১০
গরমের এক দুপুরে বেশ আয়েশ করে বই পড়ছিলাম। গুপ্তধন শিকার টাইপের বই। দম ফেলার ফুরসত নেই।
এমন সময় উত্তরের ইকবালদের মহল্লা থেকে বেশ গোলমাল ভেসে এলো। মহিলা কেউ, কান্না কাটি করছে। সাথে বাচ্চা কাচ্চার কান্না আর বেশ শোরগোল।
ইকবালদের মহল্লাটা বেশ ঘনবসতি । বস্তি বলা চলে। একদম নিন্ম আয়ের মানুষজন থাকে ওখানে।
বেড়া আর টিনের চালের ঘর। লাইনের জল। দুইবেলা লাইন ধরে বস্তির মা মেয়েরা কলসি ঠিলা ভরে জল নেয়। তখন হালকা পাতলা ঝগড়া হয়। কিন্তু তত বেশি না। এত বছর ধরে আছি-কিন্তু কোন মারামারিই হয়নি। দুই একটা দাম্পত্য কলহ ছাড়া বেশ চুপচাপ।
আজ আবার কী হল ?
বোঝা যাচ্ছে মস্ত কোন কেওয়াজ।
ঝেড়ে দৌড় দিলাম।
পরিচিত এক মহিলা যাকে সবাই শঙ্করের মা বলি-তিনি কান্নাকাটি করছেন। পাশে তার পিচ্চি পিচ্চি দুই বাচ্চা মেয়ে কাদছে। কাদছে আর বলছে- ও দাদারে।ও দাদারে।
শঙ্করের বুড়ো বাপ পাথরের মত বসে আছেন। অসম্ভব রকমের কষ্টে পাথর হয়ে গেছে বুড়ো। কী হয়েছে কিছুই বুঝলাম না।
শুনলাম শঙ্কর নাকি মুসলমান হয়ে গেছে।
শঙ্করকে চিনতাম বহু আগে থেকেই। রোগা কালো আর লম্বামত এক ছেলে। বয়স বাইশ বা তেইশ হবে। কোন এক কারখানায়
লেদ মেশিনের কাজ করে। আগে রঙমিস্ত্রি ছিল। খুব হাসি খুশি এক ছেলে। সবাই পছন্দ করে। ওর আয়েই সংসার চলে। মা সারাদিন ঘর কন্যার কাজ করে। আর অন্যের বাড়িতে টুকটাক ফাই ফরমায়েস খাটতো। যেমন- মসলাবাটা, দুই কলসি জল এনে দেয়া, ঘর মুছে দেয়া। হেন তেন।
পিচ্চি ভাই বোন দুটো অনেক ছোট। ক্লাস টুতে পড়ে প্রাথমিক ইস্কুলে। শঙ্করের বাপ বুড়ো রোগা ভোগা মানুষ। সারা বছরই অসুস্থ ।বেকার। মিষ্টির দোকানের বাক্স বানাতে দেখতাম মাঝে সাঝে। আর প্রতি বিকালে রামবাবুর পুকুর পাড়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে যেত।
রামবাবুর পুকুরটা মৎস্যশিকারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। জুতার বাক্সের আকারের পুকুরটার তিন দিকে তিনটে ঘাঁট ছিল।
বাকি চারিদিকে ছিল হেলেঞ্চা আর জলকলমির দঙ্গল। চৈত্র বৈশাঁখ মাসেও পুকুরের জল হত বরফের মত ঠাণ্ডা।মাছ সম্ভবত ভালই পাওয়া যেত।
নইলে কি অত দূর দুরান্ত থেকে মৎস্য শিকারীরা আসে ?
তবে বেশ কয়েকজন ছিল নিয়মিত। বাদলার দিনগুলোতেও উনাদের দেখতাম। ছাতা মাথায় করে গুঁটিশুঁটি মেরে বসে আছেন। টয়লেটে বসে হাগু করার মত হাস্যকর ভঙ্গিতে। অদ্ভুত রেইনকোট গায়ে দেয়া। লম্বা পলিথিন কেটে নিজের হাতে বানানো সেই রেইনকোট । পায়ের সামনে ছোট্ট পলিথিনের ব্যাগ। ওখানে মাছ রাখা। কনডেন্স মিল্কের খালি টিনের কৌটা ভর্তি কেঁচো।
নিয়মিত শিকারীদের বসার জন্য নিধারিত জায়গা আছে। নাম লেখা নেই। তবে সবাই জানে।
পুকুর পাড়ে পাশাপাশি চারটে লম্বা হিলহিলে নারকেল গাছ । গাছগুলো জড়িয়ে রেখেছে হলুদ সবুজ ইয়া মোটা মানি প্ল্যানটের দঙ্গল। ঐ গাছগুলোর নীচে বসে শঙ্করের বুড়ো বাপ। উত্তর দিকে মসজিদের ঘাটলার পাশে বসে দাদন ভুঁইয়া। উনাকে সবাই খলিফা বলে। নাহ ইসলামী শাসন আমলের খলিফা নন। উনি আসলে দর্জি। দর্জিদের কেন খলিফা বলে কে জানে।
আমি জানি না। তোমরা কেউ জান ?
পূর্বদিকে গফুর হাজির বাড়ির ঘাঁটলা। খানিক ভাঙ্গা- চুড়া। পাশেই কতগুলো চালতা আর জামরুল গাছ। কেমন ছায়া ছায়া। ওখানে বসে আরও একজন নিয়মিত শিকারী – কালু শেখ। ইয়া লম্বা তাগড়া চেহারার মানুষ। গাল ভর্তি দাড়ি। উনার শিশি বোতলের কারবার। কালি বাজার ফল পট্টির ওখানে কালু শেখের দোকান দেখেছি। পুরানো মদের খালি বোতল আর টিনের ড্রাম ভর্তি নারকেল তেল বিক্রি করেন।
বাদবাকি মৎস্য শিকারীরা অনিয়মিত বা ভিন মহল্লার।
যার যেখানে পছন্দ বা সুযোগ মিলে সেখানেই বসে পড়ে।
ছিপ ফেলে তোম্বা মুখে চেয়ে থাকে ফাতনার দিকে। কেউ দামি ফাইবারের ছিপ , নাইলনের সুতো আর দামি বড়শি নিয়ে আসে। কেউ সরু বাঁশ বা কঞ্চির ছিপ আর সস্তা সুতা সাথে মনির মিয়ার দোকানের চারআনা করে কেনা বড়শি নিয়েই বসে। কেউ চটের একটা টুকরোর মধ্যে আয়েশ করে বসে। আবার কেউ এমনিতেই পায়খানায় বসার মত ভঙ্গি করে বসে।
যাই হউক না কেন খালি হাতে ফেরে না কেউ।
সবাই মাছ পায়।
সবচেয়ে ভাগ্যবান শঙ্করের বাপ।
সবাই বলে উনার নাকি মাছের রাশি আছে।
মাছের রাশির ব্যাপারটা সত্যি হতে পারে।
আমি নিজে অনেকদিন ছিপ হাতে বসে দেখেছি রামবাবুর পুকুর পারে।না। মাছে ভুলেও ঠোকর দেয়নি। বেশিক্ষণ বসতেও ইচ্ছা করে না। উশখুশ করতে থাকি। দেখি কালো কাঁচের মত পুকুরের জলের উপর হেঁটে যাচ্ছে অদ্ভুত রকমের কাঁচ পোকা। সবুজ টকটকে জলকলমির ডগার উপর বারবার বসার চেষ্টা করছে লাল টুকটুকে একটা ফড়িঙ। এদিক ওদিক ঘাই মারে গজার মাছের পোনা। খলসে মাছের রঙধনুর মত শরীর ঝিকিয়ে উঠে জলের নীচে।
একসময় বিরক্ত হয়ে উঠে যাই।
শঙ্করের বাপ আসতো প্রায় শেষ বিকালে।আয়েশ করে বসত নারকেল গাছগুলোর পাশে।
সূর্যটা তখন জাফরানি রঙের হয়ে আমার বন্ধু আনন্দদের মামার বাড়ির ছাদের টাঙ্কির কোনা ধরে ঝুলে আছে। যে কোন সময় টুপ করে খসে পড়ে যাবে।খসখসে বাতাস বইতো । পুকুরের জলে ক্ষুদে ক্ষুদে ঢেউ উঠত। চারিদিকটা বেশ নীরব তখন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন