১
তখন শীতের শুরুতে কবিতা সন্ধ্যা বা কবিতা পাঠের আসর হত আমাদের শহরে।
প্রতি বছর।
কারো বাসায়। বা পৌরসভার সস্তা কোন মিলনায়তনে।
তেমন কিছু না। একগাদা তরুণ ছোকরা, মাঝবয়েসী লোক পাঞ্জাবি পায়জামা পরে তোম্বা মুখে বসে থাকত। পালা করে একজন- একজন দাঁড়িয়ে নিজের লেখা কবিতা পড়ে শোনাত, সবাইকে।
বেচারার পড়া শেষ হতেই একযোগে সবাই তার সমালোচনা শুরু করত।
সমালোচনা আসলে কিছুই না। কেউ বলত- গত কুড়ি বছরে এমন কবিতা সে পড়েনি। কেউ বলত-কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব বেশি। এজরা পাউনড বা অমুকের ছায়া বিদ্যমান । ফালতু কবিতা। হেন তেন।
বেশির ভাগ সময় বিচ্ছিরি একটা ঝগড়ার মধ্যে দিয়ে এই কবিতা পাঠের আসর শেষ হত। অনেক দিন মুখ দেখা দেখি বন্ধ হয়ে যেত কবিদের মধ্যে।আবার কোন চায়ের নিমন্ত্রনে কখনো কখনো মিল ঝুল হত। কখনো বা হত না।
এমন এক কবিতার আসরে গিয়ে কবিকে আমি পেয়েছিলাম…।
বন্ধু বিপিন কবিতা লিখত,বা লেখার চেষ্টা করত। কী লিখত কে বলবে!
শীত গরম সব সময় টইটই করে ঘুরে বেড়াত। পায়ে চপ্পল। কাধে চটের ইয়া বড় এক ব্যাগ। ব্যাগটা ওর হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে থাকে। হাতে মোটা একটা ডায়েরী । ডায়েরীর অবস্তা ছ্যাঁতরা ব্যাতরা । সুয়োগ পেলেই ও নিজের লেখা কবিতা পড়তে শুরু করত।
সুযোগ পেলেই হল। কারো জন্মদিন হোক বা কুলখানি হোক কবিতা পড়বেই। বেশির ভাগ কবিতার আগা মাথা বুঝতে পারতাম না। উপমাগুলোও কেমন যেন। বেদনার বালুচর, নিঃসঙ্গ তেপান্তর, লিলুয়া বাতাস, নীল বেদনা,ধূসর কষ্ট,হলুদ ভালবাসা ।হেন তেন । হাবিজাবি।
বেশির ভাগ কবিতায় একটা মেয়েমানুষের কথা বারবার আসে। বুঝা যায় মেয়েটা বিপিনকে মোটেও পাত্তা দেয় না। অথবা বিয়ে হয়ে গেছে তার, আজব তো…। অথচ অমন তো হবার কথা না।
তবে সব সময় কবিতা লিখতে পারে না বিপিন। ভাব না উঠলে নাকি কবিতা লেখা যায় না। আর ভাবও সব সময় উঠে না।বিশেষ করে বাড়িতে তো না-ই ।
বিপিনদের বাড়ির অবস্থা কেরসিন। একগাদা মানুষ। মনে হয় কলকাতার মেসবাড়ী, বনমালী লস্কর লেন।
সারাক্ষণ লোকজন আসছে যাচ্ছে। দিনে রাত্রে, যে কোন সময় কেউ না কেউ ভাত খেতে বসেছে। উচ্ছে ভাজা,পটল ভাঁজা,ডাটা শাক, মুলো, কাঁঠাল দানার চড়চড়ি,লাউ,ঝিঙ্গে আর এক বালতি হলুদ গরম জল , -যা কিনা ওরা ডাল হিসাবে চালাত।
ওরা সপ্তাহে একদিন মাছ খেত। বছরে একদিন মাংস। কালী পুজোর সময়। তাও আবার পাঁঠার মাংস। বছরে মাত্র একদিন মাংস !
ভাবা যায় ?
বিপিনদের বাড়িতে অবশ্য কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে তরকারি রান্না করা হত। বেশি করে মশলা দিয়ে কাঁচা কাঁঠাল রান্না করলে সেটার স্বাদ যে পাঁঠার মাংসের মত হয় কে না জানে।সেই জন্যই তো কাঁঠালকে গাছ পাঠা বলে।
তো, বাড়িতে থাকলে বিপিন কবিতা লিখতে পারত না। মুড আসত না নাকি।অথচ আগারে বাগারে যে কোন জায়গাতে বসে ওর মাথায় কবিতা চলে আসত।
চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়ার সময়। কাত্তিক মাসের বিকালে রেল লাইনের উপর দিয়ে হাঁটার সময়। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরার সময়। এমন কি বটু হাওলাদারের পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সুপুরি চিবোতে গিয়েও ওর মাথায় কবিতা চলে আসত।
কবিতা নাকি মেঘের দেশের পরীর মত। যখন তখন চলে আসে…। কবিতা মাথার মধ্যে এলেই শুধু হয় না। ওটাকে আদর করে বসতে দিতে হয়।তারপর লিখে ফেলতে হত।মানে ঠিক মত বসা হলে।
বিপিনের ডায়েরির অবস্থা ও খারাপ। একটা কবিতা যে কতবার কাটা ছেঁড়া করা হয় একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। দেখলে হঠাৎ করে লিওনাদো দা ভিঞ্চির নোটবই মনে হতে পারে। তিব্বতের গুম্ফায় লুকিয়ে রাখা কোন পুঁথি ও হতে পারে ।
তবে এত গণ্ডায় গণ্ডায় কবিতা লেখার পরও বিপিনের কবিতা কোথাও ছাপা হত না। ব্যাপারটা বেশ দুঃখজনক। নানা জায়গাতে পাঠাত। নানান পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। তারপরও লাভের বেলায় ঘণ্টা। অল প্রফিট ইজ বেল।
তাতে মোটেও দমে যেত না বিপিন। ওর কথা অনুসারে একজন কবিকে মোটামুটি ভুগতে হয়।না ভুগলে কবি হওয়া যায় না।
যারা বড় বড় কবি তারা নাকি অনেক ভোগে। নজরুল সারা জীবন ভুগেছে,জীবন বাবু সারা জীবন ভুগেছেন। বিদেশের অনেক কবি নাকি দিনের পর দিন শুধু মেরুন রঙা আপেল আর বাদামি রুটি খেয়ে দিন কাটাত।
তো একদিন বিপিন বলল- ‘যাবি নাকি কবিতা সন্ধ্যায় ?’
আমার ইচ্ছা ছিল না। মানুষজনের ভিড় ভাল লাগে না। আর এইসব তো মানুষ না। কবি। আরেক ঝামেলা। শেষে কী মনে করে রাজী হলাম…।
কবিতা সন্ধ্যা হবে ফকিরাপুলের ওখানে কোন এক বাড়িতে।
কোন এক মুরুব্বি কবির বাসায়। তার আয়োজনে।গেলাম।
পুরানো দিনের বাড়ি। দেয়ালের সিমেনট খাবলা খাবলা উঠে গেছে। শেষ কবে চুন করা হয়েছিল সেটা দারোগা ইমান আলী চুনুরিও বলতে পারবে না। জানালার গরাদগুলো ক্ষয় হতে হতে সরু হয়ে গেছে।জানালার পাল্লা থেকে সর্ষের দানার মত মিহি গোল গোল দানাদার কী যেন ঝরে পড়ছে মাঝে মাঝেই।
জানালা আর দরজায় পর্দা ঝুলছে। সেগুলোর আদি রঙ কী ছিল বলতে পারলে কান কেটে ফেলব।
তবে মুরুব্বি কবি মানুষ ভাল। সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা পরনের। এই গরমেও বাসী পুরানো ঘি- রঙের চাদর কাঁধে ফেলে রেখেছেন।মুখ ভর্তি শণ পাপরির মত দাড়ি গোঁফ। সারাক্ষণই হাসছেন। এই প্রথম কোন কবি পেলাম যিনি হাসেন।
নিমন্ত্রিত কবির সংখ্যা পনের জন।
আমি বাদে।
একেক জন কবি দেখতে একেক রকম। কেউ ভীষণ রকম মোটা। ঘাড়ে গর্দানে ঠাসা। মনে হয় বাস্তব জীবনে কসাই। কেউ রোগা । এত রোগা যেন জন্মের পর থেকে কিছু খায়নি। কারো মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। যেন ক্ষৌর কর্ম না করে টাকা বাঁচাচ্ছে- সেই টাকায় নিজের বই বের করবেন। কেউ টাক মাথা।লাইটের আলোতে টাক চকচক করছে প্লাটিনামের মত।
মোটা মত একজন মহিলা কবি দেখলাম। সারাক্ষণ পাশের জনের সাথে ঝগড়া করছেন।
সবাইকে লাল চা আর গোলাপি রঙের নোনতা বিস্কুট দেয়া হল।
খালি পেটে আসলে কবিতা ফবিতা হয় না। সবাই চুক চুক করে লাল চা আর বাসি নোনতা বিস্কুট শেষ করলাম।তারপর শুরু হল কবিতা পাঠের আসর। তেমন কিছু না আসলে। একজন একজন করে দাঁড়াচ্ছে আর নিজের লেখা কবিতা পড়ে যাচ্ছে। এত মধ্যে একজনের কবিতা মাত্র বাইশ পাতার!
মাবুদে এলাহি।
বেশির ভাগ কবিতার কোন ছাতা মাথা নেই। ফালতু আজগুবি শব্দে ভর্তি। যেমন- পকেট ভর্তি ভালবাসা,বুকের পাজরে রেললাইনের কুউউ, আমলকী রঙের বসন্ত,ভালবাসার খামার।
মোদ্দা কথা যে যা খুশি লিখে এনেছে। তাই কবিতা বলে চালিয়ে দিচ্ছে।বেশির ভাগ কবিই ফালতু কতগুলো লাইন এলোমেলো করে সাজিয়ে রেখেছে।
একজন একটা কবিতা বলা শেষ করা মাত্র সবাই তার সমালোচনা শুরু করে। সমালোচনার নামে বেচারাকে নানান কায়দা করে অপদস্ত করে আর কী ।
যে যত ভালই লিখুক ভাল বলা যাবে না। কবিতা পাঠের আসরে বোধহয় এটাই নিয়ম।
আর সমালোচনাগুলো ও মোটামুটি একঘেয়ে। যেমন- কবি দুরমুজ আলী আশি দশকের কবি। উনার কবিতায় একই সাথে রয়েছে প্রেম আর দ্রোহ। তিনি যৌবনের পূজারি। তার বাক্য বিন্যাস ভাবগম্ভীর অথচ অর্থপূর্ণ। বাক্য ব্যবহার সংযত ও সীমিত। উপমায় নতুণত্ব নেই। লোরকা গারসিয়া আর এজরা পাউনডের কবিতার সাথে অনেক মিল রয়ে গেছে।কবি দুরমুজ আলী নিরন্তন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন আশা করি।
হেন তেন…।
একটা জিনিস বুঝতে পারলাম তখনই, কবিদের পেট ভর্তি হিংসা। কেউ কাউকে পছন্দ করে না। একজন আরেক জনের পিছে লেগে আছে খামখাই। হয়ত মনে মনে ভাবে- বাকি সব কবি যদি মারা যেত তবে সে একাই বড় কবি হয়ে যেত। পুলজারিৎ পুরস্কার ফিলিপ পুরস্কার সব পেত।নিদেন পক্ষে জাতীয় কবি নিশ্চিত হত।
সব কবি চা বিস্কুট খেল আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করল।
এতগুলো কবির মধ্যে একজন আমার বেশ নজর কাড়ল। রোগা মত। লম্বা। ঢোলা গুড়ের রঙের প্যান্ট আর লম্বা ঝুলঝুলে পাঞ্জাবী পরনের।চোখ দুটিতে রাজ্যের বিষাদ। যেন মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে গেছে বেচারার। কথা তেমন বলেন না। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা।ভালই মানিয়েছে।
এই বিষাদমাখা কবিই দলের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ। উনার কবিতাগুলো বেশ পিচ্চি পিচ্চি।
অন্য কবিদের মত বিশাল আকারের কবিতা সঙ্গে করে আনেননি উনি।
একটা কবিতা—–
মেয়েটার চোখের জল।
বোকা আমি ভাবতাম
হয়ত সেটা কাজল।।
প্রত্যেকটা কবিতাই এই রকম। মোট ছয়টা কবিতা পড়লেন। তেমন হাততালি কেউ দিল না ।বরং তার কবিতায় ব্যবহার করা ভাষা আর উপমা নিয়ে সবাই বেশ কচলে দিল তাকে।যেমন করে রাস্তার শরবতওয়ালারা লেবু কচলায়।
একজন বলল- কলকাতার কোন এক কবি নাকি এই রকম কবিতা লেখে।
মানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চোর বলল আর কি।
আরেকজন বলল- ঘাই হরিণীর ডাক শব্দটা জীবনানন্দ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ এই কবি জীবন বাবুর ভাবধারায় আছন্ন।ছন্দেও নাকি গরমিল আছে বেশ।
মোট কথা সব মিলিয়ে বেশ কেলেঙ্কারি কাণ্ড। উহ। মানুষগুলো পারেও। এই জন্যই কবি আর কাকের সংখ্যা সমান আমাদের দেশে।
কবিতা সন্ধ্যা শেষ করে যখন বাইরে চলে এলাম বাইরে তখন ময়ূরকনঠী রাত। অচেনা শহর। হলুদ সোডিয়ামের আলোতে মনে হয় অসুখে ভুগছে শহরটা। দাঁতাল শূয়রের মত হুস হাস করে দৌড়ে যাচ্ছে দানব ট্রাক। টুং টাং করে ঘনটা বাজিয়ে যাচ্ছে রিক্সা।
বাস ভর্তি পাকা ফলের মত লটকে আছে মানুষ।
পিচ্চি সাগরেদ থাপড় দিচ্ছে বাসে গায়ে। বলছে -ওস্তাদ থামেন বামে। অন্ধ ফকির ভিক্ষা করছে।হাতে ধরা টিনের থালা ।সেটা আবার গেছে মরচে। ট্রাফিক পুলিসটা মাইকেল জ্যাকসনের মত নেচে নেচে ভিড় বাট্টা কমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে জগা খিচুড়ি।
ভাগ্য ভাল আমার সাথে ভন্ধু বিপিন ছিল। সাথে বিষণ্ণ কবি।অচেনা শহরে ভয় থাকে না। যদি পাশে পুরানো বন্ধু আর কোন বিষণ্ণ কবি থাকে।
বাইরে গরম।
একটা শরবতওয়ালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাঠের কেমন একটা ঠেলা গাড়ি নিয়ে লোকটা দাঁড়িয়ে। তার বিচিত্র ঠেলা গাড়ি ভর্তি হরেক পদের বোতল। সেই বোতল ভর্তি রঙ বেরঙের তরল।
আমাদের দেখা মাত্র লোকটা বিশাল এক টুকরো বরফ , যেটা কিনা মিনি আইসবার্গের মত - সেটা ভেজা তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঠের তক্তার উপর ঘষা শুরু করল।তক্তার উপর ধারলো লোহার পাত ছিল। বিচিত্র শব্দ করে বরফের কুঁচি ঝরে তিনটে গ্লাস ভরে ফেলল। তারপর সেই গ্লাসে কায়দা করে ঢেলে দিল সবুজ-লাল-হলুদ-কমলা সিরাপ।সবুজ একফালি লেবু।
দারুন সেই শরবত। ব্যাবিলনের রাজ প্রাসাদেও মনে হয় না এমন শরবত পাওয়া যেত ।দূরের সিন্ধু দ্বীপ আর পানাম নগরীতেও এমন শরবত পাওয়া যেন না।বিশ্বাস করুন…।
বিচিত্র রঙ্গিন শরবত হাতে কথা বলছিলাম কবির সাথে। কবি বলছিলেন তার কথা।
আমরা মুগ্ধ শ্রোতা।
কবি বলছিলেন শব্দের কথা, কবিতার কথা। উপমার কথা। একটা সরল কথা একটু সুন্দর করে বললে কবিতা হতে পারে। আর কবিতায় সুন্দর একটা ছবি ফুটে উঠবে।
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই।
মাত্র এক লাইনে কি সুন্দর একটা ছবি ফুটে উঠে না ?মনে হয় না -ঠাণ্ডা গোলগাল একটা চাঁদ উঠেছে নীলচে কালো আকাশে ?
-আর মোটা আখের মত বাঁশঝাড় দেখা যাচ্ছে। ওদের পাতা পাবদা অথবা বাঁশপাতা মাছের মত।
আবার
মেঘের ছায়া- ঢাকা সজল কেয়াঝাড়,
পদ্মপুকুরের সবুজ ঢালুপাড়,
তরুণ তরুলতা বাতাসে কয় কথা-
আমারি নাহি পাখা ভুবন ভুলাবার।
—-
টুকরো টুকরো শব্দ। কিন্তু দারুন অর্থবহ।
অথবা —
ঠিক দুক্কুর বেলা ঘুরঘুট্টি।
থই থই মেঘ কালো কুরকুটটি !
ইন্দ্রের কোচ ম্যান গলা খাকরায়,
ঐরাবতের পিঠে বেত হাঁকরায়।
বা
আমি ছিলাম ছাতে
তারায়-ভরা চৈত্র মাসের রাতে।
বা
জলের ছায়ায় ভেসে চলে জলের মাছগুলি,
কোথা থেকে কোথা চলে কে বলবে খুলি।
বা
ফাল্গুনে বনে বনে
পরীরা যে ফুল বোনে।
এই জিনিস গুলো হল ছন্দ। অবশ্য ছন্দ না থাকলে যে কবিতা হবে না এমন কোন কথা নেই। যেমন জীবনবাবুর কবিতায় তেমন ছন্দ নেই। কিন্তু যা আছে পৃথিবীর অন্য কোন কবির কবিতায় নেই ।
যেমন…
একটি তারা এখনো আকাশে রয়েছেঃ
পাড়াগাঁর বাসরঘরে সবচেয়ে গোধূলি-মদির মেয়েটির মতো;
কিংবা মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে-মুক্তা আমার নীল মদের
গেলাসে রেখেছিলো
হাজার হাজার বছর আগে এক রাতে- তেমনি-
তেমনি একটি তারা আকাশে জ্বলছে এখনো।’
তখন চারিদিকে নীল রঙের অন্ধকার জমে গেছে পুরানো দিনের পনীরের মত।
কবি জানতে চাইলেন- সামনে একটা হোটেলে বসে আমরা মোগলাই পরোটা খাবো কিনা। মোগলাই পরোটা আসলে দারুন কিছু না। ওই আর কি পরোটার ভেতরে ডিমের অমলেট দেয়।সেটা তো বাড়িতেই মা বানায়।
মন সায় দিচ্ছিল না। বারবার বাড়ির কথা মনে পড়ছিল আমার ।
এত রাত পযন্ত আমি বাইরে থাকি না।কখনই না।
রাস্তার এক কোনে এক ভিখিরি মা তার রোগা রোগা দুই- তিনটে বাচ্চা নিয়ে খেতে বসেছে । খাবার মানে আধপচা জলভাত। হলুদ রঙের ডাল হয়ত আছে। আর কিছু না। মা কম খেয়ে বেশি করে বাচ্চাদের মুখে তুলে দিচ্ছে। দেখে আমার মনটা হু হু করে উঠল। বাসার বাইরে আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল আমার।
কবি আর বন্ধু বিপিনকে বললাম – আমি বাসায় যাবো।
বিপিন বিরক্ত ।
কবি কী বুঝলেন কে জানে।
হেসে বললেন- আচ্ছা তবে শীতের কোন এক সকালে আমার বাসায় গিয়ে তোমরা জল খাবার খেয়ে আসবে । কেমন?
জল খাবার আসলে সকালের নাস্তা । ব্রেক ফাস্ট ।
রঙ চঙ্গা বিচিত্র একটা বাসে উঠে গুলিস্তানে চলে এলাম। গুলিস্তান আর গুলশান শব্দটা ইরানি। মানে কি, কে জানে। কে যেন বলেছিল গুলশান মানে গোলাপ বাগান আর গুলিস্তান মানে ফুলের বাগান ।
সেই রাতে বেশ দেরি করেই বাসায় ফিরলাম।
মহল্লার মোড়ে কানু নাপিত আরেক জনের বগলের চুল কাটতে কাটতে মানে চেছে দিতে দিতে চিৎকার করে বললেন-হায় হায় কত রাইত কইরা বাসায় আইছে। খারা তর বাপেরে কমু কাইল্কা।
আসলে কানু কাকা অমনই।
আমি একবার ম্যাক গাইভার স্টাইলে চুল কেটে দিতে বলেছিলাম তাই আমার উপর রাগ। উনি বাটি ছাট ছাড়া আর কোন স্টাইল জানেন না।বাটি ছাঁট দিলে আমাকে কেমন ডাকু সর্দারদের মত লাগে। কিংবা বাগদাদ কি চোর সিনেমার পাকিস্থানি নায়কটার মত।
কিন্তু আমি তো ম্যাকগাইভার হতে চাই।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন