নবীগঞ্জে নির্জন বিচ্ছিন্ন এই বাড়িতে কী হচ্ছে?- জানতে হলে একটু পিছনে ফিরে যেতে হবে ।
তিন মাস আগের কথা।
তখন প্রায় সব কয়টা দৈনিকে খবরটা ছাপা হয়েছিল।
বিখ্যাত উকিল শিবশঙ্কর চাকলাদার বাবু তার নিজের মুখে পিস্তল ঠেকিয়ে টাক মাথাটা উড়িয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করেন। চাকলাদার বাবু উকিল হিসেবে যত না বিখ্যাত ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ছিলেন স্টক মার্কেটের দালাল হিসাবে। তার চেয়ে বড় কথা, বিখ্যাত অপরাধী এবং গ্যাংস্টারদের নেতা কেশু হাওলাদারের ম্যানেজার ছিলেন তিনি ।
এই বার কেশু হাওলাদারের কথা দরকার । মূল কাহিনি উনাকে নিয়েই।
কেশু হাওলাদার অপরাধ জগতের নক্ষত্র। কম বেশি সবাই তাঁর নাম শুনেছে। বর্তমান বয়স ষাট । সব কিছু থেকে অবসরে আছে সে।
কারণ ?
যৌবনে দুই হাত ভরে প্রচুর কামিয়েছে। গত ত্রিশ বছর ধরে সে ছিল অপরাধ জগতের মুকুটহীন সম্রাট। বাংলাদেশে অমন মেধাবী কোনো লোক এর আগে অপরাধ জগতে এসেছিল কিনা সন্দেহ। আর আসবে কি না, সেটাও সন্দেহ।
কেশু হাওলাদার জীবন শুরু করেছিল কালা সিরাজ ভাইয়ের বডি গার্ড হিসাবে। কালা সিরাজ ভাই ছিল উঠতি অপরাধী এবং চট্টগ্রাম শহরে বড় সড় একটা অপরাধী দলের নেতা। ভাড়াটে হিসাবে বেশ কয়েকটা রাজনৈতিক খুন করে নাম কামায় কালা সিরাজ ভাই ।
হোটেল , গারমেনটস মালিক, কারখানার মালিক হতে শুরু করে শহরের অন্যান্য ছোট বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করত কালা সিরাজ ভাই । মাসিক চুক্তি। মোটা অঙ্কের।
না দিলে?
লোকটা হারিয়ে যেত । লাশ পাওয়া যেত নদীতে। বা নির্মাণধীন কোন বাড়ির বালি আর সিমেন্টের মধ্যে ।
ক্ষমতায় টিকে থাকতে আর আইনের হাত থেকে বাঁচতে কালা ভাই রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন । এইসব লাইনে সময় লাগে না কারও । ট্রাক ড্রাইভার এবং ডক শ্রমিকদের নেতা হয়ে যায় এক সময়।
ধাপে ধাপে ভালই যাচ্ছিলেন কালা সিরাজ ভাই। হয়তো সংসদ সদস্য হয়ে যেত । আর ঠিক সেই সময় পুলিশের হাতে খুন হয়ে যায় কালা সিরাজ। নিজের এলাকার বাইরে গিয়ে চাঁদা তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশের ভাগ হজম করে দিতে চাওয়ায় এই দুর্ঘটনা। থানায় ডেকে নিয়ে আলোচনার কথা বলে ওখানেই হজম করে ফেলা হয়।
কালা সিরাজ মারা যেতেই দলের হাল ধরে ফেলে কেশু হাওলাদার।
সিরাজের বডি গার্ড হিসাবে ছায়ার মত পাশে থেকে থেকে এই লাইনের সব অলি গলি চিনে ফেলেছিল এতদিনে । একদম দ্বিতীয় কালা সিরাজ হয়ে গেল সে। বলতে গেলে আরও নিখুঁত। আরও ধূর্ত। আরও ক্ষুরধার ।
এবং ত্রিশ বছর ধরে এই লাইনে থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেল সে।
পুলিশ, সাংবাদিক আইনের রক্ষক সবাই জানত কেশু একজন ঘাঘু অপরাধী। এবং মস্ত বড় গডফাদার। গত বছরগুলোতে তিনটে মস্ত বড় ব্যাঙ্ক ডাকাতি এই লোকের পরিকল্পনা মত হয়েছে। সব ধরনের মাদক আর জুয়ার ব্যবসা আড়াল থেকে এই লোক নিয়ন্ত্রন করে। তারপরও কেশুকে গ্রেফতার করার জন্য কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে কোন রকম প্রমাণ ছিল না।
আশ্চর্য রকমের গভীর জলের মাছ এই কেশু হাওলাদার।
ভাগ্যের ফেরে সোনায় সোহাগার মত তার পাশে জুটে গিয়েছিল শিবশঙ্কর চাকলাদারের মত ধুরন্ধর এক ক্রিমিনাল ল-ইয়ার। সারা জীবন আড়াল করে রেখেছে কেশু হাওলাদারকে।
পঞ্চান্ন বছর বয়সে কেশু ঠিক করল, এই লাইন থেকে সরে যাবে সে। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ না। চাইলেই কেউ এই লাইন থেকে সরে যেতে পারে না। বাচ্চাদের খেলা না এটা। পছন্দ হল খেললাম। ভাল লাগল না থুক্কু বলে খেলা ছেড়ে দিলাম।
যেই মাত্র সে অপরাধ লাইন ছেড়ে দেবে তক্ষুনি ভাড়াটে খুনি বা কাছের কোন বন্ধুর হাতে মারা পড়বে সে।
কাছের মানুষটা হয়ে যাবে দলের মাথা।
কিন্তু কেশু হাওলাদার তো বোকা না।
প্রথমেই সব টাকা ক্যাশ করল সে। চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে এলো নারায়ণগঞ্জে। প্রচুর টাকা দিয়ে বাড়ি কিনল একটা। কেউ জানতেই পারল না, কেশু কোথায় এসেছে ।
বিশ কোটি টাকা হাসি মুখে বিলিয়ে দিল প্রিয় সাগরেদদের মধ্যে। চাঁদা তোলা, ড্রাগ, আর জুয়ার আড্ডা সমান ভাগে ভাগ করে দিল দলের সবার মধ্যে।
প্রতিপক্ষ, যারা কেশুকে পছন্দ করতো না তাদের মধ্যেও বিলিয়ে দিল অনেক কিছু। ফলে কারও মনে কেশুর উপর কোন রকম রাগ, ক্ষোভ বিদ্বেষ রইল না এক চিমটি ও।
বাকি সব নগদ টাকা তুলে দেওয়া হল শিবশঙ্কর চাকলাদারের হাতে। শেয়ার ব্যবসা লাগানো হল সেই টাকা।
সেই রকমের মাখন মার্কা একটা আয়েশি জীবন পেয়ে গেল কেশু । ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও রকম চিন্তা নেই। নারায়ণগঞ্জের কিল্লারপুলের ওখানে এক একর জায়গার ওপর বিশাল বাগানবাড়ি মার্কা বাড়ি কিনে ফেলেছে। স্থানীয় অভিজাত সমাজে কেশু হাওলদারকে সবাই সম্মান করে। আক্ষরিক অর্থেই ভদ্রলোক সে।
দলের সর্দার থাকাকালীন সময়ে কেশু বিয়ে করে ফেলেছিল । মেয়েটার নাম - হেলেন। গহন ঘন কালো চুল , দারুণ রকমের চোস্ত একহারা ফিগার আর টানা টানা চোখ। বয়সের তুলনায় একটু বয়স্ক দেখায় - এই যা খুঁত।
হেলেন ভাল করেই জানত, কেশু কী করে। আয়ের উৎস কী। তারপরও কিশুকে সে বিয়ে করে। না, কেশুর টাকা বা ক্ষমতার জন্য নয়৷ হতভাগিনী বেচারি আসলে কেশুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।
অপরাধ জগৎ ছেড়ে দেওয়ার পর কেশু কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই ভদ্র জীবনযাপন করত। বেশিরভাগ সময় প্যারাডাইস ক্লাবে গিয়ে গলফ খেলত । তাস খেলত । ব্রিজ। কখনও বিলিয়ার্ড। মদ খেত সামান্য। খেয়াল রাখত যেন মাতাল হয়ে না যায়। মাতাল ব্যক্তি কিন্তু ভদ্রলোক হতে পারে না।
শহরের কেউ ভুলেও কল্পনা করতে পারত না - একশো ভাগ নিপাট ভদ্রলোক কেশু হাওলাদারের অতীত কী ছিল? অভিজাত সমাজে ভীষণ রকম জনপ্রিয় এই দম্পতি। সামাজিক অনুষ্ঠানে পিয়ানো বাজিয়ে হেলেন গান টান গায়। যদিও খানিকটা মোটা হয়ে গিয়েছিল হেলেন , তারপরও গলার স্বর দারুণ মিষ্টি । ভুলেও হেলেনের সাথে তরল রসিকতা করার চেষ্টা করে না কেউ। সম্মান করে সবাই। হেলেনের ব্যক্তিত্বই সেই রকম।
দিনের কিছু সময় কেশু একা থাকে। আলাদা আর একদম একা। যখন হেলেন কেনাকাটার জন্য শপিং মলে গিয়ে ঘোরাঘুরি করে অথবা বৃষ্টি দিনে কেশু যখন গলফ খেলতে যেতে পারে না । বা ক্লাবে যাবার মুড থাকে না। ঠিক সেই সময়গুলোতে মনে মনে কেশু গ্যাংস্টারদের সর্দার হয়ে যায় ।
তবে ফেলে আসা জীবনের জন্য মোটেও আফসোস করে না ।
সেইসব ভাগ্যবানদের একজন সে৷ যাঁরা অপরাধ ছেড়ে সুন্দরভাবে ভদ্র জীবনযাপন কাটাতে পারছে। সবাই পারে না। আরও বড় কথা, কোন রকম দাগ নেই কেশুর । ফুট প্রিন্ট নেই। পুলিশ লেগে নেই ওর পিছনে। অতীত জীবন নিয়ে কেউ ঘাঁটছে না । ডিবি অফিস বা ক্রাইম ব্রাঞ্চের আফিসে কোন ফাইল নেই ওর নামে।
সব মুছে রেখে এসেছে।
শিবশঙ্কর চাকলাদার মশাই বুদ্ধি করে কেশুর সব টাকা নানা জায়গায় খাটাচ্ছে।বেনামে। তিন মাস পর পর লাভের মোটা টাকা তুলে দিচ্ছে কেশুর হাতে। নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেয় কেশু ।
অবসর সময়ে বসে মাথা খাটায় সে। ভয়ঙ্কর সব ব্যাঙ্ক ডাকাতি, অপহরণ আর নিষিদ্ধ সব কাজের প্ল্যান পরিকল্পনা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টার মাথা ঘামায় । দাবা খেলার মত। প্ল্যান বানায়। সেখান থেকে খুঁত বের করে আবার নতুন করে পরিকল্পনা করে। শেষে ফাইনাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে গিয়ে আবিষ্কার করে একদম নিখুঁত ছক ছিল ওটা।
এভাবে একা একা অপরাধ নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে মনে মনে উত্তেজিত হয়ে যায় । আবিস্কার করে সময়টা দারুণ কাটছে । অবসর সময়ে অপরাধ নিয়ে ভাবতে ভালবাসে প্রাক্তন এই সর্দার। আবিষ্কার করে, মগজ আগের মতোই আছে। রেজরের মত ধার। এটা ওর মগজের ব্যায়াম। মন সতেজ থাকে। আনন্দ পায়।
গত কালই চিন্তা করে দেখতে পেলো, মাত্র পাঁচ জন লোক নিয়ে সিটি ব্যাংক ডাকাতি করে পুরো ব্যাংক খালি করে দিতে পারে সে। এবং ধরা পড়া কোনও চান্সই নেই।
আজ সকালে যখন হেলেন বাইরে গেল। তখন বসে বসে আবিষ্কার করল দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ীর একমাত্র আদরের মেয়েটাকে সহজেই অপহরণ করা যায়। এবং বেশ বড় অঙ্কের মুক্তিপণও আদায় করা যায়।
হেলেন মাঝে মাঝেই দেখে স্বামী একা- একা চুপচাপ বারান্দায় বসে কী যেন চিন্তা করে। অনেক সময় নিয়ে- ঘণ্টার পর ঘণ্টা। জিজ্ঞেস করে না কখনও। বেচারি কল্পনাও করতে পারে না , স্বামী মানে কী সব ভয়ঙ্কর চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
শিবশঙ্কর চাকলাদার যে সকালে আত্মহত্যা করল, সেই সকালে কেশু হাওলাদার প্যারাডাইস ক্লাবে গলফ খেলছিল। খেলার শেষে বারে বসে অতিরিক্ত লেবুর ফালি দেয়া ডাবল জিনের অর্ডার দিল। ভাল মতো গ্লাসে চুমুক দেওয়ার আগেই ওয়েটার এসে বলল, ‘স্যর আপনার একটা ফোন এসেছে। চিটাগাং থেকে।’
কেশু বুঝল কার ফোন। শিবশঙ্করের ফোন । কোন এক অদ্ভুত কারনে লোকটা ল্যান্ডলাইনে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে। ল্যান্ডলাইনের নাকি কম রেকর্ড থাকে ! মোবাইল সহজেই ট্রেস হয়।
উঠে গিয়ে ফোনটা ধরল কেশু । খুশিতে গুণগুণ করছে। শিবশঙ্করের ফোন মানেই টাকা পয়সা।
কিন্তু আবু বক্কর সিদ্দিকী ফোন করেছে , শিবশঙ্কর চাকলাদারের কেরানি । সালাম দিয়ে খবরটা জানাল।
‘নিজের মাথায় গুলি করেছে ?’ আবু বক্করের কথাটাই রিপিট করল কেশু। তলপেটের ভিতরটা কেমন খালি খালি লাগছে। ত্রিশ বছর ধরে চাকলাদার বাবুকে চেনে। ভালো করেই জানে সব। উকিল মশাই ঘাঘু উকিলই ছিল। ছিল শেয়ার বাজারের দুর্ধর্ষ দালাল। কিন্তু সেই সাথে আরও কিছু গুণ ছিল ভদ্রলোকের। মেয়েমানুষ আর জুয়া। এই দুইয়ের প্রতি বেশুমার টাকা ওড়াত চাকলাদার।
উকিলবাবু আত্মহত্যা করেছে ! ব্যাপারটাতে বোঝা যায় আর্থিক অবস্থার হাল এমন করেছিল যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।
হঠাৎ করেই কেশু হাওলাদারের মনে হল , কপালে ঠাণ্ডা ঘাম জমে গেছে।
নিজের ত্রিশ কোটি টাকার জন্য বুকটা হাহাকার করে উঠল। শিবশঙ্করের কাছেই ছিল টাকাগুলো।
পরের দু সপ্তাহের মধ্যে সব জানা গেল।
মোট ছয় মক্কেলের টাকা খেয়ে হজম করে ফেলেছে চাকলাদার বাবু । কেশু তাদের মধ্যে একজন। ওই ছয়জনের সাথে চাকলাদারের দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক ছিল। সবাই বিশ্বাস করত তাঁকে। মোটা অঙ্কের টাকা রেখেছিল সবাই চাকলাদার জিম্মায়। উকিল বাবু সেই টাকা সুদে খাটাত আর নানা শেয়ারে বিনিয়োগ করত।
সেই সাথে... চাকলাদার জুয়া খেলত। অনলাইনের জুয়া।
তার চেয়ে বড় কথা, ক্লায়েন্টের টাকা তুলে নিয়ে জুয়া খেলা শুরু করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে। হারছিল ক্রমাগত। নিজের বাড়ি ঘর পর্যন্ত বিক্রি করে জুয়া খেলেছে । এক সময় পৌঁছে যায় তলানি পর্যন্ত । বহু আগেই খেয়ে ফেলেছে কেশুর টাকা। জানে, কেশু তাকে জ্যান্ত রাখবে না। তাই কেশুকে কষ্ট না দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করল ক্রিমিনাল লইয়ার । পরিশ্রমের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল কেশুকে ।
নগ্ন সত্যটা হজম করতে বেশ সময় লাগল কেশুর ।
গত ত্রিশ বছর ধরে চাকলাদার বাবুর সাথে হাত দিয়ে চলেছে সে। এবং শেষ পর্যন্ত কেশুকে প্রায় রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গেছে শূয়রের বাচ্চাটা।
বাড়ি- হেলেনের গয়না, দুটো গাড়ি আর ব্যাঙ্কে রাখা সামান্য লাখ দশেক টাকা ছাড়া এই মুহূর্তে কিছু নেই কেশুর । বণ্ড, শেয়ার আর নগদ টাকা সবই ছিল শিবশঙ্করের কাছে। এবং এই মুহূর্তে সব গায়েব। শিবশঙ্করের গোপন সিন্দুক কোথায় সেটাই বা কে জানে !
চাকলাদারের অফিসে গিয়ে কেরানি আবু বক্করের মুখোমুখি বসেছিল কেশু । আবু বক্কর লোকটা তালগাছের মতো লম্বা। মাথাটা ইন্ডিয়ান বেগুনের মতো বড়। গোল গোল চোখ দুটো পাক্কা বাটপার চোখ।
শুকনো তোম্বা মুখে আবু বক্কর বলল , ‘স্যার ব্যাপারটা জন্য আমি আসলেই দুঃখিত। অফিসে আমরা পাশাপাশি থাকলেও কোনও ধারণাই ছিল না উনি কী করছেন । চেহারা দেখে কি আর মনের খবর জানা যায় ? আমাকে কিছুই জানতেন না। আপনার একার নয়। আরও অনেকের টাকা হজম করে আরও অনেককেই তিনি ফতুর বানিয়েছেন। জুয়া খেলে কেউ কি কখনও কোটি কোটি টাকা হারে ? মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বেচারার ।’
ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালো কেশু। জীবনে এই প্রথম তাঁর মনে হল , সে বুড়ো হয়ে গেছে।
শান্ত গলায় বলল, ‘ একটা উপদেশ দেই বক্কর মিয়া, সাংবাদিক বা পুলিশ ভুলেও যেন না জানে তোমার উকিলের কাছে আমার টাকা ছিল বা আমার টাকা খোয়া গেছে। যদি জানে তবে বুঝব তুমিই তাদের বলেছ। তখন নারায়ণগঞ্জ থেকে আবার ফিরে এসে এই অফিসেই তোমাকে খুন করব আমি।’
ক্লান্ত পায়ে চাকলাদারের অফিস থেকে বের হয়ে গেলো কেশু।
বাইরে গনগনে রোদ।
গাড়িতে উঠে ড্রাইভিং সিটে বসে রইল অনেকটা সময়। মুখে চোখে অন্ধকার দেখছে৷ টাকা পয়সা ছাড়া সামনের দিনগুলো কাটবে কি করে ? বাড়ি বিক্রি করতে হবে ? হেলেনকে সব জানাবে ?
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল হেলেন কিছু জানাবে না।
কিন্তু কী করবে ?
বাকি জীবনটা কাটাবে কী করে ?
নতুন একটা গাড়ির অর্ডার দিয়েছে গত সপ্তাহে । হেলেনকে নিয়ে ছুটি কাটাতে যাবে, কথা দিয়েছে। সামনেই হেলেনের জন্মদিন । ইউরোপে যাবার কথা ছিল । ওখানের একটা হোটেল বুকিং দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে কী করে হেলেনকে বলে ওর হাতে টাকা নেই ! ব্যাঙ্কে যা আছে বছর খানেক যাবে না হয়তো।
সিগারেট ধরিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করতে লাগল। ভাবছে। মাথা খাটাচ্ছে পুরোদমে। আচ্ছা খুব বেশি কি বয়স হয়ে গেছে ওর ? নতুন করে কিছু করা যায় না আবার ? কীভাবে ?
আর এই অল্প সময়ে কয়েক কোটি টাকা বানানো যায় কী ভাবে ? কোনও ঝামেলা আর ঝুঁকি ছাড়া !
ভাবছে কেশু।
সে যখন বাড়িতে ফিরল, হেলেন তখন বাইরে বেরুচ্ছিল শপিং করার জন্য। মুখ তুলে প্রশ্ন করল,
‘ভদ্রলোক আত্মহত্যা করলেন কেন?’
‘অতি চালাকের গলায় দড়ি ।’ বিষণ্ণ হেসে জবাব দিল কেশু । ‘ এইসব লোকদের শেষ পর্যন্ত এমন দশাই হয়।’
‘ দেনায় ডুবে গিয়েছিল ?’ দু চোখ বড় বড় করে বলল হেলেন । তাঁর কাছে চাকলাদার বাবু একজন জাদুকর। যেখানে হাত দেবে সেখান থেকে টাকা বানাবে। এই লোক নর্দমায় হাত দিলেও সেখান থেকে হীরা তুলে আনবে। এমন লোক ফতুর হয়ে যাবে ? ভাবতেও পারে না।
মাথা ঝাঁকাল কেশু । ‘একদম ফতুর।’
‘বেচারা।’ দুঃখী ভঙ্গিতে হাত নাড়ল হেলেন। ‘ আমাদের কাছে এলেই তো পারত। তুমি টাকা ধার দিতে পারতে। হয়ে যেত। বেচারা ।’
‘তুমি বেরোচ্ছ নাকি?’
‘হ্যাঁ । কিছু গয়নার অর্ডার দিয়েছিলাম। দেখি কতটুকু হল। সামনে স্বর্ণের ভরির দাম বাড়তে পারে। একটু বেশি অর্ডার দিয়ে রাখি।’
কথাটা প্রায় গলা পর্যন্ত চলে এসেছিল। তারপর নিজেকে সামলে নিল কেশু । শান্ত গলায় বলল, ‘আচ্ছা যাও।’
নিজেকে কামরায় এসে বসল।
হেলেনের ফিরতে কমপক্ষে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ পেল। চলে গেছে হেলেন । সিগারেট ধরিয়ে চিন্তা করতে লাগলো। কামরার ভেতরে ঘড়ির টিকটিক আর ওর ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া অন্য কোনও শব্দ নেই।
মাঝে একবার উঠে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাগানের মেরুন রঙের ঝকঝকে গোলাপগুলো দেখলো কয়েক মুহূর্ত। হেলেনের বাগান।
ফিরে এসে ডেস্কের ড্রয়ার থেকে পেট মোটা বাদামি কাগজের ফাইল বের করল। খবরের কাগজের কাটিং দিয়ে ভর্তি ফাইলটা।
দরজা খুলে বাইরে এলো একবার। রান্নাঘরে কাজের বুয়া মর্জিনার মা আর বাড়ির চাকর গোঁসাই কী যেন নিয়ে জমজমাট আড্ডা মারছে। বিষয়বস্তু খানিকটা আদিরসাত্নক । দুইজনেই বেশ রসে কষে আছে ।
ফিরে এসে ডেস্কের ড্রয়ার থেকে বাদামি রঙের ম্যানিলা ফাইল বের করলেন। হরেক খবরের কাগজ থেকে কাটিং কেটে ফাইলটা ভর্তি। সাথে ছোট্ট একটা নোট বই । তুলে নিল। এই ধরনের নোট বইতে ঠিকানা, ফোন নাম্বার এ সব লিখে রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়। জিনিসটা নতুন না। বেশ পুরানো।
কারও আসল নাম লেখা নেই। ফোন নাম্বারগুলোও উল্টা পাল্টা করে লেখা।
পৃষ্ঠা খুলে নজর ঘোরাতে লাগল। নাম্বারটা পেয়ে গেল , যেটা খুঁজছিল। ল্যান্ড নম্বর । ডায়াল করতেই অচেনা এক মহিলা বাজখাঁই গলায় জানতে চাইল , ‘কাকে চাই ?’
‘মানিক আছে ?’
‘ওহ। মানিক ভাইয়ের নাম্বার জানেন না আপনে ?মেলা দিন ধইরা তো এই নাম্বর আর ব্যবহার করেন না উনি। কাগজ কলম আছে ? লেখেন। ওনার নাম্বার দিতাচ্ছি।’
নতুন নাম্বার পাওয়া গেল। মোবাইল। ওপাশে রিঙ হচ্ছে। থমথমে মুখে বসে আছে কেশু। দুই চোখ ঠাণ্ডা।
আচমকা অন্য পাশে পুরুষ গলা বলে উঠল - ‘হ্যালো কে বলছেন ?’
‘মানিক বাবুকে পাওয়া যাবে ?’ সকৌতুকে বলল কেশু । ঠোঁটের কোণে হাসি জমে গেছে।
‘মানিক বলছি। আপনি কে?’
‘ তোমার গলার স্বর দেখছি একদম পাল্টে গেছে মানিক । আমি চিনতেই পারিনি। অবশ্যই সময়টাও কম না । সাত বছর পর তাই না?’
‘কে আপনি?’ ওপাশে কণ্ঠস্বর ধারালো হয়ে গেল।
‘কল্পনা করো।’ হাসল কেশু । ‘ অনেক দিন তাই না।’
‘ওস্তাদ আপনি ?’ চিৎকার করে উঠল মানিক । বিশ্বাস হচ্ছিল না ওর । ওস্তাদের সাথে কথা বলছে ? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যদি ওকে ফোন করতো তাহলেও এতটা চমকে যেত না।
টানা পনের বছর কেশুর ডান হাত হিসাবে কাজ করেছিল মানিক ।
জড়িত ছিল এক কুড়ি ডাকাতির সাথে । মূল পরিকল্পনা আর ছক করেছে কেশু । সেটা বাস্তবায়ন করেছে মানিক । অপরাধ জগতের লোকজন আর পুলিশের কাছে মানিক ছিল শীর্ষ কারিগরদের একজন। সবাই বলত-- মানিকের হাতে জাদু আছে। যে কোনও জটিল সিন্দুকের তালা নিমেষে খুলে ফেলতে পারে। ভিড়ের মধ্যে চোখ বন্ধ করে পকেট মারতে পারে। ডলার- টাকা- রুপির সব নোট একদম নিখুঁত ভাবে জাল করতে পারে । যে কোনও অ্যালার্ম বিকল করতে পারে। সব ধরনের গাড়ি চালাতে পারে। দৌড়াতে দৌড়াতে পনের গজ দূর থেকে পয়েন্ট থার্টি এইট অটোম্যাটিক পিস্তল দিয়ে খেলোয়াড়ের হাতের তাস ছিদ্র করে ফেলতে পারে।
এত কিছুর পরও লোকটার মাথা ছিল না। কেশু প্ল্যান করে দিলে নিখুঁতভাবে করতে পারত। কিন্তু নিজের মেধা বা যোগ্যতা কিছুই করতে পারত না। ধারালো বুদ্ধি, সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, কূটচাল এসব বিষয়গুলো মানিকের সাথে যায় না।
ব্যাপারটা বুঝতে পারে যখন কেশু অপরাধ জগৎ থেকে অবসর নেয়। নিজের মাথা থেকে সহজ একটা নীল নকশা বানিয়ে ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। ছয় বছর কাটায় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে।
পুলিশের সন্দেহ ছিল , আগেও বহু অপরাধ করেছে মানিক । কাজেই বেচারা উপর দিয়ে বেশ ভালোই ডলাই মলাই চলে জেলের ভেতর। থার্ড ডিগ্রি থেরাপি হতে নগ্ন করে গরম পাথর শরীরের উপর রেখে দেয়া । বিজলির শক । সব ।
জেল থেকে হতাশ আর বিধ্বস্ত অবস্থায় বের হয়ে আসে মানিক । তখন বয়স চলছিল ওর আটচল্লিশ। পথের ফকির বলতে যা বোঝায় তাই হয়েছিল মানিক অবস্থা। অপরাধ জগতে থাকাকালীন টাকা পয়সা ভালোই কামিয়েছিল কিন্তু দরাজ দিল আর সাগরের মত দানের হাত ছিল। হরিলুটে বাতাসের মতো দুই হাতে উড়াতো। যাকে তাকে টাকা ধার দিত। মদ জুয়া তো ছিলই।
জেলের বাইরে এসে আবিষ্কার করল সারা দুনিয়ায় সে একা। টাকা নেই । আক্ষরিক অর্থেই একটা অচল পয়সাও নেই । যাবার কোনও জায়গা নেই । পেশা নেই । বন্ধু নেই। কারও কাছ থেকে এক পয়সা পায়নি সে। এক পেয়ালা চা খাওয়ানি ওকে পুরানো অপরাধীরা।
একজনই ওকে বুকে টেনে নিল। মানিকের মা।
মানিকের মা-কে সবাই ডলি পিসি নামে চেনে । বয়স বাহাত্তর চলছে পিসির। চট্টগ্রাম শহরে অভিজাত এলাকায় দুটো ছিমছাম বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক দঙ্গল বুকে চাক্কু মারা সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা চালায়।
ছয় বছর পর ডলি পিসি নিজের ছেলেকে দেখে বড় রকম ধাক্কা খেল। সুদর্শন- পুরুষালি- লম্বা আর অভিজাত মার্কা চেহারা ছিল মানিকের । সিনেমার নায়কদের চেয়ে কোন অংশে কম না।
এখন ?
ছেলেকে দেখেই বুঝতে পারল ডলি পিসি- তাঁর ছেলে জীবনে আর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। খুব যত্ন করে নিজের পাশেই রাখতে হবে।যখন খোকা ছিল যেমন যত্ন করেছে, এখনও তাই করতে হবে।
তিন কামরার ছোট্ট একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট এনে রাখল মানিককে ।
দরদ মাখা গলায় বলল, ‘ বিশ্রাম নাও বাবা । কাজ করতে হবে না তোমার। আমি আছি না ?’
মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল মানিক ।
জানালার পাশের চেয়ারে সারাদিন বসে থাকত মানিক । দূরেই বন্দর। সারাক্ষণ চোখ মেলে দেখে। কিছুই করে না। শুধু বসে বসে দেখে। কত দূর দূর দেশ থেকে কত রকমের জাহাজ বন্দরে এসে ভিড়ে। আবার চলে যায়। ঠিক জীবনের সম্পর্কগুলির মতো না ?
নিজেকে প্রশ্ন করে- আগের মতো পুরনো পেশায় ফিরে যেতে পারবে ?
নিজেই আবিষ্কার করে, শরীরে রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেছে ওর। পুরনো পেশায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলেও ভয় পায়।
আঠারো মাস অলস বসে রইল মানিক । মনে মনে ওস্তাদের কথা ভেবেছে অনেকবার । কিন্তু ওস্তাদের কাছে হাত পাতার কথা একবারও ভাবেনি। যোগাযোগ ও ছিল না। উকিল চাকলাদার বাবুর কাছে গিয়ে ওস্তাদের নাম্বার জোগাড় করবে সেই বুদ্ধি ও মাথায় আসেনি। জেলের মার খেয়ে খেয়ে ওর মোটা ব্রেন আরও মোটা হয়ে গেছে।
ওর চোখে আজও কেশু হাওলাদার সুপারহিরো । মগজ বটে লোকটার । বাপরে !
দিনগুলি হয়তো এই ভাবেই যেত। কিন্তু যায় না তো।
হঠাৎ করে পুলিশের পুরানো বড় বড় কিছু কর্মকর্তা বদলি হয়ে যায়। যাদের প্রত্যেক সপ্তাহে মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে ডলি পিসি তাঁর মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা চালাত।
নতুন অফিসার এসেই শক্তভাবে মাঠে নামে।
শহরের সবগুলো পতিতালয় আর রেল লাইট এরিয়া বন্ধ করে দেয়। ডলি পিসির দুটো ও। পিসির সবগুলো মেয়েদের ধরে জেলে ঢোকানো হয়।
ডলি পিসির উপর দিয়ে বেশ ধকল গেল। লম্বা আর দীর্ঘ সময় তাঁকে থানা আর আদালতে দৌড়ঝাঁপ করতে হল। সব টাকা খরচ হয়ে গেল জলের মতো । শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হাসপাতালে গেল ডলি পিসি। প্যারালাইজড হয়ে পা অবশ হয়ে গেছে। হাঁটতে পারে না।
মায়ের বিপদে আরও দিশেহারা হয়ে গেল মানিক । কোনও উপার্জন নেই। তিন কামরার ফ্ল্যাট ছেড়ে, কয়েক ব্লক দূরে বন্দরের কাছাকাছি সস্তা- ময়লা এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়ে - পাগলের মতো চাকরি খুঁজতে লাগল। অবস্থা এতই খারাপ হল যে- হাতের ঘড়ি, দামি জুতা পর্যন্ত বিক্রি করে ফেলল।
পুরানো অপরাধীকে চাকরি দেবে কে?
কয়েক দিন না খেয়ে থেকে শেষে সস্তা ধরনের একটা ভাতের হোটেলে ওয়েটারের কাজ পেল মানিক । সারাজীবনে একটাই বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছে সে, পুরনো সোনালি দিনগুলোতে যে বাড়িতে ভাড়া থাকত সেই বাড়িওয়ালীর কাছে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে রাখল।
আশা ছিল কেউ যদি ওকে খোঁজে !
যদি !
এটাই হয়তো নিয়তি।
আর সেই জন্যই মানিককে খুঁজে পেয়েছে ওস্তাদ ।
নিজের কানের উপর ভরসা হারিয়ে ফেলল।
আবারও চিৎকার করে উঠল - ‘ ওস্তাদ, বিশ্বাস করুন আপনার গলা আবার শুনতে পারব জীবনেও ভাবিনি । কিন্তু আপনার কথা রোজ ভেবেছি।’
ফোনের স্পিকারে কেশুর হাসি শোনা গেল। ‘ কেমন আছো তুমি মানিক ? সব ঠিকঠাক চলছে তো ?’
চোখ ফিরিয়ে ভাতের হোটেলটা দেখল মানিক।
সরু এক চিলতে জায়গা। বাইরে বেতের ঝুড়ি ভর্তি ভাত আর অ্যালুমিনিয়ামের গামলা ভর্তি তরকারি রাখা। ময়লা মেঝে। দেওয়ালে পানের পিক আর তরকারির ঝোলের দাগ।
প্রত্যেকটা টেবিল তেলতেলে । জানালার কাচ এত ময়লা যেন বাইরে কুয়াশা জমেছে। কয়েকটা টেবিলে এঁটো বাসনপত্র। নীলচে মাছি উড়ছে ভনভন করে । টেবিলগুলো ওকেই পরিষ্কার করতে হবে। ময়লা বেসিনের উপরে ভাঙ্গা আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে পেল- মোটা বেঁটে একটা লোক। মুখটা ঘামে থই থই করছে। মোটা গোঁফ। মোটা ভুরুর নীচে এক জোড়া ভীতু চোখ।
ক্যাশিয়ারের সামনে থলথলে ভুড়ি নিয়ে মহাজন বসে বসে পিঠের ঘামাচি গালছে । সতর্ক চোখে ওকেই দেখছিল লোকটা।
‘জমজমাট আছি ওস্তাদ।’ মিথ্যা কথা বলল মানিক । সিদ্ধান্ত নিল, নিজের করুণ অবস্থার কথা ভুলেও উস্তাদকে জানাবে না । ব্যর্থ লোকদের পছন্দ করে না কেশু । গলায় আনন্দের ভাব এনে বললো, ‘ নিজের ছোটখাটো একটা ব্যবসা চালাচ্ছি। ভাতের হোটেল। ফাটাফাটি চলছে।’
চেষ্টা করল ওর কথা যেন মহাজন লোকটা শুনতে না পায়।
‘শুনে ভাল লাগল মানিক ।’ খুশি মাখা গলায় বলল কেশু। ‘ আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। অবশ্যই যদি তোমার আগ্রহ থাকে আর কি। বেশ বড় অঙ্কের ব্যাপার। একদম পাটি গণিত বুঝলে ? আমি যদি বলি মোটা টাকা তবে টাকাটা মোটাই হবে। তুমি যদি ভাগে পঞ্চাশ লাখ টাকা পাও ? কেমন লাগবে?’
শরীর ঘেমে গেলো মানিকের ।
‘ লাইনটা ঠিক ক্লিয়ার না ওস্তাদ । কী বললেন বুঝতে পারিনি।’ ঢোঁক গিলে বলল মানিক ।
‘ পঞ্চাশ… লাখ … টাকা।’ ধীরে ধীরে প্রলম্বিত সুরে সময় নিয়ে বলল কেশু। ‘তোমার ভাগ।’
চোখ বন্ধ করলো মানিক ।
কল্পনায় দেখতে পেল থানার ছোট্ট অন্ধকার কামরাটা। নাকের সর্দি আর কফ থু- থু মাখা নোংরা দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসে আছে ও ৷
হাসি হাসি মুখে ওর সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে চার জন গাট্টা গোটটা কালো ধুমসো পুলিশ। হাতে চামড়ার বেল্ট। পুলিশের মারের কথা মনে হতেই সারা শরীর থর থর করে কেঁপে উঠল।
‘লাইনে আছো ?’ কেশুর কণ্ঠ শোনা গেল । খানিক বোধ হয় ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে।
‘আছি ওস্তাদ। কাজটা কী?’
‘ ফোনে এত কথা বলা যাবে না। বাসায় এসো । সামনে বসে কথা বলব। নারায়ণগঞ্জে থাকি আমি। কবে আসতে পারবে ?’
নিজের জামা কাপড়গুলো দেখলো মানিক । ময়লা।ইস্তি করা হয়নি অনেকগুলো মাস। কুঁচকে আছে। অমন জামা কাপড় পরে ওস্তাদের সামনে গেলে মান ইজ্জত আর থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা নারায়ণগঞ্জ যাবার ভাড়াও নেই। চাইলে ওর মহাজন ছুটি দেবে না। শুক্রবার সহ সপ্তাহে সাত দিনেই কাজ করে।
কিন্তু পঞ্চাশ লাখ টাকা !
ওস্তাদ কখনও ফাউ কথা বলে না । মিথ্যা তো না- ই। যাই ঘটুক না কেন , প্রজেক্ট সফল হোক বা না হোক পঞ্চাশ লাখ টাকা ওর ভাগে আসবেই - এই ব্যাপারে একশো ভাগ নিশ্চিত সে।
‘ শনিবার আসি ওস্তাদ ? ব্যবসা নিয়ে একটু বিজি আছি।’ তারপরও নিজের ভাবটা ধরে রাখতে চাইল সে ।
‘ আজ কী বার ? মঙ্গলবার । শনিবার তো অনেক দূর। ব্যাপারটা আর্জেন্ট। বৃহস্পতিবার কেমন হয় ?’
‘ পারব ওস্তাদ।’ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল মানিক ।
‘ এক্সপ্রেস ট্রেন আছে না ? চিটাগাং টু নারায়ণগঞ্জ। চলে এসো। স্টেশনে নেমেই ফোন দেবে । আমি স্টেশন থেকে তোমাকে তুলে নেব।’
সস্তা বাটন ফোনটার সুইচ কেটে দিয়ে ঘামে ভেজা ময়লা প্যান্টের পকেটের ভিতর রেখে দিল মানিক । ওস্তাদের সাথে কাজ করার সুযোগ হারাতে চায় না সে।
ঘাম- মশলা আর মাছ ভাঁজার তীব্র গন্ধে বাস্তবে ফিরে এলো।
তুড়ি মেরে মহাজন বারেক মিয়া ডাকল ওকে। ‘ কাম ফালাইয়া মোবাইল কার লগে পীরিত মারাও মানিক সাহেব ?’
‘আরে নাহ।’ ময়লা এপ্রনে হাত মুছতে মুছতে বেহায়ার মতো হাসল মানিক । ‘ এক মাতাল ফোন দিয়েছিল। চিনি লোকটাকে। অনেক আগের পরিচয়। তাই ফোন কাটতে পারিনি। ফোনই ধরতাম না। অচেনা নাম্বারে ফোন দিয়েছিল। ব্যাটা একটা উল্লুক ।’
‘হুম। তোমার দোস্ত তোমার লাহানই তো হইব।কাউয়া কাউয়ার লগে উড়ে। কইতর উড়ে কইতরের লগে । ’ বিরক্ত প্রকাশ করলো বারেক মিয়া। ‘যাও কাম করো। খাম্বার লাহান খারাইয়া থাইকো না।’
কিচেনে গিয়ে কাচের গ্লাসগুলি মাজতে লাগল মানিক । সারাটা দিন খুব একঘেয়ে কাটল। মাথার ভিতর ‘পঞ্চাশ লাখ’ শব্দটা ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার।
পঞ্চাশ লাখ !
বিকেল চারটায় ছুটি পেয়ে মানিক ফিরে এল নিজে নিরানন্দ বিবর্ণ বাড়িতে।
উঁচু ভলিউমে রেডিও ছেড়ে দিয়ে স্নান করে দাড়ি কামাল । মোড়ের লন্ড্রি দোকানে ওর সবচেয়ে ভাল জামা আর প্যান্টটা জমা দিল। ভাল করে কেচে ইস্ত্রি করে দেবে ওরা । অন্য একজোড়া শার্ট প্যান্ট পরে বাইরে বের হল।
মায়ের সাথে দেখা করতে হবে।
ঠাসাঠাসি করা বাসটা ওকে নামিয়ে দিল হাসপাতালের সামনে । ফুটপাত থেকে মায়ের জন্য আঙুর কিনে নিল সামান্য। বুড়ি আঙুর পছন্দ করে।
ফিনাইলের কুৎসিত ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে হাসপাতালে লম্বা করিডোর পার হয়ে শেষ মাথায় নিঃসঙ্গ একটা রুমে গেল মানিক । ওখানে বিছানার ওপর শুয়ে আছে অসুস্থ এবং প্রায় যম দুয়ারে পৌঁছে যাওয়া বুড়ি মা- ডলি পিসি।
যতবার মা -কে দেখে ততবার ভেতর ভেতর কেঁপে উঠে মানিক ।
মায়ের মুখটা পুরনো আইভরির মতো হলুদ হয়ে গেছে ।যন্ত্রণা বেচারির মুখ আর চোখের কোণে দাগ ফেলে গেছে। বিছানার পাশে শূন্য চেয়ারে বসে মায়ের শীর্ণ হাতটা ধরল মানিক । গত সপ্তাহে মা ওকে কথা দিয়েছে। শরীর ভালো হলে সে আবার দেনদরবার করবে। সংসদ সদস্য আর বদলি হয়ে আসা নতুন পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলে নিয়মিত মাসোহারা এবং এক কালীন টাকা দিয়ে তাঁদের ম্যানেজ করে আবার ব্যবসা চালু করবে।
এখনও আশার জ্বলজ্বল করে ওঠে ডলি পিসির দুচোখ।
কিন্তু মানিক বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে । কেন যেন মনে হয় ওর মা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। এই হাসপাতাল থেকে বের হলেও বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে না বাকি জীবন।
ওস্তাদের ফোনের ব্যাপারটা মা-কে জানাল সে।
‘পুরো ব্যাপারটা আসলে কি ঠিক জানি না।’ সত্য কথাই বলল মানিক । ‘কিন্তু ওস্তাদকে তো তুমি চেনো। আমাকে ভুল পথে গাইড করেনি তিনি। কখনই না।’
ধীরে ধীরে লম্বা করে শ্বাস নিলো ডলি পিসি।
সারা শরীরে ব্যথা চিনচিন করে ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন কিছু না। সারাক্ষণ ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছে সে। কেশুকে খুব সম্মান করে বুড়ি। কয়েকবার এসেছিল ওর বাড়িতে । সবচেয়ে সুন্দরী আর দুর্দান্ত মেয়েটাকে নিয়ে বেশ ডলাই মলাই করে কাহিল করে ফেলত । পরে হাফ বোতল স্কচ মেয়েটাকে সাথে গিলত ৷ যাবার আগে মোটা বকশিস দিয়ে দিয়ে যেত সুন্দরীটাকে।
বাপের ব্যাটা এই কেশু। বিচক্ষণ- ধূর্ত এবং অনেক বেশি করিৎকর্মা। এত অল্প সময়ে আর কোনো অপরাধী এত টাকা আর নাম কমাতে পারেনি। আর কি সুন্দর কায়দা করে সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে শান্ত ভদ্রলোকের জীবন বেছে নিয়েছে !
এখন সেই লোক তাঁর ছেলেকে চাইছে !
‘ যাও বাবা ।’ ডলি পিসি বলল নরম গলায়। ‘ তোমার ওস্তাদের সাথে দেখা করো। উনি কখনও ভুল করেন না। মনে রেখো পঞ্চাশ লক্ষ টাকা । কোনও কোনও মানুষ সারা জীবনেও এই টাকাটা চোখে দেখে না।’
‘হ্যাঁ ,মা।’ মাথা ঝাঁকাল মানিক । ‘ ওস্তাদ কখনও ভুল করেন না। পঞ্চাশ লাখ টাকার কথা বলেছেন তার মানে পঞ্চাশ লাখই দেবেন। কিন্তু মা আমি এই অবস্থা ওনার সামনে যেতে পারব না। এমন কি ভাড়ার টাকাও নেই আমার কাছে। আমি... আমি মিথ্যে বলেছি। বলেছি, আমার নিজের হোটেল ব্যবসা আছে। আমাদের করুণ অবস্থার কথা ওস্তাদকে বলতে পারিনি মা।’
বুড়ি হাসল। মায়ের হাসি। ‘ আমার কাছে টাকা আছে বাবা । তুমি একদম ফিটফাট হয়েই ওখানে যাবে।’
বিছানা পাশে ছোট্ট একটা লকার । হাত বাড়িয়ে লকারের ভেতর থেকে কুমিরের চামড়ার কালো একটা ব্যাগ তুলে নিলো ডলি পিসি। ভেতর থেকে একটা মোটা খাম বের করে তুলে দিল মানিক হাতে।
‘এই টাকা তোমার । খরচ কর বাবা। ভাল জামাকাপড় কিনে নাও। দামি একটা টাই লাগাবে গলায়। আমার ছেলেকে টাই পরলে বেশ লাগে। স্যুট কিনবে সুন্দর দেখে। পাতলা একটা ব্রিফকেস নিয়ে যাবে। তোমার ওস্তাদ স্টাইল পছন্দ করে।’
খাম খুলে ভেতরটা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল মানিক । এক হাজার টাকার নোট। পঞ্চাশটা।
‘টাকা কোথায় পেলে মা?’
‘অনেক দিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিলাম বাবা। আমার ইমার্জেন্সি মানি। এখন তোমার। খুব সাবধানে খরচ করে টাকাগুলো।’
‘কিন্তু মা টাকাগুলো তোমার বেশি দরকার৷ ওষুধ, হাসপাতালের বিল...।’তখনও সম্মোহিতের মত টাকাগুলোর দিকে চেয়ে আছে ।
নড়ে চড়ে শোয়ার চেষ্টা করল ডলি পিসি। ব্যাথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে কপালে। ‘ আরে বোকা ছেলে তুমি লাখ লাখ টাকা বানাতে যাচ্ছ। বাকি জীবন চলে যাবে আমাদের। যাও কেশুর সাথে কথা বলো। টাকাটা নাও।’
টাকা নিয়ে মানিক ফিরে এল বারেক মিয়ার ভাতের হোটেলে।
সাফ জানিয়ে দিলো কাজ ছেড়ে দিচ্ছে। বারেক মিয়া চেহারাটা ভাতের ডেকচির তলার মত কালো করে বসে রইল । বিড়বিড় করে বলল, ভাত ছিটাইলে কাউয়ার অভাব হয় নি ? কামের মানুষের অভাব আছে নাকি দুইন্নায় ? এক ফুন দিলে লাইন ধরব আমার দুকানে।
বুধবার কেনাকাটা করল মানিক । নিজের কামরায় ফিরে সদ্য কেনা বাছুরের চামড়ার স্যুটকেসে নতুন কেনা স্যুট আর জামা প্যান্ট সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখল ।
দীর্ঘ দিন পর দামি সেলুন থেকে চুল কেটেছে। বাসার বাথরুমে অনেক সময় নিয়ে দাঁড়ি গোঁপ কামালো। নতুন কেনা জুতা আবার পালিশ করলো।
শেষ মেষ পরিপাটি হয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই খুশি হয়ে গেল। চেহারার মধ্যে বেশ একটা চেকনাই দেখা যাচ্ছে।
আজও এক পোঁটলা আঙুর কিনে হাসপাতালে চলে এলো মানিক । তরুণী নার্স জানালো, আজকে ডলি পিসির সাথে দেখা করতে পারবে না সে।
‘খুব খারাপ নাকি মায়ের অবস্থা ?’ ভয় পেয়ে গেল মানিক ।
‘আরে না । আসলে ব্যথা অনেক বেড়ে গেছে।’ নিজের ইউনিফর্মটা টেনে
টুনে ঠিক করতে করতে বলল রোগা মতো নার্সটা। ? আপনি কালকে উনার সাথে দেখা করতে পারবেন।’
ছন্নছাড়ার মতো হাঁটতে হাঁটতে বের হল মানিক । রাস্তায় বেরিয়ে আবিষ্কার করল এখনও হাতে আঙুরের পোঁটলা ধরে রেখেছে।
ফুটপাথের কোণায় শুয়ে থাকা এক ফকিন্নির হাতে তুলে দিল আঙুরের পোঁটলাটা ।
ফিরে এল নিজের বিবর্ণ ধূসর কামরাতে।
বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নামা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে রইল চিত হয়ে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করল। কিন্তু ভুলে গেছে কী ভাবে প্রার্থনা করতে হয়।
জীবনেও কখনও প্রার্থনা করেনি। বারবার ফিসফিস করে বলতে লাগল , ‘ভগবান মায়ের দিকে খেয়াল রেখো ৷ মায়ের পাশে থেকো তুমি। মা-কে আমার খুব দরকার।’
পাশের বাসায় কারা যেন বিকট শব্দে গান বাজাচ্ছে।
রাত আটটার দিকে হাসপাতালে ফোন দিলে একবার। রিসিপশনের এক মহিলা ফোন ধরে বলল, ডলি পিসি এখনও ঘুমাচ্ছে। ব্যথা কমেনি। না, কোনও ডাক্তারের সাথে কথা বলা যাবে না।
ফোন কেটে বাইরে হাঁটতে বের হল সে। মাঝারি মাপের কম দামি একটা বারে বসে পরপর দুই বোতল দেশী মদ শেষ করে যখন বাড়ি ফিরল, তখন পুরোদস্তুর বেহেড মাতাল সে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন