সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্রেরা মরে গেলে চুমকি হয়ে যায় ২১

 ২১

 

 

 

 

অনেক । অনেক। অনেক বছর পর দেশে ফিরলাম ।

ক্লান্ত।

 

ঠিক করলাম,  শুধু ঘুমিয়ে কাটাব এক বছর।

 

মাঝে কতগুলো বছর চলে গেছে বাউ কুড়ানি হাওয়ায়।

অচিন  এক অভিশাপে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে হয়েছে আমাকে।

মারিয়ানা আইল্যান্ড থেকে আফ্রিকা। অর্ধেক সময় জীবনের গেছে হোটেলের কিচেনে। বারে। এয়ারপোর্টে । আর বিমানের ভেতরে।

 

ছোট বেলায় দুপুর বেলা মা ঘুমিয়ে পড়লে কড়া রোদে বাইরে বেড়িয়ে পড়তাম।

কী   ভাবে যেন জেগে পিছন থেকে মা চেঁচিয়ে বলতো - সারা জীবন বাইরে বাইরে ঘুরবি।

 

মায়ের অভিশাপ লেগে গেছে।

 

কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারিনি।

 

কোন জনমের পাপ শোধ করছি হয়তো।

হয়তো যীশুকে যখন পেরেক মারা হচ্ছিল ভিড়ে দাঁড়িয়ে হাসছিলাম আমি।

 

বা পাণ্ডবরা যখন অজ্ঞাত বাসে ছিল । তখন শকুনির কাছ থেকে সোনার মুদ্রা নিয়ে পাণ্ডবদের খুঁজে বেড়িয়েছি।

 

কে জানে !

 

যাই হোক। ফিরে এসেছি মায়ের কাছে ।

 

বড় একটা ধাক্কা খেলাম আমার পুরানো শহর দেখে।

এত বদলে গেছে !

 

প্রচুর দালান বাড়ি উঠেছে। বেশুমার । অচেনা সব মানুষজন গিজগিজ করছে। কাউকেই চিনি না। ডায়মন্ড সিনেমা হল আর হংস থিয়েটার বন্ধ হয়ে সুপার মার্কেট উঠেছে।

গান রেকর্ড করার দোকান একটাও নেই সেটার সঙ্গত কারণ আছে। গান এখন ফ্রি। কেউ গান কেনে না।

 

 মনে হচ্ছে আমিই সেই  মেসোপটেমীয় মহাকাব্যের নায়ক  গিলগামেশ। উরুক এর প্রথম রাজবংশের পঞ্চম রাজা। লগানবান্দা ও দেবী নিনসানের পুত্র।

 

 বন্ধু এনকিডুর মৃত্যুর পর অমৃতের খোঁজে গিলগামেশ  চলে যায় পৃথিবীর শেষ প্রান্তে। মৃত্যুসায়রের তলায় গায়ে কাঁটাযুক্ত একধরনের লতা আছে । জীয়নলতা। এই লতাই পারে মানুষকে অমরত্ব দিতে।

 

লতা নিয়ে ফেরার পথে দীঘির পারে সেটা রেখে স্নান করতে নামলেন গিলগামেশ।

সেই ফাঁকে এক সাপ এসে খেয়ে ফেলে জীয়নলতা। স্নান শেষে গিলগামেশ  উঠে দেখেন, সাপের মৃত খোলস পড়ে আছে দীঘির পাড়ে। আর, জীয়নলতা খেয়ে নবযৌবন নিয়ে চলে গেছে সেই সাপ।

 

ক্লান্ত, পরাজিত, পরিশ্রান্ত গিলগামেশ উরুক ফেরেন।

 

অবাক হয়ে দেখেন সব কেমন বদলে গেছে। কাউকে তিনি চেনেন না। কেউ তাকে চেনে না।

 

এক উরুকবাসীকে গিলগামেশ  জিজ্ঞেস করেন, এনকিদুর কথা। গিলগামেশের কথা ।

 

  ' কাদের কথা বলেছেন? অমন কাউকে আমরা চিনি না । ' জবাব দেয় উরুকবাসী।

 

গিলগামেশ বোঝেন, কেউ কাউকে মনে রাখে না।

 

আমার শহরে নিজেকে গিলগামেশ মনে হতে লাগল।

 

এক সপ্তাহ ঘুমালাম।

 

জেটল্যাগের সমস্যায় ভুগে যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ি। আবার জেগে উঠি অচেনা  বেখাপ্পা সময়ে। মধ্যরাতে।

 

শেষে কনকচাঁপা ফুলের মত এক বিকেলে  হাঁটতে বের হলাম।

 

দিগু বাজারের উল্টা দিকে অচেনা এক পুরানো বইয়ের দোকান দেখে থমকে দাঁড়ালাম।

 

দেশ ছাড়ার আগে তো এটা দেখিনি।

 

চাঁছা ছোলা চেহারার এক লোক দোকান চালাচ্ছে। মুখে রস কশ নেই। যেন সামনের সপ্তাহেই উনার ফাঁসী। তবে দোকানে স্টক নেহায়েত মন্দ না ।অভ্যাস মরলেও যায় না। হিরণ্যাক্ষ হিরণ্যকশিপুর মত ।

পাঁড় মাতাল বোতল দেখলে ফিরে চাইবেই।

 

তন্ময় হয়ে বই ঘাঁটতে লাগলাম।

 

কয়েকটা বই ঘেঁটেই কেমন যেন খুঁত খুঁত করতে লাগল অবচেতন মনে। বইগুলো চেনা। কারও বাড়িতে দেখেছি। ভালমত খেয়াল করতেই আবিস্কার করলাম প্রায় দশ পনেরটা বইয়ের ভেতরে প্যাঁচানো স্বাক্ষর করা। পুরানো দিনের ঝর্ণা কলমে। নীল কালি।

 

অবাক হয়ে গেলাম , চিনতে পেরে।

অমনটা কী করে সম্ভব?

 বইগুলো আমাদের সেই কবির সংগ্রহের বই। তার নাম লেখা।

 

 'ফেরিওয়ালার কাছে বইগুলো পেয়েছেন না কেউ বিক্রি করেছে?' বিক্রেতাকে নরম গলায় প্রশ্ন করলাম।

 

 লোকটা চমকে গেল। কেন কে জানে?

 

তড়িৎ জবাব দিল , ' না। বাই। একজন গাহেক ফোন দিছিল। বাড়ি ভর্তি বই । কইল বিশ টেকা পিস কইরা বেচব। আমি মুলামুলি কইরা লট সুদ্দা কিন্না আনছি। নগদ টেকা দিয়া। কুনু সমুস্যা?'

 

জানালাম , কুনু সমুস্যা নেই। জিজ্ঞেস করলাম সেই গাহেকের ঠিকানা।

 

যা ভেবেছি । কবির বাড়ির ঠিকানা দিল।

 রিক্সা নিয়ে উঠে পড়লাম।

 

অমন কাকতালীয় ঘটনা কেন ঘটে মানুষের জীবনে?  কোন ইশারায় চলে সব ?

 

এলাকায় গিয়ে কবির বাসা আর খুঁজে পাই না।

 আশ্চর্য হলেও সত্যি।

হয়  কী   করে?

 

শে পাশের সব কিছু চিনতে পারছি। উনার বাড়ির সামনে যে দোকানে পরোটা , সবজির ভাজি, হালুয়া বিক্রি হত সেটাও আগের জায়গায় আছে। দোকানের সামনে ঘিয়ে রঙা একটা কুকুর লোভী চেহারা নিয়ে বসে থাকতো ওখানে প্রায় একই রকম অন্য একটা কুকুর বসে আছে।

এটার চেহারায়ও খিদে।

 

কবির বাড়ির উল্টা দিকে নাপিতের দোকান ছিল। আজও আছে। শুধু ভেতরের আয়না পাল্টে দিয়েছে।  এসি  বসিয়েছে।

 

অথচ কবির বাড়িটা নেই।

 

সেই পুরানো স্মৃতি মাখা ইটের বাড়ির বদলে ঝাঁ চকচকে ছয় তলা দালান। এক দুই তলা আবার মার্কেট। তিন চার তলা গার্মেন্টস । আর উপরে বসত বাড়ি। বারান্দায় কাপড় শুকাতে দেয়া দেখে অমনই বুঝলাম।

 

একতলার সামনেই  নিতম্বের সাইজের টুলে বসে ছিল দারোয়ান। কান খোঁচাচ্ছিল।

আমার দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে আছে।

 

মোটামুটি নিশ্চিত আমি।

 

রাস্তা আর দালানের ছক চিনতে পেরেছি।

এগিয়ে গিয়ে দারোয়ানের সামনে গিয়ে কবির নাম বললাম।

 

'আপ্নের আপারমেন্ত আছে স্যারের লগে?' গম্ভীর দারোয়ান।

 

ভাল চমক তো ।

হাসলাম।

 জানালাম নেই। সাথে নিজের নাম বললাম।

 

হাফ প্যান্ট পরা রোগা মত একটা পিচ্চিকে ডেকে কী   যেন বলল দারোয়ান।

পিচ্চি প্রায় দৌড়ে দালানের ভেতরে চলে গেল।

 

প্রায় পনের মিনিট পর ইয়া মোটা এক ভদ্রলোককে নিয়ে পিচ্চি দূত ফেরত এলো।

 

লোকটা প্রায় বিখ্যাত এক কাওয়ালি গায়কের সাইজ। শিশু হাতি বলা যায়। মাথায় টাক। গায়ে দামি জামাকাপড়।  ঘামছে দরদর করে।

আমাকে দেখেই হাসল।

হাসি দেখে চিনতে পারলাম।

কবি। আমাদের সেই কবি।

 

'কেমন আছ ম্যাক গাইভার?' হেসে বললেন কবি।

 

সেই পুরানো নামে আমাকে কেউ ডাকল। অনেক অনেক বছর পর।

  

বিশাল পাঞ্জার মধ্যে আমার হাতের তালু নিয়ে ঝাঁকালেন ইচ্ছা মত।

 

তখনও কথা বলতে পারছি না।

 

এই আমাদের কবি?

 

যাকে মনে হত নীল কমলের মত সুদর্শন  । টাটকা কবিতা লিখে ফেলতে পারতো কাগজ পেলেই।

 

ভরা  নক্ষত্রের রাতে রেললাইনের চকমকি পাথর হাতে নিয়ে আবৃতি করতেন মায়াবী সব কবিতা !

 

'চিনতে অসুবিধে হচ্ছে তাই না?' হাসতে হাসতে বললেন কবি। ' সবাই তোমার মত আকাশ থেকে পড়ে। তুমি অবশ্য আগের মতই আছ।'

 

 'আপনার এই অবস্থা হল কেমন করে?' বোকার মত বললাম।

 

'সে অনেক গল্প। চা খাবে? নাকি এখনও মায়ের হাতের চা ছাড়া অন্য চা ভাল লাগে না। '

 

'এখনও ভাল লাগে না।'

 

'চল বসি।'

 

ছয় তলা ছাদের উপর বসলাম। বেশ কিছু টুল বেঞ্চি দেখে বুঝা যায় প্রায়ই মজমা জমে এখানে। এক কোনে ভাঙ্গা একটা ফেন্সিডিলের বোতল।

বাহ ভাল তো !

 

'তুমি তো মিয়া বিরাট ভাগ্যবান। সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিদেশ চলে গেলে। তাও আবার আমেরিকায়। '

হাসতে হাসতে বললেন কবি।

গলার সুরে বিদ্রুপ ।

 

এক লহমার জন্য মনে হল চেহারায় অন্য রকম ছাপ দেখতে পেলাম।

ঈর্ষা? ঘৃণা?

 

কে জানে । মানব চরিত বড়ই জটিল ।

 

 চুপ করে রইলাম। জানি এই লোকটা আমার শৈশবের সেই কবি না।

এ অন্য কেউ।  

যাকে আমি চিনি না।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...