১৮
সে সময় বোধহয় আমার শনির দশা চলছিল।
অসুখ আর ভালো হয় না ।
দিনরাত শুয়ে বসে থাকার মধ্যে কী যে যন্ত্রনা !
শরীরে একদম বল পাই না । মা ছিল তাই বেঁচে গেছি।
কত রকমের পথ্য রান্না হল আমার জন্য !
রেণুর ঠাকুমার টোটকা নিতে আরও দুই এক বার যেতে হয়েছিল ওই বাড়িতে । আগের মতই একগাদা লতাগুল্ম কচলাতে হয়েছিল বসে বসে।
অবশেষে মায়ের ভালবাসায় হেরে যম চলে গেল। যাওয়ার আগে দুয়ারের বাইরে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলে গেল- ফির মিলেঙ্গে চলতে চলতে ।
একসময় শরীরটা ভালো হলো।
তবে পড়াশোনা অনেক পিছিয়ে গেছি ।
ইন্টারমিডিয়েট এর দ্বিতীয় বর্ষ উঠলাম। কিন্তু সিলেবাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ ও শেষ হয়নি।
অসুখ থেকে উঠে আবিষ্কার করলাম, সারা পৃথিবী যেন অনেক দূর এগিয়ে গেছে । আমি শুধু একা পিছিয়ে গেছি।
কবির সাঙ্গোপাঙ্গ অনেক বেড়ে গেছে।
শহরের সবকটা চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেন। বেচারা সম্ভাবত আমার উপর বিরক্ত । একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন । লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সাথে জড়িত। এবং ঢাকার কোন আবৃত্তিকারের সাথে যৌথ অ্যালবাম বের করার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন।
আর বিপিন?
ওই ছাগল এখনো সম্পাদকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছে । কবে কোন সম্পাদক ওর কবিতা পড়ে খুশি হয়ে ছাপবে কে জানে?
সব জায়গায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । শুধু মাত্র কবি বা লেখক হবার জন্যও মানুষ এত চেষ্টা করে ?
ধন্য ছেলের অধ্যাবসায় ।
সবার প্রতি একরাশ বিরক্তি নিয়ে একা একা ঘুরে বেড়াই শহরে।
অসুখে ভুগে ভুগে আমার কী হয়েছে কে জানে !
বই খাতা খুলে দেখি পড়াশোনা মাথায় ঢুকছে না। মাথা ঘোলাটে হয়ে গেছে । পরীক্ষা মাত্র তিন মাস বাকি। সিলেবাসের চার ভাগের এক ভাগ ও শেষ হয়নি।
খুব অসহায় লাগে ।
বেশিক্ষণ পড়তে পারি না। সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ।
একটা জিনিস আবিস্কার করলাম সেই সময়। যেটা বাকি জীবন কাজে লেগেছিল ।
পৃথিবীর সব সম্পর্ক পরিবর্তনশীল । সময়ের সাথে সাথে মানুষ নতুন নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পুরনো সম্পর্ক সহজেই ভুলে যায়। ঠিক যেন গতকালের সূর্যাস্তের মতো ।
শুধু মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক টিকে থাকে । আর কিছু না টিকে না ধূলামাটির এই পৃথিবীতে।
গর্ভে সন্তান আসার সাথে সাথে মা যে অনুভূতি পালন করে সেটা বয়ে যায় সারা জীবন।
কে জানে হয়তো মরণের পরেও !
মা পাশে থেকে সাহস দিতে লাগল। বলল- ইচ্ছা করলে পরীক্ষা ড্রপ দিতে পারি।
রাজি হলাম না।
লেংচে লেংচে ব্যাচে পড়তে যাই ।
বগলে বই নিয়ে বাড়ি ফিরি। তারপর বই খাতা সব টেবিলের উপর ধপাস করে ফেলে ছাদে চলে যাই ।
জলের ট্যাংকের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকি । কিছু ভাল লাগে না।
আমাদের বাড়ির সামান্য দূরে রেললাইন।
চব্বিশ ঘন্টায় শুধু একটা ট্রেন যায় । তাও গভীর রাতে।
কুউউ ঝিঁক ঝিঁক শব্দ করে।
শুনি।
রেণুর সাথে দেখা হয় না।
কড়ির মত সাদা গাড়িতে চেপে ও কলেজে যায়। বেহালা বাজানো শিখতে যায় ।
কবি আর বিপিন দু'জনকেই হারিয়ে ফেলেছি। মিল্লাত ভাই হাল ছেড়ে দিয়ে ওনাদের আটা-ময়দা দোকানে ঢুকে পড়েছেন। মহল্লা ছেড়েই চলে গেছেন ।
পরীক্ষা দিলাম ।
কেমন হয়েছে জানি না । শুধু পরীক্ষা হলে বসে উদাস হয়ে যেতাম । ফেলে আসা দিনগুলোর কথা অযথাই মনে পড়তো পরীক্ষা হলেই ।
আশ্চর্য কান্ড !
পরীক্ষা হলে যে অচেনা স্যার গার্ড দিতেন তারা অবাক হয়ে বলতেন -এই ছেলে লিখছ না কেন? প্রশ্ন কমন পড়েনি? শরীর খারাপ?
আমি থতমত খেয়ে কলম মুঠো করে আবার লিখতে চেষ্টা করতাম।
আগে কী লিখেছি সেটা আবার পড়তে হতো কী লিখছি সেটা বোঝার জন্য !
এমন কারো কখনো হয়েছে কিনা কে জানে, পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিকে চোখের সামনে অতীত ভেসে উঠছে ।
পরিষ্কার দেখতে পেতাম - বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। আমি জানালার পাশে বসা । বৃষ্টির রেণুগুলো বালটিক সাগরের স্যামন মাছের ডিমের মতো । রান্নাঘরে কী যেন রান্না করছে মা। লোভাতুর ঘ্রাণ ।
কচু আর গিমা শাকের দঙ্গল জানালার বাইরে ভিজছে ।
প্রত্যেকবার চমক ভাঙ্গে স্যারের ডাকে।
পরীক্ষা শেষ করে অলস পায়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরি ।
এক দিন শেষ হলো পরীক্ষা।
মস্ত বড় এক বিপদ গেল যেন।
যে কাহিনি আপনাদের শোনাতে বসেছিলাম সেই কাহিনীর মূল চরিত্র সবাই হারিয়ে গেছে।
বিশ্বাস করুন । কেউ নেই। কাউকে পাই না। হঠাৎ আচমকা ধূমকেতুর এক একজনকে পাই । ছায়া ছায়া। দুর্লভ অর্কিডের ফুল ফোটার কয়েক মুহূর্ত পর যেমন ঝরে যায়, তেমনই ।
লোকমুখে বিপিনের খবর পাই। সারাদিন টিউশনি করে ও ।
সকালে বের হয়। দুপুরে ভাত খেতে আসে । খাওয়া শেষ করে আবার পথে নেমে পড়ে । রাত পর্যন্ত টিউশনি করে শেষে একটা রাজনৈতিক দলের আপিসে আড্ডা মেরে বাড়ি ফেরে।
এই রাজনৈতিক সংগঠনের কাজ ধনীদের ঘৃণা করা এবং দেশের সব কাজে বিদেশি শক্তির হাত আছে বলে সন্দেহ করা।
এতকিছুর পরও বেহায়ার মত কবির বাড়িতে গিয়েছিলাম । একবার।
বাইরে থেকে উঁকি মেরে দেখি একাগাদা চ্যাংড়া পোলাপানদের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন।
সিগারেটের ধোঁয়ার ধূসর । যেন জুয়ার আড্ডা। ভিতরে ঢুকেনি।
ফিরে এসেছি ।
প্রতিটা মানুষ ক্যারিয়ার শুরু করার সময়ই পাগলাটে কিছু ভক্ত পায়। সেই ভক্তরাই তাকে মাথায় তুলে দেয় । সফলতার স্বাদ পেতে সাহায্য করে । পরে সফলতার স্বাদ পেতেই সেই পুরানো ভক্তদের ভুলে যায় অনায়াসে।
কবি সকল হয়নি। তবে সফল হওয়ার জন্য কতগুলো নোংরা কায়দা জানতে হয় সেগুলো রপ্ত করছেন।
ফর্মুলা গুলির মধ্যে একটা হচ্ছে , প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকদের সাথে গায়ে পড়ে বন্ধুত্ব অর্জন করা এবং তাদের তেল দেওয়া ।
আমাদের দেশের সফল কবি-লেখকগণ একটা জিনিস খুব পছন্দ করেন। সেটা হলো পোষা চাটুকার রাখা বা একগাদা তোষামুদে মানুষের বৃত্তে বন্দি থাকা ।
ব্যতিক্রমঃ হয়তো কেউ আছে। সম্ভাবনা খুব কম । থাকলে সেটা একটা দুর্লভ উদাহরণ হবে।
পোষা চাটুকারদের ভিড়ে নিজেকে সহজ , সফল এবং স্বচ্ছন্দ বোধ করেন ওনারা । এবং প্রিয় কোন চাটুকারকে হালকা-পাতলা ব্যাকআপ দেন। কখনো কখনো । তবে খুব বেশি না। যাতে নতুন লেখক বা কবি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে না ওঠে ।
আমাদের কবি তখন আগারে বাগাড়ে সব লেখক-কবিদের সাথে বন্ধুত্ব লাভের জন্য পাগল হয়ে উঠলেন।
বেশিরভাগ সময় খবর পেতাম অমুক লেখকের বাড়িতে মদ্যপান করতে গেছেন । বা তমুক পত্রিকার কবিদের সাথে বসে দুপুরে খাওয়া সারছেন।
আখেরে হয়তো লাভ হয় এতে !
খ্যাতি লাভের জন্য নোংরা ইঁদুর দৌড় সব পেশায় আছে। আর লেখালেখির জগত তো সেই কবে থেকে নোংরা হয়েছে ।
বই পত্রে পড়েছি, দলাদলি নাকি রবীন্দ্রনাথের আমলেও ছিল । তাকে ব্যঙ্গ করে কত মানুষ কত কবিতা লিখেছিল। জীবনানন্দ দাশ বেঁচে থাকতেই শুনতেন, সবাই বলত তার কবিতা নাকি কবিতা হয় না ।
একজন কবি সাহিত্যিক হতে চায় কেন? অর্থ উপার্জনের জন্য? খ্যাতির মোহে? নাকি শুধুমাত্র নিজেকে প্রকাশ করার জন্য? অথবা সবগুলোই?
আমি প্রথম কোন লেখককে দেখেছিলাম পৌর পাঠাগারে । মোটেও অমায়িক লোক বলে মনে হয়নি তাকে । গম্ভীর অহংকারী চেহারা। পুরো দুনিয়ার উপর যেন বিরক্ত । যারা তাকে ঘিরে রেখেছিল অটোগ্রাফের লোভে তাদের উপরও বিরক্ত।
ভালো লাগেনি তাকে ।
শুধু মূর্খের দেশে লিখে বলে অমন ভাব?
আমি চেষ্টা করলেও কোন কবি সাহিত্যিক হতে পারব না জানি। তবে বিশ্বাস আছে জীবিকার জন্য যা করব ভালবেসেই করব।
এই সব চেনা ছক বদলে গেল এক লহমায় ।
বাবার ব্রেইন স্টোক হল এক রাতে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন