কোন কারণ ছাড়াই নিষ্ঠুর আচরণ করে

 সম্ভবত এটা করে সে  খুব মজা পায়

 

 আইল্যান্ডের  দুঃখিনী  মহিলা  নিপুণা  গৃহলক্ষ্মীর মত   শাক রান্না শেষ  করে  মাটির কালো  একটা পাতিলে  দুই এক  মুঠো চাল বসিয়ে   দিত 

কী এক ইন্দ্রজালিক দক্ষতায় ,   অতি অল্প সময়ে  সেই  সস্তা চাল থেকে পুণ্যবানের আত্মার মত সাদা আর ঝরঝরে  ভাত  নামিয়ে  ফেলত

 তারপর অনেকটা সময় ধরে চলতে তার আহার পর্ব 

 তার খাওয়ার ভঙ্গি ছিল আক্ষরিক অর্থেই অভিজাত 

 রাস্তায় কোন ভিখারিনী বা  ছিন্নমূল কোন মানুষকে এত সুন্দর ভঙ্গিতে ভাত খেতে দেখিনি আমি 

বড় জানতে ইচ্ছে করতো তার অতীত !

 কে সে ?  কোত্থেকে এসেছিল,  আমাদের এই  নগরে ? কী  হয়েছিল তার ভাগ্যে  ?  আর  পরিবার ?  কোথায় গিয়েছিল  সবাই ?

কখনোই জানতে পারেনি 

 সে  মাত্র মাস   তিনেক  ছিল সেই আইল্যান্ড

 এর মধ্যে  কর্তব্যরত পুলিশ তাকে উঠিয়ে দিয়েছে  কোথায়  চলে গেছে   সে কে জানে !   আজ প্রায়  চল্লিশ   বছর তার কথা   বলতে  গিয়ে অদ্ভুত রকমের মায়া অনুভব করছি

মনে হয় না  বেঁচে আছে ?

যেখানে থাকুক ভাল থাকুক 

পরের জন্মে সুন্দর একটা সংসার পাক ভাল মন্দ রান্না করে প্রিয়জনের সাথে বসে যেন খেতে পায় পেটপুরে


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...