দশ
বিছানায় আধা অচেতন অবস্থায় শুয়ে ছিল শিশির। মাথার ভিতরে যন্ত্রণা। যেন মাথার ভেতরে হাতুড়ি দিয়ে নিয়মিত ছন্দে আঘাত করছে কেউ।
গাড়ির শব্দ শুনে মেঘা দৌড়ে গেল জানলার সামনে। চোখ বড় বড় করে বলল, ‘ আরও তিনজন এসেছে। দুটো মেয়ে । আর মোটা মধ্যবয়স্ক একটা লোক। কিন্তু কারা এঁরা?’
টালু মালু করে জানালার সামনে চলে এল শিশির। চোখ কুঁচকে বাইরের দৃশ্য দেখল কয়েক মুহূর্ত।
‘এই মেয়ে এখানে কেন?’ বিড়বিড় করে বলল, ‘ এ তো বিখ্যাত ধনী ব্যবসায়ী আলম খন্দকারের মেয়ে। এখানে কী করছ?’
এক লহমায় ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল ওর কাছে। ‘ মেঘা ওরা মেয়েটাকে কিডন্যাপ করেছে। আমি শিওর। আর নিরাপদে লুকিয়ে রাখার জন্য আমাদের বাড়িটা ব্যবহার করবে গুন্ডারা। কঠিন আইডিয়া। পুলিশ সারা ঢাকা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজবে। সারা দেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজবে। কিন্তু এই জায়গার কথা ভুলেও ভাববে না। কারও মাথায়ই আসবে না এই জায়গার কথা।’
***************************************
দুপুর তিনটের খানিকটা পর হোটেল ছাড়ল কেশু। দারুণ রকম বখশিস দিল দারোয়ান আর রুম সার্ভিস ছেলেটাকে।
বাইরে গনগনে রোদ। চৈতালি বাতাসে ধুলো উড়ছে। গাড়ি চালাচ্ছে নবীগঞ্জের দিকে ।
পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আবারও ভাবছে। অনেক বছর অ্যাকশনে নেমেছে । কেমন যেন চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে বুকের বাম দিকে । জীবনে প্রথমবার মতো নিজের ভেতরে আত্মবিশ্বাসের অভাব অনুভব করল। বুকের বাঁ দিকটা চেপে মনে মনে ভাবল - বুড়ো হয়ে গেছ তুমি কেশু। কিন্তু এখন পিছিয়ে যাওয়ার আর কোন উপায় নেই। মানিকের উপরে পুরোপুরি ভরসা রাখা যায়। সুন্দরভাবে সব সামাল দিতে পারবে।
নির্জনবাস বাড়ির সামনে যখন গাড়ি থামল, পোকা এগিয়ে এল কেশুকে রিসিভ করার জন্য।
‘সব ঠিক আছে ?’ জানতে চাইল কেশু। ‘প্রথমেই আমার গাড়িটা লুকিয়ে ফেলার ব্যবস্থা কর।’
তখনই নীচতলার দরজা খুলে গেল । বাইরের গরম রোদের আলোর মধ্যে চলে এলো মানিক। মানিককে দেখে পুরনো মেজাজে ফিরে গেল কেশু । পাশে পুরোনো দিনের একটা লোক থাকলে যেমন লাগে আর কি !
‘সব ঠিক আছে ওস্তাদ । তবে শিশির বাবু খানিকটা অসুস্থ।’
‘কেন কী হয়েছে?’
‘পোকা মেরেছিল।’
দুই চোখ জ্বলে উঠল কেশুর। পোকার দিকে কটমট করে চেয়ে বলল- ‘মেরেছ কেন ?’
‘সাহেব বউয়ের সামনে হিরো হবার চেষ্টা করেছিল। বাধ্য হয়েই দাওয়াই দিতে হয়েছে।’ মিনমিন করে বলল পোকা।
‘কী অবস্থা এখন ?’
‘আগের চেয়ে ভাল’
‘উনার কাছে নিয়ে চলো আমাকে।’
নিচতলার ড্রয়িং রুমের সোফায় সবাই বসে আছে । দরজার সামনে পিস্তল হাতে পাহারা দিচ্ছিল রুইতন । আক্ষরিক অর্থেই একটা সিংহের মতো কামরার ভিতরে ঢুকল কেশু ।
ভেতরের আবহাওয়া আরামদায়ক । নিঃসঙ্গ সোফায় বসতে বসতে শিশিরের দিকে চেয়ে পাক্কা ব্যবসায়ীদের মত বলল, ‘ আমার শুভেচ্ছা নিন। আমার এক লোক আপনার সাথে বাজে ব্যবহার করেছে, সেজন্য ক্ষমা চাইছি আমি।’
‘কে আপনি?’ জানতে চাইল শিশির। ‘এই মানুষগুলো কী করছে আমার বাড়িতে ?’
‘নাম ধাম আপাতত বাদ থাকুক।’ হাসি মুখে বলল কেশু। ‘আমাকে শুধু একটু সাহায্য করবেন আপনি।’
‘কী ধরনের সাহায়্য চাইছেন ? তাছাড়া আপনার ভাব চক্কর দেখে তো মনে হচ্ছে না কোন রকম সাহায়্য দরকার।’
‘দরকার। এই খেলায় আপনি মোটেও দুধভাত না। আপনার রোল অনেক বড়। আমি অনেক বেশি ভাগ্যবান যে দেশের সবচেয়ে ধনী লোকের একমাত্র মেয়েটাকে অপহরণ করতে পেরেছি। আপাতত আপনার বাড়িতে থাকব আমরা। আর আপনি দয়া করে মেয়েটা বাবার সাথে যোগাযোগ করবেন এবং ভদ্রলোকের কাছ থেকে দশ কোটি টাকা মুক্তিপণ হিসাবে তুলে এনে আমার হাতে দেবেন।’
হতভম্ব শিশির তাকিয়ে রইল কেশুর মুখের দিকে।
‘আপনার একটা বাচ্চা আছে তাই না?’ শয়তানের মতো হাসল কেশু। ‘ আণ্ডা বাচ্চা আমিও পছন্দ করি । শিশু মানেই যীশু । কৃষ্ণ। বাচ্চাদের বিপদে ফেলতে চাই না বুঝলেন। কিন্তু আমার একটা ত্যাঁদড় লোক আছে। পোকা । ও বেচারা বাচ্চা -মহিলা কিছুই কেয়ার করে না। সব সমান ওর কাছে। মানুষকে মারতে পছন্দ করে। সাইকো না কি বলে না ইংরেজিতে ?- সেটাই । আপনার মত লেখকের ভাষায় পোকা হচ্ছে নরকের কীট।’
‘কিন্তু তৈমুর খন্দকার সাহেব এত সহজে টাকা দেবেন না।’ হতাশ গলায় বলল শিশির।
‘এটা যে খন্দকার সাহেবের মেয়ে সেটা আপনাকে কে বলল ?’ গলার স্বর কয়েক ধাপ চড়ে গেল কেশুর। দুই চোখ কুঁচকে গেছে।
‘সবাই চেনে মেয়েটাকে।’ ক্লান্তির ছাপ শিশিরের গলায়। ‘বিখ্যাত বাপের মেয়ে। আপনি এত সহজে পার পাবেন না সাহেব।’
‘কোনও সমস্যা হবে না।’ কেশু বলল । ‘আপনি মেয়েটার বাপের সাথে কথা বলবেন। বোঝানোর দায়িত্ব আপনার। যদি টাকা না দেয় ধরে নেব আপনি ভদ্রলোককে ভালো মতো পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলতে পারেননি। টাকা দিতে হবে ক্যাশ। আমি জানি খন্দকার সাহেব কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে পারবেন। হয়তো উনার বাড়িতেই নানান জায়গায় পাঁচ দশ কোটি টাকা পড়ে আছে। ট্যাক্স মেক্স দেয় না এই দেশের বড় লোকেরা। আর কালো টাকার তো অভাব নেই । টাকার পোঁটলা আমার হাতে তুলে দিলেই আপনার খেলা শেষ। একদম সহজ একটা কাজ তাই না ? ’
‘একদম। মুদির দোকান থেকে পাঁচ টাকার ধনিয়ার গুঁড়া কেনার মত সহজ।’ এত বিপদের মধ্যেও টিটকারিটা না মেরে পারল না শিশির।
এবার চেহারাটা ভয়ঙ্কর করে তুলল কেশু। ‘ যদি খন্দকার সাহেব টাকা না দেয়। কিংবা পুলিশে খবর দেয় ।আর পুলিশ যদি গন্ধ শুঁকে শুঁকে এই বাড়ি পর্যন্ত চলে আসে তবে আপনার বউ বাচ্চা আর খন্দকারের মেয়েকে খুন করে আমরা বাতাসে গায়েব হয়ে যাব।’
উঠে দাঁড়াল কেশু। লাল চোখে কয়েক মুহূর্তে চেয়ে রইল মেঘার দিকে।
তারপর বের হয়ে গেলো বাইরে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন