সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দাদুর চিড়িয়াখানা

 দেরাদুনের আমাদের যে বাড়ি  সেই বাড়ি আর   বাগান সব কিছুর হর্তাকর্তা ছিল দাদু।

একটা বট গাছ শুধু আমার ছিল।

 বট গাছটা  একদম বুড়ো আর প্রায় দানবের মত সাইজ । দাদুর বয়স ছিল ৬৫। এই বয়সে দাদু গাছে চড়তে পারত না, তাই আমি ওটার মালিক হয়েছিলাম আমি।

নইলে হয়তো দিত না।

বট গাছটা আমাদের বাড়ির চেয়ে পুরানো। দাদুর চেয়ে পুরানো। দেরাদুন শহরের চেয়ে পুরানো। হিমালয়ের  উপত্যাকার মতই পুরানো এটা।

আমার প্রথম বন্ধু ছিল একটা ছোট্ট- ধূসর রঙের কাঠবিড়ালী। বেচারা বাগানেই থাকত। আমি  ওকে না দেখার আগ পযন্ত   ভাল প্রাইভেসি নিয়েই  ও ছিল।

 প্রথম দিন যে আমাকে দেখে ভয় পায়নি অমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে আমার হাতে এয়ার গান না দেখে খানিক ভরসা যে পেয়েছিল সেটা বলতে পারি।  নিয়মিত ওর জন্য বিস্কুট আর কেকের টুকরো নিয়ে যেতাম। ধীরে ধীরে ওর ভয় ভেঙ্গে গেল ,আর আমার হাত থেকে খাবার নেয়া শুরু করলো।

এমন কি আমার পকেটে ঢুকেও আঁতিপাঁতি করে খুঁজত খাবার টাবার কিছু আছে নাকি।

কাঠবিড়ালীটা ছিল একদম পিচ্চি। বয়স কম।

ওর বন্ধু- বান্ধব আর আত্মীয় স্বজনরা নিশ্চয় ওকে বোকা ভাবত। কারন ও মানুষকে বিশ্বাস করে।

বসন্ত নামে দারুন একটা মৌসুম আছে। 

সেই মৌসুমে বট গাছটায় হাজারে বিজারে লাল রঙের পিচ্চি পিচ্চি ডুমুরের মত ফল ধরত। আর সেই ফল খাওয়ার লোভে হরেক রকম পাখী এসে ভিড় করতো বটগাছের ডালা পালায়। 

গোলাপি পালকের বুলবুল, ঘন ঘাসের রঙের টিয়া আর জামফলের মত রঙের কাক। ওরা সারাক্ষণই নিজেদের মধ্যে হল্লা ম্ললা করে ঝগড়া করতো। 

লাল  ডুমুরের মৌসুমে বট গাছটার আশে পাশে থাকার উপায় ছিল না।পুরো  সড়কের মধ্যে ওটাই ছিল কোলাহলপূর্ণ একটা বাজে জায়গা।

বট গাছটার মাঝাঁমাঝি জায়গায় একটা তক্তার মত লাগিয়েছিলাম। 

যেই দুপুরগুলোয় তেমন একটা গরম পড়ত না সেই দুপুরে গিয়ে বসে থাকতাম। বই পড়তাম।যেমন ধর- ট্রেজার আইল্যান্ড, হাকলবেরি ফিন , মৌগলির গল্পটা, নানান রকম গোয়েন্দা গল্প।

 মোটকথা মিকচার পড়া ।

যখন পড়তে ভাল না লাগতো তখন অলস ভাবে বট গাছের ডালাপালার দিকে চেয়ে থাকতাম। 

দিদিমাকে দেখতাম জামা কাপড় কাচার পর রোদে দিচ্ছে।

 আমাদের বাবুর্চিটা ফল বিক্রেতার সাথে ঝগড়া করছে। দাদু বাগানের গাঁদা ফুলগুলো দেখে বিরক্ত হয়ে গজগজ করছে। বিরক্ত হবারই কথা। এই মৌসুমে ইংল্যান্ডের বাগানগুলো ভর্তি থাকে হলুদ হলুদ গাঁদা ফুলে। 

অথচ আমাদের বাগানে তেমন হচ্ছে না।

বট গাছে বসে থাকার সময় রোমাঞ্চকর তেমন কিছুই হত না।

কিন্তু গরমের এক দুপুরে দারুন একটা ঘটনা হল।

বাগানের ভেতরে বিশাল একটা কেউটে সাপ আর একটা বেজি মরণ লড়াই করছিল তখন।

ঠিক বরাবর সামনে বট গাছে আমি বসা।

এপ্রিলের দুপুর । বাতাস গরম। 

দাদু বাড়ির ভেতরে ঝিমাচ্ছে। আমারও কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছিল। ভাবছিলাম বাড়ির পিছনে পুকুরে গিয়ে খানিক সাঁতার কেটে আসব কিনা।

তখনই সাপটা এসে ঢুকেছিল বাগানের ঝোপের ভেতরে। একটু আরামের আশায়। ভাগ্য ভাল বেজিটা তখনই এসেছে।

 নইলে ?

দুপুরের উজ্জল আলোতে দেখতে পেলাম ওরা চেয়ে আছে , একে অপরের দিকে। 

বেজিটা তিন ফুট লম্বা, ধূসর। চালাক আর লড়াকু। আর কেউটে সাপটা ও দক্ষ আর অভিজ্ঞ। আলোর গতির চেয়ে দ্রুত নড়তে পারে। বিশাল ধারালো লম্বা দুই দাঁত আছে ওর। বিষে ভর্তি। কামড়েই মৃত্যু। 

মরণপণ লড়াই ছিল  সেটা ।

ছয় ফুট লম্বা কেউটে সাপটা বুকে ভর দিয়ে তিন ফুট পযন্ত উঁচু হচ্ছিল এক একবার। ভয়ংকর হিস হিস শব্দ করছিল।

 দুই  ভাগে ভাগ করা লম্বা জিভটা বের করে কুলার মত মাথাটা মোচড়াচ্ছিল ঘন ঘন। 

বেজিটার ঘন লোম ওকে বাঁচিয়ে দিচ্ছিল কেউটের কামড় থেকে।

কেউটে দুলছিল ধীরে ধীরে।

চেষ্টা করছিল বেজির নড়াচড়ার একটা ছক ধরতে। যাতে কামড় বসাতে পারে।আর বেজিটার সম্পদ ছিল ওর কাঁচের পুঁতির মত উজ্জল দুই চোখ। 

নজর রাখছিল কেউটের কুলার মত ফণার দিকে। 

দ্রুত সামনে পিছনে জায়গা বদল করছিল । বার বার ব্যর্থ হচ্ছিল কেউটের মরণ ছোবল।

মজার ব্যাপার হল কোত্থেকে যেন একটা শালিক আর বুনো কাক এসে বাগানের এক কোনে ক্যাকটাস গাছের উপর বসে ওদের লড়াই দেখছিল।

 সেই সময় একবার দ্রুত ছোবল দিল কেউটে। মনে হল, এই বার আর বেজি ভাই বাচবে না।

কিন্তু ব্যর্থ হল কেউটে। ঠিক তক্ষুনি এক সাথেই চিৎকার করে উড়ে গেল শালিক আর বুনো

কাকটা। ওরা একই সাথে আঘাত করলো কেউটের মাথার পিছে।

কয়েক ফোঁটা রক্ত ঝিকিমিকি করে উঠল কেউটের পিঠে।

শালিক আর বুনো কাকটা উড়ে গিয়ে আবার বসে রইলো ক্যাকটাস গাছের উপরে।

নিরাপদ জায়গায়।

একই ঘটনা আবার হল।

পরের বারও কেউটে ছোবল দিল।

বুনো কাক আর শালিক বিকট চিক্কুর দিয়ে উড়ে গিয়ে একই সাথে ঠোকর দিল কেউটের

পিঠে। চক্কর মেরে উড়ে চলে এলো নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় ক্যাকটাস গাছের উপর।

তিন বারের সময় অঘটন ঘটলো। ওদের সময়ের হিসাবে খানিক গোলমাল হল।

কেউটের পিঠে কামড় দিয়ে শালিকটা ফিরতি পথ ধরে উড়ে গেল। মাত্র এক মুহূর্ত  দেরি করে ফেলেছিল কাকটা।

চাবুকের মত ঝলসে উঠলো কেউটে।

আঘাত খেয়ে বাগানের বিশ ফুট দূরে গিয়ে পড়ে রইলো কাকটা।

আবার লড়াই বাঁধল কেউটে আর বেজির।

তবে কেউটে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ছিল বেজির সামনে। আর বেজির সাহস বাড়ছিল। 

বার বার  থাবা দিয়ে আঘাত করে যাচ্ছিল কেউটের শরীরে।

এক সময় দড়ির মত নিথর হয়ে গেল কেউটে।

শালিক পাখিটা নেমে এলো ক্যাকটাস গাছের উপর থেকে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে পরীক্ষা

করলো কেউটের মৃতদেহ। কর্কশ গলায় ডাক দিয়ে অভিনন্দন জানালো বেজিটাকে।

তারপর উড়ে চলে গেল।

ততক্ষণে আমি গাছ থেকে নামার সাহস পেলাম।

দৌড়ে চলে গেলাম বাড়ির ভেতরে।

হাপাতে হাঁপাতে সব বললাম দাদুকে।

সব ঘটনা শুনে দাদুর খুশি দেখে কে। 

খুবই খুশি হল কারন আমাদের বাগানে একটা বেজী আছে। বাগানে একটা বেশি থাকলে সাপ খোপ আর ভয়ে আসে না।

 সেদিন থেকেই নিয়ম করে রান্নাঘর থেকে বেজিটার জন্য খাবার দেয়া শুরু হল। খাবার নিয়ে ঝোপের পাশে রেখে দিতাম। বেজি এসে খেয়ে যেত। 

দাদু কখনই বেজিটাকে পোষ মানানর চেষ্টা করেননি। কারন পোষা বেজির চেয়ে বুনো বেজি ভাল কাজ করে।এরপর থেকে যখনই আমি বট গাছে বসে থাকতাম  তখনই বেজিটাকে দেখতে পেতাম।

বাগানের চারিদিকে ব্যস্ত সমস্ত ভঙ্গিতে ছোটাছুটি করছে।

একবার দেখি ওর মুখে একটা বড় সাদা ডিম। বুঝতে পারলাম আমাদের রান্নাঘর থেকেই

চুরি করেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হল বেচারা কখনই পাখির বাসা থেকে ডিম চুরি করেনি।

আর দিদিমা ও ডিম চুরির অপরাধে ওকে তিরস্কার করেনি।

কেউটে সাপ মেরে আগেই নিজের বাহাদুরি প্রমান করেছে সে।

বেজিটার ভয়ে কখনই কোন সাপ ঢুকতো না আমাদের বাগানে।

বট গাছে  বসলেই বেজিটার বাগান পাহারা দেয়ার কাজ পরিষ্কার দেখতে পেতাম।

বট গাছে শুধু আমি একা থাকতাম তা কিন্তু না। কাঠবিড়ালীটা তো ছিলই। আর ছিল একটা সাদা ইঁদুর। 

সাদা ইঁদুরটা দাদুর। বাজার থেকে চার আনা দিয়ে কিনে এনেছিল । আমিই ওটাকে নিয়ে বট গাছের তক্তার উপর গিয়ে বসতাম। 

কাঠবিড়ালী আর সাদা ইঁদুরটার মধ্যে বেশ ভাল দোস্তি হয়ে গিয়েছিল। ওরা সার্কাসের ক্লাউনের মত বুড়ো বট গাছের ঝুরি বেয়ে উঠা নামা করতো। কাঠবিড়ালীটা বাসা বানানোর জন্য জায়গা খুঁজছিল।

প্রথমে চেষ্টা করছিল আমার জামার পকেটে বাসা বানাতে। 

প্রতেকবার জামা পাল্টানর সময় দেখতাম আমার পকেট থেকে শুকনো খড়কুটো আর ঘাস ঝুরঝুর করে পড়ছে। 

এর মাঝে একদিন দিদিমার উলের চাদরটা হারিয়ে গেল। পুরা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল।

না।

কোথাও পাওয়া গেল না। একদম হাওয়া হয়ে গেছে।

পর দিন বাগানে আসতেই খেয়াল করলাম বট গাছের গোঁড়ায় কী   যেন একটা চকচক করছে। 

তদন্ত চালাতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম গর্তের কাছে উল বোনার একটা কাঁটা পরে আছে। 

আর  গর্তের ভেতরে ঠাসা উলের সেই চাদরের টুকরো টুকরো অংশ।

সেই উলের বিছানায় শুয়ে আছে তিনটে পিচ্চি বাচ্চা কাঠবিড়ালী।

দারুন ব্যাপার তো।

দাদুর চিড়িয়াখানার সদস্য বাড়ল। 

রাস্কিন বন্ড -এর Grandfather’s Zoo গল্পের ছায়া অবলম্বনে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...