এগারো
বাইরে অনেক রাত।
নির্জনবাস বাড়িটা থমথমে । দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই , ভিতরে কত বড় নাটক চলছে।
নিচতলার ড্রয়িং রুমের সোফায় শুয়েছে মানিক । এখান থেকে পুরো বাড়ি নিয়ন্ত্রন করা যায়। মনে শান্তি নেই। মায়ের কথাই ভাবছে। দুই সপ্তাহ ধরে মাকে দেখতে পাচ্ছে না। আশা করছে এই সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে ।
এখানে আসার আগে নানান পাবলিক প্লেস থেকে হরেক নাম্বার দিয়ে কয়েকবার ফোন করেছিল হাসপাতালে।নার্স সব সময় বলল, মা ঘুমাচ্ছে বা অসুস্থ, ফোন দেওয়া যাবে না।
কাজ ঠিকমত শেষ হলে ওস্তাদ ওকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দেবে।ওস্তাদের মুখের জবান কখনও নড়চড় হয় না। টাকাটা পেলে মা যতই অসুস্থ হোক না কেন সব ঠিক করে ফেলবে মানিক । বাড়িতে চব্বিশ ঘন্টার জন্য নার্স রেখে দেবে মায়ের জন্য।
তারপরেও পুলিশের ব্যাপারটা মাথায় আছে।সেটা পরে দেখা যাবে।ঝামেলা পোকাও করতে পারে।সাবিহার দিকে কেমন করে যেন নজর দিচ্ছিল । সাবধানে থাকতে হবে।
পাশের রুমের শুয়ে আছে সাবিহা। একটু ভয় পায়নি। পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করছে।হ্যাঁ, রুইতন যখন অ্যাসিডের বোতল বের করেছিল তখন সাংঘাতিক ভয় পেয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে একদম অ্যাডভেঞ্চার মার্কা মুডের মধ্যে আছে মেয়েটা।
নিজেদের কামরায় শুয়ে আছে পিচ্চি, শিশির আর মেঘা।
সাথে জমাট বাঁধা আতঙ্ক। দুশ্চিন্তা। উদ্বেগ।
‘তোমার কী মনে হয় ?’ বহু বার জিজ্ঞেস করার পর আবারও জানতে চাইল মেঘা।
‘ পুলিশের কাছে গিয়ে লাভ নেই।’ শান্ত গলায় জবাব দিল শিশির। ‘ ওদের কথা মতই কাজ করতে হবে। স্বার্থের জন্য সবই করতে পারবে ওরা। আমার স্থির বিশ্বাস দুঃখীরাম বেঁচে নেই।বাকি অন্য সবার কথা জানি না। কিন্তু পোকা…ও সবই করতে পারবে।’
বাড়ির বাইরে বারান্দায় বসে আছে দুই পোকা। শিশিরের ফ্রিজে পাওয়া বোতল গায়েব করে মদ গিলছে দুই ভাই বোন। বাড়ি পাহারার কাজও করছে একসাথে।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর দুম করে প্রশ্ন করে বসল রুইতন, ‘চাকরটার নাম যেন কী ? সুখীরাম না দুঃখীরাম, ওকে রাতের খাবার দিলে না যে। আমরা সবাইওর কথা ভুলে গেছি। ব্যাটার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে?’
‘ওর একটুও খিদে পায়নি।’ দায়সারা জবাব দিল পোকা। ‘মারা গেছে লোকটা।’
চমকে ফিরে তাকাল রুইতন । ‘ কীভাবে?’
‘চিৎকার করতে যাচ্ছিল। আমি ভয় পেয়ে আঘাত করছিলাম ওকে। থামাতে চেয়েছিলাম। হাত থেকে ডিম পড়ে যেমন ভেঙে যায়, তেমনই মারা গেল লোকটা।আসলে হায়াত মউত সব উপরওয়ালার হাতে।’
‘লাশটা?’ঢোক গিলে বলল রুইতন ।
‘দূরে, বালির তলায় পুঁতে রেখেছি।’ আঙুল তুলে কোয়াটারের পেছনটা দেখাল পোকা।
‘কেশু যখন জানবে?’ কাটা কাটা গলায় বলল রুইতন। ‘মার্ডার যখন হয়ে গেছে মনে হয় না পুলিশ দূরে থাকবে। প্রথমে কিডন্যাপ পরে খুন। ভালো। খুব ভালো।’
মুখোমুখি বসে আছে কেশু আর শিশির।
কেশুর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মানিক ।
ড্রয়িং রুম । সকাল নয়টা হয়ে বেশ কিছু মিনিট।
বাইরে শিশিরের গাড়িটা মেরামত করছে পোকা। স্পার্ক প্লাগ লাগানোর পর ভুয়া নাম্বার প্লেট লাগাচ্ছে । কেশুই সাথে করে নাম্বার প্লেটটা নিয়ে এসেছিল।
‘খন্দকার সাহেবকে কি বলতে হবে মনে আছে নিশ্চয়ই ?’ বলল কেশু । ‘ভাল মত বুঝিয়ে বলবেন, টাকা পেলে উনার মেয়ের কোন ক্ষতি হবে না। যদি কোন রকম অং বং দেখি তবে আপনাকে প্রণাম জানিয়ে পোকার হাতে আপনার বউ আর বাচ্চাকে ছেড়ে আমি চলে যাব।বুঝেছেন ?’
‘ বুঝেছি।’ মাথা নাড়ল শিশির।
‘আপনাকে অনুসরণ করে পুলিশ যদি এখানে আসে, তবে বুঝতে পারবে আপনি ওদের নিয়ে এসেছেন। তখন প্রথমেই আপনার বাচ্চা আর বউকে মোরব্বা করা হবে। খন্দকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সোজা চলে যাবেন নারায়ণগঞ্জ। ক্রিসেন্ট হোটেলে মামুন হাসান নামে উঠবেন। আমি উঠব পিঙ্ক রোজ হোটেলে। ফোন দিলে আমি আপনার সাথে দেখা করব। দুজন মিলে একসাথে ফিরে আসব এই বাড়িতে। ব্যস, আপনাদের সবাইকে সসম্মানে ছেড়ে চলে যাব আমরা। কিন্তু আপনি কোনও রকম চালাকি করলে বা আমি যদি বুঝতে পারি আপনি কোন রকম কূটকৌশল করছেন তবে...।’
‘ থাক, থাক। আর বলতে হবে না।’ শক্ত মুখে বলল শিশির।
‘আপনার গাড়ি তৈরি।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল কেশু । ‘গিন্নি আর বাচ্চার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়ে যান। সাথে আমিও যাব।’
‘চাপা মারার আর জায়গা পান না মিয়া ?’ খেঁকিয়ে উঠলেন তৈমুর খন্দকার। ‘আপনি ওদের একজন। এখানে এসে ভং ধরছেন।’
শিশির আর খন্দকার বসে আছে মুখোমুখি। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে আমজাদ। অন্য সময় খন্দকার সাহেবের ড্রয়িং রুমটা দেখে মুগ্ধ হতো শিশির । চারদিকে ঢাউস সব কাঠের আলমারি ভর্তি বই আর দামি সব শো- পিস।
‘বিশ্বাস করুন, স্যার ।’ শান্ত গলায় বলল শিশির। ‘ আমাদের দুজন অবস্থা হুবহু এক। আপনার মেয়ে জিম্মি। আর আমার বউ - বাচ্চা। আপনার চেয়ে আমার অবস্থা বেশি খারাপ। আমি আপনার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওদের দিলেই আমার বউ আর বাচ্চা মুক্তি পাবে।’
‘আপনার বাড়িটা কোথায়?’
‘ কোনও রকম তথ্য দিতে পারব না স্যার। এমনকি আমার পরিচয় ও দিতে পারব না। টাকাটা দিয়ে দিন স্যার। দুই কিস্তিতে দিতে হবে। এক হাজার টাকার নোট।’
‘আপনি নিজেও কিন্তু এই ক্রাইমে জড়িয়ে যাচ্ছেন।’ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন খন্দকার।
‘কিছু কেয়ার করছি না স্যার। আমার মাথায় আমার বাচ্চা আর স্ত্রীর নিরাপত্তা ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবছি না।’
‘টাকা দিলেই যে আমার মেয়েকে আমি ফেরত পাব তার নিশ্চয়তা কী?’
‘কোনও নিশ্চয়তা নেই স্যার। ফিরে গিয়ে আমার বউ আর বাচ্চাকে দেখতে পাবো কিনা তাও জানি না। আপনার তো টাকার অভাব নেই স্যার। নিজের মেয়ের জীবন নিয়ে জুয়া খেলবেন কেন?’
‘ওরা কতজন আছে ? দেখতে কেমন ?’
‘বললাম তো, কোন তথ্য দিতে পারব না।’ অসহায় ভাবে বলল শিশির । ‘তবে আপনার মেয়ে এখন পর্যন্ত নিরাপদে আছে।’
‘ঠিক আছে।’ খানিক ভেবে বললেন খন্দকার। ‘আপনি একটু বসুন । ভয় পাবেন না। পুলিশকে ফোন দেবো না।’
পাশের কামরাতেও চলে এলেন খন্দকার আর ম্যানেজার আমজাদ খান।
‘লোকটাকে পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে দাও।’ চিন্তিত সুরে বললেন খন্দকার সাহেব। ‘কালকের মধ্যে তুলে দেবে।’
‘কিন্তু স্যার...।’ কিছু বলতে চাইল আমজাদ ।
‘উহু, লোকটা অপরাধী না বা কিডন্যাপারদের কেউ না। বেচারাকে ফাঁদে ফেলে ব্যবহার করছে ওরা৷ চেহারা দেখো। মারধর করা হয়েছে। আর টাকা নিয়ে ভেগে যাবে তাও না৷ এখন পর্যন্ত অন্য কেউ জানে না সাবিহাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। এই লোক জানে। বেচারাকে বেশ কায়দা করে ফাঁসানো হয়েছে। লিঙ্ক হিসাবে ব্যবহার করার জন্য।’
‘স্যার, লোকটা চেহারা কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে আমার কাছে।’ বলল আমজাদ চিন্তিত সুরে। ‘ মনে হচ্ছে কোথায় যেন দেখেছি উনাকে । মনে হয় পত্রিকায় ছবি দেখেছি।’
দু চোখ কুঁচকে ফেললেন খন্দকার। ‘চিন্তা কর, আমজাদ। মনে করার চেষ্টা করে কোথায় দেখেছ। তাহলে পুরো জট খুলে যাবে।’

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন