২
শীত কাল চলে এলো কেমন করে জানি।
বাতাসে কমলালেবুর ঘ্রান।চারিদিকে হলুদ গাদা ফুল। হলুদ রোদ।
আমাদের ইস্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্বাভাবিক কারনেই পরীক্ষা খুব একটা ভাল হয়নি। আমার কোন দোষ নেই। আসলে প্রশ্ন কমন পড়েনি। ফালতু সব প্রশ্ন এসেছিল। বইতে নাকি সব প্রশ্নের উত্তর আছে। আমি খুঁজে পাইনি।
চৌবাচ্চার অংকটা এসেছিল। ঐযে একটা চৌবাচ্চার চার পাঁচটা নল আছে। একটা নল দিয়ে এতক্ষণে চৌবাচ্চা ভর্তি হয়। আরেকটা নল খালি রাখলে এতক্ষণে চৌবাচ্চা খালি হয়। সব নল খুলে রাখলে কতক্ষণে কি হয়? আজগুবি অংক। মাথা খারাপ না হলে কেউ চৌবাচ্চার নল মুচড়া মুচড়ি করে ?
তাও অংকটা পারতাম। আসলে আমাদের বাসায় চৌবাচ্চা নেই । তাই পারিনি।
আরেকটা অংক এসেছিল- এক টাকায় সাতটা আমলকী কিনে দেখা গেল পড়ে তিনটা আমলকী পচে গেছে। তখন কত ,মানে শতকরা কত ক্ষতি হবে। এটাও পারতাম । কিন্তু সেটা তো আমলকীর সিজন না। বাজারে আমলকী বেশ আক্রা ছিল।আচারয়ালার কাছেও আমলকীর আচার দেখিনি।
ইতিহাসে প্রশ্ন ছিল সবচেয়ে খারাপ। যাদের চিনি না জানি না তাদের ব্যাপারে বিদঘুটে সব প্রশ্ন।
আর ইংরেজিতে সেই ডাক্তার আসার পূর্বে রোগি মারা গেল সেটা ইংরেজিতে লিখ।
সারাবছর বই খাতা খুলে দেখিনি। কারন নতুন বই গুলো পেয়ে মনে হয়েছিল -আরে এ আর এমন কঠিন কি ? একটু হাতালে পিতালেই মুখস্ত হয়ে যাবে।
ও দিকে খবর পেয়েছি নদীর ওপারে নবীগঞ্জে এক সাধু আছে। একটা তাবিজ নিলেই পরীক্ষায় পাশ। তাবিজের হাদিয়া একুশ টাকা। অনেক কষ্ট করে একুশ টাকা জমা করে রেখে দিয়েছি হরলিক্সের বয়ামের মধ্যে।
পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে নবীগঞ্জ গেলাম।
গিয়ে যা শুনলাম তাতে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।
সাধু বাবাকে নাকি পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। সাধু গঞ্জিকার ব্যবসা করত। গঞ্জিকা মানে গাঁজা।
হায় হায়।
সেই বার আমি আর বিপিন বহু কষ্ট করে নবীগঞ্জ থেকে ফিরে এসেছিলাম। সাধুবাবার খবর শুনে দিশা হারিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পরে ফেরার সময় দেখি ভুল রাস্তায় চলে গেছি। কিছুই চিনছি না। ভুলে অন্যের বাড়ির উপর চলে গিয়েছিলাম। আমাদের দেখে চার-পাঁচটা কুকুর তেড়ে এলো। দারুন দৌড় দিলাম । পিছন পিছন কুকুরগুলো দাঁত বের করে ধাওয়া করল।
সে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা । দৌড়াতে দৌড়াতে ভাবছিলাম কোরিয়ানরা নাকি কুকুর খায়।এই মুহূর্তে কোন কোরিয়ান আশে পাশে থাকত যদি।
ছিল না। বরং ধঞ্চে ক্ষেতের পাশে হিসু করতে বসেছিল এক বুড়ো।আমাদের অবস্থা দেখে খ্যাক খ্যাক করে হাসছিল বুড়োটা। মানুষ কত খারাপ।
নদীর ঘাঁট পযন্ত দৌড়ে গেলাম আমরা। শেয়ালকাঁটা আর শন ঘাসে আমাদের পা হাত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। কতবার যে গোবরে পা দিয়েছি উপরওয়ালাই জানেন।
বিপিনের অবস্থা দেখে মায়াই লাগল । মারা যায়নি কেন কে জানে ! জোরে জোরে দম ছাড়ছে আর নিচ্ছে।
এক পাটি স্যান্ডেল হারিয়ে ফেলেছে কবে। দুই তিন বার আছাড় খেয়ে পড়ে হাটুর কাছে ছিলে গেছে। দেখতে হালিমে দেয়া মাংসের মত লাগছে হাটুর মালাইচাকিটা।
নদীর ঘাটে একটা চায়ের দোকান। পাকা কলা আর পাউরুটি ঝুলছে। বয়াম ভর্তি বাসি বিস্কুট। বিপিনের জন্য দয়া হল। এক টাকার বাবুল বিস্কুট কিনে দিলাম। সোনালী রঙের বড় বড় বিস্কুটে ইংরেজি কী সব লেখা।অনেক সময় নিয়ে বিস্কুট আর টিনের মগ ভর্তি করে নদীর জল খেলাম দুই জনে।
দারুন হাওয়া বইছে। শীতলক্ষ্যা নদীর ঘোলা জল টলমল করছিল। দূরে কাশ বন। লম্বা লম্বা শন আর হোগলার বন।
খাতা খুলে বিপিন কবিতা লিখে ফেলল-
সেইদিন দুজনে খেয়েছিলাম হায়
রাস্তার কুকুরের ধাওয়া।
এত কষ্টের পরও আমাদের
হল না তাবিজ পাওয়া।।
এটা কিছু হল? যতসব ফালতু।
আরও একটা কারনে পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হল।
আমার শেষ আশা ছিল কাহিল চন্দ্র সাহা। ও হচ্ছে ক্লাসের সবচেয়ে ভাল ছাত্র।সব মুখস্ত। তোতা পাখীর মত পুরো বই মুখস্ত বল যেতে পারে। সব অংক পারে। আঁট দশটা ইংরেজি রচনা ও মুখস্ত। মোটামুটি সবাই আমরা ওকে ঘৃণা করি।
কারন পড়া না পারলেই স্যারেরা বলেন-মিলন কাহিলের পা ধুয়ে পানি খা।
এটা কোন কথা?
কারও পা ধুয়ে কি জল খাওয়া যায়? তার উপর কাহিলের পা ভর্তি প্যাঁচড়া ।শুকিয়ে আমসত্ত্বের মত হয়ে গেছে।
যাই হোক, ভেবেছিলাম কাহিল চন্দ্র সাহা আমার সামনে বসবে। দেখে দেখে লিখে ফেলব। ওমা পরীক্ষার দিন দেখি কাহিল মাথা ভর্তি গোবর দিয়ে এসেছে। পাগল হয়ে গেল নাকি পড়তে পড়তে?
মনে মনে খুশি হলাম সবাই । গোল হয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম - কী হয়েছে?
শুনলাম কাহিলের নাকি জণ্ডিস । মাথায় গোবর না। আসলে তেলাকুচ পাতা বেঁটে দেয়া।
আর কাহিল তেমন কিছুই লিখতে পারল না পরীক্ষার খাতায়।
উঁকি দেয়ার আগেই পাশ থেকে এক ছোকরা মিহি গলায় স্যারকে ডেকে বলল-স্যার , দেহেন দেহেন মিলন না কাহিলের খাতা দেইখা দেইখা লেহে।
স্যার এসে আমার কান দুটো পুরানো দিনের রেডিয়োর মত মুচড়ে দিলেন ইচ্ছামত…।
মোদ্দা কথা পরীক্ষা খারাপ হল। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার পর বিভূতি স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে কি ফালতু কথাই না বলেছিলেন। বললেন - বড় হয়ে তোকে রিক্সা চালাতে হবে বলে দিলেম।বাপ মাকে বল তর পড়ার পেছনে টাকা পয়সা খরচ যেন না করে।
এই বলে দারুন লিকলিকে একটা বেত দিয়ে ভালমত ধুলা ঝেড়ে দিলেন আমার জামা কাপড় থেকে।
বড় হয়ে আমাকে রিক্সা চালাতে হবে কথাটা শুনে মনে মনে বেশ দমে গেলাম। এতগুলো স্যার বার বার এই কথা বলেন। খুব ভয়ের ব্যাপার। আমি কল্পনা করি দশ বছর পর ময়লা লুঙ্গি আর ঘামে ভেজা জামা পরে রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
আমার মহল্লার পরিচিত মেয়েগুলো যেমন-রিমি,সোমা,শিলা, টুম্পা এরা এদের বাচ্চা কাচ্চা আর জামাইদের নিয়ে ব্যাগ ভর্তি কেনাকাটা করে আমাকে জিজ্ঞেস করছে- এই রিক্সা নিমতলি যাবে ? ভাড়া কত ?
আমি গামছা দিয়ে মুখ মুছে হেসে বলছি- ইনসাফ কইরা দিয়েন আফা।
মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলছে- একি মিলন না ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন