চার
ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি।
ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুইতন। ঠোঁটে সিগারেট। বড় বড় কালো চোখ দুটো স্থির রাস্তার উল্টো দিকে। ওখানে হোয়াইট হাউস ক্লাব। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল ওকে। পছন্দ মতো মক্কেল পেল রাত তিনটার দিকে । লোকটা মাতাল। মাতাল বা আধ মাতাল খদ্দের ওর পছন্দ।
সাধারন বাঙালি মেয়েদের চেয়েও রুইতন খানিকটা লম্বা। লোভনীয় শরীর। সরু কোমর। লম্বা পা। চামড়ার কালো প্যান্ট পরে আছে। উপরে টাইট কালো টি শার্ট।বৃষ্টির জন্য আজ গায়ে চাপিয়েছে কালো চামড়ার একটা উইন্ডচিটার। মুখের গড়ন লম্বাটে। চোয়ালের হাড় উঁচু। চোখ দুটো বড় বড়।ঘন কালো মনি । নাকটা বড্ড মিষ্টি।
ওকে সুন্দরী বলবে না কেউ। সেই অর্থে না। মনোহরা, সেটাও না। তারপরও শুধুমাত্র ওর দু চোখ দেখেই যে কোনও পুরুষ ওর প্রেমে পড়ে যাবে । চুম্বকের মতো অদ্ভুত রকমের একটা আকর্ষণ আছে মেয়েটার মধ্যে।
কিন্তু লাভ নেই।
রুইতনও ওর ভাই পোকার মতো নিষ্ঠুর । মায়া- দয়াহীন। জন্মগত ভাবেই ওরা মিথ্যুক, অসৎ আর বিশ্বাসঘাতক। তবে একটা জিনিস ভাল, মস্ত বড় একটা গুণ আছে ওদের। আপনি যদি সেটা গুণ হিসাবে ধরেন আর কি ! ওরা ভাইবোন, একে অপরের জন্য জান দিয়ে ফেলতে পারে ।
সারাক্ষণ প্শুর মত নিজেদের মধ্যে নিজেরা ঝগড়া করে। কিন্তু বিপদে পড়লে এক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুর উপর ।
একে অপরের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। যা উপার্জন হয় দুজনে সমান ভাগ করে নেয়। টাকাটা যেই কামাক না কেন ।
এই মুহূর্তে রাস্তার অন্য পাশে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পোকা। বোনের চেয়ে কয়েক ইঞ্চি লম্বা সে। দেখতে বোনের মত হলেও নাকটা ভাঙ্গা। ছোটবেলার মারামারি করতে গিয়ে ভেঙেছে । চোখের নীচ থেকে চোয়াল পর্যন্ত লম্বা কাটা দাগ আছে একটা।
মাস কয়েক আগে , অসতর্ক অবস্থায় আক্রমণ করে ক্ষুর বসিয়ে দিয়েছিল পুরানো এক শত্রু। দাগ শুকিয়ে চেহারাটা ভয়ংকর করে তুলেছে। লোকজন দেখলে চমকে যায়। ব্যাপারটা ভীষণ উপভোগ করে পোকা।
আর যে ব্যাটা ক্ষুরের দাগ রেখে গেছে ?
ছেড়ে দেয়নি দুই ভাই বোন। মেরে ল্যাংড়া বানিয়ে দিয়েছে। চোখেও দেখে না ভালমত। বাকি জীবন রাস্তার মোড়ে বসে ভিক্ষা করতে হবে।
হোয়াইট হাউজ ক্লাবের ভেতর থেকে রোগা মত একটা লোক বের হয়ে এলো। অস্থির ভাবে ডানে বামে তাকাতেই চোখাচোখি হল রুইতনের সাথে। পকেটে হাত রেখে গট গট করে হাঁটতে লাগল লোকটা।
অপেক্ষা করতে লাগল রুইতন।
কেউ না কেউ ওর কাছে আসবেই। সময় যতই লাগুক।আসবেই। এ এক অচিন মাকড়সার জাল।
একে একে লোকজন বের হচ্ছে ক্লাব থেকে। গাড়ি বা রিকশায় উঠে চলেও যাচ্ছে।
রুইতন অপেক্ষা করছে।
তখনই ছোট খাট বেঁটে ধরনের একটা লোক বের হয়ে এলো। গায়ে রেইন কোট। মাথায় কাপড়ের তোবড়ানো টুপি।
নতুন সিগারেট ঠোঁটে দিয়ে ক্লিক করে লাইটার জ্বালাল রুইতন। লোকটা যাতে ওর দিকে ফিরে তাকায়। লাইটারের আলোতে দেখতে পায় ওর মার কাট চেহারাটা।
কাজ হয়েছে।
কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে রাস্তা পাড় হয়ে ওর দিকেই এল লোকটা।
অভিজ্ঞ চোখে রুইতন জরিপ করে ফেলল- লোকটার জুতা আর রেইন কোট দামি। সোনার বেল্ট লাগানো ঘড়ি ।
লোকটার চেহারা হুবহু শেয়ালের মত লম্বাটে। রোদে পোড়া। বেঁটে। কেমন গ্যাল গ্যালে হেসে বলল - ‘ কি ব্যাপার ডার্লিং ? বন্ধু কালাচানের জন্য অপেক্ষা করছ নাকি ?’
পেশাদারী একটা হাসি বিলিয়ে রুইতন বলল, ‘কালাচান লাগবে না। সামনে শ্যামসুন্দর দাঁড়িয়ে আছে। চল।’
হাসল বাঁটুল। ‘ যেই বৃষ্টি হচ্ছে । একটু নিরিবিলি আর প্রাইভেট জায়গা না হলে রসিক নাগর হওয়া যায় না। চল যাওয়া যাক। সারারাত রস- কষ- সিঙ্গারা আর বুলবুলি মার্কা আলোচনা করব আমরা।’
রুইতন হেসে আড়মোড়া ভাংল । যাতে ওর শরীরের উপরের অংশ লোকটার চোখে পড়ে ভাল করে। ‘কোথায় যাওয়া যায় বলতো ?’
‘কোন হোটেলে হলে ভাল হয়।’ হাসল বাঁটুল । ‘ তোমাকে খুশি করার মতো যথেষ্ট টাকা আছে পকেটে । তা তোমার পরিচিত কোনও হোটেল আছে নাকি? একটু নির্জন জায়গায় হলে ভাল হয়। লোকজন যাতে না দেখে আর কি। ’
ঘটনা খুবই সহজে এগোচ্ছে ।যেমনটা ওরা চায়।
একটু ইতস্তত করার ভান করে রুইতন বলল, ‘ আমার পছন্দের পরিচিত একটা জায়গা আছে। একদম নিরাপদ । চলো।’
সিগারেটে টোকা দিয়ে দূরে ছুড়ে মারল রুইতন। এটা ইঙ্গিত ৷ রাস্তার উল্টাদিকে অন্ধকারে দাঁড়ান পোকা যেন বুঝতে পারে , ওরা কোথায় যাচ্ছে।
খদ্দের লোকটার গাড়ি আছে। কালো রঙের বুইক । দুজনে বসল। মক্কেলের পকেটে কেমন টাকা থাকতে পারে সেটা নিয়ে ভাবছিল রুইতন। ঘড়িটার দাম নিয়েও বেশ
আশাবাদী।
মাত্র পাঁচ মিনিটেই নদী পাড়ের সস্তা ভাঙ্গা ছায়াময় একটা হোটেলে হাজির হল ওঁরা৷।
রিসেপশনের বসে থাকা দাড়িওয়ালা, ময়লা বুড়ো লোকটা রুইতনের দিকে চেয়ে চটকদার ভাবে চোখ টিপল । জবাবে পাল্টা চোখ টিপে জবাব দিল রুইতন । ওরা দুইজনে এর মানে জানে, কয়েক মিনিটের মধ্যে পোকা এসে হাজির হবে।
বুড়োকেও সামান্য ভাগ দিতে হয়।
দোতলার একটা কামরা ওদের। এইসব কাজ চলবে টাইপের সাইজ। ডাবল বেড। কাঠের খটখটে দুটো চেয়ার। কমোড হলুদ হয়ে যাওয়া টয়লেট। আর মামুলি রঙ জ্বলা কার্পেট মেঝেতে।
হাসিমুখে বিছানায় বসল রুইতন।
বাঁটুল ওর রেইনকোট খুলে দরজায় গাঁথা পেরেকে ঝুলিয়ে রাখছে।
‘ আমার গিফট চাই ডার্লিং।’ হাত পাতলো রুইতন। ‘ তৈরি তো ? ঘণ্টায় তিন হাজার টাকা নিই আমি ।’
দাঁত বের করে মজাদার ভঙ্গিতে হাসল বাঁটুল। সোজা গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে । রংজ্বলা পর্দা সরিয়ে নীচের বৃষ্টি ভেজা পথঘাট দেখছে। রাস্তার উল্টো দিকে তখন হোন্ডা থামিয়ে সতর্কভাবে নামছে পোকা। এই দিক ঐদিক চেয়ে রাস্তা পাড় হয়ে হোটেলের দিকে আসছে।
‘কী দেখছ ওখানে ? আমি তো এখানে।’ তীক্ষ্ণ গলায় বলল রুইতন। ‘এখানে এসো। আমার গিফট চাই।’
‘কোনও গিফট নেই তোমার জন্য ।’ মজাদার ভঙ্গিতে হাসল বাঁটুল। ‘গিফট তোমার ভাইকে দেব ডার্লিং।’
চমকে গেল রুইতন। ‘ আমার ভাই ? কী আবোলতাবোল বলছ ?’
‘ গত সপ্তাহে আমার জিগরি দোস্ত আতিকুল্লাহকে তুলে এনেছিল তোমরা ।ওর সব টাকা পয়সা রেখে দিয়েছো। তাতে ও সমস্যা ছিল না। তোমার হারামজাদা ভাই পোকা মারধর করে আমার দোস্তের হাড়গোড় ভেঙে দিয়েছে। এবার দেনা শোধের পালা।’
বাঁটুল লোকটাকে আগ্রহের সাথে নতুন করে দেখল রুইতন । ভঙ্কুর শরীর। তেমন পোক্ত না। সমস্যা হবে না । এক ঘুষিতে কাজ শেষ করে ফেলবে পোকা।
‘এই বুড়ো বয়সে ফালতু ঝামেলায় যাবেন না বাঁটুল দাদা।’ বলল রুইতন। ‘ আমরা ঝামেলা চাই না। ঘড়ি আর মানিব্যাগ আমাদের হাতে দিয়ে কেটে পড়ুন।’
বাঁটুল লোকটার চেহারায় হাসি উপচে পড়ছে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি উপভোগ করছে সে।
‘ পোকা গ্রুপ, আমার চোখে তোমার বাচ্চা পোলাপান।’ বলল বাঁটুল । ‘ বহুদিন ধরে একই খেলা খেলেছ । আজ শেষ। খানিকটা সবক দেয়া দরকার তোমাদের।’
তখনই ধিরিম করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল পোকা।
সাধারণত সে যখন কামরাতে ঢোকে তখন রুইতনের জামা কাপড় খোলা থাকে। আর বিছানায় শিকারের সাথে শুয়েই থাকে। মঞ্চ সাজানো থাকে । রাগি ভাই হিসাবে পোকার পক্ষে সুবিধা হয় তর্জন গর্জন করার।
এইবার ভিতরে ঢুকে যখন দেখল , রুইতন পরিপাটি পোশাক পরে বিছানায় বসা , বেঁটে লোকটা ঘরের মাঝখানে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তখন বেশ থতমত খেয়ে গেল।
‘এসো পিতলা ঘুঘু… নাকি পিতলা পোকা ?’ বাঁটুল লোকটা বলল, ‘ তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার জন্য আইটাই করছে মনটা।’
একে অপরের দিকে তাকালো পোকা আর রুইতন।
‘ঠিক আছে চান্দু।’ কামরার দরজা বন্ধ করে মুঠি পাকিয়ে সামনে এগোতে এগোতে বলল পোকা। ‘ ঘড়ি আর মানিব্যাগ বের কর জলদি । বাসায় গিয়ে ঘুমাতে হবে আমাকে।’
‘ আমার অবশ্য অত তাড়া নেই।’ হাসিমুখে বলল বাটুল। এত কিছু হচ্ছে কিন্তু মোটেও নার্ভাস হয়নি লোকটা। মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করছে। ‘মানিব্যাগ চাও ? দিচ্ছি।’
পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঝট করে রিভলভার বের করে সোজা পোকার কপালের দিকে তাক করল।
‘এটা মনে হয় আশা করনি পোকা ?’ হাসল বাটুল ।
নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে রইল পোকা । ‘খামখাই নাটক করছেন আপনি। পরে কিন্তু সামাল দিতে পারবেন না। ’
ধীরে ধীরে লোকটা পিছন দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল রুইতন । লক্ষ্য রাখছে, পোকাও তৈরি হচ্ছে ।
আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল পোকা । তখনই গুলি করলো লোকটা। কিন্তু গুলির বদলে পিস্তলের ভেতর থেকে বের হল তরল অ্যামোনিয়া।
হাঁটু ভেঙে মেঝেতে পড়ে গেল পোকা । যন্ত্রণা পশুর মতো কাতরাচ্ছে।
রুইতন দাঁড়ানোর আগেই ওর দিকে অ্যামোনিয়ার রিভলবার তাক করে ট্রিগার চাপল বাঁটুল। দুহাত দিয়ে চোখ দুটো বাঁচালো মেয়েটা। কিন্তু হাত দুটো অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝে পুড়ে গেল। বিছানা থেকে মেঝেতে পড়ে চিতকার করতে লাগল রুইতন ।
সারা ঘর ভর্তি অ্যামোনিয়ার তীব্র গন্ধ। আর ধোঁয়া।
নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করল বাঁটুল। অ্যামোনিয়ার বিদঘুটে রিভলবারটা পকেটে ভরে দরজার গেঁথে রাখা পেরেকটা উপর থেকে রেইনকোট তুলে গায়ে চাপাল।শান্ত ভাবে টুপিটা বাতাসে ঝেড়ে মাথায় দিয়ে ফুর্তিবাজ মানুষের মত হাসিমুখে পোকা গ্রুপের দুই সদস্যকে কাৎরাতে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর গুনগুন করতে করতে নীচে চলে গেল। শান্ত ভাবে গাড়িতে উঠে হারিয়ে গেল বাদলা ভরা রাতের আঁধারে।
বেঁটে লোকটা কে ? কার শোধ তুলেছিল ওদের উপর ? সেই সব কখনই জানতে পারেনি পোকা গ্রুপের দুই সদস্য।তবে অনুমান করে নিয়েছিল ওদের শিকারদের মধ্যে কেউ ভাড়াটে লোক দিয়ে কাজটা করিয়েছিল।
বা সবই হয়তো প্রকৃতির প্রতিশোধ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন