তেরো
বাদামি রঙের বড় ক্যানভাসের ব্যাগভর্তি টাকা।
টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে শিশির।
‘এখনও মনে পড়ছে না লোকটা কে কোথায় দেখেছ ?’ চিন্তিত সুরে জানতে চাইলেন তৈমুর খন্দকার।
‘না, স্যার।’ লজ্জিত গলায় বলল আমজাদ। ‘কিন্তু আমি নিশ্চিত খবরের কাগজে দেখেছি লোকটাকে। হয়তো সাংবাদিক বা কলাম টলাম লেখে। এমন কিছু।’
‘চিন্তা করতে থাকো।’ তাগাদা দিলেন খন্দকার। ‘ শোন, হারামজাদারা যদি মনে করে আমি টাকা দিয়ে বসে বসে বাদাম ভাজা খাব তো সেটা মারাত্মক ভুল হবে। পুলিশকে জানাব না ঠিক আছে। কিন্তু ক্রাইম ব্রাঞ্জে এক বন্ধু আছে আমার। নাম, গাউস চৌধুরী। উনার সাথে যোগাযোগ করো । ফোন করবে না । হয়তো তোমার নাম্বারটাও ট্যাপ করে সব শুনছে ওরা। নিজের গাড়ি নিয়ে একা চলে যাও।’
দেড় ঘণ্টা পরের কথা।
খন্দকার সাহেবের স্টাডি রুমে গম্ভীর মুখে বসে আছেন গাউস চৌধুরী। আর আবদুল হাই। রেকর্ড করা ভয়েস মেসেজটা বাজিয়ে শুনলেন , পর পর কয়েক বার। এর মধ্যে খন্দকারের মুখ থেকে বার তিনেক ঘটনাটা শুনে ফেলেছেন।
‘তাহলে এই ব্যাপার ?’ মন্তব্য করলেন গাউস চৌধুরী। ‘ টাকা যে কালেক্ট করতে এসেছিল , তাঁর চেহারার বর্ণনা করুন।’
আমজাদ বলল।
‘সিসি ক্যামেরায় যে ছবি এসেছে লোকটার সেটা স্পট না।’ খানিক রেগে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘মাথায় ক্যাপ পরে এসেছে । তারমানে চালু পয়সা।’
‘আব্দুল হাই , আপনি সব কটা বিখ্যাত পত্রিকা অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখুন তো এই রকম চেহারার কোনও সাংবাদিক বা অন্য কোনও কর্মচারী আছে কিনা।’ হুকুম দিলেন গাউস চৌধুরী । ‘ তার আগে সিসি ক্যামেরার ছবি আর আমজাদের বর্ণনা শুনে স্কেচ আঁকিয়ে নিন আমাদের আর্টিস্টের কাছ থেকে। সূত্র একটা ঠিকই পাব।’
‘স্যার আমরা ওই লোকের গাড়ির নম্বর টুকে রেখেছি।’
এতক্ষণে তথ্য দিল আমজাদ।
নাম্বার দেখেই হাসলেন গাউস চৌধুরী। ‘ ওটা ভুয়ো নম্বরপ্লেট। চালু গ্যাং । তা আপনার কি মনে হচ্ছে যে আসল নম্বর প্লেটের গাড়ি নিয়ে আপনার বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করবে? অ্যাঁ ? আর কোনো তথ্য ?’
‘যে লোকটা টাকা নিয়ে গেছে ওর চেহারায় মারের দাগ ছিল। কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, হাতে সাইকেলের চেন প্যাঁচানো এক গুন্ডা নাকি ওঁকে মারধর করেছে। এটা কোন তথ্য হতে পারে?’ বললেন খন্দকার।
‘এমন কাউকে চেনেন নাকি?’ আব্দুল হাইয়ের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন গাউস চৌধুরী।
‘এটা খুব পুরনো স্টাইলের।’ মুখ গোমরা করে বলল আবদুল হাই। তার পরেও প্রায় একশোর বেশি হারামজাদাকে চিনি। বেশ কিছু চ্যাংড়া মাস্তান সাইকেলের চেন দিয়ে মারামারি করে তৃপ্তি পায়। পিস্তলে ঝামেলা থাকে। সবসময় যোগাড় করা ও যায় না। সাইকেলের চেইন বহন করলেও আইনত সেটা অস্ত্র না। তাই আর কী ।’
‘টাকার পরিমাণ অনেক বেশি ।’ চিন্তিত সুরে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘রেকর্ডের যে গলা শুনতে পেলাম সেটা বেশ বয়স্ক বুড়ো মানুষের গলা । বাচনভঙ্গি পুরনো দিনের অপরাধীদের মতো। অনেকটা পুরানো দিনের ডন ইমদাদুল , হাজি সুফিয়ান, আঙুল কাটা আজাদ , বগা নজরুল , আকবর শেঠ, টোকাই মিজান এদের মত। একদম পেশাদার। একদম নতুন কোনও টিম বলে মনে হচ্ছে না। আর আমার কেন যেন বারবার কেশু হাওলাদার কথা মনে পড়ছে। অবসর নেওয়ার আগে শয়তানটা বড় কোনও খেলা খেলতে চাইতে পারে৷ যাতে বাকি জীবনটা আরাম আয়েশে কাটাতে পারে। কাকতালীয় হলেও সত্য আমরা কিন্তু মানিক আর কেশুকে একসাথে দেখেছি। আবার এই দুই নিস্পাপ ভদ্রলোক একই সাথে গায়েব হয়ে গেছে। কোনও খোঁজ- খবর নেই। বড্ড বেশী কাকতালীয়। ওদের ব্যাপারে ও খোঁজ নাও।’
পিচ্চির ট্যাঁ ট্যাঁ কান্নার শব্দে জ্ঞান ফিরে পেল মেঘা। প্রথম কয়েক মিনিট বুঝতে পারল না কী হয়েছিল আসলে। সব মনে পড়তেই দৌড়ে বারান্দায় গেল। রুইতন বসে বসে পুরনো সিনে ম্যাগাজিন পড়ছে।
‘সর্বনাশ হয়ে গেছে।’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মেঘা। ‘তোমার ভাইকে থামাও।’
‘আমার অত ঠ্যাকা নেই ।’ নিলিপ্ত ভাবে বলল রুইতন । মন দিল ম্যাগাজিনে।
অনেক অনুনয় করে বুঝল , লাভ হবে না । দৌড়ে চলে গেল পাশের কামরাতে। যেখানে পোকা সাবিহাকে নিয়ে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। গায়ের জোরে দরজায় আঘাত করতে লাগল সে। চিৎকার করে বলছ, ‘সাবিহা তুমি ঠিক আছো ?’
ভিতরে নীরবতা।
ভয় পেয়ে গেল মেঘা। পোকা হারামজাদা মেয়েটাকে খুন করে ফেলে নি তো ?
বেশ খানিক নীরবতা। ভেতর থেকে অস্বাভাবিক শান্ত গলায় সাবিহা বলল, ‘সব ঠিক আছে। আপনি চলে যান।’
প্রথমে মনে হল ভুল শুনেছি মেঘা।
পর মুহূর্তে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
পরপর কয়েকটা ফোন পেলেন গাউস চৌধুরী।
যে পুলিশ অফিসার সাবিহার পিছন নিয়েছিল সে রুইতনের চেহারার বর্ণনা দিল৷ এবং জানালো পরে দেখে চিনতে পারবে। আর আমজাদ খান ফোন দিয়ে বললো, পুরনো খবরের কাগজে আর ইন্টারনেটে ছবি সে শিশিরকে চিনতে পেরেছে। ব্যাটা একজন লেখক।
‘ঠিক আছে, ওর প্রকাশকদের কাছে খোঁজ নিয়ে বাড়ির ঠিকানা বের করো।’ হুকুম দিলেন গাউস চৌধুরী। ‘আর খন্দকারের বাড়ির আশপাশে দশ মাইলের মধ্যে যত হোটেল আছে, চোখ রাখো। মাছ ধরা পড়তে পারে।’
‘এক কাপ কফি দেবেন ?’ রান্না ঘরে ঢুকে বলল সাবিহা।
চমকে ফিরে তাকাল মেঘা। ‘তুমি ঠিক আছো?’
লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল সাবিহা।
অদ্ভুত নরম স্বরে বলল, ‘ভাবী আসলে দুই কাপ কফি দিন। আমার জন্য আর পোকার জন্য। পোকা গোসল করছে। ঠিক করছি আমরা বিয়ে করব।’
‘তোমার মাথা ঠিক আছে ?’ বোকা বোকা ভাবে বললে মেঘা। কিছুই মাথায় ঢুকছে না ওর।
‘আর কী সব আবোল তাবোল বলছ তুমি ?’ পরিস্থিতি ভুলে চেঁচিয়ে উঠল মেঘা। ‘লোকটা একটা পশু। আমাকে মারধর করেছে। তোমাকে অপমান করছে। আর তুমি কি না...।’
‘না ভাবি।’ স্বপ্নিল ভাবে বলল সাবিহা। ‘পোকা আমার স্বপ্নের পুরুষ । সারাজীবন চেয়েছি অমন দুর্দান্ত মারকুটে একটা লোককে বিয়ে করব । পোকা আমার বোরিং জীবনে রাজপুত্রের মতো এসে হাজির হয়েছে। ধূমকেতুর মতো...।’
‘ব্যাপার বউদি মণি ?’ বাথরুমের দরজা খুলে বের হয়ে এল পোকা । কোমরে তোয়ালে জড়ানো। খালি গা। ‘কেন আমার প্রেমিকার মনে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন ? নাকি চান আপনার মাথা টয়লেটের কমোডে ঠেসে ধরি ? বাবুটাকেও করতে পারি...।’
আতঙ্কে কামরার বাইরে দৌড়ে চলে গেল মেঘা।
ও ঈশ্বর কী হচ্ছে এ সব?
শিশির কোথায় তুমি ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন