আর দশটা সাধারন গলির মতই, বিচিত্র কিছু নেই।
সামনে একটা টঙের দোকানে পান আর সিগারেট বিক্রি হয়। মোটা মত এক লোক দোকান চালাচ্ছে । সামনে পানগুলো রাখা। লাল রঙের ভেজা কাপড় দিয়ে পানগুলো ঢেকে রাখা। যাতে রসালো থাকে । শুকিয়ে বাকরখানি হয়ে না যায়। ঝকঝকে পেতলের ঘটি থেকে খয়ের নিয়ে পেতলের চামচ দিয়েই যত্ন করে মাখাচ্ছিল লোকটা।
পাশে দাঁড়িয়ে হারাধন বাবু জিজ্ঞেস করলেন , ‘ আজ্ঞে এখানে নাকি কোথায় টাইম মেশিন ভাড়া দেয় ?’
‘ সামনের গলির পরের গলি। তারপর ডাইনে মোচড় দেবেন ।’ চোখ মুখ কুঁচকে হারাধন বাবুর দিকে তাকাল লোকটা।
হন হন করে হাঁটা ধরল হারাধন বাবু। পানওয়ালার বর্ণনা মত মোচড় দিয়েই পেয়ে গেল অফিসটা। সাদামাটা অফিস। তেমন এলাহি কিছু মনে হয় না। একটা সাইন বোর্ডে লেখা - ড্রিম ট্র্যাভেল।
আর কিছু লেখা নেই।
গেইটের সামনে ইউনিফর্ম পরা দারোয়ান ছিল। হারাধন বাবুর আঙ্গুলের ছাপ পরীক্ষা করে ভেতরে ঢুকতে দিল। আঙ্গুলের ছাপ বলে হারাধন বাবুর কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। অপরাধ করে পালিয়ে যাবার জন্য টাইম মেশিন ভাড়া নিচ্ছেন না। অফিসের ভেতরটা ঠাণ্ডা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত । মুশকো একজন বসে আছে। প্রায় দরজার সমান চওড়া। মাথা ভর্তি টাক। হারাধন বাবুকে দেখে আগ্রহ ভরে তাকাল লোকটা।
‘ আজ্ঞে টাইম মেশিন ভাড়া দেন তো ?’ জানতে চাইল হারাধন বাবু।
‘ জি ওটাই আমাদের পেশা। আমার নাম সাফাত আলী মৃধা। আমিই ম্যানেজার। ভাড়া নেবেন ? ’
‘ ঘণ্টা কত করে ?’
‘ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া দেয়া হয় না। কারন মেশিনে করে আপনি যেখানেই যে সময়েই যান যখন ফিরে আসবেন সময় ওটাই থাকবে। সময়ের কোন হের ফের হবে না।যাবেন ? ’
‘ যাবার জন্য তো আসা। কী কী করতে হবে ?’
‘ তেমন কিছু না , একটা ফর্ম পূর্ণ করতে হবে। টাকা পেমেন্ট করবেন। আর ওখানে গিয়ে কিছু নিয়ম মেনে চলবেন।’
‘ যেমন ?’
‘ অবশ্যই ফেরত আসবেন। গিয়ে যদি থেকে যান তবে মারাত্নক সমস্যা হবে। অতীতে গিয়ে থেকে গেলে আপনার বংশধরদের বা পরিবারের জন্য সমস্যা দেখা দেবে বা আপনার আচরণে জন্য ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সমস্যা হবে । আমাদের চেনা ছক নষ্ট হয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ গিয়েও কিছু করলে সমস্যা হবে। এই জন্য অনেকে টাইম মেশিনে করে পালিয়ে যায়। ফিরে আসতে চায় না। সরকারি লোক গিয়ে তখন ধরে নিয়ে আসে। সরকারি লোক আপনাকে ধরে নিয়ে আনলে সারাজীবন পস্তাবেন। জিনিসটা বিরক্তকর। ’
‘ একমত।’
‘ আর অতীতে গিয়ে কোন ঘটনার সাথে জড়াবেন না। যাতে ভবিষ্যতে সেটার প্রভাব পরে। কোন গাছ পালা বা পাথর আনতে যাবেন না সুভেনিয়র হিসাবে। কঠোর আইন। আনলেই জেলে দেয়া হবে। কারো সাথে ঝগড়া করবেন না। দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করবেন না। কোন কিছুর সাথেই জড়াবেন না। ঠিক আছে ?’
মাথা নাড়লেন হারাধন বাবু। কতগুলো কাগজ দেয়া হল। সাইন করে নিলেন । উত্তেজনায় ধুকপুক করছে বুকের ভেতরটা। বুড়ো বয়সে অ্যাডভেঞ্চার করার মজা আলাদা।
টাইম মেশিনটা দেখতে আহামরি কিছু না।
লোহার চেয়ারের মত। প্রচুর যন্ত্রপাঁতি ঠাসা। গিয়ারের মত বেশ কিছু চাকা। বসে পড়লেন হারাধন বাবু। উনার বাম হাতে ঘড়ির মত একটা কী যেন বেঁধে দিলেন হেকমত আলী মৃধা।
‘ সাল তারিখ আপনি ফিট করবেন।’ ব্যাখ্যা করলেন সাফাত আলী। ‘ ফিরে আসতে চাইলে কবজির এই ঘড়িতে চাপ দিলেই চলে আসবেন। ‘ একদম সহজ। রোজ হাজার মানুষ যাচ্ছে। ভয়ের কিছু নেই। যন্ত্রপাতির গোলমালের জন্য অন্য কোন সময়ে ফেঁসে যাবেন না। গেলে সরকার আপনার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেবে।’
‘ আমার পরিবার নেই।’
‘ সেটা আরও ভাল কথা।’
টাইম মেশিনে বসলেন হারাধন বাবু। একটু ভয় ভয় করছে। ছোট বেলায় একবার দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাবার পর অমন ভয় পেয়েছিলেন।
মাথায় হেলমেটের মত যন্ত্র ফিট করে দিলেন সাফাত আলী। ‘ রেডি ?‘
মাথা নাড়লেন হারাধন বাবু। চালু হয়ে গেল যন্ত্রটা। সাফাত আলীর চোখের সামনে গায়েব হয়ে গেলেন হারাধন বাবু।
ধীরে সুস্থে চেয়ারে এসে বসলেন সাফাত আলী। লাঞ্চ বক্স খুলে ডিম ভাঁজা আর পরোটা বের করে খাওয়া শুরু করলেন। খাওয়া শেষ করে যখন ভাবছেন কফি নেবেন কিনা তখনই মৌমাছি উড়ে যাবার বিন বিন শব্দের মত করে টাইম মেশিন চালু হয়ে গেল। ফিরে দেখেন শুয়ে আছেন হারাধন বাবু।
‘ যাক ফিরে এসেছেন । কেমন লাগল ?’ হাসি মুখে জানতে চাইলেন সাফাত আলী মৃধা ।
বোকা বোকা ভাবে উঠে বসলেন হারাধন বাবু । ‘ এক গ্লাস জল হবে ?’ ভাঙ্গা গলায় বললেন।
‘ নিশ্চয়ই । সবারই এমন হয়।’
বেল চাপতেই এক লোক হাজির হল ।
‘ পানি আর নাস্তা নিয়ে এসো উনার জন্য ।’ অর্ডার দিলেন সাফাত আলী । ‘ তা কী কী দেখলেন ?’
‘ অনেক কিছু রে ভাই। সে এক অশৈলী অভিজ্ঞতা। কত জায়গায় গেলাম। তবে আমার সামনেই একটা দুর্ঘটনা দেখলাম।’
‘ সে কি ? কার দুর্ঘটনা ? কোথায় ?
‘ কোলকাতায় গিয়েছিলাম । ১৯৫৪ সালে। চোখের সামনে দেখি মোটা মত একটা লোক ডাব নিয়ে হেঁটে যাছে। একদম ট্রামের তলায় পড়লো লোকটা। ইচ্ছা করলেই ঠেলা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারতাম।
‘কত তারিখের ঘটনা ?’
“ অক্টোবরের ১৪।’
‘ আরে ওটা তো জীবনানন্দ দাশ !’ বিলাপ করে উথলেন সাফাত আলী।
‘ হ্যাঁ, আমি দেখা মাত্র চিনেছি।’ হাসি মুখে বললেন হারাধন বাবু।
‘ কবিকে বাঁচালেন না ?’ হাহাকার করে উঠলেন সাফাত আলী।
‘ আপনিই না বলেছেন কিছু না করতে ।যাতে ভবিষ্যৎ বদলে না যায় ।’
‘ আরে গাধা তাই বলে...। কিছু পরিবর্তন দুনিয়ার ভাল আনে। আর আপনি কি না ...।’
‘ আসলে আপনার কথা শুনেই নিজেকে বিরত রেখেছিলাম। নইলে হাত দিয়ে একটু ধাক্কা দিলেই বেঁচে যেতেন উনি।’
‘ আপনার মত গাধাগুলো যেমন টাইম মেশিন ব্যবহার না করে আর এমন একটা আইন পাস করা হোক । দোয়া করি ।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন সাফাত আলী।
(শেষ )

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন