সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঈশ্বরের চোখ

 ঠুক ঠুক করে লাঠিতে শব্দ করতে করতে ওরা আসতো

 

কত বয়স বলা মুশকিল লুঙ্গি আর আইভরি রঙা পাঞ্জাবি পরনের মুখ ভর্তি দাড়িগোঁফ মাথায় টুপি  ওদের আর্থিক অবস্থার তুলনায় জামা কাপড় বেশ পরিষ্কার দুইজনের হাতেই লম্বা লাঠি কাধে কাপড়ের ঝোলা ওরা দুই ভাই , চেহারায় অদ্ভুত মিল একই ছাঁচে বানানো ছাপা সন্দেশের মত

 

বড় ভাই সামনে থাকে হাতে অ্যালুমিনিয়ামের চ্যাপ্তা থালা  শিশুর হাসির মত টোল খাওয়া থালা  উপরে পাঁচ পয়সা আর দশ পয়সা যা আজকাল ডাইনোসরের মত বিলুপ্ত বা মানুষের মমতার মত হারিয়ে গেছে

বড় ভাই গান গাইত-

 

 দেখ আমিনা মায়ের কোলে

দোলে শিশু ইসলাম দোলে,

কচি মুখের শাহাদাতের বানী সে শোনায়।। 

 

ছোট ভাইটা তাল ধরত সাথে সাথে দুইজনেই অন্ধ মুখে বসন্তের দাগ ভিক্ষা করার সময় কেউ জানতে চাইলে বলতো- শীতলা মায়ের দয়া হইছিল ছোট বেলায় দুই ভাই অন্ধ হইয়া গেছি   

সপ্তাহে একদিন আসতো 

চলে যেত 

 

অনেকক্ষন কানে ঠুক ঠুক শব্দ বাজত 

খারাপ লাগত দুই ভাইয়ের জন্য  কী  কষ্ট !

 

 বড় ভাইটা আবার ছোটটাকে খেয়াল রাখে কোন বিরান দালান বাড়ির  বাইরে বসে শুকনো রুটি আর পানি ভাগাভাগি করে খেত অন্ধ দুই ভাই 

ঠিক বিশ বছর পর আবার দেখলাম ওদের

 কবির ভাষায় কুড়ি বছর পর আবার 

 

 

অন্য মহল্লায় এক ধুলি মাখা পথে বসে আছে দুই ভাই অনেক বুড়ো হয়ে গেছে জামা কাপড় আগের মত দাড়ি গোঁফ বেশির ভাগ সাদা ক্লান্তি আর জরা বাসা বেঁধেছে, মুখে শরীরে  বুড়ো বড় ভাই,  তার বুড়ো ছোট ভাইকে খাবার দিচ্ছে

 

 

 পুরানো এই শহর কত বদলে গেছে নিজেই চিনতে পারি না নগরের অলিগলি দালান বাড়ি  মনিহারি দোকান  বদলে গেছে সড়কের নাম  হারিয়ে গেছে পদ্মপুকুর 

 দুই অন্ধ ভাই টিকে আছে,  গ্রামফোনের বাতিল রেকর্ডের মত

 দূর থেকে দেখলাম অনেক সময় ধরে 

ঢাকা শহরে এক অন্ধ মা - কে দেখেছিলাম তিন বাচ্চা নিয়ে ভিক্ষা করে হোটেলের বাইরে পচা ভাত খাচ্ছে,  মাটির সানকিতে করে অন্ধ মা নিজে কম খেয়ে খুঁজে খুঁজে বাচ্চাদের মুখে খাবার ঠুসে দিচ্ছিল এই সব  মস্ত অজগরের মত   কালো পিচের মত রাস্তা পার হয় কেমন  করে ? যেখানে গো গো করে ছুটে যায় দানব ট্রাক কত মতলববাজ মানুষ  নিত্য করে  আনাগোনা

 

 

মিন্নত আলী মাজারের  খানিক  দূরে,  ডি আই টি মার্কেটের বাইরে ভিক্ষা করে অন্ধ এক তরুণ কোলে ফুটফুটে বাচ্চা একটা মেয়ে বয়স তিন বা  চার ওটা আসলে একটা পরীর বাচ্চা ভুলে ময়লা পৃথিবীতে চলে এসেছে

 

 বিকেলে সেই একই পথে ভিক্ষা করে ফর্সা মত অন্ধ একটা যুবতী  পিচ্চি ধরণের ওরা কারা জানি না তবে একদিন যুবতীর কোলে সেই পরীর বাচ্চা দেখলাম চেহারায় মিল দেখে বুঝলাম ওদের বাচ্চা 

খোঁজ নিলাম 

যা ভেবেছি

 

 দুই অন্ধ ভিক্ষুক মায়াবী টানে বাঁধা পড়েছে প্রণয়ের শিবিরে বিয়ে করেছে ওদের ভালবাসা  সেই পরীর বাচ্চাটাতবে ভাগ্য কত ভাল বাচ্চাটার চোখ হয়েছে নক্ষত্রের মত উজ্জ্বল সে চোখ বড় বড় করে চারিদিক দেখে দেখে লোকজন বাজার সওদা আর সওদাগর 

ওদের জীবন নিয়ে ভাবি বাপ মা পালা করে দুই বেলা ভিক্ষা করে একজন বাচ্চা বহন করে অপর জন গেহস্থালী কাজ করে অন্ধ চোখেই রান্না করে বাজার করে দিনমান পার করে ওদের চোখের  মণি সেই বাচ্চটা যার চোখে ওরা দেখে দুনিয়ার সব কিছু 

 

 মেয়েটা বড় হয়ে অন্ধ বাপ মা কে লালন পালন করবে তো ? নাকি বিয়ে হলে চলে যাবে ? আমি কেন ভাবি অবাস্তব ধরে নেই,  বাচ্চাটা ওদের দেখবে পুষবে

 

নিজের কত অপূর্ণতা নিয়ে দিনমান অভিমান করি ঈশ্বরের কাছে 

হেন হলে ভাল হত তেন হলে ভাল হত  

 

আজ এই সুযোগে ধন্যবাদ দিতে চাই উনাকে 

 

সমুদ্র মেঘলা এই পৃথিবীর কত সুন্দর জিনিস দেখেছি

 

আমার  মায়ের মুখ, শিশুর হাসি, সূর্যমুখী ফুলের মত সুন্দরীদের প্রিয়মুখ, যারা আমাকে ভালবাসত

 

  হয়তো আজও বাসে। 

 

দেখেছি ,  ময়ূরকণ্ঠী রাতে সাগরের জলে জেলিফিসের দেশান্তর কোজাগরী রাতে হলুদ রেণু রেণু     জোসনায় ভিজতে থাকা বিরান বনভূমি পাহাড়ের উপরে ঘন সবুজ   পাইনের জঙ্গল। আফ্রিকান কমলা রোদ   সবুজ ঘাসের বন। তুষার ঝড় লাল টকটকে বনমোরগ। নীল কুয়াশা।কচি ঘাস। বর্ষার জলে ভিজে বেড়ে উঠা মরিচের চারা।

   

এত কিছু দেখার আছে এক জনমে শেষ করা যাবে না 

 

কৃতজ্ঞ আমি 

পোড়া চোখে যা দেখলাম সবই রয়ে যাবে

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...