উনিশ
জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে মানিক আর পোকা।
ওদের দিকে চেয়ে রুইতন বুঝতে পারল বড় বড় খেলাগুলি তাহলে এমনই হয় ?
দরদর করে ঘামছে ওর দুর্দান্ত ভাই আর বিখ্যাত গুন্ডা মানিক ।
নিজ এলাকা কুকুরও বাঘ। বাইরে গেলেই জারিজুরি খতম।
’লাশটা কার ছিল ? তোমাদের সামনে যেটা দেখলাম।’ মোটা কর্কশ গলায় জানতে চাইল মানিক ।
‘কার আবার ? চাকরটার। বাধ্য হয়ে খুন করতে হয়েছে। আপনি তো গাধার মতো পুলিশের লোক মেরে ফেলেছেন।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল পোকা।
’ওটা একটা দুর্ঘটনা।’ বিব্রত গলায় বলল মানিক । ‘আসলেই মারতে চাইনি লোকটাকে।’
’থানায় গিয়ে সেটা বলবেন। উনারা ঠিকই বুঝবে। চা বিস্কুট খাওয়াবে।’ নরম গলায় বিদ্রুপ করল রুইতন।
দ্রুত মেঘার কামরাতে চলে গেল মানিক ।
বড় বড় চোখে ওর চলে যাওয়া দেখল রুইতন।
’ভয় পাবেন না। আমরা বিপদে পড়েছি। চারিদিকে পুলিশ আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আর বোকা মতো একজন অফিসারকে মেরে ফেলেছি আমি । বিশ্বাস করুন , মারতে চাইনি৷ সামনে বিপদ। সম্ভবত পোকা আর ওর বোন ঝামেলা করবে। আপনি কি এখনও আমার পক্ষে আছেন?’ হব হব করে বলে গেল মানিক ।
’হ্যাঁ।’ শান্ত গলায় মেঘা বলল । ‘আপনার পাশে আছি।’
’ঠিক আছে। আমি যাই বলব তাই করবেন। এখানে থাকুন । চেষ্টা করব আপনাদের নিরাপদে রাখতে।’
মানিক ফিরে এল ড্রইংরুমে।
রুইতন আর পোকা এখনও জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে নজর রাখছে।
’আমরা এখন করবটা কী ?’ আতঙ্কিত স্বরে জানতে চাইল পোকা।
’গ্যারেজে গাড়ি আছে।’ শান্ত গলায় বলল মানিক । ‘বাড়ির পিছন দিয়ে আমরা ভাগতে পারি।’
ব্যাপারটা বোকামি হয়ে যাবে । তবুও মানিক চাচ্ছে ঘটনাটা যত দ্রুত শেষ হয় ততই ভাল । পালাতে গিয়ে যদি গুলি খেয়ে মারা যায় তবে আরও ভাল । কিন্তু ধরা পড়ে জেলে ফেরত যেতে চায় না। এই মুহূর্তে মাত্র দুটো চাওয়া আছে মানিক । এক, দ্রুত সবকিছু শেষ হোক৷
আর দুই, পিচ্চিটা বেঁচে থাকুক। নিরাপদে থাকুক।
’আপনি পাগল হয়ে গেছেন নাকি ?’ রেগে গেল রুইতন। ‘গাড়ি নিয়ে পালাতে পারবে নাকি ? গুলি খেয়ে মরবেন।’
’এটাই সেরা উপায়।’ বলল মানিক । ‘ওরা হয়তো ভাবতেও পারবে না। হঠাৎ করে যদি গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যাই তবে ঠিকই ভেগে যেতে পারব। খানিক পর আরও বেশি অফিসার চলে আসলে তখন আর পারব না।’
’কথার মধ্যে যুক্তি আর লজিক দুটোই আছে।’ একমত হল পোকা। ‘নাহ, মানিক ভাই আপনি আসলেও বস পাবলিক।’
’পোকা।’ হিম হিম গলায় বলল রুইতন। ‘আরে গাধার বাচ্চা । বাইরে বের হলেই গুলি চালাবে পুলিশ । শুধু একটা কাজ করলে পুলিশ আমাদের চুলও ছুঁতে পারবে না।’
’কী ?’
’জিম্মি হিসেবে যদি শিশিরের বউটাকে সাথে নিয়ে যাওয়া যায়।’
কয়েক মুহূর্ত উজবুকের মতো দাঁড়িয়ে রইল পোকা। ধীরে ধীরে খুশির হাসিতে ভরে গেল ওর কুৎসিত মুখ। ‘ না রে বোন জীবনে প্রথমবার তোর কাছে হার মানলাম। ব্রেইন আর মগজ দুটোই আছে তোর। বউদি মণিকে সাথে নিয়ে যাই। দেরি করছিস কেন?’
মেঘার কামরার দিকে পা বাড়াল পোকা।
থেমে গেল মানিকের গলা শুনে।
‘ দাঁড়াও পোকা। আমরা এখনই বের হয়ে যাবো। কিন্তু ওই মহিলাকে সাথে করে নিয়ে যাবো না।’
পোকা ফিরে দেখলে ওর কপাল বরাবর পিস্তল ধরে আছে মানিক।
নির্জনবাস বাড়ির ফটকের বাইরে।
দূরে । পুলিশের জিপের সামনে তর্ক করছে আবদুল হাই আর শিশির।
‘দেখুন শিশির বাবু। আপনাকে কিছুতেই বাড়ির ভিতর যেতে দিতে পারি না। তিন জন পেশাদার অপরাধী আছে ভেতরে । আমাদের এক জনকে মেরে ফেলেছে ইতিমধ্যে। ভিতরে কারও লাশ আছে। পরিস্থিতি খুবই খারাপ। অপেক্ষা করুন। ঢাকা থেকে এক দল অফিসার আসছে।’ উত্তেজিত ভাবে বললেন আবদুল হাই ।
’স্যার আমার বউ আর বাচ্চা ভেতরে।’ অসহায় ভাবে বলল শিশির। ‘ মুক্তিপণের টাকা পর্যন্ত নিয়ে এসেছে আমি। টাকা ওদের হাতে দিলে আমার ফ্যামিলিকে ছেড়ে চলে যাবে। তখন আপনারা ওদের পিছু ধাওয়া করবেন।’
’আপনার কেন মনে হচ্ছে টাকা পেলেই সবাইকে ছেড়ে দেবে ? জিম্মি হিসেবে আটকে রাখতে পারে তো। তাই করবে। আমি নিশ্চিত।’
বদরুল জিপের ভেতর থেকে আব্দুল হাইয়ের উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠল,
’স্যার লাইনে গাউস চৌধুরী আছেন। আপনাকে চাইছেন।’
শক্তিশালী ওয়ারলেস সেট রয়েছে জিপের ভিতরে ।
জিপের দিকে দৌড় দিল আবদুল হাই।
কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল শিশির। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। দৌড়ে গিয়ে বসল ওর সাদা ক্যাডিলাক গাড়িতে। ঝড়ের বেগে গাড়ি নিয়ে চলতে লাগল বাড়ির দিকে।
পিছন থেকে পাগলের মতো চেঁচাতে লাগল বদরুল আর হাই । ততক্ষণে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছে শিশিরের গাড়িটা।
হাঁপাতে হাঁপাতে রিপোর্ট করল আবদুল হালিম।
’কাহিনিটা জটিল হয়ে গেল।’ বিরক্ত হয়ে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘আপনারা ওখানেই থাকেন । আক্রমণ করতে যাবেন না। একদল অফিসার চলে আসছে। আমিও রওনা হয়ে গেছি।’
বাড়ির ভেতরের পরিস্থিতি জটিল। বেশ জটিল ।
পিস্তল হাতে মানিক । সামনে দুই পোকা ভাইবোন।
’আপনি আসলে মস্ত বড় উল্লুক আর গাধা।’চিবিয়ে চিবিয়ে বলল পোকা । ‘মহিলাকে সাথে নিলে আমরা নিরাপদ থাকব।’
’কতক্ষণ?’ বলল মানিক। ‘সাথে মহিলাকে নিয়ে গেলেই বরং সারা দুনিয়ার পুলিশ আমাদের পিছু নেবে।’
‘যদি যাই এই মাতারিকে সাথে করে নিয়েই বাইরে যাব। নইলে এখানেই থাকব।’ তীব্র ঝাঁঝের গলায় বলল রুইতন।
তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। হেড লাইটের উজ্জ্বল আলো এসে পড়ল জানলা পর্দায়।
ঘাড় ফিরিয়ে জানালার দিকে ফিরে চাইল মানিক ।
আবার কে এল ? একটার পর একটা ঘটনা ঘটছেই।এ কেমন কাণ্ড ?
পাহাড়ি চিতার মত লাফিয়ে মানিকের উপর পড়ল রুইতন। তাল হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল দুইজন। মানিকের হাত থেকে খসে গেল পিস্তলটা । ছোঁ মেরে অস্ত্রটা তুলে উঠে দাঁড়ালো রুইতন ।
‘শালা কাউলা এখন থেকে নাটক আমরা সামাল দেব৷’ হিস হিস করে বলল রুইতন।
জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালো পোকা। ‘আরে শিশিরবাবু ফিরে এসেছে রে । হাতে ব্যাগ । রুই পিস্তলটা আমাকে দে ।’
পিস্তল হাতে জানালার সামনে গিয়ে পোকা চিৎকার করে বলল, ‘ওই যে সাহেব। ব্যাপার কী ?’
‘আমি মুক্তিপণের টাকা নিয়ে এসেছি।’
হাতের ব্যাগটা তুলে দেখাল শিশির ।
‘চালাকি করবেন না। আস্তে আস্তে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ুন। সাথে অস্ত্র থাকলে ফল ভাল হবে না। আমার হাতে পিস্তল আছে।’
এক হাতে ব্যাগ ধরে অন্য হাত উপরে তুলে বাড়ির ভিতর ঢুকল শিশির।
পাগলের মতো চারিদিকে তাকাচ্ছে মানিক । যে কোন একটা অস্ত্র দরকার।
টেবিলের উপর পিতলের ভারী শো পিসটা দেখল। নগ্ন নারীমূর্তি। একটু একটু করে ওখানে যাবার চেষ্টা করল সে।
‘নড়লেই মাথা ফাটিয়ে দেব কালু।’ হুঙ্কার দিল রুইতন ।
‘কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই মারা যাব আমরা। পুলিশের গুলি খেয়ে ।’ হাসল মানিক ।
‘চুপ থাক কাউলার বাচ্চা ।’ খেকিয়ে উঠল পোকা। শিশিরের দিকে ফিরে পোকা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘ঢাকায় গিয়ে পুলিশ আব্বুদের পাঠিয়ে দিয়েছ মামদার পোলা ?’
‘পুলিশ তোমাদের মতো বেকুব না।’ বলল শিশির। ‘ এই নাও টাকা। নিয়ে ভেগে যাও এখান থেকে।’
‘কেশু বুড়ো কোথায়?’
‘উনি ওনার ভাগ নিয়ে গায়েব হয়ে গেছেন। আর তোমাদের ভাগ পাঠিয়ে দিয়েছেন।’
‘কত দিয়েছে ?’
‘জানি না। ব্যাগ খুলে দেখো।’
‘তুই খোল হামারজাদা।’
সোফার উপর ক্যানভাসের ব্যাগটা রেখে জিপার ধরে টান দিল শিশির।
কামরার সবাই দেখল ওটা ভর্তি পেল্লাই সব টাকার বাণ্ডিল।
পোকা আর রুইতন চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। এর আগে কখনও ওরা এত টাকা একসাথে দেখেনি।
সুযোগটা নিল মানিক । টেবিল থেকে পিতলের মূর্তিটা নিয়ে গায়ের জোরে আঘাত করলো পোকার কব্জিতে। হাড় ভাঙার কুৎসিত মট শব্দ শুনতে পেল সবাই।
পোকার হাত থেকে পিস্তলটা মেঝেতে পড়ে ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে মানিক পায়ের সামনে চলে এলো।
থাবা মেরে পিস্তলটা তুলে দুই ভাইবোনকে কাভার দিল মানিক ।
‘শিশির বাবু বাইরে কতজন অফিসার আছে ?’ প্রশ্ন করল মানিক ।
‘দুইজন।’
‘ডাকুন ওদের। আমি সেরেনডার করব। আর এই দুই শয়তানকেও ধরিয়ে দেবো। ডাকুন ওদের।’
পরিস্থিতি স্বাভাবিক বুঝেই মেঘা ওর রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল। ‘শিশির তুমি... তোমার গলা শুনেছি আমি।’
‘সব ঠিক আছে সোনা।’ হাসলো শিশির। ‘দাঁড়াও আমি বাইরের অফিসারদের ডাকছি।’
গুড়ুম করে পিস্তলের গুলির শব্দে সবার কানে তালা লেগে গেল।
আবারও বারুদের গন্ধে ভরে গেছে ঘরটা।
সোফার তলায় পোকার পিস্তলটা চুরি করে লুকিয়ে রেখেছিল রুইতন। গোলে মালে সেটা বের করে গুলি চালিয়েছে মানিক পিঠে।
আশ্চর্য ! সত্যিই কোনও রকম ব্যথার অনুভূতি হল না মানিক । শুধু মনে হচ্ছে হাতুড়ি দিয়ে জোরে আঘাত করেছে কেউ। সামনের কাঁচের টেবিল ভেঙে মেঝেতে পড়ে গেল মানিক । হাত থেকে পিস্তলটা খসে গেছে । টপ করে পোকা তুলে নিল সেটা।
আহত বুনো মোষের মতো উঠে দাঁড়াতে চাইল মানিক ।
শান্ত ভাবে খুব কাছ থেকে মাথার মধ্যে দ্বিতীয় গুলিটা করল রুইতন।
মরার আগে মায়ের কথা মনে হল মানিকের । মা কষ্ট পেয়েছিল মরার সময় ?
শান্তি পেল এই ভেবে, আবার জেলে যেতে হচ্ছে না ওকে। মনে হল ওস্তাদের সাথে দেখা করে ভালোই হয়েছে । মা মরে গেলে সারাজীবন থালা বাটি মেজে জীবন চালাতে হত। চলত না। কষ্ট হত। এখন দায় শূন্যভাবে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মৃত্যু জিনিসটা এত খারাপ কিছু না আসলে ।
তৃতীয় গুলিটা খেয়ে মরল মানিক ।
ওর শেষ চিন্তা ছিল, শিশিরের বাচ্চাটা। পিচ্চি না ওর নাম ? এমন নামও রাখে কেউ ? বেশ তো !

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন